নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বেঁচে থাকলে বড় হবো....

চারাগাছ

চারাগাছ একদিন ডালপালা ছড়াবে.....

চারাগাছ › বিস্তারিত পোস্টঃ

অবিনশ্বর হাসির সুরভি: কৈলাশ খেরের \'তেরি দিউয়ানি\' এবং স্রষ্টার প্রেমে এক আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২৮



অবিনশ্বর হাসির সুরভি: কৈলাশ খেরের 'তেরি দিউয়ানি' এবং স্রষ্টার প্রেমে এক আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ

ছোটবেলায় বা কৈশোরে যখন প্রথম কৈলাশ খেরের ''Teri deewani' গানটি শুনেছিলাম, তখন আমাদের অনেকের কাছেই এটি ছিল নিখাদ এক প্রেমের গান। ব্রেকআপ, একতরফা ভালোবাসা কিংবা প্রিয় মানুষের জন্য বুকফাটা কান্নার এক দারুণ বাহন। আমরা ভাবতাম, এই বুঝি কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকা তার ভালোবাসার মানুষের বিরহে পাগল বা 'দিওয়ানি' হয়ে গেছে।

কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে, জীবনের ভাঙা-গড়া আর ভেতরের কান্নাকুলু লেন্স দিয়ে যখন গানটির মিউজিক ভিডিওটার দিকে তাকালাম, তখন চশমাটা পাল্টে গেল। কিছু গান কেবল কানের পর্দা ছুঁয়ে যায় না, কিছু মিউজিক ভিডিও চোখের কোটরে আটকে না থেকে সরাসরি আঘাত করে মানুষের অবদমিত সত্তায়, মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল কপাটটিতে। কৈলাশ খের-এর অমর সৃষ্টি 'তেরি দিউয়ানি'-র মিউজিক ভিডিওটি তেমনই এক অদ্ভুত মায়ার জগৎ।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কয়েকটি ভাঙা-গড়ার সাধারণ প্রেমের গল্প, কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে এমন এক অলৌকিক মনস্তত্ত্ব—যার মূল সুতোটি বোনা হয়েছে এক অপার্থিব "হাসি"-র কারুকাজে।

গানটির সেই কালজয়ী লাইনটা আজও বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে—
"ইশক জুনুন জাব হাদ সে বার যায়ে, হাসতে হাসতে আশিক সুলি চার যায়ে..."
(প্রেমের পাগলপন যখন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়, প্রেমিক তখন হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চেও অনায়াসে উঠে যায়।)


ভিডিওর পরিচালক এই 'হাসতে হাসতে' শব্দযুগলকে কেবল গানের কথায় আটকে রাখেননি, সুক্ষ্ম রূপক হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রতিটি ফ্রেমে ফ্রেমে।

১. পতনের মহাকাব্য এবং সেই তৃপ্তির হাসি

ভিডিওর শুরুতেই আমরা দেখি এক তীব্র আকুলতা। এক তরুণী গোলকোণ্ডা দুর্গের প্রাচীন দেয়ালের উঁচুতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তার প্রেমিকের জন্য। কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় প্রেমিক তাকে পেছনে ফেলে চলে যায়। জাগতিক নিয়মে এটি চরম এক প্রত্যাখ্যান, পরাজয়ের গ্লানি। কিন্তু সুফী দর্শনে এটিই হলো মোহমুক্তির প্রথম ধাপ।

মেয়েটি যখন দুর্গের চূড়া থেকে শূন্যে ঝাঁপ দেয়, ক্যামেরা তখন তার মুখের ওপর স্থির হয়। সাধারণ মানুষের চোখে এটি এক করুণ আত্মহত্যা, যেখানে বুকফাটা হাহাকার থাকার কথা ছিল। কিন্তু কী অদ্ভুত! মেয়েটি যখন নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে, তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক স্বর্গীয়, শান্ত হাসি। সেই হাসিতে কোনো হাতাশা ছিল না, ছিল এক পরম তৃপ্তি। সে যেন নিজের এই নশ্বর শরীরটাকে বিসর্জন দিয়ে তার ভালোবাসাকে মুক্তি দিচ্ছে মহাকর্ষের সব নিয়ম ভেঙে। শরীরটা টুকরো টুকরো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার প্রেম উড়াল দিচ্ছে অন্য কোনো অনন্ত আকাশে।

২. বিচ্ছেদ ও ত্যাগের সহজ হাসি

আরেকটি দৃশ্যে দেখি, এক তরুণী ট্রাকে করে তার চেনা শহর আর প্রেমিককে চিরতরে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। প্রেমিকটি তীব্র হাহাকারে ট্রাকের পেছু পেছু দৌড়াচ্ছে। একপর্যায়ে শরীর আর সায় দেয় না, ধুলোবালি মাখা রাস্তায় সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।

ট্রাকটা দূরে হারিয়ে যাচ্ছে, মাঝখানের দূরত্বটা কেবলই বাড়ছে। কিন্তু দুজনের চোখ যখন শেষবারের মতো এক হয়, তখন কান্নার বদলে তাদের মুখাবয়বে খেলে যায় এক সহজ, স্নিগ্ধ হাসি। এ যেন এক পরম 'মেনে নেওয়া' বা Acceptance-এর হাসি। ভালোবাসার মানুষকে জোর করে শেকল দিয়ে আটকে রাখার চেয়ে, তাকে নিজের মতো করে মুক্ত করে দেওয়ার মাঝে যে কী এক অলৌকিক আনন্দ আছে—এই হাসিটি তারই নীরব সাক্ষী। কিন্তু সুফী দর্শনে এই Acceptance-ই হলো জাগতিক সব সম্পর্ককে পেছনে ফেলে স্রষ্টার প্রেমে একাত্ম হওয়ার আসল সিঁড়ি।

৩. রূপান্তর এবং স্বস্তির হাসি

পরের গল্পে দেখি অন্ধকার জগতের এক খুনির চরিত্র, যে উদ্যত হয়েছিল এক তরুণীকে হত্যা করতে। কিন্তু মেয়েটির চোখে ভয়ের লেশমাত্র না থেকে যে পরম সরলতা ও নির্ভীকতা দেখা যায়, তা আচমকাই কাঁপিয়ে দেয় সেই খুনির ভেতরের অবদমিত আত্মাকে। সুফী দর্শনে একেই বলে গ্লানি থেকে মুক্তির প্রথম সোপান—'তওবা' বা অন্তরের পরিশুদ্ধি। সে নিজের হাতের ছুরিটি মাটিতে ফেলে দেয়। বাহ্যিকভাবে এটি একটি অস্ত্র ত্যাগের দৃশ্য হলেও, রূপক অর্থে এটি হলো মানুষের ভেতরের পশুবৃত্তি ও অহংকারের ('নফস' ) গলা টিপে হত্যা করার সুফী সাধনা।

মেয়েটি যখন ভয়ে পালিয়ে যায়, তখন সেই খুনির মুখাবয়বে কোনো গ্লানি, অনুশোচনা বা ব্যর্থতার কুৎসিত ছায়া থাকে না; বরং ফুটে ওঠে এক মুক্তপ্রাণের স্বস্তির হাসি। জীবনের নিকষ কালো অন্ধকার পথ ছেড়ে নূরের দিকে ফিরে আসার যে প্রশান্তি, নিজের হিংস্র সত্তাকে তিল তিল করে বলি দিয়ে স্রষ্টার পরম করুণার চাদরে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার যে আনন্দ—সেই হাসিতে এক মৃত মানুষের জায়গায় জন্ম নেয় এক নতুন আধ্যাত্মিক সত্তা।

