নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাজিদ উল হক আবির

সাধু সাবধান ! ব্লগের মালিক বঙ্গালা সাহিত্যকে ধরিয়া বিশাল মাপের ঝাঁকি দিতে নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত করিতেছেন। সেই মর্মে তিনি এখন কিটো ডায়েটিং, ডন-বৈঠক ও ভারোত্তলন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত। প্রকাশিত গ্রন্থঃ১। শেষ বসন্তের গল্প । (২০১৪)২। মিসিং পারসন - প্যাত্রিক মোদিয়ানো, ২০১৪ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী (অনুবাদ, ২০১৫) ৩। আয়াজ আলীর ডানা (গল্পগ্রন্থ - ২০১৬ ৪। কোমা ও অন্যান্য গল্প(গল্প গ্রন্থ, ২০১৮) ৫। হেমন্তের মর্সিয়া (কবিতা, ২০১৮) ৬। কাঁচের দেয়াল (গল্পগ্রন্থ, ২০১৯) ৭।শহরনামা (উপন্যাস, মাওলা ব্রাদার্স, ২০২২), ৮। মুরাকামির শেহেরজাদ ও অন্যান্য গল্প (অনুবাদ, ২০২৩), ৯। নির্বাচিত দেবদূত(গল্পগ্রন্থ, ২০২৪), ১০। দেওয়ানেগির চল্লিশ কানুন/ফরটি রুলস অফ লাভ (অনুবাদ, ঐতিহ্য, ২০২৪)

সাজিদ উল হক আবির › বিস্তারিত পোস্টঃ

স্টালিন পুত্র ইয়াকভঃ নিজের ইচ্ছামত টাট্টিখানা ব্যবহারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে শহীদ হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক মহান যোদ্ধা

১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:০৯



খবরটা ১৯৮০ সালে সানডে টাইমসে প্রকাশিত হবার আগে স্টালিনের পুত্র ইয়াকভের মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। জার্মান অফিসারদের হাতে আটক হবার পর তাকে কিছু ব্রিটিশ আর্মি স্টাফের সঙ্গে একই তাঁবুতে পাঠানো হয়। সেখানে সকলের একই টাট্টিখানা ব্যবহার করা লাগতো। স্টালিন পুত্রের অভ্যাস ছিল পায়খানা ব্যবহার করার পর সেটা পরিষ্কার না করেই ফিরে আসা। দুনিয়ার সবচে ক্ষমতাধর আদমির সন্তান হলেও তার এই পায়খানা নোংরা করে আসার ব্যাপারটায় ব্রিটিশ বন্দীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তারা তাদের এই ক্ষোভের কথা ইয়াকভকে বলে। তাতে আবার ইয়াকভ পাল্টা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা থামে না, বরং বারবার বারবার ইয়াকভের নজরে ব্যাপারটা আনে, এবং তাকে তার নোংরা করে যাওয়া টাট্টিখানা পরিষ্কার করতে বলতে থাকে। এতে করে সে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, ঝগড়া করে, সে ঝগড়া হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। শেষমেশ ক্যাম্প কমান্ডারকে বিচারক মেনে সে এক শুনানির অনুরোধ করে। কিন্তু অহংকারী জার্মান কমান্ডার হাগামোতার মতো বিষয় নিয়ে আসর বসাতে রাজি হয় না। স্টালিন পুত্রের পক্ষে অপমান অসহনীয় লাগে। আকাশের দিকে তাকিয়ে, রাশিয়ান ভাষার সবচে বাজে গালিগুলো চিৎকার করে উচ্চারণ করতে করতে সে ক্যাম্পকে বেষ্টন করে রাখা ইলেকট্রিক তারের বেড়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার দেহ, যা আর কখনো ব্রিটিশ সৈন্যদের টাট্টিখানাকে নোংরা করে নি, সেটা ঝুলে থাকে নিথর নিস্পন্দ অবস্থায়, বৈদ্যুতিক তারে।

স্টালিন পুত্র ছিল নিয়তির নির্মমতার শিকার। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী স্টালিনের এই পুত্র যে নারীর গর্ভে জন্মায়, স্টালিন তাকে হত্যা করেছিল। স্টালিন পুত্র তাই এক হিসেবে ছিল ঈশ্বরপুত্র (যেহেতু তার পিতাকে সোভিয়েত রাশিয়ায় ঈশ্বরের চোখে দেখা হতো) এবং একই সঙ্গে ছিল ঈশ্বর পরিত্যাজ্য। তাকে মানুষ ভয়ও পেতো দু'কারণেঃ সে তাদেরকে আহত করতে পারত তার ক্রোধের দ্বারা (যেহেতু সে স্টালিন পুত্র) এবং তার আনুকুল্যের দ্বারা (যেহেতু সে স্টালিন পুত্র, কাজেই স্টালিন পুত্রের বন্ধুদের শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেও তাকে শাস্তি দিতে পারে)।

