নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পাগলের প্রলাপ

একবার তো লিখলাম ।

আবীর আমান

আশে পাশের মানুষ বলে পাগল ছেলে । আড়ালে বলে গাধা । আমি নিজেও বুঝিনা মানুষ জিনিসটা কি?

আবীর আমান › বিস্তারিত পোস্টঃ

দি ক্লশিং রক- ইয়ান সেরেলিয়ার [অনুবাদ পর্ব ১/৫]

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ২:৩২

দি ক্লাসিং রক

মূলঃ ইয়ান শেরেলিয়ার

রূপান্তরঃ মহিউল মিঠু















জেসন আর আরগোনটসদের কাহিনী গ্রীক রূপকথার সবচেয়ে সফল কাহিনীগুলোর একটা। সাহসিকতা, ম্যাজিক আর চমকে ভরা এই গল্প তিন হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

কিরনের ছাত্র জেসন শয়তান পেলিয়াসের কাছ থেকে তার সিংহাসন ফেরত পেতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু ধূর্ত পেলিয়াস ফাঁদে ফেলে তাকে যেতে বাধ্য করে অসম্ভব এক অভিযানে।

রাজমুকুট পড়তে হলে গোল্ডের ফ্লিস ফিরিয়ে আনতে হবে ওকে। কিন্তু দিন-রাত গোল্ডেন ফ্লিস পাহাড়া দিচ্ছে এক ময়াল সাপ।

আশার কথা হল জেসনের সাথে আছে আরগনটসরা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এ সেনাদল নিজেদের কতটা সক্ষম প্রমান করতে পারবে নিজেদের, যখন প্রতিপক্ষ হল শয়তান হারপিস, তালোসের মত দানব, সাইরেনদের মত পরী আর এরকম আরো অনেকে?...





উৎসর্গপত্র,

এই দাদী-মা’র জন্য

আমার জীবনের সব রূপকথার গল্প তিনি একাই শুনিয়েছেন। এখনও শুনিয়ে চলেছেন।

নানী-মা’র জন্য

গল্প শোনানোর জন্য আমি তাকে খুব বেশিদিন পাইনি। কিন্তু অল্প কয়েকদিনে তিনি ভালোবাসার বৃষ্টি বইয়ে দিয়েছিলেন।

দাদা’র জন্য

এই ভদ্রলোককে আমি দেখিই নি, তার একটা ছবিও কারো নাই কেন কে জানে।

নানা’র জন্য

তিনি তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে উঠুন, আমরা আবার একসাথে ক্ষেতে যাব, পাকা ধান দেখতে।





সূচিপত্র

১_ গুহা ২_ নদী ৩_ নিষ্ঠুর রাজা

৪_জাহাজ তৈরি ৫_রাত্রি বিদায় ৬_অন্ধকারের কান্না

৭_ফিনিয়াস আর হারপিস ৮_সংঘর্ষ কঙ্কর ৯_আসমানী আক্রমন

১০_রাজা এইটিস ১১_মেডিয়া ১২_ লড়াই

১৩_গোল্ডেন ফ্লিস ১৪_পলায়ন ১৫_সারকির দ্বীপ

১৬_সাইরেনদের সংগীত ১৭_বিয়ে ১৮_আফ্রিকার মরুভূমিতে

১৯_তালোস ২০_ঘরে ফেরা







১... গুহা



মাউন্ট পেলিয়নের জঙ্গলে এক শীতের সকাল। ঝড়ো বাতাস বইছে। একটা লোক সেই ঝড়ো বাতাসের সাথে লড়ছে। পশমি কাপড়ের একটা পোটলা বুকের সাথে চেপে রেখেছে সে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে সেটিকে ঠাণ্ডা বাতাস থেকে বাঁচাতে।

পাহাড়ের অনেক উপরে উঠে একটা গুহা দেখতে পেল লোকটা। গুহার ভেতর থেকে বীনার শব্দ আসছে। গুহার মুখে সে পোটলাটা সাবধানে রাখল যাতে ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি তাতে না লাগে। তারপর তাড়াতাড়ি সেখান থেকে নেমে মাঠ আর আঙ্গুরের ক্ষেত পাড় হয়ে প্রাসাদে ফিরে চললো। প্রাসাদ থেকেই সে এসেছিল। একটা বিপদজনক আর গোপন কাজে পাঠানো হয়েছিল তাকে। ফিরে এসে সে তার মলিককে জানলো যে সে তার কাজ ঠিকমত করেছে।