৪. খোদার প্রেমে দিউয়ানি: মগ্ন নাচের অন্তরাল

পুরো ভিডিওর আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে ওই মেয়েটির নাচের মাঝে। ধূলিধূসরিত পথ কিংবা প্রাচীন দুর্গের শূন্যতায়, মাথার ওপরে জ্বলতে থাকা আতশবাজির আলো-ছায়ার নিচে তার এই নাচ কোনো লৌকিক মানুষের জন্য নয়। সে হলো সাক্ষাৎ "দিউয়ানি"—যে নিজের সব জাগতিক মোহ, লজ্জা আর হিসেবনিকেশ পুড়িয়ে ছাই করে সরাসরি সঁপে দিয়েছে নিজেকে।

দুনিয়ার মানুষ যখন প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়, এই দিউয়ানি মেয়েটি তখন প্রমাণ করে যে সেই ধ্বংসস্তূপের ছাইয়ের ওপর দাঁড়িয়েই আসল সুফী নাচ শুরু হয়। পৃথিবীর সব নিয়ম, সমাজ আর সীমানা পেরিয়ে সে যখন আপন মনে ঘোরে, তার মুখে লেগে থাকে এক অপার্থিব পরমানন্দের হাসি। সে কোনো মানুষের জন্য কাঁদছে না, সে মগ্ন আছে কেবল তার স্রষ্টার প্রেমে।

৫. সুফী ঘূর্ণন এবং পরমানন্দের চূড়া

ভিডিওর শেষ দৃশ্যপটটি যেন পুরো সৃষ্টির এক মহাপ্রলয়ী পূর্ণতা। সাদা পোশাক পরিহিত সুফী সাধকেরা নিজেদের অক্ষের ওপর গোল হয়ে তীব্র গতিতে ঘুরে চলেছেন—যাকে সুফী দর্শনে বলা হয় 'Sama' বা Whirling।

এই ঘূর্ণনের সময় প্রতিটা সাধক এবং সেই দিউয়ানি মেয়েটির মুখে যে আলো দেখা যায়, তা জাগতিক কোনো আলোর প্রতিচ্ছবি নয়। এটি অহংকারের মৃত্যুর হাসি। মানুষ যখন নিজের 'আমি'-ত্ব, নিজের শরীর আর সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার হিসেব শূন্য করে দেয়, তখন সে মহাবিশ্বের মূল সুর—তার স্রষ্টার সাথে একাত্ম হয়ে যায়। ঠিক যেমন গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘোরে, এই নাচও তেমনি স্রষ্টার প্রেমে মহাজাগতিক এক ঘোর।

সাধকদের ডান হাত আকাশের দিকে (ঐশ্বরিক কৃপা কুড়িয়ে নেওয়া) আর বাম হাত মাটির দিকে (তা দুনিয়ায় বিলিয়ে দেওয়া), আর মুখে লেগে থাকে সেই অবিনশ্বর পরমানন্দের হাসি।

অবাক হচ্ছেন? ঠিকই ধরেছেন। আসলে এই মিউজিক ভিডিওটিতে সরাসরি সুফী সাধকদের ধ্যানে বসা বা ঘূর্ণনের দৃশ্য নেই—তবুও আমি যখন পুরো গান আর ভিডিওটা অনুভব করি, তখন মনের অজান্তেই এক অপার্থিব কাল্পনিক দৃশ্যপট ভেসে ওঠে।

'তেরি দিউয়ানি' আসলে কোনো মানুষের বিরহের বা কান্নার গান নয়। ছোটবেলায় যা আমাদের কাছে কেবলই একটা প্রেমের গান ছিল, আজ বয়সের চৌকাঠ পেরিয়ে এসে বুঝি—এটি হলো নিজের সমস্ত অহংকার আর জাগতিক অস্তিত্বকে পুড়িয়ে ছাই করে, হাসতে হাসতে কেবল খোদাকে ভালোবেসে নিজেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার এক বুকভাঙ্গা উদযাপন। আর ভিডিওর প্রতিটি চরিত্রের সেই অবিনশ্বর হাসি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের দিউয়ানাপনা তো কেবল ওপরওয়ালার সাথেই সম্ভব!

ভিডিও লিংক :https://youtu.be/zZasH6qkn8M?si=t-SZWUApSprwhLSN

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.