নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জেট টু এ

জেট টু এ › বিস্তারিত পোস্টঃ

ক্ষুদ্রঋণের কুফল ও অপব্যবহার দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিপর্যস্থ করেছে, গরীবকে করেছে আরো গরীব ।

১০ ই ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ১০:৫৪



বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে প্রায় তিন হাজার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশে এমআরএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬০০। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বিভিন্ন ভাবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

‘ক্ষুদ্র ঋণ’ ও ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ সাম্প্রতিক সময়ের খুব আলোচিত পরিভাষা। অভাবগ্রস্থ মানুষের দরিদ্রতাকে কাজে লাগিয়ে ঋণের প্রদানের মাধ্যমে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনার নাম ‘ক্ষুদ্র ঋণ’। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন তো হয় না বরং তৃণমূল পর্যায়ে সুদের বিস্তৃতি ঘটে, তৈরি হয় নতুন কাবুলিওয়ালা।

গরীব নারী-পুরুষ গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাকসহ একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোন বিনিয়োগ করতে পারেনি। সব সংস্থা নানা প্রলোভন ও মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে দরিদ্র্য জনগণকে ঋণ নিতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। ঋণের টাকা কোথায় ব্যয় হয় সে খবর কেউ রাখে না। অনেকে ঋণের টাকায় যৌতুক, সন্তানের পড়া-লেখা, ধার-দেনা শোধ ও গৃহস্থালী আসবাবপত্র কেনায় খরচ করে ফেলে। পরবর্তীতে সুদে আসলে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। ঋণগ্রহীতার জীবন যাত্রার মানে উন্নয়ন ঘটেনি। স্বামীর অগোচরে ঋণ নেয়ায় তালাক ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। যারা হাঁস-মুরগি পালন করতো তারা বড় খামার করতে পেরেছে এমন নজিরও নেই। বরং ঋণ গ্রহীতার উপকারের চাইতে চুড়ান্ত পর্যায়ে ক্ষতি ডেকে নিয়ে আসে। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সুদের বিস্তৃতি ঘটছে তৃণমূল পর্যায়ে।

একা গ্রামীণ ব্যাংক ২৫৬৪টি শাখার মাধ্যমে দেশের ৮১ হাজার ৩১৭টি গ্রামে ৮৩ লাখ সদস্যকে ঋণের জালে আটকে ফেলেছে। এ খাতে গ্রামীণ ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের উচ্চ হার বানিজ্যিক ব্যাংকের চাইতেও বেশী।

চালু হওয়ার ৩৭ বছর পরও এমন কোন প্রমাণ নেই, যাতে মনে হতে পারে ক্ষুদ্রঋণ গরীব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারে। তবে এটা প্রমাণিত সত্য ঢাকডোল পিটিয়ে যাঁরা এ দেশের গরীব মানুষের দারিদ্য দূর করতে মাঠে নেমেছে, তারা শত শত কোটি টাকার মালিক বনেছে। ক্ষুদ্রঋণ যদি সফল হতো তা হলে আজো কেন ৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে? গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম ঋণ গ্রহীতা চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জোবরা গ্রামের সুফিয়া খাতুন বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। চিকিৎসার টাকা যোগাতে তার পরিবারের সদস্যরা দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করেছে।

বাংলাদেশের হতদরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ৬৭ শতাংশই ব্যয় করে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে কোন ভূমিকাই রাখে না। তাই ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব নয়। সম্প্রতি দেশের দূর্যোগপ্রবণ আট জেলার খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পরিচালিত এক জরিপের প্রতিবেদনে এ তিক্ত সত্য ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি দেশের দুর্যোগপ্রবণ রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় এ জরিপ চালানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ জরিপ প্রতিবেদন ‘দারিদ্র বিমোচনে দরিদ্র ব্যক্তিদের সম্পদ প্রদানে’র ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হতদরিদ্র ব্যক্তিদের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই ঋণগ্রস্থ। এদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দেনাগ্রস্থ শুধু স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর কাছে।

ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ২৯ শতাংশ হতদরিদ্র চিকিৎসা বাবাদ খরচ করে ও ১৭ শতাংশ দৈনন্দিন খাবার কেনে। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণের ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় মৃতের সৎকার, বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং জরুরি সংকট মোকাবেলায়। হতদরিদ্রের ঋণের উৎস সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০ শতাংশ মানুষ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ঋণ নেয়। দাদনের ঋণ নেয় ১০ শতাংশ। এছাড়া ১৪ শতাংশ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে, ৭ শতাংশ ব্রাক থেকে, ১২ শতাংশ বিভিন্ন এনজিও থেকে ও মাত্র ১ শতাংশ সাধারণ ব্যাংক থেকে।

এন.জি.ও দের অর্থের যোগানদাতা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। পৃথিবীর সর্বত্র তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিকাশ, খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার, ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন মুৎসুদ্দী শ্রেণী তৈরি করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পুঁজি পাহারা দেয়া তাদের লক্ষ্য। বিগত ২৫ বছরে ঋণ বা সাহায্যের নামে এদেশে এসেছে ৫০হাজার কোটি টাকা, তার ৭৫ ভাগ অর্থাৎ ৩৭.৫০ কোটি টাকা তারাই নিয়ে গেছে, বাকি ১২.৫০ হাজার কোটি টাকা এ দেশে একটি লুম্পেন ধনিক শ্রেণী গঠনে খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে তিনটি প্রতিষ্ঠান। এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই মেরুকরণ একটি প্রবণতা। ক্ষুদ্রঋণ-বাণিজ্যের মধ্যে পুঁজিবাদী-ব্যবস্থার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই একচেটিয়াকরণ ও কেন্দ্রীভবনই ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সংক্ষেপে কথাগুলো থেকে বিষয়টি স্পষ্ট, লগ্নিপুঁজির বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ মডেল খুবই সফল এবং এর বিস্তার অব্যাহত। মূলধারার ব্যাংকিংয়ে ক্ষুদ্রঋণ একটি শক্তিশালী অংশ। ক্ষুদ্রঋণের মধ্য দিয়ে যে বিপুল মূলধন সংবর্ধিত হচ্ছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে, তা বৃহৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বহুজাতিক পুঁজির বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্রঋণ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সফল মাধ্যম। বাংলাদেশে মোবাইল টেলিফোন, বীজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রমাণ আছে। কিন্তু যে মূল দাবি নিয়ে ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা শুরু, সেই দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্যের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ কোনো সমীক্ষায়ই পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি শাখা মুনাফা অর্জন করে, শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ শাখা শতভাগ ঋণ আদায় করে। কিন্তু ঋণগ্রহীতারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছে, এমন শাখার শতকরা হার মাত্র দুই ভাগের সামান্য ওপরে।

সরকার সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার বেঁধে দেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের জাল যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে, তাতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তাতে যথেষ্ট সংশয় আছে। ক্ষুদ্রঋণের বৃহৎ সংস্থাগুলোর প্রভাব এত বেশি, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষেও এসব সংস্থা নিয়ে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান এবং সেগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে ক্ষুদ্রঋণের জালে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ কীভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, সে সম্পর্কে সরকারের কোনো অনুসন্ধান কিংবা সমীক্ষা নেই।

সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। প্রতিভাত হয় জনগণের ভালো-মন্দ দেখাশোনার দায়-বোধ সরকারের আদৌ নেই। সরকার আসলে জনগণের নয়। সরকার শুধু ক্ষমতাসীন বিত্তশালীদের। তাই বিত্তহীনদের স্বার্থ সংরক্ষণে তাদেরই সচেতন হতে হবে। নিজেদের হক্ব আদায়ে নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ১২:০১

প্রকৌশলী রিয়াদ হাসান চৌধুরী বলেছেন: ক্ষুদ্রঋণ যদি সফল হতো তা হলে আজো কেন ৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে?


আপনার এই কথায় যুক্তি আছে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.