গুহায় ফিরে আসা যাক। সেখানে বীনা বাজাচ্ছিল যে লোকটা তার নাম কিরন। তিনি একজন সেনটোর। উপরের অর্ধেক মানুষ, আর কোমড়ের নিচ থেকে ঘোড়া। পোঁটলাটা আবিস্কার করতে বেশি সময় লাগল না তার। সেটাকে হাতে নিতেই ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ এলো। ভেতরে একটা সদ্যোজাত শিশু। সাথে এসনের একটা চিঠি। এসন বাচ্চাটার বাবা। সে চায় কিরন তার ছেলের দেখাশোনা করুক। আর তার যোগ্য প্রশিক্ষণে যথাযত এক রাজকুমার হয়ে উঠুক। এসন তখন আর ইওল্কোসের রাজা না, যদিও ইওল্কোস তারই রাজ্য। তার সৎ ভাই পেলিয়াস সিংহাসন দখল করে তাকে আর তার স্ত্রী আলমেডাকে বন্দী করে রেখেছে।

বন্দী অবস্থায় এসনের একটা ছেলে হল। সে আর তার স্ত্রী দুজনেই খুব চিন্তায় পরল। সিংহাসন পাকাপোক্ত করতে পেলিয়াস তাদের সন্তানের জীবন শেষ করে দিতে পারে। তাই তারা সবাইকে বলল যে তাদের মরা বাচ্চা হয়েছে আর বিশ্বস্ত এক চাকরকে দিয়ে বাচ্চাটাকে শহরের বাইরে কিরনের কাছে পাঠিয়ে দিল। এসন ভালোই জানত কিরন সম্পর্কে। কিরন আগেও অনেক রাজপুত্র আর বীরপুত্রদের লালন পালন করেছে। তার ছাত্রদের অনেকে পরে অনেক বিখ্যাত হয়েছে। তার খ্যাতি সারা গ্রীসে। আর সংগীত, চিকিৎসা, ধনুর্বিদ্যায় তার চেয়ে ভালো শিক্ষক তখন ছিল না। ছেলের নাম দেয়া হল জেসন। নামটা দিল কিরন।

প্রথমে পাহাড়ের পরীরা জেসনের দেখাশোনা করত। তারপর ছয় বছর বয়স থেকে কিরনের সাথে থাকতে শুরু করে। কিরন তাকে সন্তানের মত দেখত। নিজে যা জানত তার সবই তাকে শেখালো। লতা পাতা দিয়ে চিকিৎসাও সে-ই জেসনকে শিখিয়েছিল। তার ওষধি গাছের একটা বাগান ছিল। সেটা দেখাশোনার ভারও সে জেসনের উপর ছিল।

কিরন তাকে পড়ালেখা ছাড়াও অস্ত্রশিক্ষা, আকাআকি, ভাল বীনা আর লেইর (প্রাচীন গ্রীসের তারের এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজাতে শিখিয়েছিল। জংলি ছাগল আর হরিণ শিকারেও তাকে অপ্রতিদ্বন্দী করে তুলেছিল। সে তাকে সবসময় সাহসী আর স্বনির্ভর হতে বলত।

জেসন হয়তো হেরাকলস আর এনিয়াসের মত শক্তিশালী ছিল না কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা প্রখর রোদ অথবা তুষারপাতের মধ্যে কাজ করতে পারত অনায়েসেই। আর তাছাড়া ওরা বয়সেও জেসনের চেয়ে বড় ছিল। শিশু বয়স থেকেই তার মধ্যে রাজকীয় এক গাম্ভীর্য আর মাহাত্ম ছিল যা তাকে সতীর্থদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। কিরনের সব শিস্যরা একে একে বড় হল। বিদায় নিতে শুরু করল।

একসময় জেসনের পালা আসল। কিরন তাকে ওরাকলের(ওরাকল-যে দৈববাণী করতে পারে) সাথে কথা বলতে বলল।

ওরাকল তাকে ইওল্কোসে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। বলল, “সবার আগে তোমার উচিত, পেলিয়াসের কাছে এসনের সিংহাসন দাবী করা। কারন এসনই আসল রাজা।”

জেসন যাবার জন্য তৈরি হল। তার চামড়ার আলখাল্লাটা পড়ল। বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য একটা লেপার্ডের চামড়া নিল। আর নিজের নিরাপত্তার জন্য নিল তরবারি আর একটা বর্ষা।

