| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
[এই পোস্টটি Click This Link লেখায় রাজীব নুরের কমেন্ট ও হুমায়রা হারুনের পরামর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাদের দুজনের জন্য অজস্র ধন্যবাদ, অপরিসীম শুভকামনা।]
পাওলো ফ্রেইরে (Paulo Freire) ১৯৭০ সালে তাঁর বিখ্যাত বই Pedagogy of the Oppressed-এ শিক্ষাদানের প্রচলিত পদ্ধতিকে 'ব্যাঙ্কিং মডেল (Banking model)' বা 'শিক্ষা-জমা পদ্ধতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা এই মডেলটির এক বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই।
১. শিক্ষক যখন 'দাতা' আর শিক্ষার্থী 'খালি পাত্র'
আমাদের দেশে সাধারণত ক্লাসরুমে শিক্ষককে মনে করা হয় জ্ঞানের একমাত্র উৎস বা 'সবজান্তা'। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের মনে করা হয় একটি 'খালি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট'। শিক্ষক ক্লাসে এসে তথ্য বা নোট দেন (যা ফ্রেইরের ভাষায় 'ডিপোজিট' বা জমা), আর শিক্ষার্থীরা তা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লেখে। এখানে শিক্ষার্থীর নিজস্ব কোনো চিন্তার জায়গা থাকে না।
২. সৃজনশীলতা ও প্রশ্ন করার অভাব
শিক্ষার্থীরা যখন শুধু সাজানো নোট মুখস্থ করে, তখন তাদের critical thinking বা উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা লোপ পায়। তারা প্রশ্ন করতে শেখে না যে, ‘এটি কেন এমন?’ বা ‘এটি কি বদলানো সম্ভব?’ এটিই ব্যাঙ্কিং মডেলের নমুনা। বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার বা গাইড বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই মডেলকে আরও শক্তিশালী করেছে।
৩. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব (চুপ থাকার সংস্কৃতি)
ফ্রেইরে বলেন, এই মডেলটি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি হাতিয়ার। যেমন, আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়, ‘বড়রা বা শিক্ষকরা যা বলছেন তাই ঠিক, কোনো পাল্টা প্রশ্ন করবে না।‘ এটি বড় হয়েও আমাদের সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধা দেয়। এই পদ্ধতি মূলত আমাদের এমনভাবে তৈরি করে যেন আমরা অন্যের তৈরি করা সমাজ ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে চলি, কিন্তু তা পরিবর্তনের চেষ্টা না করি।
৪. উত্তরণের পথ: বিশ্ব পাঠ
‘বিশ্ব পাঠ’ হলো পড়ার প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবার একটি উদ্যোগ। কেবল বই পড়ার বদলে পুরো পৃথিবীকে পড়া বা বোঝা, যাতে আমাদের চিন্তা অন্যদের ঠিক করে দেয়া সীমানায় আটকে না থাকে। মানব মনকে বিকশিত হতে দিলে চারপাশের জগতকে আরও গভীরভাবে জানা সম্ভব হয়। এই মুক্ত চিন্তাই আমাদের মনের সঠিক বিকাশ ঘটায় এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও শান্তি বজায় রেখে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
আমাদের দেশে জিপিএ-৫ পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যেখানে শুধু তথ্য মাথায় ঢোকানো হয় । এটি হলো ব্যাঙ্কিং মডেল। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত এমন, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু বইয়ের অক্ষর পড়বে না, বরং নিজের সমাজ ও পৃথিবীকে বুঝতে শিখবে এবং তাকে আরও উন্নত করার স্বপ্ন দেখবে।
২|
৩০ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:৩০
রাজীব নুর বলেছেন: লেখাপড়ার মধ্য আনন্দে আছে। এটা আমি এখন বুঝি। কিন্তু যখন লেখাপড়ার মধ্যে ছিলাম, তখন লেখাপড়া বিরক্ত লাগতো।
৩|
৩০ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮
হুমায়রা হারুন বলেছেন: রাজীব বলেছেনঃ[ লেখাপড়ার মধ্য আনন্দে আছে। এটা আমি এখন বুঝি। কিন্তু যখন লেখাপড়ার মধ্যে ছিলাম, তখন লেখাপড়া বিরক্ত লাগতো।
সবার ক্ষেত্রেই তাই। কারণ লেখা -পড়ার নামে 'পরীক্ষা' নামক একটা আতংক তখন চাপিয়ে দেয়া হতো।
৪|
৩১ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬
আলামিন১০৪ বলেছেন: গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখেছেন, ধন্যবাদ।
আসলে শিক্ষক নিজে না বুঝলে বা মুখস্ত নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত হলে শিক্ষার্থীরা কী বুঝবে?
