| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা আমাদের দেশে ঋতুভেদে বদলায়। তবে ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী সময়ে আমরা এক নতুন ধরনের সিজনাল দেশপ্রেম দেখলাম। একে বলা যেতে পারে "রিটার্ন টিকিট দেশপ্রেম"। যারা দেশে বিদেশে আরাম-আয়েশে ছিলেন, তারা যখন দেশের ডাকে সাড়া দিলেন, তখন মনে হয়েছিল যেন একঝাঁক দেবদূত দেশ সেবায় নিয়োজিত হবেন । কিন্তু সমস্যা হলো , দেশে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও পদের মায়া ছাড়তে পারছেন না ।
ফারুকী সাহেব একজন প্রতিভাবান মানুষ, এটা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। "টেলিভিশন" বা "ডুব" বানিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে যখন তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা করা হলো, তখন থেকেই ঘটতে শুরু করলো অদ্ভুত সব ঘটনা ।
ফারুকী উপদেষ্টা হওয়ার আগে নিজেই বলেছিলেন, "আমি কখনো পদ চাইনি।" এই কথাটা বলার দুই বছর আগে তিনি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে উপদেষ্টা হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন বলে সাংবাদিকরা খুঁজে বের করলেন। তো পদ চাওয়া বনাম না চাওয়ার এই দ্বন্দ্বটা মিটে যাওয়ার আগেই শুরু হলো আসল নাটক। ফারুকী সাহেব উপদেষ্টা হলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের কাজ শুরু হলো এবং অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে এই জাদুঘরের সভাপতি পদে সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ হলেন তিনি নিজেই।
এখানে একটু থামা দরকার। কারণ ব্যাপারটা কেবল পদ নেওয়ার বিষয় ছিল না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই পদের জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা দরকার ছিল। সেই যোগ্যতা তার ছিল না। তাই অধ্যাদেশে সেই শর্তটাই বদলে দেওয়া হলো, তার সুবিধামতো করে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ২১ দিনের জায়গায় দেওয়া হলো ৭ দিন। লিখিত পরীক্ষার জায়গায় হলো শুধু মৌখিক পরীক্ষা। আর বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতা হিসেবে লেখা হলো "জুলাইয়ের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করা" এবং "নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিশ্বাসী।" যে কোনো সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এই দুটো যোগ্যতা লেখা থাকলে বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষের কমপক্ষে সতেরো কোটি ৯৯ লাখ আবেদন করার যোগ্য হতেন। কিন্তু কার্যত পদটা গেল এক জনেরই কাছে।
এরপর ঘটলো আরো মজার ঘটনা । নির্বাচন হলো, সরকার বদলাল, বিএনপি ক্ষমতায় এলো। নতুন সংসদে জুলাই জাদুঘর বিল উঠল এবং অধ্যাদেশে যে বিধান ছিল, যার জোরে ফারুকী জাদুঘরের সভাপতি পদে বহাল থাকার কথা, সেই বিধানটাই বদলে দেওয়া হলো। বিএনপির একজন এমপি সংশোধনী এনে সভাপতি পদটা দিয়ে দিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রীকে। ফারুকী সাহেব এই গোটা বিষয়টাকে তার বিরুদ্ধে "ফ্রেমিং" বলে চিহ্নিত করলেন। অর্থাৎ তিনি নিজে যা করেছেন সেটা সঠিক, আর যারা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা সবাই ষড়যন্ত্রকারী। এই লজিকে তিনি আরও বললেন, তিনি নাকি "হাসিনার অপকর্ম নিয়ে ডকুমেন্টারি করে এবং জুলাই জাদুঘর করার মাধ্যমে অনেক বড় পাপ করেছেন।" দেশপ্রেমের এই আত্মত্যাগ দেখে মন ভরে গেল।
