| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
খায়রুল আহসান
অবসরে আছি। কিছু কিছু লেখালেখির মাধ্যমে অবসর জীবনটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি। কিছু সমাজকল্যানমূলক কর্মকান্ডেও জড়িত আছি। মাঝে মাঝে এদিক সেদিকে ভ্রমণেও বের হই। জীবনে কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করিনি, এখন তো করার প্রশ্নই আসে না। জীবন যা দিয়েছে, তার জন্য স্রষ্টার কাছে ভক্তিভরে কৃতজ্ঞতা জানাই। যা কিছু চেয়েও পাইনি, এখন বুঝি, তা পাবার কথা ছিলনা। তাই না পাওয়ার কোন বেদনা নেই।
গতকাল রাত দশটা দশে আমার ছোট ভাই চপল ও তার ছোট ছেলে নাকিব কে এয়ারপোর্টে সী-অফ করে এলাম। এর আগে ওর বড় ছেলে নাফিসকেও এয়ারপোর্টে রিসীভ ও সী-অফ করেছিলাম যথাক্রমে ০৩ ও ০৯ মে ২০২৬ তারিখে। এবারে ওরা পৃ্থক তারিখে ও পথে বাংলাদেশে এসেছে ও ফেরত গেছে। খুবই অল্প সময়ের জন্য এসেছিল, তাই ওদেরকে নিয়ে তেমন কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি। যাও বা একদিন প্রাচীন শহর সোনারগাঁওয়ে যাবার জন্য আমরা রওনা হয়েছিলাম, পথিমধ্যে জঘন্য যানজটে আটকা পড়ে ওদের হাঁসফাস উঠে যায় এবং পরিশেষে সে যাত্রাটি পরিত্যাক্ত হয়। বড় ভাতিজা নাফিস চলে যাবার পর অবশ্য চপল ও নাকিবকে নিয়ে রংপুর গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকদিন থাকাকালে আমার ছোটভাই উৎপলসহ আমরা রংপুরে অবস্থানরত আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তারপর একদিন (১৩ মে ২০২৬) মাইক্রোবাস ভাড়া করে সবাই মিলে তুষভাণ্ডারের কাশীরামপুর, আদিতমারি উপজেলার বিন্যাগাড়ি ও আদিতমারি এবং লালমনিরহাটের হাড়িভাঙ্গায় বসবাসরত সকল আত্মীয় স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের বাসায় সকাল থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত বেড়িয়েছি। বলা যায় নাড়ির টানেই যেন এসব জায়গায় যাওয়া হয়েছিল। আদিতমারিতে চপল উৎপলের শিক্ষক রঞ্জিৎ দেবনাথ, আবু যাফর ও হাবিবুর রহমান স্যারদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। ওনারা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়ন করেছিলেন। হাড়িভাঙ্গায় আম্মার একমাত্র জীবিত বোন সাজেদা খালার বাসায় গিয়ে তার সাথে দেখা ও কুশল বিনিময় করে আসি। একেক জায়গায় মনের মাঝে একেক রকমের মিশ্র অনুভূতির জন্ম হচ্ছিল। কেন যেন মনে হচ্ছিল, আমাদের অনেকের জন্য এই আকস্মিক ও ক্ষণিকের দেখাগুলো হয়ে যেতে পারে ‘শেষ দেখা’! শেষ দেখা মানে শেষ চাক্ষুষ যোগাযোগ। এর পরে আর চোখ এদেরকে দেখতে পাবে না, শুধু হয়তো আরও কিছুদিন কান এদের কথা শুনতে পারবে আর এদের মুখ একে অপরের সাথে কথা বলতে পারবে ফোনের মাধ্যমে।
নাফিস ফেরত যাবার একদিন আগে, অর্থাৎ ০৮ মে ২০২৬ তারিখে চপল ঢাকায় বসবাসরত আমাদের এক্সটেন্ডেড পরিবারের সবাইকে একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মাত্র তিনজন ব্যতীত আমন্ত্রিত সবাই (৩০ জন+) উপস্থিত হয়েছিল। ঐ তিনজন ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে উপস্থিত হতে পারে নাই। আগে মাঝে মাঝে আমার বাসায় বিভিন্ন উপলক্ষে সবাই একত্রিত হ’তাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নানা