আমার স্কুল ও কলেজ জীবনের দুইটি ঘটনার উদাহরণ দিই
তখন আমি ঢাকার একটি স্বনামধন্য সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। বিজ্ঞানের শিক্ষক শক্তির নিত্যতা সূত্রের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন-
রাতে আমরা বিদ্যুতের আলোয় লেখা-পড়া করি। বিদ্যুত শক্তি আলোক শক্তিতে আর আলোক শক্তি জ্ঞান শক্তিতে পরিবর্তিত হয়- বুঝলেন কিছু?
কলেজ জীবনে মুক্তিবেগের উদাহরণ দিতে গিয়ে এক অধ্যাপক রকেটের প্রসঙ্গ আনলেন যা ছিল একেবারে নির্জলা ভুল
আসলে শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণী বা নবম গ্রেডে বেতন না দিলে মেধাবীরা এ পেশায় আসবে না। আর যতই আপনি সিলেবাস পরিবর্তন করেন লাভ হবে না
আরেকটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করি- আমাদের সময় ক্লাশ এইট পর্যন্ত সবার ভৃুগোল পাঠ্য ছিল। সেখানে বনভূমি সংক্রাস্ত তথ্য পড়তে গিয়ে পর্ণমোচী আর চিরহরিৎ বনাঞ্চল শব্দ দুটি সামনে আসে। বলা বাহুল্য শব্দ দুটি না বুঝে মুখস্ত করতে হয়েছিল। স্কুলের শিক্ষকদের শুধু পৃষ্ঠা ধরে পড়া মুখস্ত করতে দেয়া আর পড়া আদায় করা ছাড়া আর কিছু যে পড়াতে হয় তা বোধ হয় তারা জানত না।
৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩
আবু সিদ বলেছেন: প্রিয় আলামিন১০৪ ভাই, আপনার কমেন্ট এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনার কমেন্টের সূত্র ধরে এ প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা বলায়ে সুযোগ পেলাম।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও করুন। এটা কেবল পাঠ্য বিষয় (সিলেবাস) বা শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণী বা নবম গ্রেডের বিষয় নয়। এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক বহুমুখী সঙ্কটে নিপতিত। গত ১২ বছরে আমার আরও কিছু সহকর্মীর সাথে আমি সারাদেশে শত শত স্কুল ভিজিট করেছি, এবং অজস্র ক্লাস পর্যবেক্ষণ করেছি। আমরা কাজ করেছি মূলত প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে। স্বভাবত, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও আমাদের সাথে শরীক হয়েছেন অনেক সময়। এই অভিজ্ঞতাটুকুর আলোকে আমি যতটুকু বুঝতে পারি তা এরকমঃ
শিক্ষাব্যবস্থায় এই দুর্যোগ অনেকগুলো কারণে ঘটছে। এর প্রধান প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ -
১। পলিসির দুর্বলতাঃ শিক্ষা ব্যবস্থাটা এখনও কেরানী তৈরির উপযোগী যেটা ব্রিটিশের সময় ছিল। সৃজনশীল মানুষ তৈরির পরিকল্পনা সেখানে নেই। আবার, আমারা যদি চাই যে ক্লাস ৫-পাস শিশু সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারবে তাহলে মূল্যায়ন ব্যবস্থা তেমন হওয়া উচিত। স্কুলের পরীক্ষার যে পদ্ধতি সেখানে মুখস্তবিদ্যা যাচাই করা হয়। [এস এস সি তে সব থেকে ভালো করা শিক্ষার্থীদেরও যদি কোন বিষয়ে ১০ লাইন বাংলায় লিখতে দেয়া হয় তাহলে কয়জন সঠিক ভাবে লিখতে পারবে? অথবা কোন খবরের কাগজের একটা নিবন্ধ বা প্রবন্ধ পড়ে তাদের কয়জন বিশ্লেষণ বা সারমর্ম তৈরি করতে পারবে তা গবেষণার বিষয়।
২। প্রশাসনিক দুর্বলতাঃ বিষয়টা বলতে একটা উদাহরণ দেয়াই যথেষ্ট হবে। একবার, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক কাউকে না জানিয়ে স্কুল ভিজিটে গেলেন। দেখলেন যে সেখানে শিক্ষক নেই। একজন এস এস সি পাশ মেয়ে ক্লাস করাচ্ছে। পরিচালক মহোদয় শিক্ষককে ফোন দিয়ে বললেন, যে মেয়াটা আপনার ক্লাস করাচ্ছে ওর বেতন স্যামনের মাস থেকে ২ হাজার টাকা বাড়ায়ে দিয়েন, ও অনেক ভালো পড়ায়। শিক্ষক তো রেগে আগুন। তিনি বললেন, কে আপনি? পরিচালক মহোদয় বললেন, আপনি তো স্কুলে আসেন না। বাইরে ব্যবসা করেন। স্কুলে এসে দেখেন আমি কে?