কিরনকে ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না। তবু যেতেই হবে। কিরনের সামনে গিয়ে ও বলল, “আজ আমি বাবার সিংহাসন ফিরিয়ে দেবই দেব।” যতটা সাহস তার বুকে ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল মুখে।

‘ধৈর্য ধর, জেসন। তোমার সামনে অনেক কঠিন পথ। আমি তোমাকে শিখিয়েছি কিভাবে সেই কঠিন পথের মুখোমুখি হতে হবে।’

‘কিরন, তোমায় আর কখনই সাথে পাব না, ভাবতেই খারাপ লাগছে। জানি তোমার মত জ্ঞানী আর কেউ নেই।’

‘তুমি কি আমায় দেবতাদের মত জ্ঞানী মনে করো? তোমার যদি সেরকমই মনে হয় তাহলে আমি তোমাকে কিছুই শেখাতে পারিনি। তারা তোমার সাথে থাকবেন। আর শেষে বলব, দুটো জিনিস মনে রাখবে- সামনের মানুষটাকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে, সে যেই হোক না কেন। আর সবসময় কথা দিয়ে কথা রাখবে। সাবধানে যাও। আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার সাথে থাকবে।’

জেসন কিরনের হাতে চুমো দিল। মনের গভীর থেকে ধন্যবাদ দিল। কিন্তু কোন কিছুই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়।

তারপর বিদায় নিল।































২... নদী



জেসন এক ছুটে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলো। একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকানোর সাহস পেল না। ফের মায়া তাকে বেঁধে ফেলে! পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়ে খরস্রোতা নদী বয়ে চলেছে। তখন বসন্তকাল। বরফ গলে খরস্রোতা নদী আরো খরস্রোতা রূপ নিয়েছে। পর্বতের ডগা থেকে গলে গলে গিড়িসংকটে গর্জন তুলে পানি জলোচ্ছ্বাসের বেগে ছুটে চলেছে ভাটির দিকে। পানিতে নেমে জেসন ঠিক করল স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নদীর মাঝের পাথর আঁকড়ে ধরবে। তারপর বাকিটা পাড় হবে।

হঠাৎ সে একটা ডাক শুনতে পেল । একটা বুড়ি পাশে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হাতের লাঠি নাড়িয়ে নাড়িয়ে তাকে ডাকছে, ‘নদীটা একটু পার করে দাও না, বাপু?’

জেসন একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার নদীর দিকে চোখ দিতেই কেঁপে উঠল। এই তীব্র স্রোতের মধ্যে আরেকজনকে নিয়ে কিভাবে নদী পাড় হবে সে? যদি কোনভাবে পাথরটা মিস হয় তাহলেই শেষ। স্রোত দুজনকেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জলপ্রপাতে। আর আঁছড়ে ফেলবে নিচের পাথরে।

‘তাড়াতাড়ি করো। পানি বেড়ে যাচ্ছে । দেবী হেরার দোহাই...।’ বুড়ি আবার চিৎকার করে বলল।

জেসন হয়তো না বলত কিন্তু হঠাৎ ওর কিরনের কথা মনে পড়ল ‘তোমাকে দেবী হেরা রক্ষা করবেন।’ সে রাজি হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু আগে আরেকটু বেশি সহজ রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।’

‘না না আমি দেরী করতে পারব না।’ এই বলেই সে হাতের লাঠি ছুড়ে ফেলে এক লাফে জেসনের পিঠের উপর পড়ল। বুড়ির হাত জেসন নিজের গলায় ফাঁসের মত অনুভব করল। স্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল ওর। আর বুড়ির হাড় জিড়জিড়ে পা তো ইদুর মারা ফাদের মত ওকে জড়িয়ে রেখেছে।

স্রোত ওদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। জেসনের নিজেকে খড় কুটো মনে হল। সে কোনমতে পাথরের দিকে নিজেকে ভাসিয়ে দিল। কিন্তু পিঠের অতিরিক্ত ওজনের কারনে পাথরে কাছে ঠিক মত পৌঁছল না। একহাতে থাবা দিয়ে কনোরকম পাথরটা ধরতে পারল। একহাত দিয়েই পাথরটা ধরে রাখল কোন রকমে। পাথর আঁকড়ে ধরে একটু বিশ্রাম নিল।

‘তুমি কি আমায় ঠাণ্ডায় মেরে ফেলতে চাও নাকি? তাড়াতাড়ি কর। ঠাণ্ডায় মরার আগে ওপারে নিয়ে যাও।’ বুড়ি আবার চিৎকার শুরু করেছে ।