এদিকে আশিক চৌধুরীর গল্পটা একটু ভিন্ন ধাঁচের। তিনি মানুষটা নিঃসন্দেহে মেধাবী। সিঙ্গাপুরে এইচএসবিসিতে ভালো চাকরি করতেন, ৪১ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে লাফ দিয়ে গিনেস রেকর্ড করেছেন, আইবিএ থেকে পড়াশোনা করেছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ড. ইউনূসের একটা ফোন কলে সব ছেড়ে দেশে ফিরে আসলেন বিডার চেয়ারম্যান হতে। এই পর্যন্ত গল্পটা সুন্দর এবং অনুপ্রেরণামূলক। সমস্যা শুরু হলো এরপর থেকে।
বিডার চেয়ারম্যান হওয়ার পর আশিক চৌধুরী বিনিয়োগ সম্মেলন করলেন, চমৎকার প্রেজেন্টেশন দিলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলেন। দেশের মানুষ তাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে গেলেন। অনেকে বললেন এই লোকটা বাংলাদেশ বদলে দেবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করল। বিদেশি বিনিয়োগ কতটুকু আসলো? এফডিআইয়ের তথ্য বলছে প্রায় কিছুই না। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন জিজ্ঞেস করলেন হোল্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা যাবে কিনা, আশিক বললেন সম্ভব না। অথচ বিডা নিজেই গত এক বছরে এই ধরনের ঋণ অনুমোদন করেছে। যার দায়িত্বে থাকার কথা সেই বিষয়টাই তিনি জানেন না, এটা একটু অবাক করার মতো।
তিরিশ বছর পুরনো বিনিয়োগ সুরক্ষা আইনগুলো এখনো আপডেট হয়নি, যেটা চেয়ারম্যান হওয়ার প্রথম দিনেই করার কথা ছিল। কিন্তু টিকটক ভিডিও এবং ফেসবুক রিলস বানানো হয়েছে নিয়মিত। তবে সবচেয়ে চালাক কাজটা তিনি করে রেখেছেন চুক্তিতে; সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নিজের মেয়াদ নিশ্চিত করা। পদের মধু খাওয়ার জন্য যে ধরনের আইনি সুরক্ষার প্রয়োজন, সেটি তিনি নিতে ভোলেননি।
আর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কথা তো আলাদাভাবে বলতেই হবে। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে দলের অধিনায়ক, একজন সম্মানিত মানুষ। বছরের পর বছর অস্ট্রেলিয়ায় থেকে আইসিসিতে ভালো একটা ক্যারিয়ার গড়েছিলেন। ক্রীড়া উপদেষ্টার একটা ফোনেই সব ছেড়ে দেশে ফিরে এলেন বিসিবির সভাপতি হতে। প্রথমেই ঘোষণা করলেন, এটা হবে একটা "কুইক টি-টোয়েন্টি ইনিংস," অক্টোবরে নির্বাচন দিয়ে চলে যাবেন।
কিন্তু টি-টোয়েন্টি ইনিংসটা ধীরে ধীরে টেস্ট ম্যাচ হয়ে গেল। অক্টোবরে নির্বাচন হলো ঠিকই, কিন্তু বুলবুল নিজেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হয়ে গেলেন। তামিম ইকবাল মনোনয়ন দিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরে দাঁড়ালেন। যে নির্বাচন সুষ্ঠু করার কথা ছিল, সেই নির্বাচনেই সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠল। এরপর এলো সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট। মুস্তাফিজের আইপিএল নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে বিসিবি ভারতে যেতে রাজি হলো না। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে জোট বাঁধল। আর এর ফলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপ খেলতে পারলেন না।
তারপর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলো, বিএনপি ক্ষমতায় এলো এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিল। তদন্তে অক্টোবরের নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ মিলল। বুলবুলের দশ মাসের রাজত্ব শেষ হলো। এরপর যা হলো সেটা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য। বরখাস্ত হওয়ার পরদিনই বুলবুল আইসিসিকে চিঠি পাঠালেন। চিঠিতে লিখলেন, তার অপসারণ অবৈধ, তিনিই একমাত্র বৈধ সভাপতি, তামিমের কমিটি একটা "সাংবিধানিক অভ্যুত্থান" এবং আইসিসির অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা উচিত।
