নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আবু সিদ

আবু সিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

নিজেকে গড়ে তোলা

১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০৩

“খুদী কো কর বুলন্দ ইতনা কে
হর তকদীর সে পহলে
খুদা বন্দে সে খুদ পুছে,
বাতা তেরী রযা ক্যা হ্যায়!”

- বাল-ই-জিবরিল (জিবরাইলের ডানা), ১৯৩৫
মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭–১৯৩৮)

নিজেকে করে তোল এতটা যোগ্য যে
কোন কিছু লেখার আগে তোমার ভাগ্যে
প্রশ্ন করেন খোদা তোমাকেই স্বয়ং,
বান্দা! তোমার ইচ্ছাটাই বল বরং! - (অনুবাদঃ লেখক)


সাধারণভাবে, নিজেকে গড়ে তুলতে মূলত দুটো বিষয়ে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এর প্রথমটি হলো চরিত্র গঠন, আর দ্বিতীয়টি কাজের দক্ষতা অর্জন। চরিত্র গঠন মানুষকে সৎ ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়, যা সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। অন্যদিকে, কাজের দক্ষতা মানুষকে নির্দিষ্ট বিষয় বা প্রযুক্তিতে পারদর্শী করে তোলে। চরিত্র ছাড়া দক্ষতা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে (যেমন: অপরাধে লিপ্ত হওয়া কোনো দক্ষ হ্যাকার)। আর, দক্ষতা ছাড়া শুধু ভালো মানুষ হলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন।

এ বিষয়ে বিখ্যাত উদ্যোক্তা ওয়ারেন বাফেট (Warren Buffett) নীতিবোধ, ও কর্মদক্ষতার সাথে বুদ্ধিমত্তা যোগ করে বলেন, "In looking for people to hire, you look for three qualities: integrity, intelligence, and energy. And if they don't have the first, the other two will kill you."

অর্থাৎ, কাউকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে আপনি তিনটি গুণ খুঁজবেন: একনিষ্ঠতা/নৈতিকতা (Integrity), বুদ্ধিমত্তা (Intelligence) এবং কর্মশক্তি/দক্ষতা (Energy)। তবে তাদের মধ্যে যদি প্রথম গুণটি (নৈতিকতা) না থাকে, তবে বাকি দুটি গুণ আপনাকে ধ্বংস করবে।

এখন প্রথমে চরিত্র গঠনের কথা বলতে গেলে মনে পড়ে ছোট বেলায় শোনা প্রবাদটার কথাঃ "When money is lost, nothing is lost; when health is lost, something is lost; when character is lost, everything is lost."
অর্থাৎ,টাকা-পয়সা হারালে কিছুই হারায় না, স্বাস্থ্য হারালে কিছুটা ক্ষতি হয়, কিন্তু চরিত্র নষ্ট হলে সবকিছু শেষ হয়ে যায়।

সে সময় বাজারে বা বইয়ের দোকানে বাংলাদেশী লেখক ডা. লুতফর রহমানের 'উন্নত জীবন', 'মহত জীবন' এসব বই বিক্রি হত। বিদেশী লেখকদের মধ্যে ডেল কারনেগির বিভিন্ন লেখাও পাওয়া যেত। বর্তমান সময়ে এসে মনে হচ্ছে যে আজকাল সমাজ বা রাষ্ট্র নীতি-নৈতিকতা বা নাগরিকদের চরিত্র গঠন নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। চরিত্র গঠনের বিষয়টা এখন হয়ে গেছে ব্যক্তি বা পরিবার বিশেষের।

যাইহোক, এ দুটো বিষয় আবার তিনটি ভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত হয়। নিচে এ বিষয় তিনটি নিয়ে আলোচনা করা হলো।

১. ব্যক্তি মানুষের সাধনা
কয়েক দিন আগে (October 2026) আমি মাইক টাইসনের (Mike Tyson) একটা ছোট বক্তৃতা দেখছিলাম। সাংবাদিকেরা তাকে প্রশ্ন করলেন যে মুষ্টিযুদ্ধে সর্বকালের সেরা কে? টাইসনের উত্তর, আমি নই। এটা মুহাম্মদ আলী (Muhammad Ali)। টাইসন যাই বলুক না কেন তিনিও সেরাদের একজন।

