| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ঠিকানা- স্বপ্নবাজ সৌরভ
ফয়সালের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।
কেউ তাকে ঠিকানা দিলে সে কখনো কাগজে লিখে রাখত না।
মনে রাখত।বাড়ির নাম।রাস্তার বাঁক।সামনের গাছটা।
জানালার রং। কখনো কখনো দরজার পাশে রাখা জুতোর জোড়াটাও।
সে বলত,
“ঠিকানা কাগজে থাকে না। মানুষ যেখানে অপেক্ষা করে, ঠিকানা আসলে সেখানে।”
নীহা প্রথম দিন কথাটা শুনে হেসেছিল।
বলেছিল,
“আপনি পোস্টম্যান নাকি কবি?”
ফয়সাল বলেছিল,
“কোনোটাই না। ভুল ঠিকানায় অনেক চিঠি দেখেছি।”
“মানুষ ভুল ঠিকানা দেয়?”
“সবসময় না। কখনো মানুষ নিজেই জানে না, তার আসল ঠিকানা কোথায়।”
নীহা তখন আর কিছু বলেনি।
কিন্তু কথাটা মনে রেখেছিল।
নীহা প্রথম এসেছিল শহরের পুরোনো ডাকঘরে একটা চিঠি নিয়ে।
খামের ওপর একটা নাম—
আফসার রহমান।
ঠিকানা নেই।
শুধু লেখা—
“পুরোনো শহর। নদীর কাছাকাছি।”
ফয়সাল খামটা হাতে নিয়ে বলেছিল,
“এটা কোথায় পাঠাব?”
নীহা বলেছিল,
“জানি না।”
“তাহলে আমাকে দিলেন কেন?”
“আপনি তো ঠিকানা খুঁজে বের করেন।”
“কে বলেছে?”
“আপনার সহকর্মী।”
“উনি মিথ্যা বলেছেন।”
নীহা একটু হেসে বলেছিল,
“তাহলে আজ সত্যি করে দেখুন।”
ফয়সাল খামটা উল্টেপাল্টে দেখল।
“আফসার রহমান কে?”
নীহা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“আমার বাবা।”
“ঠিকানা জানেন না?”
“জানি না।”
“কতদিন ধরে খুঁজছেন?”
“অনেকদিন।”
“শেষ কবে দেখেছেন?”
নীহা একটু থেমে বলল,
“মনে নেই।”
ফয়সাল আর প্রশ্ন করল না।
পরদিন থেকেই সে খোঁজ শুরু করল।
পুরোনো শহরের গলি।
চায়ের দোকান।
নদীর ঘাট।
পুরোনো বাড়ির দারোয়ান।
একজন বলল, আফসার রহমান নামে একজন আগে এখানে থাকতেন।
আরেকজন বলল, তিনি বহু বছর আগে চলে গেছেন।
কেউ বলল, তিনি নাকি নদীর ওপারে থাকেন।
কেউ বলল, বিদেশে।
কেউ আবার বলল,
“এই শহরে আফসার রহমান নামের মানুষ কম ছিল না।”
তিন সপ্তাহ কেটে গেল।
কোনো ঠিকানা পাওয়া গেল না।
একদিন নীহা ডাকঘরে এসে বলল,
“পেলেন?”
ফয়সাল মাথা নাড়ল।
“না।”
“তাহলে চিঠিটা?”
“আমার কাছে আছে।”
“কেন?”
“যতদিন ঠিকানা না পাই।”
নীহা বলল,
“চিঠি হারিয়ে গেলে?”
ফয়সাল হেসে বলল,
“হারাবে না।”
“এত নিশ্চিত কীভাবে?”
“কারণ এটা আপনার।”
এরপর নীহা প্রায়ই আসতে লাগল।
কখনো চিঠি নিয়ে।
কখনো কোনো পুরোনো ছবি নিয়ে।
কখনো শুধু জিজ্ঞেস করতে—
“কিছু পাওয়া গেল?”
ফয়সাল প্রতিবার মাথা নাড়ত।
“না।”
একদিন নীহা বলল,
“আপনি চাইলে এই কাজটা বাদ দিতে পারেন।”
“কেন?”
“আপনার তো কোনো লাভ নেই।”
ফয়সাল বলল,
“সব কাজের লাভ থাকতে হয়?”
