নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭


তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের রাত।
বরফ পড়া শুরু হয়নি। মন্ট্রিয়লের রাস্তা জনাকীর্ণ। বাড়ি থেকে বের হলে কো-দ্যেনিশ রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা লাইব্রেরি আছে। তার পরে আছে একটা সুপার মার্কেট। মার্কেটের পাড়ে বিশাল মাঠ শহরের শেষ প্রান্ত নির্দেশ করে।কারণ বিশাল মাঠ পেরিয়ে বেশ দূর পর্যন্ত নির্জন এলাকা শেষ হলে শুরু হয় অন্য পাড়া। তবে স্কুলের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পায়ে হেঁটে মাঠ পেরিয়ে তাদের পাড়ায় চলে গেলেও সাধারণের চলাচলের জন্য কোন রাস্তা নেই।
বাসা হতে এই লাইব্রেরি পর্যন্ত যেতে রুমার মিনিট বিশেক সময় লাগে। আজ বিকেল করে রওনা দিয়েছে বলে লাইব্রেরি থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। শীত কাছে এসে পড়েছে। সন্ধ্যার পর রাত পৌনে আট-টা যেন মনে হচ্ছে অনেক রাত। তাই আলো ঝলমলে রিসেপশান থেকে বের হয়ে রাস্তার নিয়ন আলো যেন খুব ম্রিয়মান মহে হচ্ছে রুমার কাছে। চারিদিকের অন্ধকার দেখে অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘আজ এতো দেরী করে ফেললাম? এখন যে বেশ রাত।’
ঝিরিঝিরে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা রুমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু এত ঠান্ডা লাগালে খেসারত দিতে হবে চরম ভাবে, রুমা তা জানে। অথচ লাইব্রেরি থেকে বের হতে যে এত দেরী হবে তা তার খেয়াল ছিল না। আসলে বইয়ের রাজ্যে এলে রুমা সবকিছু ভুলে যায়। তারপরও লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে রাস্তায় পা রেখে এবার জোর কদম পা চালালো। বাড়ি ফিরতে হবে। গলায় কোন স্কার্ফ বা মাফলার নেই। ঠান্ডাটা প্রথমে গলায় –ই লাগে। তাছাড়া বৃষ রাশির জাতিকা বলে কথা। গলা তো তাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। গলাবন্ধনিটা সাথে রাখাই উচিত ছিল। কেন যে সাথে আনে নি। ঠান্ডা ঝাপটার দাপুটে ভাব নিয়ে কখন যে প্রকৃতি অবির্ভুত হবে তা তো জানা নেই।
আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতে বেশ জোর কদমে হাঁটছে। সাদার ওপর নীল ফুলের ছাপা একটা জামা পড়েছে। দেশে থাকতে তার বাবার সাথে কিনেছিল কাপড়টা। বেশ পাতলা কাপড়টা। কিন্তু ঠান্ডা তেমন লাগছে না ,তবে রাস্তায় বেশীক্ষণ সময় ধরে এভাবে হাঁটতে থাকলে ঠান্ডা লাগা অবধারিত হয়ে উঠবে। আর এই ভাবনাটুকু যেন ঠিক ধরে ফেলে হেসে ফেললো, সামনের দিক থেকে হেঁটে