আলী প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে তার সাধনা শুরু করতেন এবং মাইলের পর মাইল দৌড়াতেন। আর ফাইটিং রিংয়ের প্রাক্টিস তো ছিলই। টাইসনও কম নন। তিনিও কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলেন।

আলী ও টাইসনের কথা ভাবতে ভাবতে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। আমার ছোটবেলা কেটেছিল বাংলাদেশের ছোট এক মফস্বল শহরে। সেসময় সেখানে দুজন সুপরিচিত মানুষ ছিলেন। তাদের আসল নাম কী তা আমি কখনো জানতে পারিনি। কিন্তু লোকজন তাদের একজনকে বলত ‘রুস্তম’ আর একজনকে ডাকত ‘মোশিয়ার’ বলে।

প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে তারা দুজন স্কুলের মাঠে কুস্তি লড়ত। প্রতিবারই তাদের দুজনের জন্য থাকত পুরস্কার! পুরস্কারে কোন কম-বেশি হত না। জেতা ও হারার পুরস্কার একই ছিল! অনেকটা তা কুস্তিতে অংশগ্রহণের জন্য সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো।

রুস্তম থাকত আমাদের বাড়ির পেছনে। এই কুস্তির জন্য সে কী প্রস্তুতি নিত তা আমরা দেখতে পেতাম। যেদিন কুস্তি হবে তার দিন কয় আগে গোসলের আগে সে তেল মেখে একটু হাত-পা ছোড়াছুড়ি করত তার উঠানে। আর মোশিয়ার থাকত বেশ দূরে। তাই তার কী ধরনের প্রস্তুতি থাকত বা আদৌ কোন প্রস্তুতি থাকত কিনা তা আমার কখনো জানা হয়নি।

কুস্তি লড়াইয়ের সময় আসলে শহরের মানুষজন ভিড় করত স্কুলের মাঠে। কিন্তু রুস্তম বা মোশিয়ার কেউই আসলে কুস্তি লড়তে জানত না। তারা তাই চেষ্টা করত নানান কৌশলে মানুষকে হাসাতে। তারা গায়ে চপচপ করে তেল মেখে লড়াইয়ে নামত। এক অন্যের হাত ধরে পেঁচিয়ে ধরার বা হাতের ফাক গলে বেরিয়ে যাওয়ার কসরত দেখাত তারা। তারপর মাটিতে ফেলে হাত-পা চেপে ধরত। দর্শকেরা তখন তালিতে তালিতে মুখর করে তুলত দুনিয়া। সাবাস! বাঘের বাচ্চা! এসবও বলত। তাদের পরিচিতরা 'রুস্তম' 'মোশিয়ার' বলে চিৎকার করত। এতেই কুস্তি শেষ হত। দর্শকেরা আবার পরের লড়াইয়ের অপেক্ষায় থাকত। কিন্তু আসল কুস্তি কিভাবে লড়তে হয় তা শহরবাসীদের জানা ছিল না। তাই যা দেখত তাতেই তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠত!

কর্ম দক্ষতায় আমরা অনেকটা রুস্তম ও মোশিয়ারের মতো। আমরা সাধারনত নিজেদেরকে দক্ষ হিসাবে গড়ে তুলি না। তাই সেই ত্রুটি ঢাকতে তোষামোদ আর তেলবাজি করে সময় কাটিয়ে দিই! কখনো আবার জায়গা মতো উপহার উপঢৌকন পাঠায়!

রুস্তম আর মোশিয়ার নিজেদেরকে কুস্তির জন্য গড়ে না তুললেও মাইক টাইসন বা মুহাম্মদ আলী অনেক যত্নে নিজেদের গড়ে তুলেছিলেন। নিজেকে গড়ে তুলতে একই রকম বা আরও বেশি সাধনা করেছিলেন বোল্ট।

ইউসেইন বোল্ট (Usain Bolt): ইউসেইন বোল্টকে বলা হয় মানবেতিহাসের দ্রুততম মানব। ১০০ মিটার মাত্র ৯.৫৮ সেকেন্ডে এবং ২০০ মিটার ১৯.১৯ সেকেন্ডে শেষ করে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েন। তবে তার এই গতির পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছরের সাধনা ।

