নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বেঁচে থাকলে বড় হবো....

চারাগাছ

চারাগাছ একদিন ডালপালা ছড়াবে.....

চারাগাছ › বিস্তারিত পোস্টঃ

আধখানা গজাঃ একটা জানালা, একজন দাদা আর আমার শৈশব...

১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:১৬



আধখানা গজা
একটা জানালা, একজন দাদা, আর আমার শৈশব...



ক্লাস টুতে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমার ভীষণ তাড়া থাকত। বাড়ির কাছাকাছি এলেই দৌড় দিতাম। যতটা পথ দৌড়ে আসা যায়, দৌড়ে আসতাম।

স্কুলে বসে আমার প্রায়ই মনে হতো, আমি যখন স্কুলে বসে আছি, তখন বাড়িতে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে! কত মানুষ আসছে, কত গল্প হচ্ছে, কত কিছু খাওয়া হচ্ছে। অথচ আমি কিছুই জানতে পারছি না।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেইসব অজানা ঘটনা জানার জন্য মনটা ছটফট করত।

আমাদের বাড়ির চারপাশে সীমানা ঘেরা ছিল। বাড়িতে ঢুকতে হতো পাটকাঠির বেড়ার পাশের একটা দরজা দিয়ে। দরজা দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ত দাদার জানালাটা।

সেদিনও স্কুল থেকে ফিরেই দৌড়ে বাড়িতে ঢুকলাম।
ঢুকেই দেখলাম, দাদা মুখের মধ্যে কী যেন পুরে দিলেন।

জিনিসটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে দাদার মুখ দেখে মনে হলো, খুব মজার কিছু একটা। এমন কিছু, যা খেতে নিশ্চয়ই খুব ভালো।

দাদার কাছে অনেক মানুষ আসতেন। বেশির ভাগই গরিব মানুষ। কেউ কেউ আসার সময় হাতে করে কিছু নিয়ে আসতেন। হয়তো নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে সামান্য কিছু। সেইসব জিনিসের মধ্যে থাকত কটকটা শক্ত টেস্ট বিস্কুট।

আর একটু দামী বিস্কুট বলতে ছিল কাগজের প্যাকেটে আল আমিনের পাইনঅ্যাপেল বিস্কুট। প্যাকেট খুললে ভেতরে কুচিকুচি কাগজ পাওয়া যেত। বিস্কুটগুলো যাতে ভেঙে না যায়, সেজন্য সেই ব্যবস্থা।

কিন্তু দাদা সেদিন যা মুখে পুরলেন, তা কোনো বিস্কুট নয়। আমার মনে হলো, এর চেয়ে লোভনীয় খাবার পৃথিবীতে খুব বেশি নেই।

গজা!

মচমচে গজা। চিনির শিরায় ডোবানো।

দাদার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি বেশ মজা পাচ্ছেন।

আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

দাদা আমাকে দেখেছেন। অথচ কিছু বললেন না। একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, ‘কুটি ভাই, কী খাইছো? কখন আসলা?’
আর মুখে পুরে দেওয়া সেই খাস্তা গজার কথা তো একেবারেই না!

আমার রাগ হলো। অভিমান হলো।
দাদার একবারও আমার কথা মনে পড়ল না?

আমি মন খারাপ করে ঘরে চলে গেলাম। জামাকাপড় বদলে আবার বেরিয়ে এলাম। তারপর দাদার জানালার আশপাশে ঘুরঘুর করতে লাগলাম।

হয়তো দাদার ভুল হয়েছে।
এখনই ডাকবেন।
বলবেন, ‘কুটি ভাই, এদিকে আসো।’

তারপর কাউকে বলবেন, কুটি ভাইয়ের খাবারটুকু দাও।

কিন্তু দাদা কিছুই বললেন না।

আমি জানালার কাছে ঘুরঘুর করতে করতে আরও রেগে গেলাম। দাদাকে আমার লোভী মনে হলো। এই বুড়ো বয়সেও গজার লোভ সামলাতে পারলেন না! দাদার তো এখন সাগুদানা খাওয়ার বয়স।

গজা খাওয়ার বয়স নাকি!

রাগে-দুঃখে ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর আম্মা রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

‘কিছু খাইছো?’