আসা এক পথচারী । তাকিয়ে আছে তার দিকে আর হেঁটে আসছে । মধ্যবয়সী হালকা পাতলা গড়নের মাঝারী লম্বার ফ্রেঞ্চ একজন মহিলা। রুমার প্রথমে খেয়ালে এসেছে কে যেন হেসে ফেলেছে তাকে দেখে, তার মনের ভাবনাগুলোকে পড়ে ফেলে। প্রথমে চোখে পড়েছে তার হাসি। তারপর তার মুখখানা। হাসিটা এমন যেন তিনি রুমার মনের সব ভাবনা চিন্তাকে স্বচ্ছভাবে দেখতে পাচ্ছেন। তিনি নিজ কানে, রুমার মনের কথাগুলো শুনতে পাচ্ছেন।এজন্যই হেসে ফেলেছেন। রুমাকে দেখে হাসিটা এমন ভাবে দিলেন, যেন তিনি জানেন রুমা এ পথ দিয়েই যাবে। তাকে তিনি চিনেন আর চিনেই তার পাশ দিয়ে হেঁটে আসার বাহানা করেছেন।এবং মুখোমুখি হবার পর হাসি আর ধরে রাখতে পারেননি। রুমা তাকে এক সাধারণ পথচারী হিসাবে ভেবেছে, যতক্ষণ না তার হাসিটা তার মনে দাগ কেটেছে। টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ করার ক্ষমতা রুমার নেই। তবুও যেন সেই সময়ে রুমাকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি চিনি তোমাকে । আমি চিনেই এসেছি তোমার সামনে।’
কিন্তু কোথা থেকে এলেন উনি?
চলার পথে কোথায় যে কখন পোর্টাল উন্মোচিত হয়ে আমাদের হায়ার –সেলফ্ বা কোন কোন সময়ে গার্ডিয়ান –অ্যাঞ্জেল, মানবরূপে ঝুপ্পুস করে সামনে এসে পড়ে আর সাধাসিধে ভাব দেখিয়ে এগিয়ে এসে আসন্ন বিপদে আগলে রেখে তা থেকে রক্ষা করে আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, তৎক্ষণাৎ তো তা বুঝেও ওঠা যায় না।
কিন্তু ঐ শীতের রাতে ভদ্র মহিলার সেই হাসি যেন রুমাকে মনে মনে কিছু কথা বলে গিয়েছিল।
রুমাও যেন কিভাবে, কে জানে, তার নিজের অজান্তে বুঝে নিয়েছিল মহিলার বার্তা, ‘গলায় স্কার্ফ পর নাই কেন? ঠান্ডা লাগলে কি হবে এবার?’
কে ইনি?
রুমা ভাবছে, ইউনিভার্স থেকে নিযুক্ত তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল না তো ইনি? কিভাবে এরকম মনোসংযোগ সম্ভব হলো ইনার সাথে?
কে ইনি ?
কি ভাবে পারলেন ভাবনা চিন্তার সকল আদান প্রদান নিমেষেই করে ফেলতে?
সেদিন রুমাকে যেন ইনি বুঝাতে এসেছিলেন, এই রিয়্যালিটিতে, এই জগতে সে মোটেই একা নয়। সে কখনোই একদম একা থাকে না। সামনে নির্জন শীতের রাস্তায় লোক চলাচল আরো হালকা হবে। ঠান্ডা ঝাপটার মাঝ দিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অনেকটা পথ একা যেতে হবে । কিন্তু সে একাকী হবে না কখনোই। তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল থাকবে তার আশে পাশেই। সর্বক্ষণ। মানুষরূপে প্রতিভু হবে, যখন প্রয়োজন।
.........
০৭/০৯/২০২৬
পোর্টাল - ১ সাইকেল চালক

