নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রচর্চা কোন পথে?

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০৪

একটি অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক তরুণের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য অশালীন শব্দ। কারো মুখ থেকে অশালীন শব্দ বের হওয়া অর্থাৎ কাউকে গালি দেওয়া কোনো ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো একজন নাগরিক কত ভদ্র ভাষায় সরকারের সমালোচনা করছে তা শোনা নয়, বরং নাগরিকের ভাষা যখন ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কিভাবে তা মোকাবিলা করে। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থক ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য গাজীপুরের বাসিন্দা সিফাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা সরকারকে সেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সিফাত তাঁর ফেসবুক ভিডিওতে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য যে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কেবল ব্যক্তির গালিগালাজ হিসেবে দেখলে আসল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হবে। আসল প্রশ্ন হলো নাগরিকের ক্ষোভের জবাবে রাষ্ট্র তার অভিযোগ শুনবে, নাকি তার কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করবে?



​সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সিফাত বাসায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে তিনি অত্যন্ত কটু ও অশালীন ভাষায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপি, এর নেতাকর্মী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সমালোচনা করেন। এরপর স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সহায়তায় স্হানীয় গাছা থানা পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং পরে একটি পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। তিনি ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না তদন্তের পর্যায়ে তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। ​এখন প্রশ্ন হলো সিফাত কী বলেছেন সেটিই কি রাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ, নাকি তিনি যে অভিযোগ করেছেন সেটি প্রথম উদ্বেগ হওয়া উচিত? একটি রাষ্ট্রের সব নাগরিক শালীন শান্তিনিকেতনি ভাষায় কথা বলবে এমনটি মোটেও নয় কেউ কেউ চরম অশালীন ভাষায়ও সমালোচনা করতে পারে এবং করবে । কিন্তু সেই সমালোচনার বিষয়টি সত্য কি না, তা দেখাই সরকারের প্রথম কাজ। সিফাতের ভাষা রাষ্ট্র পছন্দ না ও করতে পারে, কিন্তু বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তা এই মুহূর্তে দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রাহকেরই বাস্তব অভিযোগ। সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রথমে জিজ্ঞাসা করা বিদ্যুৎ বিলটি কেন এত বেশি এলো? সাধারণ মানুষের সমস্যার দিকে না তাকিয়ে " আমাকে এভাবে প্রশ্ন করার সাহস কীভাবে পায় " এই প্রশাসনিক মানসিকতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।



​আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান কার্টুনিস্ট মেহেদী ফারুকের আঁকা নিজের একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করে রাজনৈতিক কার্টুন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে একই বছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসেও তিনি একই ধরনের বার্তা দেন। সেই অবস্থান দেখে আমরা সাধারণ মানুষ আশান্বিত হয়েছিল যে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাবে, যেখানে ক্ষমতার সমালোচনা সহ্য করা হবে।​নিশ্চয়ই সিফাতের ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির আদর্শ নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে কাউকে অপমান করার সীমাহীন অধিকার নয়। মিথ্যা তথ্য, মানহানি বা সহিংসতার উসকানির ক্ষেত্রে আইনগত দায় অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন অপরাধে কোন আইন প্রয়োগ হবে ? ​বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এই অধিকার নিরঙ্কুশ না হলেও সীমাবদ্ধতা আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইন রাষ্ট্রের গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য তৈরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটু ও অশালীন বক্তব্য প্রকাশের সাথে সেই আইনের সম্পর্ক কী, তা রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করতে হবে।​আইনের শাসনের সৌন্দর্য এখানেই যে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বেশি, তার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যার দায়ও তত বেশি। পূর্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে অপব্যবহার দেখা গেছে, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্হায় যদি পুরোনো সেই ভয়কে নতুন কোনো আইনের পোশাক পরায় তবে রাষ্ট্রের পরিবর্তন কোথায়? ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই রাষ্ট্রচর্চা বদলায় না রাষ্ট্রচর্চা বদলায় তখনই, যখন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি নিজের বিরুদ্ধে বলা কথাকেও আইনের সীমার মধ্যে সহ্য করতে শেখেন।​ক্ষমতায় থাকলে প্রশংসা সব সরকারই পায়। কিন্তু সেই প্রশংসা সরকারের সক্ষমতার আসল পরীক্ষা নয়। আসল পরীক্ষা তখনই, যখন সাধারণ নাগরিক রাগ করে বলে " আমার বিদ্যুৎ বিল কেন এত বেশি? নিত্যপণ্যের দাম এত কেন? কর্মসংস্থান নাই কেন? দেশে এত দুর্নীতি কেন? " রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাশীনদের কেন প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলে কঠিন পরীক্ষা তখন হয়, যখন এই প্রশ্নের ভাষা হয় অশালীন তখন ই তো রাষ্ট্র পরিচালকদের আসল পরীক্ষা । সরকার কি গালির জবাব গালি বা গ্রেপ্তার দিয়ে দেবে, নাকি জনগণের সমস্যার সঠিক সমাধান করবে? এই দুই আচরণের মধ্যেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং ক্ষমতা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রের আসল পার্থক্য।



