নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাজিদ উল হক আবির

সাধু সাবধান ! ব্লগের মালিক বঙ্গালা সাহিত্যকে ধরিয়া বিশাল মাপের ঝাঁকি দিতে নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত করিতেছেন। সেই মর্মে তিনি এখন কিটো ডায়েটিং, ডন-বৈঠক ও ভারোত্তলন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত। প্রকাশিত গ্রন্থঃ১। শেষ বসন্তের গল্প । (২০১৪)২। মিসিং পারসন - প্যাত্রিক মোদিয়ানো, ২০১৪ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী (অনুবাদ, ২০১৫) ৩। আয়াজ আলীর ডানা (গল্পগ্রন্থ - ২০১৬ ৪। কোমা ও অন্যান্য গল্প(গল্প গ্রন্থ, ২০১৮) ৫। হেমন্তের মর্সিয়া (কবিতা, ২০১৮) ৬। কাঁচের দেয়াল (গল্পগ্রন্থ, ২০১৯) ৭।শহরনামা (উপন্যাস, মাওলা ব্রাদার্স, ২০২২), ৮। মুরাকামির শেহেরজাদ ও অন্যান্য গল্প (অনুবাদ, ২০২৩), ৯। নির্বাচিত দেবদূত(গল্পগ্রন্থ, ২০২৪), ১০। দেওয়ানেগির চল্লিশ কানুন/ফরটি রুলস অফ লাভ (অনুবাদ, ঐতিহ্য, ২০২৪)

সাজিদ উল হক আবির › বিস্তারিত পোস্টঃ

বুকের ভেতর বটবৃক্ষ, পর্ব ৮ঃ শান্তির মা, কই যে থাকে

০৩ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৪৬

ঘটনা আজকের তারাবির পর বেতরের নামাজের সময়ের। দীর্ঘ ২০ রাকাত তারাবি শেষ করে ইমামের পিছে বেতরের নামাজে দাঁড়িয়ে মন যে কই চলে গিয়েছিল, জানি না। হঠাৎ খেয়াল করলাম তৃতীয় রাকাতে ফাতেহার সঙ্গে সুরা মিলিয়ে আরেকটি সুরা পড়ে ইমাম সাহেব তাকবির দিলেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে রুকুতে চলে গেলাম। রুকুতে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড পরে খেয়াল হল, রুকুতে আমি একাই আছি। বাকিরা সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে দোয়া কুনুত পড়ছে। আমি লজ্জার মাথা খেয়ে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া কুনুত পড়া শুরু করলাম। ইমাম রুকুতে যাওয়ার আগে পড়ে শেষও করলাম। সালাম ফিরাবার পর লজ্জায় আর ডানে বামে তাকাতে পারি না। মাথার সামনের দিকে বেশ কিছু চুল পড়ে যাওয়ায় (হয়তো জীবনে শেষবারের মতোই) প্রায় কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল রেখেছি। দাঁড়ি বড় করেছি। যারা আমার আগের মঠেল মার্কা চেহারার সঙ্গে পরিচিত, তারা এখন আমাকে বেশ কিছুদিন পর সামনাসামনি দেখলে ভিরমি খান। আমার লম্বা সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করা লাগে এই হাল কেন। সে যাক, লম্বা চুল, কোর্তা - পাজামা, মুখ ভর্তি দাঁড়ি আর মাথায় টুপি - সব মিলিয়ে আমাকে ইয়ামন ফেরত দরবেশের মতো লাগে। মাঝে মাঝে অফিস থেকে আগে ফিরতে পারলে এই রমজানে আসর থেকে ইফতারের আযান পড়ার একটু আগ পর্যন্ত মসজিদে বসে সুললিত কণ্ঠে, তারতিলের সঙ্গে কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করি। আমার তিলাওয়াত আলহামদুলিল্লাহ আসলেই বেশ সুন্দর। গান গাইতাম যেহেতু, কণ্ঠ সহায়তা করে। তো সব মিলিয়ে আমার যে দরবেশি চেহারা আর চরিত্র এই গোটা রমজান জুড়ে মহল্লার মসজিদে তৈয়ার করেছি, সেটার দফারফা হয়ে গেলো মনে হচ্ছিল, বেতরের নামাজে দোয়া কুনুত পড়ার বদলে রুকুতে চলে গিয়ে।

