| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ষাট বছরের মাজেদা গত দুই সপ্তাহ ধরে শুধু প্লান করেছে, সে তার একমাত্র নাতিটাকে দেখতে যাবে। মেয়ে-জামাই বাড়ি বলে কথা! খালি হাতে কি যাওয়া যায়? তার ওপর তার সাত বছরের আহলাদি নাতিটা! তার জন্য কিছু নেই দেখলে হয়ত জামাইয়ের সামনেই উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেলবে। পলা-পাইন তো, কিছু বলতেই পারে , বুড়ি নিজে নিজে ভাবে। সে কল্পনায় নাতিকে জড়িয়ে ধরে তার গালে একটা চুমুও দিয়ে দিলো।
সে থাকে জিঞ্জিরা। আর মেয়ে থাকে সেই গাবতলী। সেখানে আসা-যাওয়া করতে লাগে প্রায় একশ টাকা। নাতির জন্য ভালো কিছু নিলে দু-একশ টাকার কমে হবে না। সব মিলে আড়াইশ তিনশ টাকা লাগব, মনে মনে টাকার হিশাব কষে সে। সেই বুড়ো ভাম, নিজের স্বামীর কথা মনে করে মাজেদা, টাকার কতা কইলে আর কানে হুনে না – হালাই বদ বেটা!
সন্তান বলতে তাদের ওই একটা মেয়ে। তবু মেয়ের দিকে বুড়োর যেন কোন টান নেই; সেই বিয়ে দিয়েই শেষ। এদিকে মেয়ে পোয়াতি হলো, বাচ্চার মা হলো সেসবে মেয়ের মা-বাপকেও তো কিছু খরচ করতে হয়। আর নাতিটা? সে তো আমার কলিজার টুকরা! ওর জন্য কিছু না নিলে বুড়ির যেন শান্তি হয় না।
সারা বছর ধরে বুড়ি তাই সংসার খরচ থেকে একটু একটু করে জমায়। কিছু টাকা সে উপার্জনও করতে চায়, কিন্তু তার ‘বুড়ো ভাম’ স্বামীটা তাকে বাড়ির বাইরে কোন কাজ করতে দেয় না। নিজের বউকে দিয়ে আয় করাবে এমন খারাপ মানুষ সে নয়। কিন্তু মাজেদা কাজ ভালোবাসে। তাই পয়সা বা আয়ের কথা না ভাবলেও সে তার আত্মীয় আর প্রতিবেশীদের যথাসম্ভব সাহায্য করে, কাজ করে দেয়। এতে তার আয় হয় না ঠিক কিন্তু অনেকে তাকে ভালোবেসে দুটো ডিম, কিছু চাল বা সবজি দেয়। মাজেদা সেগুলো জমিয়ে রাখে। পরে তার স্বামী বাজারের টাকা দিলে সে টাকাটা জমায় আর তার জমানো জিনিসগুলো ব্যবহার করে।
এভাবে বাজারের টাকা বাচিয়ে গত দুমাসে সে প্রায় হাজার খানেক টাকা জোগাড় করেছে । জামাই বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে সবসময় মাজেদা এরকমটা করে । এবার হিসাব কষে দেখল যে গেল এক বছর সে তার মেয়ে-জামায়ের জন্য কিছুই কেনেনি । মেয়ের জন্য একটা শাড়ি আর জামায়ের জন্য একটা জামা কেনার কথা ভাবল সে । এসবের ফাকে মেয়ে বাড়ি যাবার একটা দিন-তারিখও সে ঠিক করে নিলো ।
মেয়ের বাড়ি যেতে গিয়ে একবার ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়েছিল বুড়ি মাজেদা । অল্পবয়সী ছিনতাইকারী ছোকড়া তার হাতের ছোট ব্যাগটা নিয়ে চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল । এ ঘটনায় রাস্তার লোকজন তাকে সহানুভূতি দেখাল বটে কিন্তু মনটা তার ভেঙে গেল । যাইহোক, নিজেকে সামলে নিয়েছিল সে । সেবার কোনরকম খালি হাতে মেয়ের বাড়ি গিয়ে পৌঁছেছিলো সে । সে কি লজ্জার কথা! খালি হাতে কি জামাই বাড়ি যাওয়া যায় ? সেই থেকে মাজেদা বড় একটা ব্যাগ নিয়ে যাতায়াত করে । পাশাপাশি, এখন সে আর নগদ টাকা না নিয়ে আগেভাগেই জিনিশপত্র কিনে ব্যাগে ভরে নেয় ।