​সিফাতের ঘটনা যদি সত্যিই বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল প্রশাসনিক তদন্ত। মিটার রিডিং, বিলিং সাইকেল, কিংবা বিতরণ কোম্পানির হিসাবে কোনো ভুল ছিল কি না তা পরীক্ষা করা কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে অভিযোগের বিষয়ের চেয়ে অভিযোগকারীর পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি সরকারের সমর্থক হলে " সমস্যা " বিরোধী হলে " ষড়যন্ত্র " আর কটু কথা বললে " রাষ্ট্রবিরোধী " মনে করার এই মনোভাব অত্যন্ত বিপজ্জনক। পুলিশ, সরকার বা ক্ষমতাসীন দল কেউই এককভাবে রাষ্ট্র নয় রাষ্ট্র হলো সংবিধান, আইন, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সমষ্টি। ​অবশ্যই কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি থাকতে পারে, তবেই তা স্পষ্ট হতে হবে। সিফাতের বিরুদ্ধে যদি সত্যিই গুরুতর কোনো অপরাধের প্রমাণ থাকে, তবে আদালতে তা উপস্থাপন করা হোক এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তি হোক। কিন্তু যদি তাঁর বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ও সমালোচনা করাই গ্রেপ্তার ও পরবর্তীতে পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার মূল কারণ হয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ আজ একজন সিফাত, কাল অন্য কেউ। আজ বিদ্যুৎ বিল, কাল দ্রব্যমূল্য, পরশু দুর্নীতি কিংবা মুক্ত সাংবাদিকতা প্রতিটি অস্বস্তিকর কণ্ঠকে যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, তবে নতুন বাংলাদেশ আবার পুরোনো ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্তে ফিরে যাবে। ​রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নাগরিক সমালোচনা করলে দলীয় কর্মীরা যদি সেটিকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নিয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করেন, তবে দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা ভেঙে যায়। পাশাপাশি চাটুকারিতার সংস্কৃতিও বিপজ্জনক। ক্ষমতার চারপাশে থাকা সুবিধাভোগীরা সবসময় বলে " সবকিছু ভালো চলছে "। কিন্তু একজন ক্ষুব্ধ নাগরিকের অশালীন কথার ভেতরেও এমন কিছু বাস্তব সত্য থাকতে পারে, যা ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায় না। শাসকের উচিত সেই বাস্তবতাকে শুনতে শেখা। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে ক্ষমতা স্থায়ী নয়। যে আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি আজ তৈরি করা হচ্ছে অতীতে ও তৈরি হয়েছে ভবিষ্যতে নিজেরাই তার মুখোমুখি হতে পারেন এমনকি নিকট অতীতে ও হয়েছেন । তাই সমালোচকদের দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার না করে আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সরকার চাইলে এই ঘটনা থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারত। তারা বলতে পারত " আপনার ভাষা আমরা সমর্থন করি না, কিন্তু আপনার অভিযোগ আমরা তদন্ত করব। অপরাধ থাকলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে, কিন্তু কেবল সমালোচনার কারণে হয়রানি করা হবে না। " এমন বক্তব্যই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনে। জনগণ নির্ভুল শাসন দাবি করে না জনগণ চায় ভুল হলে সরকার তা স্বীকার করবে, অভিযোগ তদন্ত করবে এবং সমালোচকের ওপর প্রতিশোধ নেবে না। সাধারন নাগরিক ব্যঙ্গ করলে ক্ষমতা যদি হাসতে পারে, সেটি শক্তি। সাংবাদিকের কঠিন প্রশ্নের জবাবে সরকার যদি তথ্য দিয়ে উত্তর দেয়, সেটি শক্তি। সাধারণ তরুণ ক্ষুব্ধ হলে পুলিশ না পাঠিয়ে তার সমস্যার সমাধান করাই আসল শক্তি। অন্যদিকে একটি ফেসবুক পোস্ট দেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি আতঙ্কিত হয়ে নাগরিককে অপরাধী বানানোর পথ খোঁজে, তবে তা শক্তির পরিচয় নয় তা অনিরাপত্তার পরিচয় তা ব্যর্থতার পরিচয়।

​রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য অত্যন্ত অসম। নাগরিকের হাতে কেবল মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আর কণ্ঠস্বর আছে আর রাষ্ট্রের হাতে আছে পুলিশ, মামলা ও কারাগার। এই অসম ক্ষমতার কারণেই রাষ্ট্রকে বেশি সংযত ও সহনশীল হতে হয়। সিফাতের ভাষা যদি অপরাধ হয়ে থাকে, আইনের নির্দিষ্ট ধারায় তার বিচার হোক। তবে একই সাথে তাঁর তোলা বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগেরও সত্যতা যাচাই করা সরকারের দায়িত্ব। কারণ নাগরিকের ভাষা অশালীন হতে পারে, কিন্তু নাগরিকের সমস্যা বা অভিযোগ কখনো অশালীন হয় না। ​চব্বিশের গনঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় হলো রাষ্ট্র কি নাগরিককে ভয় দেখিয়ে শাসন করবে, নাকি নাগরিকের আস্থা নিয়ে দেশ চালাবে? সরকার বদলানো সহজ, কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো কঠিন। সিফাত আব্দুল্লাহর ঘটনায় ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিচার করবে নতুন বাংলাদেশে ক্ষমতার মুখ বদলেছে নাকি ক্ষমতার সংস্কৃতির ও বদল হয়েছে ।



মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.