| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একটা মাত্র জিনিস ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে গেলে সম্ভবত দেশের অনেক জট খুলে যেত। সেটা হলো আইনের শাসন। এই দায়িত্ব একান্তই রাষ্ট্রের, সরকারের। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে, তাহলে বাকিটা ধীরে ধীরে পথ খুঁজে নেয়।
তবে ব্যক্তি ও সমাজের স্তরে যে জিনিসটা প্রায় হারিয়েই গেছে, তা হলো পরমত সহিষ্ণুতা। একসময় বুশ সাহেব বলেছিলেন, “Either you are with us, or against us.” সেই মানসিকতা যেন আমাদের সমাজেও অদৃশ্যভাবে জায়গা করে নিয়েছে। এখন মনে হয়, কেউ আমার মতের না হলে সে আমার শত্রু। মাঝামাঝি কোনো জায়গা নেই, ধূসর কোনো অঞ্চল নেই, শুধুই সাদা আর কালো।
রাজনীতির ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখি, এই ‘একদলীয় মানসিকতা’র বীজ অনেক আগেই বোনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতায় থাকা দল ভেবেছিল, বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না। পরে অন্য দলগুলোও একই ইচ্ছা লালন করেছে, প্রতিপক্ষকে মুছে ফেলার ইচ্ছা। গত ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই চেষ্টার সাক্ষী।
আজকের বাস্তবতায়, কেউই খুব নির্দোষ নয়। অথচ, আমরা যখন কথা বলি তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একপাক্ষিক মত দেই। আমার পছন্দ না করা দলেরও যে ভাল কিছু থাকতে পারে, এটা একদমই ভাবতে পারি না।
জামায়াত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী। তাদের লক্ষ্যও অনেকটা প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া।
বিএনপি এক অদ্ভুত অবস্থানে। বিশাল জনসমর্থন থাকার পরও নেতৃত্বে দিকনির্দেশনার অভাব, যেন নিজেরাই জানে না কীভাবে এগোতে হবে।
আর ২৪-এর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল, তাদের মধ্যেও ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে কিছু মানুষ পথ হারিয়েছে বলে শোনা যায়।
রাজনীতি শেষ পর্যন্ত একটা ন্যারেটিভের খেলা। গল্প বানানোর, গল্প চালানোর, আর গল্পে মানুষকে বিশ্বাস করানোর খেলা। একসময় এই খেলায় সবচেয়ে দক্ষ ছিল আওয়ামী লীগ। এখন অনেকেই বলে, ন্যারেটিভ তৈরীর মুকুটহীন সম্রাট হয়ে উঠছে জামায়াত।
যে জামায়াত সমর্থক, সে শুধু জামায়াতপন্থী লেখা পড়ে ও শেয়ার করে।
যে বিএনপি-সমর্থক, সে শুধু বিএনপিকেন্দ্রিক খবর দেখে।
যে আওয়ামী লীগপন্থী, তার ফিডেও একই চক্র।
গুগল-ফেসবুকের যুগে আমরা সেটাই দেখি, যেটা অ্যালগরিদম মনে করে আমরা দেখতে চাই। ধীরে ধীরে আমরা এমন এক জগতে ঢুকে পড়ি, যেখানে নিজের মতটাই একমাত্র সত্য মনে হয়। কয়েনের অন্য পিঠটা চোখের সামনেই থাকলেও আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, পরিবারে দূরত্ব বাড়ে, সমাজে দেয়াল ওঠে। দেশের কথা বলে তৈরি করা এই ন্যারেটিভে শেষ পর্যন্ত দেশের কী লাভ, তা অনেক সময় অজানাই থেকে যায়। গত দেড় বছরে বরং দেখেছি সমাজের বিভক্তি আরও গভীর হয়েছে।
বাংলাদেশের সমাজে এবং রাজনীতিতে ধর্মের উত্থান স্পষ্ট। তবে ধর্ম যে ধৈর্য ধারণের কথা বলে, কারো উপর জোর জবরদস্তি করতে না বলে, শ্রদ্ধা-সম্মানের কথা বলে, নমনীয়তার কথা বলে – সেসবের চর্চা সেভাবে পরিলক্ষিত হয়না। আমরা বলি এক। করি আরেক।
২০২৪-এর যে আশার ট্রেন যেভাবে ঝমঝমিয়ে এসেছিল, মনে হয়েছিল নতুন এক যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু ঠিকমতো উঠে বসার আগেই যেন ট্রেনটা আবার চলে গেল। তবুও তর্ক থামবে না। চায়ের কাপে ঝড় উঠবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধ চলবে। বিভিন্ন সেটেলড ইস্যুতেও সন্দেহের বীজ ঢুকবে, ইচ্ছা করেই ঢোকানো হবে। সেসব, কেউ বিশ্বাস করবে, কেউ করবে না। । পাশাপাশি বসা মানুষ দুজন ধীরে ধীরে দুই ভিন্ন গ্রহের প্রাণী হয়ে যাবে। এভাবেই ট্রেন চলবে, জীবন চলবে।
শুধু যারা চলে গেছে, তারা আর ফিরবে না। যারা দৃষ্টি হারিয়েছে, তারা দেখবে না।
©somewhere in net ltd.