“হয় না?”
“আপনি বাবাকে কেন খুঁজছেন?”
নীহা চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
“জানি না।”
ফয়সাল অবাক হলো।
“জানেন না?”
“না।”
“তাহলে?”
নীহা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“হয়তো কিছু মানুষকে খুঁজতে হয়, কারণ তারা হারিয়ে গেছে।”
“আর যদি পাওয়া যায়?”
“তাহলে?”
“তাহলে কী করবেন?”
নীহা একটু হেসে বলল,
“জানি না।”
একদিন বিকেলে খুব বৃষ্টি নামল।
ডাকঘর বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে।
নীহা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল,
“আজ মনে হয় ভিজেই যেতে হবে।”
ফয়সাল ছাতাটা এগিয়ে দিল।
“নিন।”
“আপনি?”
“আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে পারি।”
নীহা ছাতাটা নিল না।
বলল,
“একসঙ্গে হাঁটলে হয় না?”
ফয়সাল একটু থেমে বলল,
“হয়।”
তারা এক ছাতার নিচে হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তা ভিজে।
দোকানের আলো পানিতে কাঁপছে।
কেউ কথা বলছে না।
হঠাৎ নীহা বলল,
“আপনার বাড়ি কোথায়?”
“এই শহরেই।”
“নিজের বাড়ি?”
“নেই।”
“তাহলে কোথায় ফিরতে ইচ্ছে করে?”
ফয়সাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“যেখানে কেউ অপেক্ষা করে।”
নীহা আর কোনো কথা বলল না।
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তাদের সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না।
তারা প্রেমে পড়েছিল কি না, কেউ কাউকে বলেনি।
কিন্তু ফয়সাল জানতে শুরু করেছিল—
নীহা চা খায় চিনি ছাড়া।
বৃষ্টির দিনে তার মন খারাপ হয়।
সে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা আগে পড়ে না।
আর কোনো কিছু নিয়ে খুব চিন্তিত হলে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের নখ ঘষে।
নীহা জানত—
ফয়সাল রাস্তায় হাঁটার সময় সবসময় রাস্তার ডান দিক দিয়ে হাঁটে।
কেউ তাকে ধাক্কা দিলে সে রাগ করে না।
দোকান বন্ধ করার আগে তিনবার তালা পরীক্ষা করে।
আর কোনো মানুষ নিজের কষ্টের কথা বললে বিষয়টা বদলে দেয়।
কিছু কিছু সম্পর্কের কোনো ঘোষণা থাকে না।
শুধু একদিন হঠাৎ মনে হয়—
এই মানুষটা না থাকলে একটা জায়গা খালি লাগে।
এক সন্ধ্যায় নীহা বলল,
“আমি বাবাকে খুঁজে পেলে হয়তো আর আসব না।”
ফয়সাল হাসল।
“তাহলে ভালো।”
“ভালো?”
“হ্যাঁ। আপনার কাজ শেষ হবে।”
নীহা তাকিয়ে রইল।
“আপনার?”
“আমার?”
“আপনার কাজও শেষ হবে?”
ফয়সাল কিছু বলল না।
নীহা বলল,
“আপনি কখনো জানতে চান না, আমি কেন বাবাকে খুঁজছি?”
“চাই।”
“তাহলে জিজ্ঞেস করেন না কেন?”
“আপনি বলতে চাইলে বলবেন।”
নীহা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমি শুধু জানতে চাই, তিনি কোথায় গিয়েছিলেন।”
“কেন?”
“কারণ ছোটবেলায় তিনি বলেছিলেন, মানুষ যত দূরেই যাক, একদিন না একদিন নিজের বাড়িতে ফিরে আসে।”
ফয়সাল বলল,
“আপনার বাবা ফিরবেন?”
নীহা বলল,
“জানি না।”
“আপনি অপেক্ষা করবেন?”
নীহা একটু হেসে বলল,
“হয়তো।”
তারপর একদিন সত্যিই একটা খবর এল।
আফসার রহমানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
চিঠিটা ফেরত এল।
খামের ওপর লাল কালি দিয়ে লেখা—
“ঠিকানা অজ্ঞাত।”
নীহা চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
ফয়সাল বলল,
“খুব কষ্ট হচ্ছে?”