বোল্ট যখন ছোট ছিলেন, তখন চিকিৎসকেরা তার মেরুদণ্ড বাঁকা দেখতে পান। শারীরিক এই অবস্থাকে বলা হয় স্কোলিওসিস (Scoliosis) । এর কারণে তার ডান পা বা পায়ের চেয়ে প্রায় আধা ইঞ্চি ছোট ছিল। চিকিৎসকেরা ভেবেছিলেন, এমন হাড়ের গঠন নিয়ে সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক দৌড়ানোই কঠিন, সেখানে বিশ্বসেরা হওয়া একেবারে অবাস্তব!

কিন্তু বোল্ট কখনো হাল ছাড়েননি। শারীরিক দুর্বলতাকে জয় করতে তিনি অভাবনীয় পরিশ্রম শুরু করেন। বোল্ট বছরে ১১ মাস, সপ্তাহে ৬ দিন প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা করে ট্র্যাক ও জিমে ঘাম ঝরান।

এভাবে টানা চার বছর ঘাম ঝরানোর পর ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে বোল্ট মাত্র ৯.৬৯ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেন! ২০০৯ সালে তিনি সেই রেকর্ড ভেঙে করেন ৯.৫৮ সেকেন্ড। বোল্ট বলেন, 'I trained 4 years to run 9 seconds, and people give up if they don't see results in 2 months.' অর্থাৎ, আমি ৯ সেকেন্ডের একটি দৌড়ের জন্য টানা ৪ বছর পরিশ্রম করেছি, আর মানুষ ২ মাসে ফল না পেলেই হাল ছেড়ে দেয়।"

২. সামাজিক প্রেরণা
১৯৭০-এর দশকে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা কোন মানুষের একক চেষ্টায় ঘটেনি। স্টিভ জবস (১৯৫৫- ২০১১) যখন তার প্রথম অ্যাপল কম্পিউটার তৈরির চিন্তা করেন, তখন ক্যালিফোর্নিয়ার সামাজিক চিন্তাভাবনা, প্রযুক্তি-বান্ধব সংস্কৃতি এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের পরিবেশ তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ঐতিহাসিক এই যাত্রার পেছনে তৎকালীন সমাজের বিশেষ অবদান ছিল।

'হোমব্রু’ বা ‘ঘরে তৈরি’ কম্পিউটার ক্লাব (Homebrew Computer Club):
১৯৭০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমী, হ্যাকার ও উদ্ভাবকদের নিয়মিত আড্ডা দেয়ার জায়গা ছিল 'হোমব্রু কম্পিউটার ক্লাব'। এটি ছিল প্রযুক্তিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার এক বিপ্লব । সে সময়ে কম্পিউটার ছিল বড় কোন ঘরের মতো এবং অনেক দামি। সেগুলো কেবল বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক বা বড় সামরিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু হোমব্রু ক্লাবের সদস্যরা বিশ্বাস করতেন: কম্পিউটার প্রতিটি সাধারণ মানুষের ঘরের টেবিলে থাকা উচিত।

এই ক্লাবে তরুণরা নতুন তৈরি সার্কিট বোর্ড নিয়ে আসতেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতেন। জবস ও ওজনিয়াক প্রথম যখন অ্যাপল কম্পিউটারের সার্কিট বোর্ড ডিজাইন করেন, তখন তিনি এই ক্লাবের সবাইকে সেটি দেখান। ক্লাবের বন্ধুদের উৎসাহ ও চাহিদা দেখে জবস বুঝতে পেরেছিলেন যে, সার্কিট বোর্ডটি সাধারণ কোন কাঠের বা প্লাস্টিকের বক্সে ভরে বাজারে আনলে হাজার হাজার মানুষ তা আনন্দের সাথে 'পার্সোনাল কম্পিউটার' হিসাবে ব্যবহার করবে।

