| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
কুমিল্লা পিবিআই জোনাল অফিসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে শুধু ধূসর কুয়াশা চোখে পড়ে। ২০১৬ সালের সেই কালভৈরব রাতের পর থেকে এই শহর কতবার ঋতু বদলেছে, কিন্তু ময়নামতির বাতাস থেকে এখনো যেন একটা চাপা কান্নার শব্দ মুছে যায়নি।
টেবিলের ওপর দশ বছরের পুরনো ফাইলটা ছড়ানো। ফাইলের ওপর ধুলোর একটা পাতলা আস্তরণ জমেছিল, যা পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান নিজের রুমাল দিয়ে আলতো করে মুছে নিয়েছেন। ভিকটিমের নাম—সোহেলী জাহান তন্বী। ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী, মঞ্চের উজ্জ্বল নাট্যকর্মী।
দশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে চার-চারটি তদন্ত সংস্থা আর পাঁচজন বাঘা বাঘা অফিসার কেসটা ঘেঁটেছেন। কিন্তু ফাইলটা শুধু এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে স্থানান্তরিত হয়েছে, সত্যের আলো দেখেনি। আরিয়ান গত মাসে এই মামলার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন শুধু নিঝুম হয়ে বসে ফাইলটা পড়েছেন।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিদর্শক তানভীর কফির মগটা টেবিলের এক কোণে রাখলেন। তানভীরের নিজের বোনও ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী, তাই এই কেসটার সাথে তার এক ধরণের ব্যক্তিগত আবেগ জড়িয়ে গেছে।
“স্যার,” তানভীর একটা সিলগালা করা খাম এগিয়ে দিলেন। “সিআইডির ডিএনএ ল্যাব থেকে সাপ্লিমেন্টারি রিপোর্টটা এসেছে। তবে ল্যাবের টেকনিশিয়ান নুসরাত আপা গোপনে আমাকে একটা কথা বলেছেন। এই এভিডেন্সগুলো যখন ২০১৬ সালে পাঠানো হয়েছিল, তখন প্রপার প্রিজারভেশনের অভাবে ডিএনএ মারাত্মকভাবে ডিগ্রেডেড (Degraded) হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা যে ‘মাইটোক্রন্ড্রিয়াল ডিএনএ’ (mtDNA) সিকোয়েন্সিং টেকনিক ব্যবহার করতে বলেছিলাম, তাতেই একটা মিরাকল হয়েছে।”
আরিয়ান চশমাটা নাক বরাবর ঠিক করলেন। নস্টালজিয়া বা আবেগ তাঁর পেশাগত সত্তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি রিপোর্টের পাতাটা উল্টালেন। তাঁর চোখ দুটো হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
“তানভীর,” আরিয়ানের কণ্ঠস্বর ইন্টারোগেশন রুমের দেয়ালের মতোই ঠাণ্ডা শোনাল। “এতদিন আমরা জানতাম তন্বীর পোশাকে তিনজন ভিন্ন পুরুষের এসটিআর (STR) প্রোফাইল পাওয়া গেছে। কিন্তু এই নতুন রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, কামিজের ভেতরের এক টুকরো কাপড়ে মানুষের রক্তের দাগ ছিল। সেই রক্ত থেকে পাওয়া গেছে চতুর্থ একজন অজ্ঞাতনামা পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল, যা আগের তিনজনের বীর্যের নমুনার সাথে মেলেনি।”
তানভীর চমকে উঠলেন। “তার মানে... খুনি তিনজন নয়, চারজন? কিন্তু স্যার, তন্বীর বাবা শুরুতে যে ডায়েরির পাতাটা জমা দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি তন্বীর এক শিক্ষকের কাছে শোনা কিছু আশঙ্কার কথা লিখেছিলেন, সেই ফাইলটা তো দেখছি ২০১৩ সালের পর থেকে গায়েব!”