নীহা মাথা নাড়ল।
“না।”
“মিথ্যা বলছেন।”
“হয়তো।”
তারপর সে চিঠিটা ফয়সালের হাতে দিয়ে বলল,
“এটা আপনি রাখুন।”
“কেন?”
“আপনার কাছেই থাক।”
“আপনি নেবেন না?”
“না।”
“কোনোদিন দরকার হলে?”
নীহা বলল,
“তখন আপনার কাছ থেকেই নেব।”
এরপর কয়েক মাস কেটে গেল।
নীহা আর বাবার খোঁজ করল না।
ফয়সালও চিঠিটার কথা তুলল না।
জীবন তাদের নিয়ে অন্য ব্যস্ততায় চলে গেল।
নীহা একটা স্কুলে চাকরি পেল।
ফয়সাল ডাকঘরের চাকরি ছেড়ে ছোট একটা বইয়ের দোকান দিল।
দোকানের নাম রাখল—
ঠিকানা।
নীহা সাইনবোর্ড দেখে হেসে বলল,
“এই নাম কেন?”
ফয়সাল বলল,
“যারা বই কিনতে আসে, তাদের ঠিকানা দিতে হবে।”
“বইয়ের আবার ঠিকানা?”
“সব গল্পের একটা ঠিকানা থাকে।”
“আমার গল্পের?”
ফয়সাল একটু তাকিয়ে থেকে বলল,
“ওটা এখনও খুঁজে পাইনি।”
নীহা হেসে ফেলল।
“আপনি এখনও ঠিকানা খুঁজছেন?”
ফয়সাল বলল,
“অভ্যাস হয়ে গেছে।”
একদিন নীহা দোকানে এসে বলল,
“আপনার জন্য একটা চিঠি আছে।”
ফয়সাল অবাক।
“আমার?”
“হ্যাঁ।”
“কে লিখেছে?”
“আমি।”
সে খামটা এগিয়ে দিল।
ফয়সাল খামটা নিল।
“এখন পড়ব?”
“না।”
“কখন?”
“যেদিন মনে হবে, সত্যিই পড়তে পারবেন।”
ফয়সাল হেসে বলল,
“এত কঠিন কী লিখেছেন?”
নীহা বলল,
“কিছু কথা মুখে বলা যায় না।”
তারপর চলে গেল।
ফয়সাল চিঠিটা সেদিন রাতে খুলল না।
পরদিনও না।
এক সপ্তাহ পরও না।
চিঠিটা তার ড্রয়ারে থেকে গেল।
তারপর নীহা কিছুদিন দোকানে এল না।
প্রথম সপ্তাহে ফয়সাল ভেবেছিল, স্কুলের কাজ।
দ্বিতীয় সপ্তাহে ফোন করতে গিয়েও করেনি।
পরের সপ্তাহে খবর পেল—নীহা হাসপাতালে।
সে ছুটে গেল।
নীহা জানালার পাশে শুয়ে ছিল।
মুখটা একটু ক্লান্ত।
তবু ফয়সালকে দেখে হাসল।
“এতদিন পর এলেন?”
ফয়সাল চেয়ার টেনে বসে বলল,
“চিঠিটা পড়েছি।”
নীহা চোখ খুলল।
“কী লিখেছি?”
“আপনি লিখেছেন, ‘আমি এতদিন বাবার ঠিকানা খুঁজেছি। কিন্তু এখন মনে হয়, আমি আসলে একটা বাড়ি খুঁজছিলাম।’”
নীহা চুপ করে রইল।
ফয়সাল বলল,
“তারপর লিখেছেন—‘যেখানে গেলে মনে হবে, আমাকে আর কোথাও যেতে হবে না।’”
নীহার ঠোঁটে হাসি ফুটল।
“আর?”
ফয়সাল বলল,
“শেষটা বলব না।”
“কেন?”
“আপনি নিজেই বলবেন।”
নীহা চোখ বন্ধ করে বলল,
“ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলল,
“ফয়সাল?”
“হুম?”
“আপনি কি জানেন, আমি কেন আপনার সঙ্গে এতদিন কথা বলেছি?”
“কেন?”