পরের পাথর আর জেসনদের মাঝে স্রোত সাদা ফেনা তুলছে। এই বাড়তি বোঝা নিয়ে সে এই স্রোত সাঁতরে পাড় হতে পারবে না। লাফিয়ে পাড় হতে হবে। এদিকে বুড়ি ঘোড়ার জকির মত বসে আছে পিঠে। পাথরের উপর উঠে জেসন লাফ দিল। অতিরিক্ত ভাগ্যের জোর বা দেবতাদের খাস রহমত, যে কারনেই হোক শেষ পর্যন্ত টাল সামলে ঠিক মত পাথরের উপর দাঁড়াতে পারল সে। এখানে স্রোত খানিকটা শান্ত। বাকিটা হেঁটেই পাড় হল।

পিঠের বোঝাটা নামাতে নামাতে ও বলল, ‘দেবতারা নিজ হাতে বাঁচিয়েছেন।’

সে ঘুরে বুড়িটার দিকে তাকাল কিন্তু বুড়ি হাওয়া। তার জায়গায় অসম্ভব সুন্দরী এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।

‘আমি দেবী হেরা, জিয়ুসের স্ত্রী।’ জেসনের দিকে তাকিয়ে বললেন দেবী। ‘আমার দরকারের সময় তুমি সাহায্য করেছ। যদি কখনও তোমার কোন দরকার হয়, আমাকে ডেকো, নিরাশ হবে না।’

এই বলে হেরা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে মাউন্ট অলিম্পাসের মাথায় তার সিংহাসনে ফিরে গেলেন।

জেসন আলখাল্লা আর লেপার্ডের চামড়া চিপে পানি ফেলে দিল। তার তরবারি আর বর্শাটা ঠিকঠাক থাকলেও স্রোতের মধ্যে একটা স্যান্ডেল খোয়া গেছে। সে হেঁটে হেঁটে ইওল্কোসে ঢুকল। তার এক পায়ে স্যান্ডেল আরেক পা খালি।

























































৩... নিষ্ঠুর রাজা



জেসন ইওল্কোসের বাজারে ঢুকতেই, সামনে বেশ একটা ভীড় দেখল। লোকজন রাজার জন্য অপেক্ষা করছে। রাজা দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দিতে আসছে। ফিরাস আর এডটাস পাশের দুই শহরের রাজা। তারাও সেখানে উপস্থিত। কিন্তু ভীড়ের লোকজন সব তাকিয়ে আছে জেসনের দিকে। সবাই অনুমান করতে চেষ্টা করছে ওর পরিচয়। কেউ ভাবল, ও কবিতা আর গানের দেবতা এপোলো আবার কেউ ভাবল যুদ্ধের দেবতা এরিস।

একটা খচ্চরে টানা গাড়ি এলো। গাড়ি থেকে বের হল রাজা পেলিয়াস। শুধু এক পায়ে সেন্ডেল পড়া সুদর্শন জেসনকে দেখে রাজা ভয়ে হালকা একটু কেঁপে উঠল। একবার এক জ্যোতিষী তাকে বলেছিল, একদিন এক পায়ে স্যান্ডেল পরে এক ছেলে আসবে আর তার কাছ থেকে তার রাজ্য ছিনিয়ে নেবে। ভয় গোপন করে রাজা ওকে কাছে ডেকে ওর পরিচয় জানতে চাইল।

জেসন জানত না যে সে স্বয়ং পেলিয়াসের সাথেই কথা বলছে। সে স্বাভাবিকভাবেই তার পরিচয় দিল।

‘কিন্তু এসনের তো কোন ছেলে নেই।’ পেলিয়াস বলল।

যখন জেসন পেলিয়াসকে সব খুলে বলল তখন সে আরো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার পাশে যে দুজন রাজা বসে আছে তারা বিবাহসূত্রে জেসনের কাছের আত্মীয়, তারা জেসনের পক্ষ নিতে পারে তাই সে তার সাথে উল্টা পাল্টা কিছু করার চিন্তাও করল না।

‘তাহলে এখন এসনের কাছে তোমার কাজ কি?’ পেলিয়াস জিজ্ঞাসা করল।

‘পেলিয়াসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে তার সিংহাসন ফিরিয়ে দেয়া।’

জনগনের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। বেশির ভাগই পেলিয়াসের বিরূদ্ধে। জনগন তাকে বিশেষ পছন্দ করত না। জেসনের বিরূদ্ধেও কেউ কেউ ছিল। কিন্তু রাজা শুধু একটু কুটিল হাসি হাসল আর বলল, ‘ধরো, তুমি একজন রাজা। একজন ওরাকল তোমাকে বলল, নিয়তি তোমার এক প্রজার হাতে তোমার মৃত্যু লিখেছে। তখন তুমি কি করবে?’