৩। স্কুলের অব্যবস্থাপনাঃ ক্লাসে শিক্ষকরা কী পড়াচ্ছেন কেমন পড়াচ্ছেন তা দেখার কেউ নেই। পর্যাপ্ত মনিটরিং ও মেন্টরিং নেই।
৪। শিক্ষাদান পদ্ধতিঃ ক্লাসে বা শ্রেণীকক্ষে ফলপ্রসূ শিক্ষাদান নেই। বেশিরভাগ সময় শিক্ষক/শিক্ষিকা একাই কথা বলে যান। শিশুরা শেখার বিষয়গুলো প্রাকটিস করতে পারে না।
৫। মানবসম্পদঃ শিক্ষক নিয়োগে ভীষণ সমস্যা। একবার এক স্কুলে গিয়ে দেখা গেল যে স্কুলের ক্লাস-৫ এর শিক্ষার্থীরা ক্লাস-৩ এর বাংলা বই পড়তে পারে না। উদ্বেগের ব্যাপার হলো যে এমন একজন শিক্ষককেও পাওয়া গেল যিনিও ক্লাস-৩ এর বাংলা বই পড়তে পারেন না।
এক্ষেত্রে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশে অধিকাংশ চাকরি (বিশেষত, সরকারি চাকরি) যেন এক ধরনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা। একবার কোন মতে ঢুকতে পারলে ব্যাস, জীবন পার। নিজের স্কিল উন্নত করার দিকে আর কারও কোন মনযোগ নেই। একটা উদাহরন দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। আরেকবার আরেকজন সরকারি কর্মকর্তা স্কুল ভিজিটে গিয়ে দেখলেন যে দোতলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ এর মতো। অন্যদিকে, পাশের একটা বেড়ার স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮০০। স্কুলটা কোন কিন্ডারগার্টেন নয়। স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ছেলে-মেয়ে স্কুলটা চালায়। শিক্ষার্থীরা যে যা পারে বেতন দেয়। যারা পড়ায় তারা হয়ত মাসে ৫/৭ বা ৮/১০ হাজার টাকা পায়। তাদের কোন পেনশন বা ভবিষ্যৎ নেই! অন্যদিকে, সরকারী প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষক পাচ্ছেন প্রায় হাজার ৩০ - অন্য সুযোগ সুবিধা তো আছেই!
এগুলোর বাইরে কারিকুলাম বা সিলেবাস, এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে যেগুলো নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী কাজ করা প্রয়োজন। হয়ত আমাদের প্রয়োজন, ২০-২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘ ও কার্যকরী পরিকল্পনা, এবং সবার সহযোগিতা! আমার অভিজ্ঞতা যদিও প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রিক, তবু যতটুকু বুঝতে পারি তাতে মনে হয় হাইস্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় বা কারিগরি স্কুলের অবস্থা এর থেকে বিশেষ উন্নত নয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিকল্পনা এবং অনেক অনেক কাজ করা প্রয়োজন।
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:১২
হুমায়রা হারুন বলেছেন: পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।
অনেক বড় ক্লাশে পড়ার পর একটা শব্দের সাথে পরিচিত হলাম 'প্রশ্ন ব্যাংক'। ওখানে MCQ প্রশ্ন আর উত্তর দেয়া থাকবে। ওগুলো থেকে প্রশ্ন আসবেই আসবে। বই না পড়লেও চলবে।
তখন এই প্রথম দেশে 'MCQ' পদ্ধতি চালু হলো। আমরা এসব টার্ম আগে শুনি নাই। তারপর
ছেলেমেয়েরা বই পড়া বাদ দিয়ে প্রশ্ন ব্যাংক মুখস্থ করে বাংলায় যখন ৯০% মার্ক্স পাওয়া শুরু করলো তখন তো আমাদের আক্কেল গুড়ুম। আমরা তো বাংলায় ৬০% কি সর্বোচ্চ ৬২% পেলে সেই ছাত্রকে দেখতে যেতাম। আর এখন বাংলায় , ইংরাজীতে ৮০% ছাড়িয়ে যাচ্ছে! কি সাংঘাতিক মেধার ছড়াছড়ি।
তারপর আসলো 'গোল্ডেন A'.
আর বুঝবার সাধ্যি আমার নাই।