আজ সকালে তার ‘বুড়োভাম’ স্বামীর সাথে একটু ঝগড়াঝাঁটি ও মন কষাকষি করে নেয় মাজেদা – সে এটাকে সুসম্পর্কের একটা অংশ বলে মনে করে । প্রথমে তার স্বামীকে সে তার সাথে মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বোঝায় । পরে ব্যর্থ হয়ে বুড়োর ওপর রাগ ঝাড়ে সে, মাইয়া তো আমি একাই পেটে ধরছিলাম! জন্ম তো আমি একাই দিচিলাম! দ্যাকতে তো আমি আমি একাই যামু! সে তার ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ।
সারা বাজার ঘুরে বুড়ি মাজেদা মেয়ের জন্য সুন্দর একটা শাড়ি কিনে নেয় । এবার জামায়ের জন্য জামা খোঁজে সে । কয়েক দোকান ঘুরে যে জামাটা তার পছন্দ হয় সেটার দাম চারশ টাকা । শাড়িটা সে আগেই কিনে নিয়েছে আটশ টাকা দিয়ে । এখন সে কি করবে? যদি চারশ টাকা দিয়ে জামাটা সে নেয় তাহলে গাড়ি ভাড়া দেবে কীভাবে? একবার ভাবে মেয়ের শাড়িটা বদল করে একটু কম দামের শাড়ি নেবে । পরে সে মনে করে, মাইয়াডার লাইগা কিনছি; এহন আবার বদলামু? অন্যদিকে, জামায়ের জামা বদলানোর কথা সে ভুলেও চিন্তা করে না । সে ভাবে, জামা ভালা না হইলে জামাইরে ক্যামনে দিই? এইডা কিছু হইলো? বছরে দুএকবার দেই, ভালো দেইখাই তো দেওন লাগে! দেহা যাক । সে শাড়ি আর জামা তার ব্যাগে ভরে নেয় ।
বাসে উঠে নাতির কথা মনে পড়ে তার । হঠাৎ মনটা তার হায়! হায়! করে ওঠে । নাতিটার জন্য কিছু না নিয়ে সে কিভাবে বাসে উঠে পড়ল? কিছু দিন ধরে সে তার স্মৃতি শক্তির দুর্বলতা বুঝতে শুরু করেছে । ‘আজকাল সব ভুইলা জাইতাছি গা – কি যে হইলো?’ভাবতে ভাবতে তার তার পেটিকোটের ফিতার কাছে হাত দিলো সে । না, সব ঠিক আছে । সেখানে সে সব সময় একশ টাকা গোপন করে রাখে । তার ভালো লাগলো যে টাকাটা সে ভুলে খরচ করে ফেলেনি । মনে স্বস্তি ফিরে এলো তার । এবার বাসের সিটে বসে চোখ বুজে থাকলো সে ।
বার-চোদ্দ বছরের এক কিশোর ভাড়া নিচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে । ভাড়া নিতে নিতে মাজেদার সামনে এসে পড়ল সে । তার দিকে ছেলেটা যখন তাকাল বুড়ি ঘুমে অচেতন। ভোঁস ভোঁস নাক ডাকছে । মাথার কাপড় তার বেশ সরে গেছে । মাথার কাঁচাপাকা চুল এলোমেলো দুলছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে । পায়ের নিচে রাখা ব্যাগের পাশে এক পা থেকে তার খুলে পড়েছে স্যান্ডেল । বেঘোরে ঘুমতে গিয়ে পানের রসে লাল ঠোঁট তার একটু বাঁকা হয়ে পিছন থেকে প্রকাশ দিচ্ছে তার বিবর্ণ দাঁত । বুড়ির এ অবস্থা দেখে ছেলেটার মায়া হলো । তাকে সে জাগালো না। সে ভাবলো, দেহি নানি বাসস্ট্যান্ড ছাড়ায়ে তারপর উঠে নাকি।
কিছুক্ষণ বাদে সে বুড়ি ‘নানি’র কাছে আবার ফিরে এলো । আস্তে আস্তে ডাকল সে, নানি! ও নানি! নামবা কই? মাজেদা আরামোড়া ছেড়ে বলল, গাবতলী । তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল । গাবতলী এখনও ঢের দূরে । ছেলেটা তাই ভাবলো, কাছাকাছি যাইয়া ডাকুমনে ।