“ফাইল গায়েব করা হয়েছে, তানভীর,” আরিয়ান উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে কুয়াশা ভেঙে হালকা রোদের রেখা ফুটছে। “যে ব্যক্তি বাকি তিনজনকে ওই রাতে তন্বীর ওপর চড়াও হতে প্রশ্রয় দিয়েছিল, সে নিজে এই চতুর্থ প্রোফাইলের মালিক। এবং সে অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কেউ, যে গত দশ বছর ধরে প্রতিটি তদন্ত সংস্থাকে ম্যানিপুলেট করেছে।”
ঠিক তখনই আরিয়ানের পার্সোনাল ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে পিবিআই হেডকোয়ার্টারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার নাম।
আরিয়ান ফোনটা কানে নিলেন। ওপাশ থেকে ভেসে আসা গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুধু একটা কথাই বলল, “আরিয়ান, তন্বী কেসের ডিএনএ রিপোর্টটা আমাদের কাছে পাঠিয়ে ফাইলটা আপাতত হোল্ড করো। উপর মহল থেকে সরাসরি নির্দেশ আছে।”
ফোনটা কেটে গেল। আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
তানভীর আরিয়ানের মুখের ভাব দেখে অবচেতনভাবেই রিভলবারের বেল্টটা হাত দিয়ে ছুঁলেন। “স্যার? প্রেশার আসছে?”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু ডায়েরি থেকে একটা নাম বের করলেন—সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুল ইসলাম। “হাফিজুলকে ঢাকাররের কেরানীগঞ্জ থেকে যে টিমটা নিয়ে আসছে, তাদের বলো সোজা পেছনের দরজা দিয়ে ওকে এই রুমে ঢোকাতে। আমরা অফ-দ্য-রেকর্ড কথা বলব।”
ইন্টারোগেশন রুমের ভেতরে একটা মাত্র নীল বাতি জ্বলছে। টেবিলের ওপাশে বসে আছেন সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুল ইসলাম। বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায়, চুলে পাক ধরেছে। অবসরে যাওয়ার পর তাঁর চেহারায় সেই সামরিক দাপট নেই, কেবল একটা চাপা ধূর্ততা খেলা করছে।
আরিয়ান ভেতরে ঢুকে কোনো ফাইলপত্র খুললেন না। তিনি চেয়ারটা টেনে হাফিজুলের ঠিক মুখোমুখি বসলেন। প্রায় দুই মিনিট ঘরের ভেতর কোনো শব্দ হলো না, শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া।
হাফিজুল প্রথম অস্বস্তি কমাতে গলা খাঁকারি দিলেন। “স্যার, দশ বছর আগের এক মরা কেস নিয়ে আমাকে কেন হয়রানি করছেন? সিআইডি তো আমাদের তখনই জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছিল। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত এভিডেন্স নেই।”
“এভিডেন্স সময়মতো তৈরি করে নেওয়া যায়, হাফিজুল সাহেব,” আরিয়ান খুব শান্ত গলায় বললেন। “আপনাদের রক্তের নমুনা নিয়ে ডিএনএ ম্যাচিং করার সাহস বা সুযোগ আগের অফিসারদের হয়নি। কিন্তু আজ সকালেই আপনার রক্তের নমুনা ল্যাবে গেছে। তবে আমি আপনাকে নিয়ে চিন্তিত নই।”
আরিয়ান পকেট থেকে তন্বীর সেই কামিজের রক্তের দাগের ছবিটা বের করলেন।
“আমি এই চতুর্থ মানুষটাকে নিয়ে ভাবছি,” আরিয়ান ছবিটা হাফিজুলের চোখের সামনে ধরলেন। “তন্বীর কামিজের এই অংশে যার রক্ত লেগে আছে। ২০১৬ সালের ২০শে মার্চ রাতে যখন আপনারা তিনজন মিলে কালভার্টের পাশে অন্ধকার ঝোপের মধ্যে মেয়েটাকে কোণঠাসা করেছিলেন, সে কিন্তু ভেঙে পড়েনি। সে লড়াই করেছিল। আর সেই লড়াইয়ের মাঝখানেই সেখানে একজন বড় অফিসার গাড়ি থামিয়েছিলেন, তাই না?”
হাফিজুল প্রথমে একটা শুষ্ক হাসির চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর আঙুলের কাঁপুনি থামছিল না। “আমি... আমি কিছু জানি না। ওখানে কোনো অফিসার ছিলেন না। আমরা ডিউটি শেষে জাস্ট ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম।”
“ডিউটি শেষে যাচ্ছিলেন, নাকি তন্বীকে জোর করে জিপে তোলার চেষ্টা করছিলেন?” তানভীর এবার টেবিলের ওপর জোরে থাপ্পড় মারলেন। তাঁর চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। “সেই রাতের পাওয়ার হাউসের ডিউটি রেজিস্টার থেকে দুটো পাতা ছেঁড়া ছিল, যা আমরা গতকাল রিকভার করেছি। ওই রাতে ওই চত্বরে কার গাড়ি প্রবেশ করেছিল, তার এন্ট্রি সেখানে ছিল।”
হাফিজুল টেবিল থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন। তাঁর চোয়াল শক্ত হলো। “স্যার, আপনারা ভুল ট্র্যাকে যাচ্ছেন। সেদিন যা করার সার্জেন্ট জাহিদুল আর করপোরাল শাহীন করেছে। ওরা মেয়েটাকে ঝোপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আমি তো শুধু দূরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিলাম। আমি তন্বীর গায়ে হাতও দিইনি।”
আরিয়ান আরও একটু সামনে ঝুঁকে এলেন, তাঁর কণ্ঠস্বর এখন সাপের মতো হিসহিস করছে, “তুমি তন্বীকে ছোঁওনি হাফিজুল, কিন্তু লাশটা টেনেহিঁচড়ে ঝোপের ভেতর লুকিয়েছিলে। তবে ভয়টা কাটতে পারোনি। তাই এই দশ বছর অবসরে গিয়েও তুমি রাতে ঘুমাতে পারোনি। চোখ বন্ধ করলেই তন্বীকে দেখতে পাচ্ছ, তাই না? জাহিদুল আর শাহীনকে দিয়ে যে অফিসার গল্পটা সাজিয়েছিলেন, সে আজ প্রমোশন পেয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়ে এসি রুমে বসে আছে। আর তুমি এই স্যাঁতসেঁতে থানায় বসে ঘামছ। কার জন্য নিজেকে শেষ করছ?”
