নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ঋষিলিপি

বাঙালী ঋষি

Cogito, Ergo Sum

বাঙালী ঋষি › বিস্তারিত পোস্টঃ

আইজুদ্দীনের রোজনামচা

২৯ শে মে, ২০১৯ রাত ৩:৩৭

১.
একটা মানুষের পক্ষে কত অপকর্ম করা সম্ভব। জানি না, আর জানিনা বলেই খারাপটা খারাপই থাকে। আর সেই খারাপের ভয়ে আমরা কুঁকড়ে থাকি। বাসের ভেতরে এই নিয়ে আলোচনা যখন ঝগড়ায় রুপান্তরিত হতে যাচ্ছি ঠিক তখনই মগবাজারে এক লোক নেমে যায় পাঞ্জাবী পড়া। কেউ খেয়াল করে না। সবাই খারাপ-ভালো নির্নয় করতে ব্যাস্ত। তিনি নেমে যাওয়ার পরে সেই আলোচনা যথারীতি রাজনীতিতে এসে দাড়িয়েছে। ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটতে শুরু করেছে। মানুষের এই উত্তেজনা দেখে লোকটা হাসে। তিনি মগবাজার থেকে মৌচাকের দিকে হাটতে থাকেন। মাতৃছায়ার গলির সামনে এসে একটা চায়ের দোকান দেখা যায়। তিনি চায়ের দোকানে গিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকেন। তার ঘড়ির দিকে বার বার তাকানো দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। একটা ভ্যান গলি দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ভ্যানটা তার সামনে দাড়ালে তিনি সিগারেট ফেলে ভ্যানে উঠে বসেন। আগে থেকেই বলা ছিল, কারন লোকটা কোন কথা না বললেও ভ্যানচালক মৌচাকের দিকে এগোতে থাকে।

২.
মালিবাগ মোড়ে তুমুল জ্যাম, গাড়ী একচুলও নড়ে না। চৈত্রের ক্ষরতাপে গাড়ীর টায়ার গলে রাস্তার সাথে আটকে যাবার মত গরম। মাঝে মাঝে ভেসে আসা বসন্তের ঠান্ডা বাতাস বসে থাকা যাত্রীদের কিছুক্ষন চুপ করিয়ে রাখলেও বেশীক্ষন পারবে বলে মনে হয় না। মোড় থেকে অনেক দূরে জ্যামের ভেতরে মোটরবাইক নিয়ে আটকে আছে আনিস। বার বার ঘড়ি দেখছে, আজকেও মনে হচ্ছে অফিসে দেরী হবে। কিন্তু এই জ্যামের ধাঁধার ভেতর থেকে ফুটপাত ছাড়া বেরনোর আর কোন পথ না পেয়ে বাইক ফুটপাতেই তুলে দেয়। ওর দেখাদেখি আরো কয়েকটা বাইকও উঠে পড়ে। ফুটপাত ধরে চলা মানুষজন স্ব-সম্মানে জায়গা করে দেয়। কিছুদুর আসতেই দেখে ফুটপাত জুড়ে মানুষজন দাঁড়িয়ে গলা উচু করে কিছু দেখতে চাচ্ছে। আনিসও গলা বাড়ায়, কিন্তু সামনে মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। কয়েকবার হর্ন দিলেও মানুষ জন সরছে না দেখে মোটরসাইকেন স্ট্যান্ড করিয়ে চায়ের দোকানে দাঁড়ায়। দোকান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে চায়ের কথা বলে আবারো ফুটপাতের উপরে এসে গলা বাড়ায়। কিছুই দেখতে পায় না, হটাত দুটো ছেলেকে ভীড় ঠেলে বেরিয়ে আসতে দেখে সরে দাঁড়ায়। একবার ভাবে মোড়ে কি হচ্ছে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু পরক্ষনেই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে। সিগারেট টানতে টানতে কান খাড়া করে শুনতে থাকে ছেলেদুটো কিছু একটা নিয়ে দারুন মজা করছে। তাদের মধ্যে একজন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে, “এটা কি অধর্ম নয়রে, মামা। ৬ টাকায় এত্তুসা চা দাও”। কথাটা শুনে চমকে ওঠে, এটা তো মামুনের কথা ছিল। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মামুন ছিল একটু বামপন্থী। কোন অন্যায়-অবিচার দেখলেই বলে উঠত “এটা কি অধর্ম নয় রে?” এতদিনপরে ছেলেদুটোর মুখে এই কথাটা শুনে ও সেই দিনগুলোর স্মৃতিতে কিছুক্ষন সাঁতার কাটে। ছেলেদুটো চলে যেতেই ও দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে কি নিয়ে কথা বলছিল ওরা। জবাবে দোকানদার তেমন কিছুই বলতে পারল না। এর মাঝেই দোকানে একজন ট্রাফিক পুলিশ আসতেই দোকানদার হেসে জিজ্ঞেস করে, কি ওস্তাদ মামলা জটিল মনে হইতাসে। ট্রাফিকটি জটলার দিকে তাকিয়ে সমস্ত বিরক্তি নিয়ে বলে, “কোন এক পাগলের বাচ্চা রাস্তার মাঝখানে আইসা বইছে। শালার জন্য সকাল থেকে স্যারের ঝাড়ি খেয়েই যাচ্ছি। শালা কিছু বলেও না, সরেও না। আর আমাগো তো বিনোদনের অভাব, নতুন কিছু দেখলেই জটলা করি। শালা দেশটাই একটা রঙ্গমঞ্চ বানিয়ে ছাড়ল”। একটা সিগারেট ধরাতেই স্যারের ফোনে সিগারেট ফেলে আবার জটলার ভেতরে ঢুকে যায় পুলিশটা। ওর যাওয়া দেখে দোকানদার হেসে বলে, দেখলেন মামা শালার মেজাজ। সকাল থেইকা এই প্যারা খাইতাছে, মনে হয় কোন ধান্দাই হয় নাই। দেখলেন না, সিগারেটের দামটাও দিয়া গেল না।