উপেক্ষা আর বিশেষাধিকার, আনন্দ এবং বেদনা - ইয়াকভের মতো করে এই দুই বিপরীত মেরুর অবস্থান আর কেউ কখনো বোঝে নি; মানব অস্তিত্বের এক মেরু থেকে অপর মেরুতে পা রাখা যায় কতোটা সংক্ষিপ্ত পথে, ইয়াকভের মতো করে তা কেউ কখনো জানে নি।
তারপর, যুদ্ধের শেষদিকে সে জার্মানদের হাতে বন্দী হয়, তাকে জেলখানা ভাগ করে নিতে হয় এমন আরেক জাতির যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে, যারা গোড়া থেকেই তাকে দু'চোখে দেখতে পারত না। এরাই তাকে টাট্টিখানা নোংরা করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এই মানুষটি, যার কাঁধে ছিল সর্বোচ্চ ক্রমের নাটুকেপনার ভার (যেহেতু সে একই সঙ্গে ছিল এক স্বর্গচ্যুত ফেরেশতা, এবং ঈশ্বরপুত্র), তাকে হাগামোতার মতো একটা বিষয়ে বিচারের সম্মুখীন করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত ছিল? মানবজীবনের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্নস্তরের নাটক তবে এরকম মাথায় চক্কর লাগিয়ে দেয়ার মতো কাছাকাছি?

মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো নিকটবর্তী? নৈকট্য তবে মাথাও ঘুরিয়ে দিতে পারে?

পারে। যখন উত্তর আর দক্ষিনমেরু এতোটা কাছাকাছি চলে আসে যে, তারা চাইলেই একে অপরকে স্পর্শ করতে পারে, এমতাবস্থায় পৃথিবী উধাও হয়ে যায়, আর মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে এমন এক শূন্যতায়, যা তার মাথা ঘুরিয়ে দেয়, সে তাল হারিয়ে পড়ে যেতে বাধ্য হয়।

যদি উপেক্ষা আর ছাড় দেয়া - উভয়ে মিলে যায়, যদি উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্টের মাঝে কোন তফাৎ না থাকে, যদি ঈশ্বরপুত্রকে তার হাগামোতা নিয়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব তার ওজন হারিয়ে পরিণত হয় অসহনীয় ভারহীন এক বস্তুতে। যে মুহূর্তে স্টালিন পুত্র ছুটে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে নিজের শরীর ছুঁড়ে মারে, তখন অসহনীয় ভারহীন এক পৃথিবীর বুকে আকাশের দিকে মাথা তুলে, ইয়াকভের প্রাণহীন দেহকে ধারন করে দাঁড়িয়ে থাকা সে তারের বেড়াগুলিকে একত্রে এক সাংগীতিক স্টাফ নোটেশনের মতো লাগে। সে এমন এক পৃথিবীর বস্তু, যে পৃথিবীর মাত্রাজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে।

স্টালিন পুত্র তার প্রাণ হারালো পায়খানার মতো একটা বিষয় নিয়ে। কিন্তু নিজের খেয়ালখুশী মতো হাগার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো আদতে কোন অনর্থক মৃত্যু নয়। জার্মানির সীমানা আরও পূর্বের দিকে ঠেলে বাড়াতে গিয়ে যেসব জার্মান প্রাণ হারাল, কিংবা পশ্চিমের ওপর নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে গিয়ে যে সব রুশিরা মারা পড়লো - এগুলো হচ্ছে বেকুবের মতো মারা পড়া। এসকল মৃত্যুর কোন অর্থ নেই, নেই সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা। যুদ্ধের সামগ্রিক মূর্খতার মধ্যে স্টালিনপুত্রের মৃত্যুই একমাত্র আধ্যাত্মিক মৃত্যু।

(লেখাটি মিলান কুণ্ডেরার অমর উপন্যাস অস্তিত্বের অসহনীয় ভারহীনতা (দা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং) এর ষষ্ঠ পরিচ্ছদের একটি অংশ। উপন্যাসটি আমার অনুবাদ করা শেষ, ভাষা সম্পাদনা করতে গিয়ে এই অংশটুকু, ভাবলাম আমার ব্লগের পাঠকদের উদ্দেশ্যে শেয়ার করি। কুণ্ডেরা এখানে সকল রকমের যুদ্ধের সামগ্রিক অসাড়তার অসাধারণ সমালোচনা করেছেন।)

মন্তব্য ২ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২৩

ঠাকুরমাহমুদ বলেছেন:



ভালো লিখেছেন। যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে আমার ভালো লাগে। বাংলাদেশের যুদ্ধ সহ অন্যান্য দেশের যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা দেখেছি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কিছু লিখি, অল্প কিছু লিখেছি। আশা করি আগামীতে লিখবো।

১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৪০

সাজিদ উল হক আবির বলেছেন: ধন্যবাদ, শ্রদ্ধেয় ব্লগার। আরও একটু খুঁটিয়ে পড়লে হয়তো লেখার সারফেসের বাইরে আরও কিছু ম্যাসেজ ধরা পড়বে। আন্তরিক শুভকামনা। আপনি আপনার দেখা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখুন। আমি পড়বো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.