হাফিজুলের কপালের চামড়া কুঁচকে গেল, চোখ দুটো তীব্র আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। তিনি টের পাচ্ছিলেন, দেয়ালটা পিঠের গায়ে এসে ঠেকেছে। আরিয়ানের চোখের শীতল দৃষ্টি তাঁর ভেতরের শেষ প্রতিরোধটুকুও তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিল।
হাফিজুল দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। “আমি মারিনি স্যার! আমি কসম খেয়ে বলছি আমি মারিনি! মেজর সুমন... তখন উনি মেজর ছিলেন। ওই রাতে ড্রিংকস করে গাড়ি নিয়ে ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমাদের দেখে তিনি গাড়ি থামান। তন্বী সুমন স্যারের কলার চেপে ধরেছিল, স্যারকে চড় মেরেছিল। স্যার রেগে গিয়ে তন্বীর ওড়না দিয়ে ওর গলা পেঁচিয়ে ধরেন... আমরা শুধু লাশটা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে ফেলেছিলাম স্যার... আমাদের ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন তিনি!”
রুমের কোণ থেকে তানভীর দ্রুত জবানবন্দি রেকর্ড করে নিলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক ধরণের স্তব্ধতা।
আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের নীল আলোয় তাঁর অবয়বটা এক নির্মম সত্যের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি তানভীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তানভীর, এবার জবানবন্দিটা সিল করো। সব উত্তর পাওয়া গেছে।”
থানার বাইরে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলের আকাশটা আজ অদ্ভুত লালচে রূপ নিয়েছে।
তানভীর পাশে এসে বললেন, “স্যার, ব্রিগেডিয়ার সুমনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করার আগে আমাদের এডিশনাল আইজি স্যারের ক্লিয়ারেন্স লাগবে। কিন্তু হেডকোয়ার্টার থেকে যে ফোনটা এসেছিল... আমরা কি সত্যি ফাইলটা পাঠাতে পারব?”
আরিয়ান কোটের পকেট থেকে চশমাটা বের করে মুছলেন। তারপর দূর সেনানিবাসের অন্ধকার কালভার্টটার দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন, “মানুষ ভাবে ক্ষমতা আর দেয়াল দিয়ে সত্যকে বন্দী করা যায়, তানভীর। কিন্তু সত্য আসলে বাতাসের মতো। তাকে যত চেপে ধরা হয়, সে তত তীব্র বেগে বেরিয়ে আসে। তন্বী সেদিন হেরে যায়নি, সে নিজের নখের ডগায় খুনিদের পরিচয় লিখে রেখে গিয়েছিল।”
আরিয়ান গাড়িতে গিয়ে বসলেন। জিপটা যখন শহরের মূল রাস্তার দিকে চলতে শুরু করল, বাইরে তখনো হালকা কুয়াশা জমছিল।
হঠাৎ দূরে সেনানিবাসের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ সান্ধ্যকালীন সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। সেই কর্কশ আওয়াজটা কুয়াশা চিরে আরিয়ানের কানের পর্দায় আঘাত করল। আরিয়ান চোখ বন্ধ করলেন। তিনি জানেন, ব্রিগেডিয়ার সুমনের নামটা ফাইলে ওঠার সাথে সাথেই ফাইলটা আবার কোনো লকারে বন্দী করার চেষ্টা শুরু হবে। যুদ্ধটা কেবল শুরু হলো।
২|
২০ শে মে, ২০২৬ সকাল ১০:১১
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আসল অপরাধী আদৌ ধরা পড়বে কিনা, তা নিয়ে আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এটি সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:০৮
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ব্রিগেডিয়ার সুমনের নামটা ফাইলে ওঠার সাথে সাথেই ফাইলটা
আবার কোনো লকারে বন্দী করার চেষ্টা শুরু হবে। যুদ্ধটা কেবল শুরু হলো
...................................................................................................
চলমান ঘটনার বাস্তব কাহানী !
আপনার তথ্যগুলো কি গোয়েন্দা দপ্তর থেকে আসছে ?
দশ বৎসর পর সোহেলী জাহান তন্বীর হত্যার লুকানো তথ্য বেড়িয়ে আসছে
যা আমরা কল্পনাও করতে পারছিনা ।