দোকানদারের কথায় সায় দিয়ে আনিসও ভাবতে থাকে। আমাদের চারপাশের সব জায়গাতেই অনিয়ম-দুর্নীতি। এমনকি ও নিজেও এই সিস্টেমের একটা অংশ। কেউ আমরা আইন মানি না। যার যেমন খুশী সে সেভাবেই চলছে, চালাচ্ছেও। ও সিগারেট ফেলে সিদ্ধান্ত নেয় কি হচ্ছে নিজের চোখে দেখার। মানুষের ভীড় ঠেলে এগোতে থাকে ও। নতুন আয়রন করা কাপড় মানুষের ঠেলা ঠেলিতে ময়লা হয়ে গেলেও সেদিকে কোন খেয়াল দেয় না। হঠাত করে ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখে, ধবধবে পাঞ্জাবী পড়া একজন লোক চত্বরে বাঁশের খাঁচা বানিয়ে তার ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাথায় জটা পড়া চুল, ভারি শেকলে হাত-পা বাঁধা। এই শেকল নিয়ে লোকটা নড়া চড়া করছে কি করে সেটাই আশ্চর্য। ওর দিকে ঘুরতেই দেখে বুকের উপরে একটা প্লেকার্ড ঝুলানো, তাতে বড় করে লেখা “বিবেক”। আর কিছুক্ষন পর পর বলে উঠছে, “এটা কি অধর্ম নয় রে”। আনিস চমকে লোকটার চোখের দিকে তাকায়। ও সম্মোহিতের মত তাকিয়ে থাকে। খুব পরিচিত মনে হয় দৃষ্টিটা। কিছুতেই মনে পড়ে না। এক দৃষ্টিতে আনিসের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার বলে ওঠে। আনিস ভাবতে থাকে, কে লোকটা। হটাত মনে হয়, এই চোখ তো মামুনের। এই ভয়ানক হাসি মামুনের মুখেই দেখেছিল শেষবার। হটাত হারিয়ে যাওয়ায় আগে। ও কোনরকমে ভীড় ঠেলে বেরিয়ে এসে, তাড়াতাড়ি মোটরসাইকেলটা ঘুরিয়ে অন্যপথে অফিসের দিকে রওনা হয়। যেতে যেতে কেবল ভাবতে থাকে মামুনের কথা। শেষ দিকে মামুনের আচরনে অনেক আস্বাভাবিকতা ধরা পড়লেও ওরা খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। কারন ওরা জানে, কোন কিছু নিয়ে আপসেট হলেই মামুন এমন অস্বাভাবিক আচরন করে। সেবার হাসিটা ছাড়া আর কোন কিছুই মাত্রা ছাড়ায়নি। মামুনের অন্তর্ধান নিয়েও ওরা খুব উত্তেজিত হয় নি। সেগুলো প্রায় ভার্সিটি শেষের ঘটনা। তবে মাঝখানে ৫-৭ বছর কি করে কাটল সেটা ভেবেই পায় না।