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

সৈয়দ মশিউর রহমান বলেছেন: গল্পটি পড়ে ভালো লাগলো।

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২

হুমায়রা হারুন বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ

২| ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল থাকবে তার আশে পাশেই। সর্বক্ষণ।
.......................................................................................
মানুষ যেখানেই যাকনা কেন তার অবচেতন মন সামাজিক
সংযোগ প্রত্যাশা করে ।

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০১

হুমায়রা হারুন বলেছেন: একদম

৩| ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:০০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




পোর্টাল – ২ : গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ গল্পটি মূলত এক শীতসন্ধ্যার সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এর
অন্তর্লীন ব্যঞ্জনা বহুদূর বিস্তৃত। মন্ট্রিয়লের ঠান্ডা, ক্রমশ জনশূন্য হয়ে আসা রাস্তা, লাইব্রেরির আলো পেরিয়ে
রাতের ম্লান নিয়ন-আলোয় প্রবেশ সমস্ত দৃশ্যপট যেন ধীরে ধীরে বাস্তব জগতের সীমানা সরিয়ে পাঠককে এক
অন্তর্জাগতিক অঞ্চলের দিকে নিয়ে যায়।

রুমার একা বাড়ি ফেরার পথটি এখানে শুধু একটি রাস্তা নয়; এটি যেন মানুষের অস্তিত্বের প্রতীকী পথ যেখানে
আমরা প্রত্যেকে শেষ পর্যন্ত একা হাঁটি, অথচ অদৃশ্য কোনো সহচর আমাদের সঙ্গে থাকে। সেই অদৃশ্য উপস্থিতিই
গল্পে ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’-এর রূপ নেয়। বিশেষ করে অপরিচিত ফরাসি মহিলার রহস্যময় হাসিটি গল্পের
সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত। তিনি কোনো নাটকীয় অলৌকিকতা প্রদর্শন করেন না; বরং একটি হাসি, একটি দৃষ্টি,
একটি অনুচ্চারিত বার্তার মধ্য দিয়ে রুমার অন্তর্জগতে প্রবেশ করেন। ফলে তাঁর উপস্থিতি একই সঙ্গে বাস্তব,
স্বপ্নময় এবং অতীন্দ্রিয় হয়ে ওঠে।

গল্পটির সৌন্দর্য এখানেই যে, ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’কে লেখক হিসাবে আপনি প্রচলিত দেবদূতের অবয়বে হাজির
করেননি। তিনি এসেছেন একজন সাধারণ মধ্যবয়সী পথচারীর বেশে হেঁটে এসেছেন, হেসেছেন, হয়তো একটি
সতর্কতাও জানিয়েছেন, তারপর মিলিয়ে গেছেন। এই সাধারণের আবরণেই অসাধারণের আবির্ভাব গল্পটিকে
একটি চমৎকার মায়াময়তা দিয়েছে। পাঠক হিসাবে আমাদের মনেও তখন প্রশ্ন জাগে তিনি কি সত্যিই একজন
অপরিচিত নারী, নাকি রুমার জন্য নির্দিষ্ট কোনো অদৃশ্য শক্তির সাময়িক মানব-প্রতিভূ?

‘পোর্টাল’ ধারণাটিও এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পোর্টাল যেন কেবল কোনো অতিলৌকিক দরজা নয়; বরং
দৃশ্যমান বাস্তবতা ও অদৃশ্য বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক ক্ষণিক ফাটল। সেই ফাটল দিয়েই কখনো হায়ার-সেলফ,
কখনো গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল, কখনো বা আমাদের গভীরতম অন্তর্দৃষ্টি মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়। সবচেয়ে
মুগ্ধকর বিষয় হলো ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার মুহূর্তে মানুষ নিজেই তা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। পরে ফিরে
তাকালে ঘটনাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।

আরও একটি সুন্দর দিক হলো, গল্পটি আসলে ‘একা থাকা’ এবং ‘একা না থাকা’র মাঝখানের সূক্ষ্ম ব্যবধানটিকে
স্পর্শ করেছে। নির্জন শীতের রাস্তায় রুমা শারীরিকভাবে একা; কিন্তু গল্পের দর্শনে সে কখনোই নিঃসঙ্গ নয়।
মানুষের চোখে যা নিঃসঙ্গতা, মহাবিশ্বের বৃহত্তর বোধে হয়তো সেটিই অদৃশ্য সঙ্গের মুহূর্ত। এই উপলব্ধিই
গল্পটির আবেগগত কেন্দ্র।

শেষ পর্যন্ত ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’কে সত্যিই অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা হবে, নাকি একে রুমার অন্তর্দৃষ্টি,
অবচেতন মন কিংবা আকস্মিক মানবিক সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে পড়া হবে লেখক হিসাবে আপনি তার
সিদ্ধান্ত আমাদের মত সাধারণ পাঠকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। আর সেখানেই গল্পটির সার্থকতা। কারণ কিছু
কিছু অভিজ্ঞতার সত্যতা প্রমাণ করা যায় না; শুধু অনুভব করা যায়।

শীতের রাত, পাতলা নীল-ফুলের জামা, গলায় স্কার্ফ না থাকার সামান্য অসতর্কতা, এক অপরিচিত নারীর অকারণ
হাসি এই ছোট ছোট বাস্তব উপাদানগুলোর মধ্য দিয়েই গল্পটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়
আমাদের। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই কি একা? নাকি অদৃশ্য কোনো স্নেহময় উপস্থিতি নীরবে
আমাদের পাশে হেঁটে চলে শুধু প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেকে চিনিয়ে দেয়?

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ সেই অদৃশ্য সঙ্গের প্রতি এক মায়াময়, অন্তর্মুখী এবং আধ্যাত্মিক অভিবাদন।

শুভেচ্ছা রইল

৪| ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

রাজীব নুর বলেছেন: সহজ সরল ঝামেলাবিহীন লেখা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.