মনটা সকাল থেকেই বিক্ষিপ্ত। আজ সাতসকালে নতুন একটা কাজ শিখেছি। ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যাংক টু ব্যাংক টাকা ট্রান্সফার করা। আমার বাচ্চার মায়ের অ্যাকাউন্টে ১০,০০০ টাকা পাঠাতে গিয়ে দেখি, অ্যাপ আরও ১০ টাকা কেটে নিলো। সে নেক। আমি টাকা পাঠানোর কনফার্মেশন ম্যাসেজ বাচ্চার মাকে মোবাইলে ম্যাসেজ করে জানানোর পর সে ফিরতি ম্যাসেজে জানালো, আগামীকাল মঙ্গলবার আমার বাচ্চার সঙ্গে আমার সাপ্তাহিক সাক্ষাতের প্রি - ফিক্সড ডেট থাকলেও, সেটা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, আমার বাচ্চার শরীর হালকা খারাপ। ম্যাসেজটা যখন এলো, আমি আমার তৃতীয় বর্ষের স্টুডেন্টদের অ্যাডভান্সড রিডিং অ্যান্ড রাইটিং ক্লাসে গানের রিভিউ লেখা শেখাচ্ছি। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে - কোল্ড প্লে ব্যান্ডের ফ্লাই অন । পর্দায় লিরিক ভেসে আছে -

Flock of birds
Hovering above
Just a flock of birds
That's how you think of love

And I always
Look up to the sky
Pray before the dawn
'Cause they fly away
Sometimes they arrive
Sometimes they are gone
They fly on
Ride through
Maybe one day I'll fly next to you
Fly on

ইত্যাদি।

ছেলে মেয়েগুলি তর্ক লাগিয়ে দিয়েছে - এটা প্রেমের গান। এই পাখি হচ্ছে যার যার প্রেমিক বা প্রেমিকা। তারা আসে এবং যায়, ইত্যাদি। আরেকদল বলছে, তাহলে ফ্লক অফ বার্ড, বা পাখির দল কেন বলা হল? প্রেমিক প্রেমিকা গুচ্ছ বোঝাতে?

আমি তখন যে লিরিক ভিডিওটা অন করে রেখেছিলাম, তাতে দল বেঁধে উড়তে থাকা পাখির দিকে তাকিয়ে আছি। মন চাইছিল, আসলেই সেই পাখিগুলর ঝাঁকের একটা হয়ে ওদের সঙ্গে উড়ে বেড়াতে। জীবনানন্দ তো সাধে বলেন নি, যে জীবন দোয়েলের - ফড়িং এর, তার সঙ্গে আমাদের দেখা হয় না। আমরা জন্মেছি মানুষ হয়ে, এই জীবনের ভার বহন করে বেড়ানোই আমাদের নিয়তি।

তো, এ সপ্তাহে তাহলে আমি আমার সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। এটা নিয়ে আসলে তর্ক করার কিছু নেই। ডিভোর্সের পর বাচ্চার মায়ের ইচ্ছার ওপর অনেকাংশেই নিরভর করে বাচ্চাকে দেখতে পাওয়া না পাওয়া। আমি চিন্তা করে দেখি ইদানীং, আমার বাচ্চার সঙ্গে আমার অধিকাংশ স্মৃতি, গত ২ বছরের, গাড়ির ভেতর। গাড়িতে ওকে পিক করে আনা, আর পরে ফেরত দিয়ে আসা, এই করতে করতে জুলাই ২০২৪ এলো, সেই কারফিউ, সে লড়াই, সেই গোলাগুলি। আমার মাথায় একটা কন্সারন, বাচ্চাকে দেখতে পাচ্ছি না সপ্তাহ গড়িয়ে যাচ্ছে। বা, বাচ্চাকে যদি ফাঁকেতালে একদিন আনতে পারি বাসায়, কারফিউ শুরু হবার আগেই ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে ওর মায়ের বাসায়। তারপর শীত - গ্রীষ্ম - বর্ষা, ঝড়, বন্যা কত কিছু দেখলাম বাপব্যাটা গাড়িতে বসে। গাড়ির ভেতরেই ওর আর আমার সবচে বেশী সময় কেটেছে।

