| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স যখন সবে দু’বছর তখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুরে কিছু জমি কিনে নেন। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি- শুধু দু’টি ছাতিম গাছ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। মহর্ষির এই জায়গাটা এতই ভালো লেগে গেলো তিনি যখনই এখানে আসতেন সেই ছাতিম তলায় বসে নীরবে ধ্যানমগ্ন হতেন। তারপর একসময় একতলা, তারপর দোতলা, চারিদিকে শাল, আমলকি, কাঁঠাল, আম, দেবদারু আর ফুলের বাগান তৈরি করা হলো। এখানেই মহর্ষি একটি ‘ব্রহ্মআশ্রম’ তৈরি করলেন। অনেকটাই প্রাচীন ভারতীয় গুরু-শিষ্যের পাঠশালার মতো। মহর্ষির আশ্রমে ছিলো একটি অতিথি ভবন, প্রার্থনা কক্ষ এবং ধর্মীয় সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থাগার। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই আশ্রমটিকে ‘শান্তিনিকেতন’ আশ্রমে অভিহিত করেন এবং এখানে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৬৩ তে যাত্রা যে আশ্রমের, ১৯০১ এ স্কুল এবং ১৯২১ এ বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যেই সেই আশ্রমের পূর্ণাঙ্গ রূপকল্প সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো কোনটিই বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান নয়।
গবেষণা ও গবেষণালদ্ধ জ্ঞানের মধ্য দিয়েই শান্তিনিকেতনের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো। গ্রামের যুব স¤প্রদায়কে স্বনির্ভর করার জন্য তিনি এখানে “ব্রতী বালক সংগঠন” নামে একটি স্কাউট সংগঠন গড়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আশ্রম সম্পর্কে বলেছেন যে এ আশ্রমের কোথাও প্রাচীর বা গন্ডী নেই। এ একেবারে বিশ্বের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে আছে। এখানে বিশ্বের চারিদিক হতে যাত্রীরা আসছে এবং অবশ্যই তারা এখান থেকে অর্জিত জ্ঞান-সাধনা দ্বারা উন্মুক্ত জীবনের পথে বেরিয়ে পড়বে। তিনি নিজে যেমন ছিলেন উদার বিশ্বমানবতাবোধে জাগ্রত, তাঁর আশ্রম-সন্তানরাও তেমনি সুদূরপ্রসারী চিন্তা-দর্শনে উদ্দীপ্ত হবে এবং গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা স্বনির্ভর হবে- এই ছিলো তাঁর প্রত্যাশা। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, নেপাল, আসাম, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসত শিক্ষার্থীরা।
ঋষি-কবি তাঁর চিন্তা-চেতনার আলোক-রেখা শুধুই কাব্য-সাহিত্যে সীমায়িত রাখেন নি। তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মুক্তির কথা ভেবেছেন। রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সভ্যতার সংকটের কথা ভেবেছেন। ব্যক্তিজীবনে বহুবার শোক-যাতনা তাঁকে মুহ্যমান করেও বিচলিত করতে পারেনি। গান্ধীজীর সাথে তাঁর মতাদর্শের কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সেই গান্ধীজীই বলেছেন: যার বাংলা অর্থ এরকম- গুরুদেব একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তাঁর মধ্যে যে কবিত্বশক্তি, মহৎ চিন্তা-চেতনা এবং স্বদেশবোধ আছে তা অত্যন্ত বিরল। তিনি যথার্থই সম্মান প্রাপ্তির যোগ্য।
শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এদেশীয় প্রচলিত শিক্ষার সমালোচনা করে বলেছেন: “আমরা যতই বিএ, এমএ পাস করিতেছি, রাশি রাশি বই গিলিতেছি, বুদ্ধিবৃত্তিটা তেমন বলিষ্ঠ এবং পরিপক্ক হইতেছে না।....সেই জন্য আমরা অত্যুক্তি আড়ম্বর এবং আস্ফালনের দ্বারা আমাদের মানসিক দৈন্য ঢাকিবার চেষ্টা করি।” [“শিক্ষার হেরফের”]
শিক্ষার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে গুটিকতক বই তুলে দিয়ে- সর্বোত্তম ফল লাভের প্রত্যাশা যে নিরর্থক সে সম্পর্কে তিনি তাঁর শিক্ষা সংক্রান্ত প্রবন্ধ সমূহে বলেছেন। এমনিতেই বঙ্গমাতা সন্তানদের মানুষ হতে দেবার বেলায় অনেকটাই আদরের আবরণে তাদের শিশুদের শিশু করেই রাখে। এজন্য কবি আক্ষেপ করে ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় বলেছেন-
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালো ছেলে করে।
“বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কন্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না।” [“শিক্ষার হেরফের”]
তাঁর আশ্রম প্রাঙ্গন সবার জন্য উন্মুক্ত। তিনি প্রাচীন ভারতীয় গুরু-শিষ্যের শিক্ষা সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে যেয়ে বলেছেন- গুরুর শিক্ষায় উপদেশ নয়, নীতি নয় বরং শিষ্য পেত শক্তি। শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি। তাঁর মতে- উন্মুক্ত প্রকৃতি, অগ্নি, জল, বায়ু সমগ্র বিশ্ব বিশ্বাত্মা দ্বারা পরিপূর্ণরূপে দেখতে শেখাই যথার্থ শেখা। তাঁর মতে “গাছপালা, স্বচ্ছ আকাশ, মুক্ত বায়ু, নির্মল জলাশয়, উদার দৃশ্য- ইহারা বেঞ্চ এবং বোর্ড, পুঁথি এবং পরীক্ষার চেয়ে কম আবশ্যক নয়।” [“শিক্ষা সমস্যা”]
রবীন্দ্রনাথ কখনোও নিজস্ব ধর্মমত বা ধর্মদর্শন কারো ওপরে চাপিয়ে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন না। একবার গান্ধীজী তাঁর আশ্রমে এসে দেখলেন- ব্রাক্ষ্মণ ছাত্ররা পৃথক সারিতে ভোজন করছে। গান্ধীজী বললেন- আশ্রমের সকলে সমান, এখানে আহারে বিহারে অশনে বসনে পার্থক্য থাকা উচিত নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর উত্তরে বলেছিলেন: “যে জিনিস অন্তর হইতে গৃহীত হয় না তাহা বাহিরের চাপে স্থায়ী ফলপ্রদ হয় না। সেই জন্য তিনি বাহির হইতে নৈতিক চাপের পক্ষপাতী নহেন।”
প্রতি বছর নববর্ষের সকালে আশ্রমের ছাত্রদের নিয়ে তিনি মন্দিরে প্রার্থনা ও উপাসনা করতেন। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকীর্নতা দূরীভূত হবে বলে তিনি মনে করতেন। শান্তিনিকেতনে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে গান গাইতেন। কখনোও সমবেত, কখনোও একলাই গেয়ে চলেন মনের আনন্দে। আচার্যদেব যেনো এক দীপ্ত অগ্নিশিখা। আশ্রমের শিক্ষার্থীদের ভাব-রস, কলা-শৈলী শিক্ষার জন্য তিনি তাদেরকে দিয়ে বেশ কটি পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। যেমন, শান্তি, বাগান, বীথিকা, প্রভাত প্রভৃতি। আশ্রমের শিক্ষার অঙ্গ ছিলো শিক্ষামূলক ভ্রমণ। প্রতি বৎসর শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হতো বিভিন্ন দর্শনীয় ও শিক্ষণীয় স্থানে। শিক্ষকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস, হাসপাতাল, পাকশালা, বিদ্যুৎব্যবস্থা ইত্যাদি সুবিধাদি রেখেছিলেন। এজন্য তাঁকে অনেকবারই ভীষণ আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনোই দমে যান নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যেমন একজন পার্শি বণিক বোমানজি টেকনিক্যাল বিভাগের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ত্রিপুরার রাজা মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর এককালীন পাঁচ হাজার টাকা দান করেন এবং আরও পাঁচ হাজার টাকা সাহায্যের প্রতিশ্র“তি জ্ঞাপন করেন। চিত্রশিল্পী শ্রীযুক্ত গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় বিদ্যালয়কে একটি বহুমূল্য অনুবীক্ষণযন্ত্র দান করিয়াছেন [রবিজীবনী, প্রশান্ত কুমার পাল, ৭ম খন্ড]। তবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর দানের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিলো। তিনি নিজে তাঁর জমিদারী আয়ের একটি বড় অংশ আশ্রমের জন্য ব্যয় করতেন। এমনকি পারিবারিক গহণাও বিক্রয় করতে কুন্ঠিত হন নি। তাঁর রচনা সমূহ প্রকাশের রয়ালিটির অংশও এই শিক্ষার্থীদের জন্য অকৃপণহস্তে ব্যয় করেছেন। তাঁর জীবদ্দশায় বৃটিশ সরকার তাঁকে কোনভাবেই সহযোগিতা করেন নাই। তাঁর নোবেল পুরস্কারের একটি বড় অংশ আশ্রমের জন্য এবং একটি অংশ পতিসরে কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যাংকে দান করেন। যুবা বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমবায় আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি সেসময় বিদ্যালয়ে একটি সমবায় ভান্ডার স্থাপন করেন। যা এখন ‘বিশ্বভারতী সমবায় সমিতি’ নামে কার্যকর রয়েছে।
শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘বিচিত্রা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানেরও উদ্বোধক। এখানে পড়তেন ঠাকুরবাড়ির প্রতিমাদেবী, অলকেন্দ্রের স্ত্রী পারুল, গগণেন্দ্রনাথের ছেলেমেয়েরা, সুধীন্দ্রনাধের কন্যা রমা, নীলরতনবাবুর তিন কন্যা- নলিনী, অরুন্ধতী, আরমীরা। আরও বেশ ক’জন ছিলো এখানকার শিক্ষার্থী। তবে এই ‘বিচিত্রা’ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি বিভিন্ন কারণে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও মাঝে মাঝে ক্লাস নিতেন। তিনি সাধারণত ইংরেজির ক্লাস নিতেন। তিনি সর্বদাই প্রার্থনা করতেন এই আশ্রম একদিন বিশ্ব আশ্রমে পরিণত হবে। তিনি বলেছিলেন একসময়: “বিশ্বভারতী যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তবে ভারতীয় সঙ্গীত ও চিত্রকলা শিক্ষা তাহার প্রধান অঙ্গ হইবে এই আমাদের সংকল্প হউক।”
আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতীর কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো ১৯২১-এ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমৃত্যু ছিলেন এই বিদ্যাপীঠের আচার্য। ১৯২২-এ তাঁর বাংলা গ্রন্থাবলীর গ্রন্থস্বত্ব-সমুদয় বিশ্বভারতীতে দান করেন। জমিদারপুত্র রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকে অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে বড় হয়েছেন। মহর্ষির উপনিষদিক চিন্তাও তাঁকে অনেকটা বাহুল্যবর্জিত জীবন যাপনে উজ্জীবিত করেছে। তাঁর কাছে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান নেই। তাঁর মতে, ধনীর আদুরে সন্তানকে অকর্মণ্য ও দাম্ভিক করে গড়ে তোলেন তাঁর পরিবার। অথচ শিশু কিন্তু প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে উঠতে আগ্রহী থাকে। “সুগমতা, সরলতা, সহজতাই যথার্থ সভ্যতা”- এটি রবীন্দ্রনাথের উক্তি। অধ্যাপকবৃন্দের সম্পর্কেও তাঁর অভিমত- অধ্যাপকের ধ্যান-জ্ঞান-তপস্যা হবে অধ্যাপনা এবং অধ্যয়ন।