আইসিসির একজন বর্তমান পরিচালক এই চিঠি পেয়ে যা বললেন সেটা হলো সব থেকে মূল্যবান মন্তব্য। তিনি বললেন, এটা অবাক করার বিষয় যে একই বিসিবি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সময় আইসিসির সামনে "সরকারি নির্দেশ মানতে হয়" বলে সরে গেল, আর এখন সেই সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইসিসির কাছে সুরক্ষা চাইছে। আইসিসি স্বাভাবিকভাবেই এই চিঠিতে কোনো সাড়া দেয়নি।
এই তিনজনের গল্প আলাদাভাবে দেখলে হয়তো তিনটে আলাদা গল্প; কিনতু একটাই প্যাটার্ন দেখা যায়। তিনজনই মেধাবী, তিনজনই ভালো অবস্থানে ছিলেন, তিনজনই "দেশের ডাকে" সাড়া দিয়ে এলেন এবং তিনজনই যখন বিদায় নেওয়ার সময় হলো তখন নানা উপায়ে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করলেন। ফারুকী অধ্যাদেশে নিজেকে গুঁজে দিলেন। আশিক চুক্তির মেয়াদ ব্যবহার করলেন। বুলবুল আইসিসিকে চিঠি পাঠালেন।
অন্তর্বর্তী সরকার মানে যে দীর্ঘমেয়াদি সরকার নয়, এটা নামেই বলা আছে। "অন্তর্বর্তী" শব্দের বাংলা অর্থ "মাঝামাঝি সময়ের," "সাময়িক," "দুই পর্যায়ের মাঝে।" এটা বুঝতে পিএইচডি লাগে না। কিন্তু এই তিনজনের মধ্যে কোথাও একটা বিশ্বাস জন্মেছিল যে এই সাময়িক পদ হয়তো স্থায়ী হয়ে যাবে, অথবা স্থায়ী করে নেওয়া যাবে কোনো না কোনো কৌশলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের এই পর্বটা হয়তো একদিন পাঠ্যবইয়ে উঠবে। সেখানে লেখা থাকবে একটা দেশের কথা যেখানে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নিজেকে জাদুঘরের প্রধান বানালেন, একজন স্কাইডাইভার বিনিয়োগ সম্মেলনে রিলস বানালেন আর একজন ক্রিকেটার "টি-টোয়েন্টি ইনিংস" খেলতে এসে বিশ্বকাপ বয়কট করে চলে গেলেন। আর তারপর যার যার মতো করে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করলেন। এই গল্পে না আছে ভিলেন, না আছে হিরো। আছে শুধু তিনজন মানুষ যারা দেশকে ভালোবেসেছিলেন, দেশের পদকেও ভালোবেসে ফেলেছিলেন এবং দুটোকে আলাদা করতে পারেননি।
আশিক চৌধুরীর অযোগ্যতায় বিদেশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোঠায়-দৈনিক ইনকিলাব
আপাতত আইসিসির সাড়া পাচ্ছেন না বুলবুল-ঢাকা ডায়েরী
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ফারুকীর অনিয়মের কীর্তি-পদ্মা ট্রিবিউন
Photo card credit : পদ্মা ট্রিবিউন , দৈনিক ইনকিলাব ও ঢাকা ডায়েরী
২|
২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৪:০৭
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বাংলাদেশ বদলে দেবেন।
ধীরে ধীরে কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করল। বিদেশি বিনিয়োগ কতটুকু আসলো?
.........................................................................................................
বাস্তবতা হলো, বাংলায় একটি প্রবাদ হলো, " যেই লাউ সেই কদু "
যেখানে ইন্ট্রীম সরকারের লক্ষ্য বিভ্রান্তে ভরপুর, উপদেষ্টারা নিজ
আখের গোছাতে ব্যস্ত, তাহলে ভলো কিছু জনসাধারণ কি আশা করবে ???
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৪:০৫
ঢাকার লোক বলেছেন: মন্তব্য নাই! পদ আঁকড়ে থাকা আমাদের ঐতিহ্যবাহী অভ্যাস। দেশের সর্বোচ্চ পদ থেকে শুরু করে সব পদেই, দেশ সেবার সুযোগ স্বেচ্ছায় হাত ছাড়া করতে সবাই নারাজ।