‘বিনা দোষে তো আর কাউকে মারতে পারি না তাই তাকে এমন এক কাজের জন্যে পাঠাবো যেন সে কখনই আর ফিরে না আসে। এই যেমন তাকে গোল্ডেন ফ্লিস আনতে কোল্কিস পাঠানো যেতে পারে।’

‘কিন্তু যদি সেই খুনি তুমি হও, তাহলে?’

‘সেই খুনী যদি আমি হই তবে অবশ্যই আমাকেও যেতে হবে। তাতে অবশ্য ফলাফলটা একটু অন্যরকম হবে। আমরা গোল্ডেন ফ্লিস ফেরত পাব আর ফ্রিক্সাসের হত্যার প্রতিশোধও নেয়া হবে।’ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল জেসন।

‘তাহলে যাও আর গোল্ডেন ফ্লিস ফিরিয়ে আনো।’

পেলিয়াস যখন বুঝেছে ভাগ্য জেসনের হাতে তার মৃত্যু লিখেছে তখন সে বুদ্ধি করে জেসনকে ফাঁদে ফেলেছে । জেসনও তা বুঝল। কিন্তু পেছনোর কোন পথ নেই।

‘ঠিক আছে। কিন্তু আপনি আমার বাবার সিংহাসন দখল করেছেন আগে সেটা তাকে ফেরত দিন।’

‘রাজা হওয়ার অবস্থা তার নেই। সে বুড়ো হয়ে গেছে।’

‘যদি তাই হয় তাহলে এই সিংহাসন আমার, আপনার না।’

পেলিয়াস অস্বীকার করতে পারল না। বিশেষ করে যখন ফেরাস আর এডমেটাস জেসনের পক্ষ নিয়েছে। বুদ্ধি করে বলল, ‘ঠিক আছে তবে আগে প্রতিজ্ঞা মত তোমাকে গোল্ডেন ফ্লিস আনতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে তুমি রাজা হওয়ার যোগ্য। আর তাছাড়া আমাদের এখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। ওরাকল বলেছে আমাদের শহরের উন্নতির জন্য গোল্ডেন ফ্লিস খুবই দরকার। আমিই আনতে যেতাম কিন্তু আমি বুড়ো হয়ে গেছি। তাই তোমাকেই আনতে হবে।’

জেসন ফ্রিক্সাস আর গোল্ডেন ফ্লিসের গল্পটা জানে। কিরন তাকে বলেছিল। ফ্রিক্সাস ছিল জেসনের আত্মীয়। ফ্রিক্সাস যখন ছোট তখন তাকে আর তার বোন হেলেকে খুন করার ষড়যন্ত্র করা হয়। তাদের দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হবে বলে ঠিক করা হয়। বলি দেওয়ার সময় জিউসের আদেশে একটি ভেড়া তাদের বাঁচায়। ভেড়াটার সারা গায়ে ছিল সোনার লোম। ভেড়াটি তাদের দুজনকে সাগর নদী পাড় করে অনেক দূরের দেশ কোল্কিসে নিয়ে যায়। মাঝপথে মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে আর সাগরে পড়ে মারা যায়।

কোল্কিসের রাজা এইটিস। খুবই ধূর্ত। ফ্রিক্সাস পালাতে পারায় কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সে ভেড়াটিকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেয়। কিন্তু ওই ভেড়ার ছালটা ছিল খুবই মূল্যবান। সেই ছালটাই গোল্ডেন ফ্লিস। এইটিস ওটা নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল। তাই সে সুযোগ বুঝে ফ্রিক্সাসকে খুন করে। তারপর গোল্ডেন ফ্লিস একটা গাছে ঝুলিয়ে রাখে আর পাহাড়ায় রাখে এক ময়াল সাপকে। সাপটি সেই থেকে দিনরাত পাহাড়া দিয়েই যাচ্ছে।

যাই হোক, তারপর জেসন তার মা-বাবার কাছে গেল। শয়তান পেলিয়াস তাদের মুরগীর খোপের মত ছোট একটা ঘর দিয়েছিল থাকার জন্য। গোল্ডেন ফ্লিস অভিযানে যাওয়ার আগে জেসন তার মা-বাবার জন্য ভালো একটা বাড়ির ব্যবস্থা করল। আর অভিযানে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মা-বাবার সাথেই থাকল।

