আচার্য রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার্থীদের অভিনয়কুশলী করে তোলার জন্য নিজের রচিত নাটকে নিজেই কোন কোনটিতে অভিনয় করে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন। যেমন- ‘অচলায়তন’ নাটকে তিনি ছিলেন আচার্য অদীনপূণ্য। ‘ফাল্গুনী’ নাটকে ‘অন্ধ বাউলের’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাঙ্গনে কৃষিতত্ত্ব, চিত্রকলা, নৃত্যকলা, স্থাপত্য বিদ্যা, পাণিনির ব্যকরণ ও ভাষাতত্ত্ব, ইংরেজি সাহিত্য, কারিগরি বিদ্যা ইত্যাদি শিক্ষার ব্যবস্থা ছিলো। সঙ্গীতচর্চাতো ছিলোই।
আচার্য রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা ছিলো এমন- তেজস্বীভাবে আমাদের অধ্যয়ন-অধ্যাপনা হউক। আমরা পরস্পরের প্রতি যেন বিদ্বেষ না করি। হে দেব, আমাদের মনকে মঙ্গলের প্রতি সবেগে প্রেরণ করো।
২|
২৪ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:৩৬
িবদ্রহী বলেছেন: "আধুনিক বাংলাদেশ কে কবী গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছারা কল্পনাও করা যায়না । বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটি সবর্বপ্রথম Defined হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ বা বাংলাকে ভেেঙ্গ পশ্চিম এবং পূর্ব বাংলা তৈরীর মাধ্যমে । এর বিরোধিতা যারা করেছিলেন, রবিন্দ্রনাথ ছিলেন তাদের অন্যতম । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সক্রিয় । তঁাকে তঁার প্রাপ্য সম্মান দেয়া উচিত, কিন্তু দেবতা জ্ঞানে সব Credit দেয়ার মানে হয় না ।
বড় আশ্চর্য্যের বিষয় হল, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পরও তিনি পাবনা শাহজাদপুরের গরীব প্রজাদের শিক্ষার জন্য নূন্যতম কিছু করেননি। হাইস্কুল-কলেজ তো দূরের কথা, কুঠি বাড়ীর ত্রিসীমানায় তিনি একটি প্রাইমারী স্কুল দিয়েছিলেন এমন কোন নজীর ইতিহাসে বিদ্যমান নাই। অথছ এরা সবাই তাঁর প্রজা ছিল। ভারতবর্ষে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই একমাত্র জমিদার ছিলেন যিনি বছরে দুবার খাজনা তুলতেন। একটা বাৎসরিক খাজনা অন্যটি কালী পূজার খরছ নিবারনের জন্য।
৩|
২৪ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:৩৭
িবদ্রহী বলেছেন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৷
এক অসাধারন ব্যক্তিত্ব ৷
এক অন্যন্য প্রতিভা ৷
তার প্রতিভার প্রভাব ছড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের প্রতি শাখায় ৷
বাংলা ভাষাকে তিনি পৌছে দিয়েছেন বিশ্বের সাহিত্যের দরবারে ৷
যে রবীন্দ্রনাথ তার লেখনী দ্বারা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন, লেখনীতে নতুন ভাবধারার সূচনা করেছেন সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগোষ্টি নিয়ে কোন সাহিত্য রচনা করেন নাই ৷
