| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
তারেক আশরাফ
মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছে হয় চারোদিকে শুধু হাসিমুখ দেখতে... ঘুম থেকে উঠে পূর্নিমা হোটেলে নাস্তা খেতে গিয়ে দেখবো 'গ্লাস বয়-ম্যাসিয়ার, ক্যাশিয়ার, খদ্দের' সবাই হাসছে... হাসছে রাস্তার অচেনা পথচারীরা... চা খেতে মোশারফ মামার টং দোকানে গিয়ে দেখবো সবাই হাসছে... হাসছে রিকশাওয়ালারা, বাস কিংবা প্রাইভেটকার চালকরা... হাসছে হকাররা... হাসছে গার্মেন্টস্ শ্রমিকরা... হাসছে স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থী থেকে ভার্সিটির বুদ্ধিজীবি টাইপের গম্ভীর ছেলেটাও! হাসছে পিঠা বিক্রেতা ময়না বানু... হাসছে নির্মান শ্রমিক জালাল মিয়া... হাসছে টোকাই শফিক... হাসছে ফুলওয়ালী কুসুম! আহারে! চারোদিকে কি দারুন প্রানবন্ত সব হাসিমুখ আর হাসিমুখ... ইট,কাঠ,কংক্রিটের এই শহরের রাস্তা-ঘাটে মলিন মুখ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি! যদি কোনদিন সত্যি সত্যি এই রকম হাসিমুখ দেখতে পেতাম তবে কেমন হতো কে জানে... নিশ্চয় ভয়ংঙ্কর আনন্দময় কিছু একটা হয়ে যেতো! একদম চোখ ভিজে যাবার মত আনন্দময়...
একটি কল্পনিক গল্প
স্বর্গে বসে বঙ্গবন্ধু জানতে পারলেন বেশ কিছু দিন ধরে এখানে বিভিন্ন ধরনের বাংলাদেশিদের আসার হার কয়েক গুন বেড়ে গেছে। উনি বেশ কৌতূহলী হলেন। জরুরী ভিত্তিতে জিয়াউর রহমানকে খবর দিলেন। যথা সময়ে জিয়াউর রহমান উপস্থিত হলেন।
জিয়াউর রহমানঃ সালাম স্যার, আমাকে ডেকেছেন?
বঙ্গবন্ধুঃ হ্যাঁ, জানতে পারলাম, আমার দেশের জনগণের স্বর্গে আসার হার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেছে তুমি এ সম্পর্কে কিছু কি জানো?
জিয়াউর রহমানঃ আমিও জানতে পেরেছি, কিন্তু স্যার হেতুটা জানিনা না।
বঙ্গবন্ধুঃ হেতুটা জানার ইচ্ছা করছে, কি করা যাই?
জিয়াউর রহমানঃ জিল্লুর রহমান চলে এসছে জানেন?
বঙ্গবন্ধুঃ হ্যাঁ, জানি।
জিয়াউর রহমানঃ চলেন উনার কাছে যাই। উনি কিছু দিন হোল এসছে তো, হেতুটা জানলেও জানতে পারে।
বঙ্গবন্ধুঃ হ্যাঁ চল যাই।
জিল্লুর রহমানের বাংলোর গেটে পৌঁছে, দারোয়ানকে দিয়ে খবর পাঠালেন জিয়াউর রহমান।
জিল্লুর রহমানঃ আরে জিয়া তুমি, ক্যামন আছো?
জিয়াউর রহমানঃ আমি একা না, বঙ্গবন্ধুও আছেন।
জিল্লুর রহমানঃ সালাম বঙ্গবন্ধু, কি সৌভাগ্য আমার আপনি জিয়াকে নিয়ে আমার কাছে এসেছেন! আপনাদেরকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? কোন সমস্যা?
বঙ্গবন্ধুঃ হ্যাঁ জিল্লু চিন্তাই আছি। আমার দেশের জনগণের স্বর্গে আসার হার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেছে তুমি এ সম্পর্কে কিছু কি জানো? তুমি তো কিছু দিন আগে আসলে, কারন টা একটু বল, খুব টেনশন হচ্ছে।
জিল্লুর রহমানঃ ভিতরে চলেন। বসে কথা বলি।
বঙ্গবন্ধুঃ না, আজ না। অন্য দিন তুমি কারণটা জানলে বল।
জিল্লুর রহমানঃ (ইতস্ত হয়ে) আসলে এখানে আসার আগে আমি সিঙ্গাপুর ছিলাম তো তাই আমিও ঠিক জানিনা।
বঙ্গবন্ধুঃ জানতাম এই রকম কিছুই বলবে, তোমাদের উপর আমার একদম ভরসা নাই। জিয়া এখন কি করা যাই।
জিয়াউর রহমানঃ তাহলে চলেন মেন গেঁটের দিকে যাই। দেশের কেউ আসলে জিজ্ঞাসা করবো।
বঙ্গবন্ধুঃ হ্যাঁ, এবার ঠিক কথা বলেছ। এদের উপর আমার বিশ্বাস উঠে গেছে। চলো দ্রুত চলো, এখানে সময় নষ্ট করে লাভ নাই(বঙ্গবন্ধু রেগে গেছেন)।
জিয়াউর রহমানঃ জিল্লু ভাই আপনি জাবেন না?