১৯৭০-এর দশকের ছকভাঙা চিন্তা:
স্টিভ এমন এক সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় হয়ে উঠছিলেন, যখন সেখানকার তরুণ সমাজে প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন কিছু তৈরি করার প্রবল আকাক্ষা ছিল। এটিকে বলা হতো 'কাউন্টার-কালচার' বা ছকভাঙা চিন্তাভাবনা। তারা বিশ্বাস করত প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে বন্দি করার জন্য নয়, বরং মানুষকে নিজের মেধা বিকাশের স্বাধীনতা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা উচিত।

সিলিকন ভ্যালির (Silicon Valley) প্রযুক্তির আবহ:
ক্যালিফোর্নিয়ার এই এলাকাটি তখন ছিল বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু, সিলিকন ভ্যালি। জবসের বাড়ির আশেপাশেই থাকত নামীদামি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির প্রকৌশলীরা। তাদের গ্যারেজে নিত্যনতুন সার্কিট ও রেডিও বানানোর কাজ ছোটবেলা থেকে জবসকে প্রযুক্তির প্রতি কৌতুহলী করে তোলে। তিনি বিখ্যাত হিউলেট-প্যাকার্ড (HP) কোম্পানির এক্সপ্লোরার ক্লাবে যোগ দিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম কম্পিউটার পার্টস দেখার ও বানানোর সুযোগ পান। এছাড়া, সিলিকন ভ্যালিতে তখন প্রযুক্তিতে টাকা দেয়ার মতো অনেক বিনিয়োগকারীও ছিলেন। জবস ও ওজনিয়াক অ্যাপল কম্পিউটার তৈরির পরিকল্পনা করলে মাইক মার্কুলা নামের এক বিনিয়োগকারী তাদের আর্থিক সাহায্য ও পরামর্শ দেন।

এখন বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা কী দেখতে পাই? শিশু-কিশোরদের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের, শিক্ষার্থী-শাখা তাদের নিজ নিজ দলে টানার চেষ্টা করছে। তার ওপর আছে 'কিশোর গ্যাং'। এখানে সবাই শুধু তাদের সংখ্যা বাড়াতে চায়! মানব জীবনের গুণগত উন্নয়নের দিকে কারও খেয়াল নেই। তাই জনসংখ্যা ১৮ কোটি নিয়েও আমরা পৃথিবীর এক বড় অর্থনীতির দেশ হতে পারিনি। অন্যদিকে, জাপানের জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় কম (১২ কোটির একটু বেশি) হওয়া সত্ত্বেও জাপান বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ ৫টি দেশের তালিকায় স্থান ধরে রেখেছে।

বস্তুত, এখানে কল্যাণমুখী সামাজিক প্রেরণা নেই। তবে, ছল-চাতুরি, লুটপাট আর অন্যায় আয়ের জন্য চারিদিকে বিরামহীন প্রেরণা। অবৈধ উপার্জনের টাকা এখানে সবাই নিতে চায়! দুর্নীতির অর্থ মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা, এতিমখানা বা যেকোনো স্থানে দিলে সবাই তাতে খুশি হয়ে যায়! অন্যদিকে, সৎভাবে কম উপার্জনের কারনে অনেকে অন্যকে দিতে পারেন না। এমন মানুষকে সমাজ ও পারিবার হীন চোখে দেখে! কই, এমন তো দেখা যায়নি যে অবৈধ উপার্জন বলে কোন টাকা নিতে কেউ অস্বীকার করেছে?

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে নিজেকে গড়ে তোলার সামাজিক প্রেরণার মানে: যেকোন ভাবে টাকা আয় কর, জমা কর, পাচার কর...

৩. রাষ্টীয় সহযোগিতা
নিজের নাগরিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে রাষ্ট্র বিভিন্ন ধরণের বহুবিধ কাজ করতে পারে। যেমন, কেবল তদারকি (Supervision & Monitoring) করেই রাষ্ট্র বিশাল অবদান রাখতে পারে। এর একটি বাস্তব উদাহরণ হলো: কোনো অতিরিক্ত আর্থিক বাজেট বাড়ানো ছাড়াই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত তদারকি, কাজের স্বচ্ছতা এবং সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এতে সরকারি সেবা দান সহজ হয়, দুর্নীতি কমে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হ্রাস পায়।