শিলাইদহ বোটে করে যখন পদ্মা নদীতে নৌ বিহার করছেন তার তীরে বসবাস কারী ছিদাম, রাজীব ও মহামায়াকে দেখেছেন অথচ তাদের প্রতিবেশী করিম, রহিম ও মালেকাকে তিনি তার দৃষ্টির বাহিরে রেখেছেন ৷
৪|
২৪ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:৩৯
িবদ্রহী বলেছেন: বাংলদেশে আদর্শহীন সেক্যুলারদের অতিমাত্রায় রবীন্দ্রপূজার রহস্য উন্মোচন করলেন বিশিষ্ট দার্শনিক এবনে গোলাম সামাদ ।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চলেছে এক ধরনের পুজা। এদেশে রবীন্দ্র সাহিত্যের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশি আলোচিত হয়ে থাকেন। প্রমাণ করার চেষ্টা চলেছে, বাংলাদেশে জাতীয় চেতনার উৎস হলেন রবীন্দ্রনাথ। একথা ঠিক, পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র সঙ্গীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল রবীন্দ্র সাহিত্য পঠন ও পাঠনের ওপর। এদেশের মানুষ করেছিল যার প্রতিবাদ। কিন্তু তাই বলে বলা যায় না যে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, রবীন্দ্র সাহিত্যে এমন কিছু নেই যে, তা বিশেষভাবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে একটা পৃথক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। আমাদের জাতীয় চেতনার অন্যতম উৎস হলো ভাষা। রবীন্দ্রনাথ নন, মাইকেল মধুসুদন দত্ত প্রথম ঘোষণা করেন বাংলা ভাষার বিজয়বাণী। মাইকেল তার অন্যতম চতুষ্পদী কবিতা ‘বঙ্গভাষা’তে বলেছেনঃ
‘হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;-
তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি,
পর-ধন লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি’
মাইকেলই আমাদের মনে উক্ত করেন ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনা, রবীন্দ্রনাথ নন। কিন্তু আজ বোঝানোর চেষ্টা চলেছে, রবীন্দ্রনাথই আমাদের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা বোধের উৎস ভুমি। সেটা ইতিহাসের বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা এখন যে চলতি বাংলায় লিখি ও কথা বলে মনোভাব ব্যক্ত করি, তার জনক রবীন্দ্রনাথ নন। মাইকেল মধুসুদন প্রথম তার লেখা নাটকে এর প্রচলন করে যান। কিন্তু জানি না, কেন রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীকে দেয়া হয় এর জন্য কৃতিত্ব। মধুসুদন ছিলেন খুবই খোলা মনের মানুষ; কিন্তু তাই বলে তিনি চাননি পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুসরণ। তিনি তাই লিখেছেন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ নামে নাটক। মধুসূদনের মনে ছিল না কোনো মুসলিম-বিদ্বেষ। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’র মতো প্রহসন লেখা। অথচ মাইকেলকে আমরা বলতে চাচ্ছি না আমাদের জাতীয় চেতনার উৎস। ঘটাচ্ছি ইতিহাসের চরম বিকৃতি। যে মাইকেল আধুনিক বাংলা ভাষার ভিত গড়লেন, সাহিত্যে আনলেন নব যুগের চিন্তা-চেতনা, তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে চলেছে রবীন্দ্র পুজা। আর এটাতে অংশ নিচ্ছেন আমাদের দেশের অনেক নামিদামি অধ্যাপক। যারা ধাঁধা লাগাচ্ছেন অনেকের চোখে। রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতায় বাংলাদেশের কোনো রাজা অথবা সুলতানকে নিয়ে গৌরব চোখে পড়ে না। রবীন্দ্রনাথ গৌরব গাথা রচনা করেছেন