জিল্লুর রহমানঃ (জিয়াউর রহমানের কাছে এসে নিচু স্বরে) কত দিন পর আইভির সাথে দেখা হোল, একটু গল্প করছি, বঙ্গবন্ধুকে একটু বুঝিয়ে বোলো, আমার এখন যাওয়া হচ্ছে না।
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান হাঁটছেন, বঙ্গবন্ধুর রাগান্বিত চেহেরা দেখে জিয়াউর রহমান চুপ-চাপ আছেন। নিরাবতা ভেঙ্গে বঙ্গবন্ধু...
বঙ্গবন্ধুঃ আমি জানতাম জিল্লু আসবেনা। আমার কাছে খবর আছে, জিল্লুর রহমান বর্তমান আওয়ামীলীগের সব থেকে ভালো নেতা ছিল। কিন্তু ওর উপরও আমার আস্থা নেই। দেশের নেতারা কেন যে এমন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেল? ফাজিলের দল নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝে না।
জিয়াউর রহমানঃ স্যার, ওই যে একটা মেয়ে আসছে এদিকে, মনে হয় আমাদের দেশের। চলেন উনার কাছে যাই।
বঙ্গবন্ধুঃ হ্যাঁ চলো।
জিয়াউর রহমান মেয়েটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
জিয়াউর রহমানঃ এই যে আপনি (মেয়ে টা পিছন ফিরে দ্যাখে, চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছে), আপনি কি আমার দেশ থেকে এসছেন?
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান কে একসাথে দেখে মেয়েটা হতবম্ব হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু বলে উঠলেনঃ
বঙ্গবন্ধুঃ এই যে আপনাকে বলা হচ্ছে, আপনি কি আমার দেশ, মানে বাংলাদেশ থেকে এসছেন? কি নাম আপনার?(ধমকের শুরে)।
এবার মেয়েটার যেন হুশ হোল, জি আমার নাম রোজিনা, আমি আপনাদের দেশের লোক। আপনাদের কত ছবি দেখেছি। আপনারা না দুই দলের নেতা, একসাথে কি করছেন? আবার কি মারামারি করবেন, এখানে কি আবার আমাকে মারবেন?
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান দুজনেই বিব্রত।
জিয়াউর রহমানঃ না, আমরা এখানে মারমারি করবো না, আপনাকেও মারা হবে না। আসলে আমাদের দেশ থেকে অনেক মানুষ আসছে, আসার কারন টা জানতে এসেছি। আপনি কি আমদেরকে বলবেন কারন কি?
রোজিনাঃ আমি মূর্খ গার্মেন্টস কর্মী, আমি এত কিছু জানি না স্যার।
বঙ্গবন্ধুঃ তুমি কেন ও কিভাবে এসছেন?
রোজিনাঃ স্যার আমার বিয়ে অইছিল ৪বছর আগে। বিয়ের ২বছর পর আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে যাই। আমার ৩বছরের একটা পুলা আছে। বাপ বুড়া, গরিব মানুষ আমগো খাওন দিবে কি ভাবে? তাই এক ভাবীর কথাই ঢাকা আসি। ভাবী ঐযে সাভার আছে না, ওই সাভারে একটা গার্মেন্টসে চাকরি দিয়ে দেই। বেশ ভালোই ছিলাম গো স্যার, কিন্তু আপনাগো দলের(বঙ্গবন্ধুকে নির্দেশ করে) রানা আছেনা। হেই হগল শ্রমিককে জুলুম করে ওর ভাঙা বিল্ডিঙের কারখানাই কাজ করাচ্ছিল। বিল্ডিং ভেঙে পড়লে আমারে জোর করে এখানে নিয়ে আসলো।
বঙ্গবন্ধুঃ কত জন ছিলেন আপনারা?
রোজিনাঃ আমি জানিনা স্যার, তবে মানুষে বলা বলি করছিল ২/৩ হাজার হবে। জানেন স্যার আমি ওখেনে ৫-৬দিন ছিলাম। চারিদিকে শুধু গন্ধ আর গন্ধ, সব আমাগো লাশের গন্ধ। আমি সেলাই করছিলাম এমন সময় উপরের ছাদ ভেঙে আমার সরিলের উপর পড়ে, আমি মাগো বল্লে চিল্লানি দিয়ে উঠি, খুব পানি খাতি ইচ্ছা করছিল, পানি চাইছিলাম কিন্তু কেউ দিইনি। স্যার গো অনেক কষ্ট হচ্ছিল, এর পর আমার তেমন কিছু মনে নেই। এক সময় দেখি আমি বিল্ডিঙের বাইরে, কিন্তু আমারে কেউ দেখতে পারছেনা। স্যার জানেন আমার ছেলেটা অনেক কান্নছে, ওই যে দেখেন স্কুলের মাঠে বসে আছে। কিচ্ছু কাচ্ছেনা, শুধু মা মা বলে কান্নছে। আমি এত করে ওর কাছে গেলাম, ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম ও কিচ্ছু ঠিক পেল না। শুধু মা দে মে দে বলে কান্নছে। আমার ছেলের কাছ থেকে আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। স্যার আমার লাশটাও আমার ছেলে পাইনি, স্যার আমার ছেলের কি হবে?