আবার, যোগ্য ও দক্ষ মানুষকে তার সক্ষমতা অনুযায়ী সঠিক কাজের ব্যবস্থা ও পদায়ন (Merit-based Placement) করে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে । যোগ্য ব্যক্তি সঠিক স্থানে বসলে তার মেধা, নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি পুরো ব্যবস্থার চিত্র বদলে দিতে পারেন।

এই দুটো বিষয়, অর্থাৎ, কার্যকর তদারকি এবং যোগ্য স্থানে যোগ্য লোক বসানো, যদি সঠিকভাবে করা যায়, তবে অতিরিক্ত নতুন কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকেরা বিপুল সুফল পেতে পারে।

বর্তমানে কেবল যোগ্য লোক সঠিক জায়গায় না থাকা এবং তদারকির ব্যর্থতার কারনে বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান লাভজনক না হয়ে উল্টো লোকসানে চলছে। এ কারনে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা থাকলেও দক্ষ জনবল হিসাবে আমাদের অস্তিত্ব নেই । আমরা সংখ্যায় বেশি, সক্ষমতায় শূণ্য!

বিষয়টা বুঝতে আমার পরিচিত কয়েকজন সিনিয়র সহকর্মী ২০০৭ সালে বাংলাদেশ বিমান নিয়ে স্টাডি করেছিলেন। তারা দেখলেন যে, ২০০৭ সালে স্কাইট্র্যাক্স বিশ্ব এয়ারলাইন র‍্যাংকিংয়ে কাতার এয়ারওয়েজ বিশ্বের ৪র্থ সেরা এয়ারলাইন এবং বিমান বাংলাদেশ শীর্ষ ১০০টি এয়ারলাইনের তালিকার বাইরে। উভয়ই রাষ্ট্রায়ত্ত হলেও পারফরম্যান্সে বিশাল ব্যবধান।

কাতার এয়ারওয়েজ (Qatar Airways)
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৭ সালে নতুনভাবে পুনর্গঠিত কাতার এয়ারওয়েজ শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন হলেও এটি বিশ্বমানের বাণিজ্যিক পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০০৭ সালের স্কাইট্র্যাক্স ওয়ার্ল্ড এয়ারলাইন অ্যাওয়ার্ডে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ভোটাভুটিতে কাতার এয়ারওয়েজ বিশ্বের ৪র্থ সেরা এয়ারলাইন (World's No. 4 Airline) হিসেবে স্থান করে নেয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ৫-স্টার (5-Star Airline) স্বীকৃতি পায়। এই এয়ারলাইনটি কাতার সরকারের সরাসরি আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিচালিত এবং বিশ্বমানের ইন-ফ্লাইট সার্ভিসের ওপর জোর দেয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স (Biman Bangladesh Airlines)
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হলেও শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন সংস্থা থেকে যায়। সময়সূচী বজায় রাখতে না পারা, বিমান বহরের নির্ভরযোগ্যতাহীনতা, দুর্বল ইন-ফ্লাইট ক্যাটারিং ও গ্রাউন্ড সেবার কারণে ২০০৭ সালে হিথ্রো এবং দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট স্লট হারানোর মতো সংকট ও কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল বিমান। বিগত ২০ বছরেও বাংলাদেশ বিমান বিশেষ কিছু উন্নতি করেছে বলে দেখা যাচ্ছে না।

অনেকে বলতে পারেন যে, কাতারের নিজস্ব তেল আছে; আর বাংলাদেশকে তো তেল বা জ্বালানি কিনে আনতে হয়। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স তালিকার শীর্ষে কে আছে তা দেখা যাক।

তালিকার শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স (Singapore Airlines)। ১৯৫০-এর দশকে একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক এয়ারলাইন্স (Malayan Airways) হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও আজ এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ও ৫-স্টার মানের বিমান সংস্থা। এর পেছনে রয়েছে সিঙ্গাপুরের অভাবনীয় ঐতিহাসিক রূপান্তর।