অসুবিধার কারণে সে রেওয়াজটা পালন করা সম্ভব হয় নাই। এ কারণে সেদিনের এ বিরাট পারিবারিক সম্মিলনটা অনেকদিন পরে হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নাতি-নাতনি, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগ্না-ভাগ্নি সহ চাচা চাচী, মামা মামী, ফুফু ও দাদা-দাদী, নানা-নানীদের সরব উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে একটা মিলন মেলায় পরিণত করেছিল। উপস্থিতদের মধ্যে কয়েকজনের বয়স সত্তর ছুঁয়েছে বা অতিক্রম করেছে। আগামীতে এ ধরণের আরেকটি পারিবারিক সম্মিলনে হয়তো আমাদের অনেকেই উপস্থিত থাকতে পারবোনা। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ভালো জানেন; তিনি সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী এবং সকল প্রাণের সৃষ্টি্কর্তা ও সুরক্ষাকারী। তাঁর পবিত্র দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তিনি আমাদের সবাইকে সুস্থ শরীরে অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হয়ে সকলের সাথে কুশল বিনিময়ের তওফিক দিয়েছিলেন বলে।
চপলকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি এমন সুন্দর একটি পারিবারিক প্রীতি সম্মিলন আয়োজন করার জন্য। সে ও নাকিব বোধকরি এখন মধ্য আকাশে নিদ্রারত অবস্থায় নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। আল্লাহতা’লা যেন ওদেরকে সহি-সালামতে নিজ গৃহে পৌঁছে দেন এবং সেখানে ওদেরকে স্বাভাবিক জীবন পরিক্রমায় ফিরিয়ে আনেন। অল্প ক’দিনের জন্য বেড়াতে আসলেও, নাফিস ও নাকিব দুই ভাই বেশ স্বাচ্ছন্দে সবার সাথে মেলামেশা করেছে। ওরা উভয়েই নিউ ইয়র্ক সিটিতে মানুষ হয়েছে। নাড়ির টান অনুভব না করলে ওদের বয়সের ছেলেদের এতদূর থেকে এত টাকা পয়সা খরচ করে ঢাকা, রংপুর ও আদিতমারি’র মত জায়গায় বেড়াতে আসার কথা নয়। ওরা খুব অল্প বয়সে মাতৃহারা হয়। এক আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় ওদের মায়ের মৃত্যুর পর চপল একাই একাধারে ওদের মা ও বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ওদেরকে লালন করে। ওদের উভয়কে সে ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছে। নাকিব Stuyvesant High School এ পড়েছে, যেটা নিউ ইয়র্ক সিটির অন্যতম সেরা স্কুল। নাফিস যে Stony Brook University থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করেছে, সেটাও একটা বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি। সেই university থেকে পাশ করা অন্ততঃ দুইজন নোবেল লরিয়েটের নাম এ মুহূর্তে উল্লেখ করতে পারছি। এরা হলেন CN Yang এবং Paul Lauterbur। CN Yang ১৯৫৭ সালে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। Paul Lauterbur ২০০৩ সালে তার magnetic resonance imaging (MRI) সংক্রান্ত কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত হন।
