| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমান সময়ে একটি বিরাট পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে যা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং আত্মোপলব্ধির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ পনের বছরের আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থার পতনের পর এ দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যাদেকে আজ আমরা " জেন- জি " হিসেবে অভিহিত করছি তারা নিজেদের আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে এক নতুন মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। এই আত্মোপলব্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক ও আধিপত্যবাদী বয়ানের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ। সম্প্রতি ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীত পাশের দেওয়ালে অঙ্কিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি কালো কালি দিয়ে বিকৃত ও নষ্ট করার ঘটনা কিংবা জাতীয় সংগীত পরিবর্তন বা পুনর্মূল্যায়নের জোরালো দাবি কোনো বিচ্ছিন্ন আকস্মিকতা নয়। এটি মূলত দীর্ঘ আড়াই শত বছরের বঞ্চনা, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মেহনতি ও স্বাধীনতাকামী মানুষের বহুদিনের সুপ্ত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে নতুন করে রচনা করার সময় এসেছে, যাতে কোলকাতার এক পাক্ষিক ও আধিপত্যবাদী বয়ানের বাইরে গিয়ে পূর্ব বাংলার নিজস্ব ইতিহাস ও ভূ-রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সঠিক রূপরেখা উন্মোচন করা সম্ভব হয় ।
বাংলাদেশের এই স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্বের ইতিহাস ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো আকস্মিক ফল নয়। এর শিকড় গাঁথা রয়েছে সুদূর অতীতে। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ১২০৪ সালে বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির গৌড় বিজয়ের মাধ্যমে এই ভূখণ্ডে প্রথম একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তৎকালীন গৌড় যা বর্তমান বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ সীমান্ত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল দিল্লির সুলতানি বা তুর্কি সাম্রাজ্যের সরাসরি অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে এক স্বাধীন সুলতানি আমলের গোড়াপত্তন করেছিল। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ থেকে শুরু করে স্বাধীন সুলতানি ও পরবর্তী সুবেদারি আমলে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা বিকশিত হয়েছিল। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমল কিংবা পরবর্তীতে মুঘল সুবেদার ইসলাম খান কর্তৃক ১৬১০ সালে ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থানান্তরের ঘটনা এই ভূখণ্ডের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিকে ত্বরান্বিত করেছিল। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা এবং কাটারাগুলো এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলের সেই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যেখানে টাকায় আট মণ চাল তিন টাকায় গরু পাওয়া যেত তা মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক একটি স্বাবলম্বী, স্বাধীন এবং জনকল্যাণমুখী অর্থনীতিরই সুফল ছিল। কিন্তু ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতার সূর্য নিভে যায় এবং শুরু হয় এক দীর্ঘতম ঔপনিবেশিক শোষণের অধ্যায় । ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭২ সালে তাদের প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে কলকাতায় স্থানান্তর করে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ঢাকা রাতারাতি তার প্রশাসনিক গুরুত্ব হারিয়ে একপ্রকার পরিত্যক্ত ও অবহেলিত জনপদে পরিণত হয়। ঔপনিবেশিক প্রভুরা কেবল রাজধানী স্থানান্তর করেই ক্ষান্ত হয়নি ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত লর্ড কর্নওয়ালিসের " চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত " আইনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার নিঃস্ব, মজলুম ও চাষাভূষা কৃষককুলের ওপর এক নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক নিপীড়ন চালিয়েছিল। এই অঞ্চলের কৃষকরা অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম নিন্ম বর্ণের হিন্দু যাদের প্রায় সকলেই প্রান্তিক কৃষক, আর ঔপনিবেশিক আনুকূল্যে কলকাতায় বসে গড়ে ওঠা নব্য জমিদার শ্রেণি ও বাবু সমাজ ছিল এর প্রধান সুবিধাভোগী। এ দেশের কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনি ও নীল চাষের রক্তঝরা ঘামে অর্জিত শোষণের উদ্বৃত্ত অর্থে কলকাতার প্রাসাদগুলো আভিজাত্যের আলোয় সেজে উঠেছিল, আর পূর্ব বাংলার জনপদ নিমজ্জিত হয়েছিল অন্ধকূপের অন্ধকারে।