১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক ও বহিষ্কার করা হয়। মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার আগ পর্যন্ত এবং স্বাধীনতার প্রথম দিকে সিঙ্গাপুর ছিল মূলত দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত অনুন্নত এক জেলেপল্লী ও বন্দর এলাকা। তাদের নিজস্ব কোনো খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দূরদর্শী নেতৃত্ব, শূন্য-সহনশীল দুর্নীতি নীতি, বিশ্বমানের শিক্ষা, কঠোর শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং সঠিক তদারকির ফলে আজ সিঙ্গাপুর উন্নয়নের সার্বজনীন রোল মডেল।

আবার, রাষ্ট্র অন্যায়কারীদের দমন করতে না পারায় জনগণ অনেকক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার ছাপ রাখতে পারছে না। যেমন, যথেষ্ট মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হওয়ার পরও মালয়েশিয়ায় কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশিরা নানান চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার মুখোমুখি হন। বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর সময় অসাদুপায় অবলম্বনকারী মধ্যস্বত্বভোগী ও বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির অতিরিক্ত অর্থ আদায় করায় অনেক বেশি খরচ হয়। ফলে অনেকে ঋণ নিয়ে সেখানে গিয়ে সঠিক কাজ বা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুরো বেতন পান না। এছাড়া ভিসার মেয়াদ ও সঠিক কাগজপত্রের অভাব থাকায় অনেকে অবৈধ বা নথিপত্রহীন হয়ে পড়েন। মালয়েশিয়ার সরকারের ধারাবাহিক ইমিগ্রেশন অভিযান ও কোটা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সঠিক নথিপত্র না থাকা কর্মীরা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে, নেপালের কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ ও আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। নেপাল থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হওয়ায় অভিবাসন খরচ কম লাগে এবং তাদের চুক্তি অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত থাকে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার আবাসন ও ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা প্রহরী (সিকিউরিটি গার্ড) পদে নেপালি কর্মীদের ঐতিহ্যগতভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, কারণ তারা নিয়মানুবর্তিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য সমাদৃত। এর পাশাপাশি তারা সহজে স্থানীয় ভাষা শিখে নিতে পারেন এবং আইনি জটিলতাও কম তৈরি করেন। ফলে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানি ও কারখানা এখন বাংলাদেশি কর্মীদের চেয়ে নেপালি কর্মীদের বেশি পছন্দ করছে।

সব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় যে সাধারন বাংলাদেশীদের নিজেদের গড়ে তোলার জন্য কেবল একটা উপায় খোলা আছে; আর তা হলোঃ ব্যক্তি মানুষের সাধনা। অবশ্য পারিবারিক অবস্থা সাপেক্ষে আমরা পরিবার থেকে কম-বেশি সাহায্য পেতে পারি। এর বাইরে কেবল ভাগ্য আমাদের গড়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে!

তথ্যসূত্রঃ
• Isaacson, W. (2011). Steve Jobs. Simon & Schuster.
https://virajdeshpande.wordpress.com/wp-content/uploads/2020/05/isaacson2011stevejobs-1.pdf-1.pdf
• Joseph, T. (2020). Labour migration dynamics in Southeast Asia: The case of Bangladeshi and Nepalese workers in Malaysia. Asian Migration Journal, 18(2), 145–168.
• Kassim, A. (2014). Recruitment and management of foreign workers in Malaysia: Policy changes and implementation challenges. Institute of Southeast Asian Studies (ISEAS).
• Rudnick, A. (2009). Working conditions and integration of migrant workers in Malaysia: Comparative analysis of South Asian labor. International Labour Organization (ILO).
• Wickramasekara, P. (2016). Regulation of recruitment in international labor migration: Lessons from South Asia to the Gulf and Malaysia. International Migration Papers, ILO.
• International Monetary Fund. (2024). World economic outlook database: Gross domestic product and economic indicators. IMF. https://www.imf.org
• World Bank. (2023). Bangladesh development update: World Bank indicators and economic growth analysis. The World Bank Group.
• World Bank. (2023). Japan economic monitor: Innovation, productivity, and structural challenges. The World Bank Group.
• United Nations Development Programme. (2024). Human development report 2023/2024: Breaking the gridlock. UNDP.


মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০৩

মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন:


কার্ল মার্ক্সের জীবন ও অধ্যবসায়ের দিকটি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। অনেক কিছু জানা হলো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.