নীহা চোখ না খুলেই বলল,
“কারণ আপনার সঙ্গে থাকলে আমাকে নিজের ঠিকানা বলতে হতো না।”
ফয়সাল কিছু বলল না।
জানালার বাইরে বিকেল নেমে আসছিল।
অনেকক্ষণ পর নীহা চোখ খুলে বলল,
“বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে?”
ফয়সাল জানালার দিকে তাকাল।
“না।”
“হলে ভালো লাগত।”
ফয়সাল মৃদু হেসে বলল,
“হবে।”
নীহাও হাসল।
“আপনি সবকিছুতেই এত নিশ্চিত কেন?”
ফয়সাল কোনো উত্তর দিল না।
কয়েকদিন পর নীহা চলে গেল।
শান্তভাবে। কোনো বিদায়ের দৃশ্য ছাড়াই।
যেন একটা দীর্ঘ কথোপকথনের মাঝখানে হঠাৎ উঠে অন্য ঘরে চলে গেছে।
ফয়সাল তার শেষ চিঠিটা আবার খুলল।
এবার শেষ পর্যন্ত পড়ল।
সেখানে লেখা—
“ফয়সাল,
আমি সারাজীবন বাবার ঠিকানা খুঁজেছি।
তারপর বুঝেছি, মানুষ আসলে বাড়ি খোঁজে না। খোঁজে এমন একজন মানুষকে, যার কাছে ফিরে গেলে নিজেকে আর ব্যাখ্যা করতে হয় না।
তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার কখনো মনে হয়নি আমি কোথাও বাইরে আছি।
মনে হয়েছে—
আমি বাড়িতে আছি।
তাই যদি কখনো কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার শেষ ঠিকানা কোথায় ছিল—
কোনো বাড়ির নাম বলো না।
কোনো রাস্তার নাম বলো না।
শুধু বলো—
তোমার চোখে।
—নীহা”
ফয়সাল অনেকক্ষণ চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
কোনো কান্না এল না।
শুধু জানালার কাঁচে হাত রাখল।
বাইরে তখন সত্যিই বৃষ্টি নামছিল।
পরদিন সকালে সে দোকানের সামনে দাঁড়াল।
সাইনবোর্ডে লেখা—
ঠিকানা।
অনেকক্ষণ নামটার দিকে তাকিয়ে রইল ফয়সাল।
তারপর দোকানের দরজা খুলল।
সেদিনও সে যথারীতি তিনবার তালাটা পরীক্ষা করল।
কাউন্টারের ড্রয়ারে নীহার চিঠিটা রেখে দিল।
আর কিছু বলল না।
সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার সময় একটা ছোট ছেলে বই কিনতে এসে জিজ্ঞেস করল,
“চাচা, দোকানের নাম ঠিকানা কেন?”
ফয়সাল বলল,
“তুমি ঠিকানা জানো?”
ছেলেটা বলল,
“জানি। যেখানে আমাদের বাড়ি।”
ফয়সাল হাসল।
“সব ঠিকানা বাড়ি হয় না。”
“তাহলে?”
ফয়সাল একটু ভেবে বলল,
“যেখানে ফিরে গেলে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না—সেটাই ঠিকানা।”
ছেলেটা বইটা বুকে চেপে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
ফয়সাল দরজা বন্ধ করল।
রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলছে।
শহর ধীরে ধীরে রাতের দিকে যাচ্ছে।
সে পকেট থেকে নীহার চিঠিটা বের করল।
শেষ লাইনটা আর পড়ল না।
চিঠিটা ভাঁজ করে আবার রেখে দিল।
তারপর হাঁটতে শুরু করল।
কোনো গন্তব্যের দিকে নয়।
শুধু হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো—
কিছু ঠিকানা কাগজে লেখা থাকে না।
কিছু ঠিকানা কোনো বাড়ির নামও নয়।
কিছু ঠিকানা মানুষ চলে যাওয়ার পরও থেকে যায়।
একটা পুরোনো চিঠিতে।
একটা বৃষ্টির সন্ধ্যায়।
একটা ছোট বইয়ের দোকানের সাইনবোর্ডে।
আর কখনো কখনো—
একজন মানুষের চোখে।
ফয়সাল হাঁটতে থাকল।
শহরের ভিড়ের মধ্যে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল সে।
শুধু দোকানের ওপরে সাইনবোর্ডটা রয়ে গেল-
ঠিকানা।
©somewhere in net ltd.