৩.
সারাদিনের ক্লান্তিতে সকালের ঘটনা খেয়ালই থাকে না। বাড়ি এসে হাতমুখ ধুয়ে খবরের চ্যানেল খুলতেই দেখে সকালের লোকটিকে আটক করেছে রমনা থানার পুলিশ। মানসিক বিকারগ্রস্ত সাব্যস্ত করে আপাতত কারাগারেই রেখেছে যতক্ষন না পর্যন্ত কেউ খোঁজ না করে। ও আরো কিছুক্ষন ঘোরাফেরা করে বিভিন্ন চ্যানেলে, কিন্তু ভাবতে থাকে মামুনের কথা। ওর স্ত্রী খাবারের জন্য ডাকলে প্রায় নিঃশ্বব্দে খাবার শেষ করে বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ইজি চেয়ারে বসে ও। স্ত্রী ওর এই অস্বাভাবিক আচরন দেখে অবাক হলেও চুপ করে থাকেন, রাতে ঘুমানোর আগে জিজ্ঞেস করবেন ভেবে। তিনি হাতের কাজ সব শেষ করে বারান্দায় এসে দেখে ঘুমাচ্ছে ও। হাতের সিগারেট পুড়ে শেষ। শরীর খারাপ করল কিনা ভেবে ডাকতে গেলে স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে মাঝপথেই থেমে যান। ভেতর থেকে একটা চাদর এনে গায়ে জড়িয়ে দিয়ে, তিনি ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়েন।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গে আনিসের। ঘুম ভাঙ্গতেই মনে হয় আজকের দিনটা অন্যরকম।

মন্তব্য ১১ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (১১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে মে, ২০১৯ ভোর ৫:৫৪

মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন:

সুন্দর। শুভ কামনা।

২৯ শে মে, ২০১৯ সকাল ১০:২৩

বাঙালী ঋষি বলেছেন: ধন্যযোগ :)

২| ২৯ শে মে, ২০১৯ সকাল ৭:১১

আর্কিওপটেরিক্স বলেছেন: ঢাকার জীবন যান্ত্রিকতায় বিপর্যস্ত....

২৯ শে মে, ২০১৯ সকাল ১০:২৩

বাঙালী ঋষি বলেছেন: নাগরিক এই কংক্রীটে মোড়া দালান কোঠার জঙলে,
উদাস মনে ঝাপসা চোখে আকাশ খুজি গোপনে

৩| ২৯ শে মে, ২০১৯ দুপুর ১২:০৭

কাজী ফাতেমা ছবি বলেছেন: ভালো লাগলো

২৯ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৩:০৭

বাঙালী ঋষি বলেছেন: ধন্যযোগ :)

৪| ২৯ শে মে, ২০১৯ দুপুর ১:১৫

রাজীব নুর বলেছেন: বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

২৯ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৩:০৮

বাঙালী ঋষি বলেছেন: ক্ষুদ্র চেষ্টা করি মাঝে মাঝে।

৫| ২৯ শে মে, ২০১৯ দুপুর ১:১৫

রাজীব নুর বলেছেন: বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

৬| ২৯ শে মে, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৫৬

মা.হাসান বলেছেন: মাথার অনেক উপর দিয়ে গেল , কিছু বুঝলাম না।

৭| ৩০ শে মে, ২০১৯ ভোর ৫:৫১

জুনায়েদ বি রাহমান বলেছেন: সুন্দর উপস্থাপন। অনিয়ম, দুর্নীতির সাথে আমরা এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে এখন কাউকে দুর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে দাড়াতে দেখলে হাসি পায়, পাগল মনে হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.