দোয়া করি, আল্লাহতা’লা যেন ওদের দুই ভাইয়ের সহায় থাকেন তাদের সারাটা জীবন জুড়ে। যে মাতৃস্নেহ থেকে ওরা অল্প বয়সে বঞ্চিত হয়েছে, সেটা কোনদিন পূরণ হবার নয়। তবে আল্লাহ চাইলে তো অবশ্যই তাদেরকে সকল আপদ বিপদ থেকে সুরক্ষা করে তাদের জীবনটাকে ভরে দিতে পারেন স্নেহ-মায়া-মমতা-আদর ভালোবাসায়। সেটাই যেন হয়। কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে ওদেরকে সাফল্যের সাথে লালন করে চপল এক অসাধ্য সাধন করেছে। আল্লাহতা’লা যেন তাকে এর জন্য যথাযোগ্য বিনিময় দান করেন এবং ওর জীবনেও সে যা কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছে তা বহুগুণে পূরণ করে দেন। মধ্যগগনে সূর্য বিরাজমান থাকা অবস্থায় আমাদের মনেই হয় না যে সূর্যটা এক সময় সারা পৃথিবীকে অন্ধকারে নিপতিত করে টুপ করে বিদায় নেবে। কিন্তু আমাদের মনে না হলেও সূর্যটা বিদায় নেয় ঠিকই। শীতকালে যখন দিনটা ছোট হয়ে যায়, তখন বিকেল বলতে কিছু থাকে না। মধ্যাহ্ন পার হবার পরেই সূর্যটা বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং খুব দ্রুততার সাথে চোখের আড়াল হয়ে যায়। আমরা যারা ‘বিকেল’ এ পৌঁছে গেছি, তারা জানিনা কার এখন শীতের বিকেল চলছে আর কার গ্রীষ্মের। যেটাই হোক, বিকেল থেকেই বিদায়ের সুর শোনা যায়; তাই মনের মাঝেও মায়ার জোয়ার উথলে ওঠে।
ওরা চলে যাবার পর ঘরটা খালি খালি লাগছে। নয় দিন আগে নাফিস চলে যাবার পরেও তাই লেগেছিল। ক্ষণিকের তরে হলেও, প্রতিটি বিদায় ব্যথা রেখে যায়, মায়া রেখে যায়। তারপরে ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক নিয়মে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। মানুষ তার নিত্যদিনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
ঢাকা
১৯ মে ২০২৬
বিকেল চারটা।
শব্দ সংখ্যাঃ ৮৪৮
২|
২০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০২
রাজীব নুর বলেছেন: সবাই ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক।
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:১৩
ইফতেখার ভূইয়া বলেছেন: আমার জীবনের দীর্ঘ একটা সময় প্রবাসে থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে প্রবাসে বেড়ে ওঠা মানুষজন কম-বেশী বাংলাদেশের জন্য অনুভব করলেও আদতে নাড়ির সাথে সেই সম্পর্কটা ঠিক ওভাবে ধরে রাখতে পারেন না। আসলে সেটা সম্ভবও নয়। ওখানে প্রাত্যিহিক জীবনের ব্যস্ততা ভাবার অতটা সময়ও দেয় না। তাছাড়া বেড়ে ওঠা চারপাশের একটা প্রভাব থেকেই যায়। তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন ব্যস্ততা কমে আসে তখন নাড়ির আকুলতাটাও খানিকটা বৃদ্ধি পায় এই যা।
আমার জন্ম ও কৈশোরের অনেকটা সময় বাংলাদেশে কাটলেও যৌবনের বেশীরভাগ সময় কেটেছে নিউ ইয়র্কে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, চাকুরি জীবনের শুরু সবই ওখানটায়। ওখানকার পথ-ঘাট, মাটি-বাতাস সবই আমার আপন বলে মনে হয়। তদুপরি বাংলাদেশ কম-বেশী মনের এক কোনে রয়ে গেছে। আমি নিজেও চেয়েছি আমার সন্তানরা বাংলাদেশের মাটিতে জন্মাক, বড় হোক, কিছুটা সময় এ মাটির সাথেও কাটাক। ওরা জানুক, ওরা কোথা থেকে এসেছে, ওদের রুটস কোথায়। কারন, ওরা খানিকটা বড় হয়ে যাওয়ার পর যখন এ মাটি ছেঁড়ে যাবে অন্তত এটা যেন ভুলে না যায় যে বাংলাদেশেও ওদের কেউ এক সময় থেকেছে।
আপনার পরিবারের কাছের মানুষগুলোর ব্যাপারে পড়ে সে ভাবনাটাই আরো জেঁকে বসেছে। তবুও দিনশেষে জীবনকে চলতে দিতে হয়, জীবনের নিয়মে। আপনার সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবন কামনা করছি। ধন্যবাদ।