আজ বিকালে বাড়ি ফেরার সময় একটা শো রুমে গিয়ে দেখলাম বাপ - ব্যাটার একই রকম কালার আর ডিজাইনের দুটো পাঞ্জাবী ডিসপ্লেতে পুতুলের গাঁয়ে পড়িয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে । আজ কেনা হল না, কারণ, শপিং মলের মালিক বলল আরও ডিজাইন আসবে কাল পরশু। ছেলেকে দেখতে না পেলেও, ছেলের ঈদশপিং শুরু করবো ইনশাআল্লাহ আগামীকাল।

ঠিক গতকাল ছিল লিগাল এইডে আমার দায়ের করা অভিযোগের শুনানি। বাচ্চার মায়ের সঙ্গে। কোন গতিতে পৌঁছানো গেলো না। চুক্তিপত্র তৈরি করার পরেও তৃতীয়বারের মতো তিনি অস্বীকার করলেন বাচ্চার কাস্টাডি সংক্রান্ত মামলা মিটাতে, যেটা এখন পারিবারিক আদালতে চলমান। আমি ভরনপোষণের অর্থ দিচ্ছি নিয়মিত, তিনিও বাচ্চাকে দেখতে দিচ্ছেন, কিন্তু মামলা তুলতে আগ্রহী নন, কারণ বাচ্চা বাবার কাছে চলে যেতে চায় বাচ্চার বাবা বাচ্চাকে খেলনা দিয়ে আরও নানা জিনিস ঘুষ দিয়ে বাচ্চার মনোযোগ কিনে নিতে চায়।

অথচ বাচ্চার মন জয় করবার একমাত্র মুদ্রা ভালোবাসা। নিশ্ছিদ্র, নিরবচ্ছিন্ন, একাগ্র মনোযোগ, এবং ভালোবাসা। মেয়েমানুষ এত বুদ্ধিমান, আমার বাচ্চার মায়ের মাথায় সেটা ঢোকে না কেন?

আমার বাচ্চার কাস্টাডি কেস জেতার কোন সম্ভবনা আমার নেই। বাচ্চা সাড়ে তিনবছর বয়স মাত্র। তবে, আমার সামনে আসলে কেসটা লড়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আপসে মানছে না যেহেতু, আর হয়রানিমূলক মামলাটাও তুলে নিচ্ছে না। নির্মম কোর্ট, কোর্টের মানুষজনের কাছে আমার এই গল্প নৈমিত্তিক ঘটনা। কি করেছি, কিসের মধ্য দিয়ে গেছি বাচ্চাকে একনজর দেখতে - ব্যাপার না। এগুলো হয়।

তবুও, বেতরের নামাজে দোয়া কুনুত পড়ার বদলে রুকুতে যাওয়ার দুঃখ ভুলতে পারছি না। জানি, মনোযোগ থাকার কথা না। তবুও।

ছোটবেলায় ড্রেনে বল পড়ে গেলে সে বল উঠাতে চাইতাম না বলে পাড়ার সমবয়সী ছেলেরা আমাকে খেলায় নিত না । আমি তখন বিকেলবেলার সময়টুকু মসজিদের বারান্দায় বসে থাকার অভ্যাস করেছিলাম। এটা আমার প্রায় পুরো হাইস্কুল জুড়ে ঘটেছিল। এখনও ইদানীং মন খারাপ থাকলে মন চায়, কিছু না করে স্রেফ মসজিদের ভেতরে ঢুকে বসে থাকি। তাতে জীবন চলে না। অনেকগুলো মানুষের দায়িত্ব কাঁধে।

ডিভোর্সের পর পুরুষমানুষ কিসের ভেতর দিয়ে যায়, সে নিয়ে খুব বেশী লেখাপত্র নেই সম্ভবত। জীবনের এই কষ্টকর ঘটনার দু'বছর পেরিয়ে এসে, মাঝেমাঝে কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেব এই বিষয়ে।


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.