বঙ্গবন্ধুঃ আচ্ছা আমরা এখন আসি।
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান কাদতেছে, কাঁদতে কাঁদতে আপন মনে হেঁটে চলেছেন। হঠাৎ অল্প বয়সী একটা ছেলে, ছেলেটার নাম; রেজাউল। ছেলেটা বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের পথ আগলে দাড়াই।
রেজাউলঃ ও আপনারা এইখানে। আপনাগের দুই দলের মানুষ শুধু মারামারি করে। আপনারা এখানে একসাথে গল্প করছেন, দাঁড়ান আমি সবাইকে বলে দেব।
বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান চমকে উঠলেন।
জিয়াউর রহমানঃ বাবা, তুমি ছোট মানুষ এখানে কি করে আসলে?
বঙ্গবন্ধুঃ আমি বড্ড ক্লান্ত, জিয়া উকে নিয়ে চলো বসি। বসে কথা বলি।
জিয়াউর রহমানঃ বাবা চলো ওই গাছের ছায়াই বসি।
রেজাউলঃ আমার হুজুরেরা দেখবে না তো? দেখলে কিন্তু আমারে মারবে। আমি কিন্তু খেলা করতে যাব, বেশি সময় থাকতে পারবো না।
জিয়াউর রহমানঃ না বাব, কেউ দেখবে না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে যেও।
বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান ও রেজাউল গাছের ছায়াই বসলো।
জিয়াউর রহমানঃ আচ্ছা বাবা তুমি কে? কিভাবে এখানে আসলে?
রেজাউলঃ আমি ছোট থাকতে আমার আব্বা মারা গেছে। বাড়িতে শুধু মা আছেন। ঐযে রফি আছে না, ওরা অনেক বড়লোক, আমার মা ওদের বাড়িতে কাজ করে। আমার মা শহরে একটা এতিম খানাই আমাকে দিয়ে দিছিল। মা বলে ওইখানে তিন বেলা খাওন পাবো আবার পড়তেও পারবো। জানেন আমি আমার মাকে বলিছি, আমি বড়হয়ে অনেক টাকা আয় করবো, মাকে আর রফিগের বাড়ি কাজ করতে দেবনা।
জিয়াউর রহমানঃ হ্যাঁ, তা বাবা তুমি এখানে আসলে কি ভাবে?
রেজাউলঃ সেডাই তো বলছি। আমাদের হুজুর আছে না। ওই হুজুর বল্লেন ঢাকা জাতি হবে।ঢাকাই আল্লাহর আইনের জন্য মিছিল করণ লাগবো। ওখানে একটা সমাবেশ আছে। হুজুরের সাথে ঢাকা গেলাম। জানেন ওখানে না অনেক বড় বড় বাড়ি আছে। শুধু বাড়ি আর বাড়ি। আচ্ছা ওই বড় বড় বাড়িতে কারা থাকে?
জিয়াউর রহমানঃ ওখানে বড় বড় মানুষেরা থাকে, বাবা। ঢাকা গেলা তারপর কি হল?
রেজাউলঃ ঢকাই সারা দিন অনেক মজা করে বেড়ালাম। মাঝে মাঝে স্লোগান দিলাম। হুজুরেরা মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছিল শুনছিলাম। রাত হয়ে গেছে হুজুর আমাদের বল্লেন, আজ এইখানেই থাকতে হবে। ওইখানে খাওন দাওন দিল, খেয়ে আমি রাস্তার উপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চারিদিকে অনেক শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আমি উঠে দাড়াতেই কি যেন একটা আমার বুকে এসে লাগে, এই যে দেখেন এখনও দাগ আছে। এই খানে গরম কি যেন একটা ঢুঁকে গেল। অনেক কষ্ট হচ্ছিল। আমি দেখছি, আমগো অনেকে চিৎকার করে বলছিল বাঁচাও গো, মল্লাম গো। তারপর আর মনে নাই। জানেন আমার মা অনেক কাঞ্চছে। আমি মার কাছে গেলাম কিন্তু মা আমাকে দেখতে পারলেন না। তবে বাড়ি থেকে আসার সময় মা প্রত্যেক বারই কান্দেন। আচ্ছা আমি বড় হলে অনেক টাকা কামাই করতে পারবো? জানেন আমার মার না অনেক কষ্ট হয়। আমি বড় হয়ে আমার মার সব কষ্ট শেষ করে দেব। রফিগের বাড়ি মারে আর কাজ করতে দেব না। মারে নতুন শাড়ি কিনে দেব। আমি গেলাম, খেলবো।
রেজাউল উঠেই দৌড় দেয়। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান অপলক চোখে ওর চলে যাওয়া দেখে। দুজনের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।আজ বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান এভাবেই কদঁছে দেশের এ অবস্হা দেখে আমার মন বলছে।
©somewhere in net ltd.