| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য
সময়টা যেন হুট করেই থমকে যায়, যখন ইথারে ভেসে আসে সেই অতিপ্রাকৃত সুরের মূর্ছনা। চোখ বন্ধ করলেই মনের ক্যানভাসে অদ্ভুত এক দৃশ্যপট জীবন্ত হয়ে ওঠে—অস্তগামী সূর্যের গাঢ় সোনালী আর লালচে আভায় চারপাশটা মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়েছে। সমুদ্রের বুকে উত্তাল নোনা জলরাশি কেটে শান্ত অথচ দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে প্রাচীন যুগের একঝাঁক বিশালাকার পালতোলা জাহাজ। চারদিকে সীমাহীন জলরাশি আর দিগন্তের বুকে জমে থাকা প্রাচীন মেঘের দল।
ঠিক এই বিষণ্ণ একাকীত্বের ব্যাকগ্রাউন্ডে যখন ধীর লয়ে বেজে ওঠে গভীর ড্রামের আওয়াজ, আর তার পিছু পিছু একদল মানুষের কণ্ঠে ভেসে আসে গম্ভীর, ছমছমে এক কোরাস—গা শিউরে ওঠে, বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। পরিচালক রিডলি স্কটের দূরদর্শী চোখ আর কিংবদন্তি গ্রিক কম্পোজার ভ্যাঞ্জেলিসের জাদুকরী সুরের মেলবন্ধনে তৈরি "১৪৯২: কনকুয়েস্ট অব প্যারাডাইস" নামের এই চিরন্তন মাস্টারপিসটি এভাবেই আমাদের চেনা বাস্তব থেকে এক লহমায় ছিনিয়ে নিয়ে যায় বহুকাল আগের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া অতীতে।
ছোটবেলার কোনো এক অদ্ভুত বিকেলে প্রথম যখন এই সুরটা কানে এসেছিল, মনে হয়েছিল এটি কেবল কোনো গানের সুর নয়; এটি যেন ফেলে আসা কোনো অচেনা অতীতের ডাক। সেবার কলম্বাসের আসল লক্ষ্য কিন্তু আমেরিকা আবিষ্কার করা ছিল না! স্পেনের রাজকীয় দরবার থেকে রানীর হুকুম নিয়ে সান্তা মারিয়া, পিন্তা আর নিনিয়ার মতো কাঠের বিশাল জাহাজগুলো যখন নোঙর তুলেছিল, তখন তিনি বেরিয়েছিলেন সমুদ্র পথ ধরে সোজা ভারতে পৌঁছানোর এক অসম্ভব স্বপ্ন বুকে নিয়ে।
মসলার দেশ ভারতে যাওয়ার নিরাপদ জলপথ আবিষ্কার করার এই নেশায় তিনি আটলান্টিক মহাসাগরের অজানা এবং ভয়ঙ্কর এক অচেনা পথের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। তারা জানতেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে। মানচিত্রের শেষ সীমানা পার হয়ে তারা যখন এমন এক দিগন্তে এসে পৌঁছলেন, যেখানে কেবল মৃত্যুভয় আর অতল জলের হাতছানি, তখন নাবিকদের মনে নেমে এসেছিল এক গভীর হাহাকার।
এই সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য যেন একেকটি জীবন্ত তৈলচিত্র। পর্দার কালার গ্রেডিং বা ভিজ্যুয়াল টোনটি খেয়াল করলে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে এক গাঢ় হলুদ আর সেপিয়া রঙের আধিপত্য। এটি কেবল এক টুকরো সূর্যাস্তের আলো নয়; এটি আসলে এক প্রাচীন, ধূলিধূসর যুগের দৃশ্যমান দীর্ঘশ্বাস।
সমুদ্রের বুকে ভাসমান সেই জাহাজগুলোর সারি দেখতে যতটা রাজকীয়, ঠিক ততটাই নিঃসঙ্গ। মাস্তুলে ধাক্কা খাওয়া নোনা বাতাস, জাহাজের কাঠের পাটাতনে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন আর বিশাল পালগুলোর বাতাসে ফুলে ওঠার দৃশ্যগুলো যখন ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা দেয়, তখন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর অবর্ণনীয় একাকীত্ব ভর করে শ্রোতার মনে। এই দৃশ্যপট আমাদের অবিরত মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি বড় আবিষ্কারের পেছনে লুকিয়ে থাকে ঘর ছাড়ার এক চিরন্তন বিষাদ।
আর এই রাজকীয় ভিজ্যুয়ালে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন মিউজিক ডিরেক্টর ভ্যাঞ্জেলিস তাঁর মনস্তাত্ত্বিক সাউন্ডস্কেপ দিয়ে। এই সুরের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই, কোনো ব্যাকরণ নেই। কোরাস দল যে ভাষায় গাইছে, পৃথিবীতে আসলে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
ল্যাটিন ভাষার মতো শোনায় এমন কিছু অর্থহীন শব্দকে বুনে ভ্যাঞ্জেলিস এই সুরের জাদুজাল তৈরি করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, শব্দের বাঁধনে যখন অর্থ আটকে যায়, তখন মানুষ তার ভেতরের আদিম অনুভূতি দিয়ে সুরকে ছুঁতে পারে না। শব্দের অর্থ যখন হারিয়ে যায়, তখনই কেবল সুরের খাঁটি নির্যাস সরাসরি মানুষের আত্মায় গিয়ে আঘাত করে।
আর তাই গানটির ভাষা আমরা বুঝি না, কিন্তু নাবিকদের সেই ঘর ছাড়ার তীব্র হাহাকার, মৃত্যুভয় আর সমুদ্রের বুকে হারিয়ে যাওয়া শত শত বেনামী প্রাণের আর্তনাদ আমাদের বুক ছুঁয়ে যায়। ট্র্যাকটির শুরুতে যে ধীর ও ভারী টিম্পানি ড্রামের আওয়াজটি প্রতিনিয়ত অনুরণিত হতে থাকে, তা যেন জাহাজের নিচে দাঁড় টানা ক্লান্ত ক্রীতদাসদের হাতের ছন্দের প্রতিধ্বনি, যা সরাসরি শ্রোতার বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দনের সাথে মিলে একাকার হয়ে যায়।
আজকের এই যান্ত্রিক কোলাহলের যুগে বসে যখন এই ওল্ড-স্কুল মিউজিকটি কানের পর্দায় এসে ধাক্কা দেয়, তখন নিজের অজান্তেই আমরা যেন সেই লালচে-হলুদ আলোয় ঘেরা জাহাজের ডেকে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে মানুষের সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প, যা সমস্ত ভয় আর একাকীত্বকে পায়ে ঠেলে সমুদ্রের ওপাড়ে নতুন এক দিগন্তের সন্ধান করতে শিখিয়েছিল।
এই অসাধারণ সৃষ্টি কেবল একটি সিনেমার আবহসংগীত হয়ে থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে মানবাত্মার এক চিরন্তন মহাকাব্য, যা বছরের পর বছর ধরে আমাদের স্মৃতির জানালায় নক করে যায় আর মনে করিয়ে দেয়—কিছু সুর কখনো পুরনো হয় না, তারা অমর হয়ে বেঁচে থাকে আমাদের ভালোলাগার চরম বিষণ্ণতায়।
©somewhere in net ltd.