৪...জাহাজ তৈরি



আরগুস ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত জাহাজ নির্মাতা। জেসন তাকে পঞ্চাশ দাঁড়ওয়ালা একটা জাহাজ বানাতে বলল। জাহাজকে অবশ্যই পুবের অজানা জগৎ পাড়ি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট মজবুত হতে হবে। কারন তার আগে কোন গ্রীক জাহাজ সেদিকে যায়নি।

মাউন্ট পেলিওনের সবচেয়ে বড় বড় পাইন গাছ কেটে মানুষ আর ঘোড়ায় টানিয়ে সৈকতে আনা হল। আস্ত গাছ লম্বা লম্বি কেটে, ভালো করে শুকিয়ে, যত্ন নিয়ে জাহাজ তৈরি করা হল। জাহাজের রং হল সিঁদুরের মত লাল। আর ওক কাঠের একটা বীম বসানো হল। ওকটা ছিল ডোডোনা গঙ্গলের। দেবী এথেনার উপহার। বীমটা ওরাকলদের মত কথা বলতে পারত। শেষে জাহাজের নাম ঠিক করা হল নির্মাতার নামানুসারে। আরগো। আর মজার ব্যাপার হল ডোডোনার ওকের কল্যানে আরগো কথা বলতা পারত।

এরমধ্যে জেসন তার অভিযানে যেতে ইচ্ছুক এমন লোকদের আহ্বান করে গ্রীসের আনাচে কানাচে খবর পাঠিয়েছিল। জাহাজ তৈরী শেষ হতে হতে গ্রীসের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বীরেরা চলে আসল ইওল্কোসে। দাঁড়টানার জন্য পঞ্চাশ জন শক্ত সমর্থ লোকও জোগাড় হল। সবাইকে ষাঁড়ের চামড়ার বর্ম, ব্রোঞ্জের তরবারি, ছাইকাঠের বর্শা আর চকচকে ঘোড়ার কেশ পড়ানো হেলমেট দেয়া হল। পরাক্রমশালী এই সেনাদলটাই আরগোনটস নামে পরিচিত। ইওল্কোসের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাদল। এই দলে জিটাস আর কেলিয়াস ছিল। তারা দুজনেই দেবতার সন্তান। ওদের পিঠে ডানা ছিল তাই উড়তেও পারত। আরো ছিল হেরাকলস আর তার ভৃত্য হাইলাস। হেরাকলসের ছিল অতিমানবীয় শক্তি। জেসনের মত সেও কিরনের ছাত্র। এছাড়া আরো বিখ্যাত অনেকে।

সবাই চাইছিল হেরাকলস অভিযানের নেতৃত্ব দিক। কিন্তু বিনয়ের সাথে হেরাকলস বলল, “জেসন এই যাত্রা আয়োজন করেছে তাই ওর নেতা হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত।”

শেষ পর্যন্ত জেসনই নেতা হল।

জাহাজ যাত্রার জন্য প্রস্তুত। নাবিকরা যতটা পারে জল আর খাবার জাহাজে নিয়ে নিয়েছে। জাহাজ ছাড়ার আগে তারা সফলতা কামনা করে এপোলোর উদ্দেশ্যে দুটো ষাঁড় বলি দিল।

জেসনকে বিদায় জানাতে ওর বাবা আসতে পারেনি, শুধু মা এসেছিল। ছেলে চলে যাবে বলে তার মন খুব খারাপ। জেসন তাকে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করল।

‘মা, দেবতারা যদি আমার মৃত্যু ঠিক করে থাকেন তাহলে তোমার এই কান্না আমাকে বাঁচাতে পারবে না...। দেবী হেরা সাহায্য করবেন বলেছেন। এথেনা আর এপোলোও আছেন আমাদের সাথে। আর এতো ভালো একটা সেনাদল নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে হারের কোন প্রশ্নই থাকার কথা নয়। আমরা সফল হয়েই ফিরব।’

তারপর অরফিয়াস তার লাইর(লাইর-প্রাচীন গ্রীসের এক ধরনের তারের বাদ্য যন্ত্র) হাতে নিল। সুরের মোহে সবাই মোহিত। গান এক সময় শেষ হল। কিন্তু আরগনটসদের হৃদয়ের গভীর থেকে সেই গান বাজতেই থাকল। সবাই যেন গানের জাদুর জালে বন্দী।





মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.