শিবাজীর। গৌরব গাথা রচনা করেছেন শাজাহানের। আমাদের দেশে বহু অধ্যাপকের কাছেই রবীন্দ্রনাথ হলেন প্রগতির পরাকাষ্ঠা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখেছেন বৈদিক যুগে ফিরে যাওয়ার। তার কাছে আদর্শ হিসেবে মনে হয়েছে তপবনের জীবন। এটা আর যাই হোক এগিয়ে থাকা মনের পরিচয়বহ নয়। রবীন্দ্রনাথ গৌরব করেছেন আর্য সভ্যতার, তার চিন্তায় ঠাঁই পেতে চায়নি অনার্য সভ্যতা। অথচ আমরা বাংলাদেশের মানুষ কতটা ‘আর্য’ সেটা নিয়ে তোলা যেতে পারে নৃতাত্ত্বিক প্রশ্ন। বাংলা ভাষাকে স্হান দেয়া হয় আর্য বিভাগে। কিন্তু এর অনেক চরিত্রই অন্য আর্য ভাষার মতো নয়। যেমন-বাংলা ভাষায় ক্রিয়া পদ ছাড়াই বাক্য হয়, কিন্তু খাঁটি আর্য ভাষায় হয় না। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ এদিক থেকে দ্রাবিড় ভাষাগুলোর সঙ্গেই মেলে। রবীন্দ্রনাথকে চিত্রিত করা হয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে। কিন্তু এক সময় রবীন্দ্রনাথ এদশে সমালোচিত হয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিপন্হী হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত গীতাঞ্জলি’র একটি কবিতায় স্বাগত করে বলেছেন মহাভারতের সাগর তীরে এদেশের মানুষের সঙ্গে একত্রিত হতে। ইংরেজ শাসনকে তিনি চেয়েছেন টিকিয়ে রাখতেই। রবীন্দ্রনাথ এদেশে যেসব তরুণ চান শক্তি প্রয়োগ করে ব্রিটিশকে বিতাড়িত করতে, তাদের সমালোচনা করে লেখেন ‘চার অধ্যায়’ নামক উপন্যাস। শরৎচন্দ্র লেখেন ‘পথের দাবি’ (১৯২৬)। শরৎচন্দ্র ছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে। ব্রিটিশ সরকার ‘পথের দাবি’ উপন্যাসকে বেআইনি করে বাজেয়াপ্ত করে। অনেকে চান রবীন্দ্রনাথ এর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তা না করে তার কাছের মানুষের কাছে মন্তব্য করেন, শরৎচন্দ্রের উচিত হয়নি ‘পথের দাবি’ লেখা। এমনই ছিল রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবোধ। বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলমান রবীন্দ্রনাথকে পড়ে সেভাবে বোঝেনি। তারা বরং শরৎচন্দ্রকে পড়েছে অনেক মনোযোগ দিয়ে। শরৎচন্দ্রকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডিলিট উপাধি প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন ঢাকা বিশ্বাবদ্যলয়ে বাংলা বিভাগ থেকে উঠতে দেখা যায় বিশেষ বিরোধিতা। যারা এর বিরোধিতা করেন, তারা অধিকাংশই ছিলেন গোঁড়া হিন্দু আর রবীন্দ্রভক্ত। এই ইতিহাস আমরা অনেকেই অবগত নই। বাংলাভাষী মুসলমান আর হিন্দুর মানসিক বিবর্তন একইভাবে হয়নি। হিন্দু সমাজে যখন জন্মেছে রাজা রামমোহন রায়, মুসলমান সমাজে তখন জন্মেছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। রামমোহন ছিলেন মুর্তিপুজার বিরোধী। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্ম সমাজ। রামমোহনের মুত্যুর পর ব্রাহ্ম সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে মন্হর বেগে চলতে থাকে রবীন্দ্রনাথের দাদু মশায় প্রিস দ্বারকানাথ ঠাকুরের বরাদ্দকৃত টাকায়। পরে ব্রাহ্ম সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নেতৃত্ব দেন ব্রাহ্ম সমাজের একটা অংশকে। ব্রাহ্ম সমাজের এই অংশ রামমোহনের চিন্তা-চেতনা থেকে বেশকিছুটা ভিন্ন হয়ে পড়ে। এর ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী চিন্তা-চেতনা। যার প্রভাব পড়েছে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনার ওপর। বাংলাদেশের মানুষ কি এই ভাবপ্রবাহের অংশ? প্রশ্নটা দেখা দেয় সঙ্গত কারণেই। আমরা বলেছি, হিন্দু সমাজে যখন জন্মেছেন রামমোহন, তখন মুসলমান সমাজে জন্মেছেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। ইসলামী পরিভাষায় ‘ফরজ’ বলতে বোঝায় অবশ্যপালনীয় কর্তব্যকে। ফরজের বহুবচন ফারায়েজ। হাজী শরীয়তুল্লাহ মুসলমান সমাজে যে ধর্ম সংস্কারের আন্দোলনের জন্ম দেন তা চিহ্নিত হয়ে এসেছে ফারায়েজী হিসেবে। ফারায়েজীরা ছিলেন পীর পুজার বিরোধী, দরবেশবাদের বিরোধী। তারা মনে করতেন লা-শরিক আল্লাহ। তারা মনে করতেন জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদ হলো ফরজ। অত্যাচারের কাছে মাথা নত করা অন্যায়। ফারায়েজীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে। তারা প্রতিরোধ গড়েন অত্যাচারী নীল কুঠি সাহেবেদের বিরুদ্ধেও। ফারায়েজীরা প্রথম সাহস করেন নীল কুঠিতে আগুন ধরাতে। ফারায়েজী আন্দোলন বিশেষ জোরালো রুপ পায় হাজী শরীয়তুল্লাহর সুযোগ্য পুত্র মোহাম্মদ মোহসীন ওরফে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে। বিলাতে কল-কারখানার অর্থনীতি গড়ে উঠতে আরম্ভ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে। বিলাত থেকে তৈরি সস্তা কাপড় এসে বিক্রি হতে থাকে আমাদের দেশে। যার ফলে দুর্দিন নেমে আসে আমাদের তন্তুবায়দের জীবনে। মুসলমান তন্তুবায়রা যোগ দেন দুদু মিয়ার সঙ্গে। দেশ স্বাধীন থাকলে হয়তো করারোপ করে বিদেশি বস্ত্র আসার পথ বন্ধ করা যেত। কিন্তু দেশ শাসন করছিল ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফারায়েজী নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব ধুমায়িত হয়ে ওঠে। রামমোহন ব্রিটিশবিরোধী ছিলেন না। তিনি চান ইংরেজদের সহযোগিতা করতে। হিন্দুদের উৎসাহিত করেন ইংরেজি শিখতে, কোম্পানির চাকরি পেতে। হিন্দু সমাজ আর মুসলমান মানসে এসে যায় বড় রকমেরই বিভক্তি। ১৯৭১-এর কথা আমার মনে পড়ে, মধ্য বাংলাদেশ থেকে দলে দলে বাংলাভাষী মুসলমান তরুণ যোগ দিতে আসে মুক্তি ফৌজে। এরা হলেন তাদেরই বংশধর যারা একদিন অংশ নিয়েছিলেন ফারায়েজী আন্দোলনে। অনেক কথা এখন বলা হয় যা ইতিহাসসম্মত নয়। রবীন্দ্র সঙ্গীত অনেকের প্রিয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথই যে আধুনিক বাংলা গানের জনক, এমন দাবি সঙ্গত নয়। বাংলা গানে নতুন ধারার প্রথম সৃজক হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। আমরা অনেকে চেয়েছিলাম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা ও সুর দেয়া গান ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’কে জাতীয় সঙ্গীত করতে। কিন্তু ভার
©somewhere in net ltd.
১|
০৪ ঠা জুলাই, ২০১১ রাত ৮:২৯
দেবরুপা বলেছেন: সুন্দর লিখা, ভাল লেগেছে...বিশ্বভারতীতে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল...রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপড় ড. টা করার প্রচেষ্টায় আছি তাই রবীন্দ্রনাথের লিখা দেখলে চোখ এড়াতে পাড়িনা....