গাবতলীর কাছে এসে ছেলেটা আবার ডাকল, নানি! ও নানি! গাবতলী আইসা গেল তো – ভাড়াডা দিয়া দাও । ‘ও, আইসা পড়ছি!’ বুড়ি হুড়মুড় করে জেগে উঠলো । ছেলেটা আবার বলল, ভাড়াডা? হ, মাজেদা বলল, দিতাছি । সে তার বড় ব্যাগ থেকে টাকার ছোট ব্যাগটা বের করল । বের করে সে নিজে দেখল এবং ছেলেটাকেও দেখতে দিলো যে টাকার ব্যাগটার চেইন খোলা – একটা টাকাও নেই তার মধ্যে । সে চিৎকার করে উঠলো, ওরে কি হইলো রে! আমার পকেত-মার হইছে রে!হাউমাউ করে মাজেদা তার দুচোখে পানি এনে ফেললো। ছেলেটাও অবাক। ‘নানি’র টাকার ব্যাগ খালি ।
ভাড়া তুলতে থাকা ছেলেটা ব্যাপারটা ড্রাইভারকে জানালো । সব শুনে ড্রাইভার বলল, ভাড়া দেওনই লাগবো । জানোস না ব্যাটা গুইনা গুইনা তিন হাজার টাকা মালিকরে দেওন লাগে প্রতি দিন? তুই নানিরে ভালো কইরা জিগা । বুড়ির অন্য কোন খানে টাকা আছে কিনা দেখ গা ।
বুড়ির কাছে টাকার কোন হদিশ নেই । ছেলেটা তাকে বলল, নানি! ভালো কইরা দেহ; ভাড়া না দিলে ক্যামনে হইব । আমাগো তো মালিকরে দেওন লাগবো । জেরার মুখে পড়ে মাজেদা তোতলাতে শুরু করলো, তারপর একসময় অজ্ঞান হয়ে গেলো ।
এতক্ষণে গাড়ি গাবতলী এসে পড়েছে । ড্রাইভার বলল, এহন কি করবি? চল্লিশ টাকার লাইগা পরের ট্রিপে দেরি হইব। নানিরে এইহানেই নামায়া দে । গাড়ি থামিয়ে তারা দুজন ধরাধরি করে বুড়িকে নামাল। তারা তাকে রাস্তার পাশের একটা চায়ের দোকানে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলো । দোকান থেকে পানি নিয়ে পানির ছিটাও মারল বুড়ির চোখেমুখে । বুড়ি তবু জাগল না, তার হুঁশ ফিরল না । ওদিকে পিছনের গাড়িগুলো হর্ন বাজাতে শুরু করলো । ড্রাইভার এক লাফে গাড়িতে উঠে ইউ-টার্ন নিতে নিতে চিৎকার দিলো, থুইয়া চইলা আয়; দেরি করন যাইব না ।
বুড়িকে এভাবে রেখে যেতে ছেলেটার খারাপ লাগছে । সে দোকানদারকে বলল, নানি এহনি ঠিক হইয়া যাইব। যদিও সে বুড়ির মেয়ে জামাই বা নাতি কাওকেই চেনে না তবু বলল, নানির লোকজন এইহানেই থাহে। এহনি আইসা পড়বো । সে এক দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে গেলো। এদিকে বুড়ির চোখ বন্ধ দেখে চায়ের দোকানে লোকজন উঁকি দিতে শুরু করলো ।
রাস্তা পার হয়ে ছেলেটা এক দৌড়ে তার বাসে উঠে পড়ল । সহসা তখন বুড়ির কথা মনে করে তার চোখ গেলো দোকানের দিকে। সে অবাক হয়ে দেখল যে বুড়ি সুস্থ সাবলীল হেঁটে হেঁটে পাশের গলিতে ঢুকে পড়ছে । আফসোস করলো সে, ওরে শালী! হারামি বুড়ি! তুমি আমারে ভাওতা দিলে?
চায়ের দোকানে তার চোখ একটু খুলে মাজেদা যখন বুঝল যে বাসের লোকজন আর তার আশেপাশে নেই সে তড়িঘড়ি উঠে পড়ল – পাছে তার ব্যাগ নিয়ে কেউ টানাটানি শুরু করে! দোকানের লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করল, ও চাচী! কি হইছে? ও খালা! অজ্ঞান হইছিলা নি? মাজেদা সেসব প্রশ্নের পরোয়া না করে দ্রুত গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে ।
নিজের মেয়ের বাড়ির গলিতে ঢুকে মনে স্বস্তি ফিরে এলো তার । এবার সে তার পেটিকোটের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা টাকাটা বের করলো । নাতির জন্য ভালো দেখে চকলেট নিলো আর নিজের জন্য নিলো একটা পান । পান মুখে দিয়ে চিবতে চিবতে বুড়ি মাজেদা প্রসন্ন মুখে পরিতৃপ্ত মনে চিরকালের নানির বেশে তার নাতির বাড়ি চলল ।
©somewhere in net ltd.