এই তীব্র অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ কখনো মাথা নত করেনি। ইতিহাসের প্রতিটি পর্বে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যারা জলন্ত প্রমান ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের দাবানল যখন সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পরতে শুরু করে তখনই এর প্রভাব পড়েছিল ঢাকায়। ঢাকার লালবাগ কেল্লায় অবস্থানরত ৭৩ নম্বর দেশীয় পদাতিক রেজিমেন্টের বাঙালি সিপাহীরা ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ব্রিটিশ নৌসেনা এবং ইউরোপীয় স্বেচ্ছাসেবকরা লালবাগ কেল্লায় অবস্থানরত বিদ্রোহী সিপাহীদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালায়। এই অতর্কিত হামলায় কেল্লার ভেতরে সিপাহীদের সাথে ব্রিটিশ বাহিনীর এক রক্তক্ষয়ী ও তীব্র লড়াই সংঘটিত হয়। অসম এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বেশ কয়েকজন সিপাহী শহীদ হন এবং বাকিদের অনেকেই বন্দি হন। ঢাকার বুকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এই সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং পরবর্তী সময়ে আন্টাঘর ময়দানে বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কে নির্বিচারে চালানো ফাঁসির নির্মম হত্যাকাণ্ড পূর্ব বাংলার মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী ও রক্তাক্ত অধায় হয়ে রয়েছে।যা ছিল এ দেশের মানুষের আজাদি ও মুক্তির আকূতি। অন্যদিকে, মীর নেসার আলী তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন কেবল ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না তা ছিল মূলত ভূমিপুত্রদের অর্থনৈতিক অধিকার ও জমিদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে এক আপসহীন সশস্ত্র সংগ্রাম। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা কিংবা ফরায়েজী আন্দোলন প্রমাণ করেছিল যে পূর্ব বাংলার মানুষ ব্রিটিশ ও দেশীয় দালালদের যৌথ শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি ও সাহস রাখে।
এই দীর্ঘ দেড় শতাব্দীর বঞ্চনার পর ১৯০৫ সালে যখন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ঢাকাকে রাজধানী করে " পূর্ববঙ্গ ও আসাম " নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করলেন, তখন এ অঞ্চলের মানুষের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়। নতুন এই প্রদেশের ভূখণ্ডে ঢাকা কেন্দ্রিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক বিশাল রূপরেখা তৈরি হয়। দীর্ঘকাল ধরে কলকাতার কৃপাপ্রার্থী থাকা পূর্ব বাংলার অবহেলিত মুসলমান, নিন্ম বর্ণের হিন্দু সহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের এটিই ছিল প্রথম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ। এই নতুন রাজনৈতিক বলয়কে সুসংগঠিত করতে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
কিন্তু কোলকাতার কায়েমি স্বার্থবাদী জমিদার, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এই প্রশাসনিক সংস্কার ও পূর্ব বাংলার উত্থানকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ঢাকাকে কেন্দ্র করে এ দেশের কৃষকদের ভাগ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলে কোলকাতায় তাদের আধিপত্য খর্ব হয়ে যাবে এই ভয়ে তারা উন্মাদ হয়ে ওঠে। ফলে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তারা তথাকথিত " স্বদেশী আন্দোলন " শুরু করে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চালিকা শক্তিতে পরিণত হন। তিনি " আমার সোনার বাংলা " গান রচনা করে, রাখি বন্ধন উৎসব পালন করে এবং বন্দে মাতরম ধ্বনি তুলে চারণকবি মুকুন্দ দাসকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে তোলেন। তিনি ও তাঁর সমমনা সাহিত্যিকরা প্রচার করতে থাকেন যে বঙ্গভঙ্গ মানে " বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ " । অর্থাৎ যে পূর্ব বাংলার কৃষকদের রক্তঘাম ও জমিদারির খাজনা থেকে কোলকাতার বাবুদের বিলাসিতা চলত, সেই পূর্ব বাংলাকে তারা কোনোমতেই একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন প্রশাসনিক সত্তা হিসেবে দেখতে চাননি।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন এক চরম রূপ ধারণ করে যে, ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানি মেরি দিল্লির রাজকীয় দরবারে আগমন উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক ভাবে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার ফলে ১৯০৫ সালে সৃষ্ট " পূর্ববঙ্গ ও আসাম " প্রদেশটি বিলুপ্ত করা হয় এবং বাংলাকে পুনরায় একত্রিত করা হয়। একই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কোলকাতা থেকে পরিবর্তন করে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯১১ সালের ২ ডিসেম্বর রাজা পঞ্চম জর্জ ভারতে আসেন এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এই অবস্থান কালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর " জন গণ মন " গানটি রচনা করেন, যা ১৯১১ সালের ২৭ ডিসেম্বর নিখিল ভারত কংগ্রেসের অধিবেশনে পরিবেশন করা হয়। এই গানে " জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্য বিধাতা " বলে সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধিপতিকে সম্মান জানানো হয়েছিল এবং রাজার প্রতি এই ভক্তি ভাবনা তৎকালীন রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ব্রিটিশদের পক্ষেই কাজ করেছিল। এই আনুগত্য ও তোষণ নীতির পুরস্কারনস্বরূপ ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ রাজ প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা "নাইট " উপাধিতে ভূষিত করেন। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার ফলে পূর্ব বাংলার মুসলমান ও কৃষকরা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়। তাদের এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ যখন ঢাকা সফর করেন তখন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এবং নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশদের কাছে ঢাকায় একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তাঁর নিজস্ব প্রায় ৬০০ একর জমি অকাতরে দান করেন, যার ওপর ভিত্তি করে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় । কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো যখন এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনও কোলকাতার তথাকথিত সুশীল ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এর তীব্র বিরোধিতা করে। তৎকালীন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সহ কলকাতার বাবুরা তীব্র ভাষায় অভিযোগ করেছিলেন যে, ঢাকাইয়া " চাষাভূষাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় করলে শিক্ষার মান ও আভিজাত্য নষ্ট হয়ে যাবে"।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক অবদান বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় স্বীকৃত হলেও, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও সামাজিক অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভাবেই কোলকাতা কেন্দ্রিক, অভিজাত ও জমিদার তান্ত্রিক। তাঁর অজস্র উপন্যাস, গল্প কিংবা প্রবন্ধে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবন সংগ্রাম, গ্রামীণ সংস্কৃতি কিংবা তাদের ঈদের আনন্দ কখনো ঠাঁই পায়নি। বিখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমেদ গভীর ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন যে, " রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যাকাশে কতবার শারদীয় পূজার ঢাক বেজেছে, কিন্তু কোনোদিন এ দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের ঈদের চাঁদ ওঠেনি "। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরম মুসলিম বিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িক লেখালেখি নিয়ে যখন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তখনও রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভাষার তথাকথিত ধ্রুবদী আধিপত্যকেই সমর্থন জুগিয়েছিলেন। তদুপরি, কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নাটোর এবং রাজশাহীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশাল জমিদারি বিস্তৃত থাকলেও তিনি এ অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের শিক্ষার জন্য কোনো স্থায়ী বিদ্যাপীঠ বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি বরং তাঁর সমস্ত অর্জিত অর্থ ও স্বপ্নের " শান্তিনিকেতন " প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে। বিখ্যাত সংবাদকর্মী, লোকশিল্পী ও সমাজসংস্কারক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ওরফে কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত " গ্রামবার্তা প্রকাশিকা " পত্রিকার পাতা উল্টালে ঠাকুর বাড়ির জমিদারি থেকে চড়া হারে খাজনা আদায়, জরিমানা এবং প্রজা নিপীড়নের অসংখ্য লোমহর্ষক বিবরণ পাওয়া যায়। এছাড়া পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তাঁর " ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় " গ্রন্থে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন কীভাবে কেবল মুসলিম পরিচয় থাকার কারণে শান্তি নিকেতনের মতো জায়গায় তাঁকে বৈষম্য ও মানসিক অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ইতিহাসের আরেকটি বড় বৈপরীত্য হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্বিমুখী ও সুবিধাবাদী প্রয়োগ। ১৯০৫ ও ১৯১১ সালে যারা " আমার সোনার বাংলা " লিখে অখণ্ড বাংলার তোড়জোড় করেছিলেন এবং বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিলেন, সেই একই রাজনৈতিক বলয় ১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয়, তখন কিন্তু অখণ্ড বাংলার দাবিতে ন্যূনতম সায় দেয়নি। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন বাংলার রূপকার জননেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন পশ্চিম বংলা ও পূর্ব বাংলাকে মিলিয়ে একটি ‘স্বাধীন সার্বভৌম " অখণ্ড বাংলা " গঠনের ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তখন কলকাতার বাবু ও কংগ্রেস নেতারা সেই প্রস্তাবকে নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করে বাংলা দ্বিখণ্ডিত করে ভারতকে উপহার দেন। অর্থাৎ ১৯০৫ সালে যখন মুসলমানদের স্বার্থে পূর্ব বাংলা আলাদা হচ্ছিল, তখন তারা বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের দোহাই দিয়ে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন আর ১৯৪৭ সালে যখন বঙ্গীয় মুসলমানদের একটি নিজস্ব রাষ্ট্র বা ভূখণ্ড তৈরি হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ এলো, তখন তারা নিজেরাই বঙ্গমাতাকে দ্বিখণ্ডিত করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করলেন। এর মাধ্যমে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁদের তথাকথিত " বাঙালি জাতীয়তাবাদ " আসলে ছিল ঢাকাবিরোধী এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদেরই এক সুপরিকল্পিত প্রসারিত রূপ।এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে কখনো সমর্থন জানাননি। তিনি সুনির্দিষ্ট ভাবে মন্তব্য করেছিলেন, হিন্দিই হতে পারে ভারতের একমাত্র জাতীয় ভাষা। এছাড়া তাঁর রচিত " শিবাজী উৎসব " কবিতায় তিনি ঔপনিবেশিক বা ভিনদেশী শক্তির বিরুদ্ধে একজন মারাঠা শাসককে কেন্দ্র করে সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদী ও ধর্মভিত্তিক ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক দিক থেকে তিনি কখনোই পূর্ব বাংলার ভূরাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য কিংবা স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রচিন্তাকে মনেপ্রাণে সমর্থন করেননি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল এ দেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, অর্থনৈতিক সমতা ও মানবিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ষাট ও সত্তরের দশকের ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদী প্রভাব পাকাপোক্ত করতে রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন সাহিত্যিক হিসেবে নয় বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে সুপরিকল্পিতভাবে প্রবর্তন করার প্রয়াস চালানো হয়। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ইবনে গোলাম সামাদ ইঙ্গিত করেছিলেন যে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক চাপ ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই তৎকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে " আমার সোনার বাংলা " গ্রহণ করতে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছিল। যে গানটি মূলত ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য ও ঢাকাকেন্দ্রিক বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে রচিত হয়েছিল, সেই গানটিকেই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে রূপান্তর করাকে বহু ইতিহাসবিদ ও ভূরাজনীতিবিদ ঢাকার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতি এক গভীর রাজনৈতিক বৈপরীত্য হিসেবে মনে করেন।
ইতিহাসের নিখুঁত পর্যালোচনা করলে আজ এই সত্য প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আসল আত্মপরিচয় যার সাথে তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িয়ে রয়েছে তার সাথে ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী রাজনীতির কোনো আদর্শিক মেলবন্ধন নেই। সম্প্রতি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথে লাখো ছাত্র-জনতাকে উজ্জীবিত ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, " চল চল চল " কিংবা " বিদ্রোহী " র মতো বিপ্লবী ও সংগ্রামমুখী পঙক্তিমালা। নজরুল ইসলাম, যার প্রতিটি শব্দে শোষিত, বঞ্চিত ও মজলুম মানুষের মুক্তির অদম্য গান বাজে, তিনিই ছিলেন এ দেশের মাটি, জল ও সাধারণ মানুষের প্রকৃত সংগ্রামের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে সময়ে সময়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রয়োজনে জাতীয় প্রতীক, সংবিধান কিংবা জাতীয় সংগীতের পর্যালোচনা ও সংস্কার করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা রাশিয়ার মতো বিশ্বশক্তির ইতিহাসেও রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের প্রয়োজনে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বহু ঐতিহাসিক নজির বিদ্যমান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সংবিধান বা জাতীয় প্রতীক কোনো অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তন ধর্মীয় বাণী নয়, বরং তা জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও রাজনৈতিক চেতনার দর্পণ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বের নামে কোনো ধরনের একপাক্ষিক আধিপত্য বা আধিপত্যবাদী নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া চলেনা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সমতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ।
অতএব ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান উত্তর নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আজ সময় এসেছে সমস্ত ঐতিহাসিক সত্যকে কোনো রাখঢাক ছাড়াই নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করার। ১৯০৫ সালে ঢাকাকে অবহেলা করার যে ঔপনিবেশিক চক্রান্ত শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে যেভাবে পূর্ব বাংলার মেহনতি মানুষের রক্ত ও অবদানকে ঢেকে ফেলার হীন চেষ্টা করা হয়েছে, সেই ভুল ও একপাক্ষিক বয়ান থেকে আমাদের অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শহর এবং এ দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের আত্মত্যাগের সঠিক ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পাঠ্যপুস্তক ও জাতীয় চেতনায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব, ঢাকাকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড়কে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েই আগামীর আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বাধীন বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪১
মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ বলেছেন: জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে দিলো
AI Overview
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের জন্য একাধিক ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ (Independent States) গঠনের দাবি জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব সেই প্রস্তাব পরিবর্তন করে একাধিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটিমাত্র রাষ্ট্র (অর্থাৎ 'State' বা পাকিস্তান) হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করেন।
এই পরিবর্তন নিয়ে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাবের ‘খৎনা করে ফেলেছেন’ (অর্থাৎ মূল প্রস্তাবের বহুবচন ‘States’ বা রাষ্ট্রগুলোকে কেটে ছেঁটে একবচন ‘State’ বা একক রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছেন)।