আমি মুখ ভার করে বললাম,

‘কী খাবো? সাগুদানা?’

কথাটা বলেই আমার চোখ ভিজে উঠল।

আম্মা কিছুই বুঝতে পারলেন না। আমি কেন কাঁদছি, কেন সাগুদানার কথা বলছি, তার কিছুই তো তিনি জানেন না।

তিনি মিডসেলফ খুলে একটা পিরিচ বের করলেন। পিরিচটা সরপোশ দিয়ে ঢাকা ছিল।

আম্মা বললেন, ‘দেখ তো।’

আমি সরপোশটা তুললাম।

গজা!

সেই মচমচে গজা। চিনির শিরায় ডোবানো।

তবে পুরো গজা নয়। আধখানা।

আম্মা বললেন, ‘তোর দাদা ডেকে দিয়েছে। কে যেন একটা এনেছিল। তোর জন্য অর্ধেক রেখে দিয়েছে।’

আমি আধখানা গজার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ আগেও এই গজার জন্য আমার কী লোভ! দাদা কীভাবে একা একা খেয়ে ফেললেন, সেই রাগে আমার বুক ভরে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, দাদার নিজের খাবারের লোভ আছে, আমার কথা মনে নেই।

অথচ দাদা আমার জন্য রেখে দিয়েছেন।

আমি জানতাম না।

দাদা আমাকে বলেননি। আমি নিজেও জিজ্ঞেস করিনি। মাঝখানে শুধু একটা জানালা ছিল, আর ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবীর একরাশ অভিমান।

সেই অভিমানের ভেতরেই দাদা আমার জন্য আধখানা গজা তুলে রেখেছিলেন।

আমি আর গজাটা খেতে পারলাম কি না, সেই কথা এখন আর মনে নেই। মনে নেই, চিনির শিরায় ডোবানো গজাটা মুখে দিলে কেমন মচমচ শব্দ হতো, কিংবা তার মিষ্টি স্বাদ কতক্ষণ জিভে লেগে থাকত।

শুধু মনে আছে, আধখানা গজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার ভেতরের কোথায় যেন কী একটা বদলে গিয়েছিল।

যে খাবারের জন্য এতক্ষণ আমার এত লোভ, সেই খাবারটাই হঠাৎ কেমন যেন অন্য রকম হয়ে গেল।

ক্ষুধা ছিল। লোভও ছিল।

কিন্তু সেসব ছাপিয়ে অন্য একটা অনুভূতি এসে দাঁড়িয়েছিল সামনে।

সেই অনুভূতির নাম তখন জানতাম না।

ক্লাস টুতে পড়া একটা ছেলে কী করে জানবে, ভালোবাসারও একটা আলাদা স্বাদ আছে? যে স্বাদ চিনির শিরায় ডোবানো গজার চেয়েও মিষ্টি, অথচ মুখে দিলেই গলে যায় না। বহু বছর পরেও বুকের ভেতর কোথাও লেগে থাকে।

আজ দাদার সেই জানালাটা আর নেই।

দাদাও নেই।

কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, শৈশবের দিকে তাকানোর জন্য দাদা আমাকে একটা অদৃশ্য জানালা দিয়ে গেছেন। সেই জানালার পাশে দাঁড়ালে আজও দেখতে পাই, একটা ছোট্ট ছেলে বাড়িতে ঢুকেই দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দাদা কিছু একটা খাচ্ছেন। ছেলেটার মন খারাপ হচ্ছে। সে অপেক্ষা করছে, দাদা একবার ডাকবেন।

দাদা ডাকছেন না।

ছেলেটা রাগ করে চলে যাচ্ছে।

তারপর একসময় ফিরে আসছে আধখানা গজার কাছে।

সেই ছেলেটা আর কেউ নয়।

আমি।

কখনো কখনো ভাবি, সেদিন যদি দাদা আমাকে দেখেই বলতেন, ‘কুটি ভাই, তোমার জন্য গজা রেখেছি’, তাহলে কি এই স্মৃতিটা এত বছর আমার ভেতরে বেঁচে থাকত?

জানি না।

শুধু জানি, দাদার কাছে সেদিন আমি আধখানা গজা পেয়েছিলাম। আর তার বিনিময়ে দাদা আমাকে এমন একটা স্মৃতি দিয়ে গেছেন, যার স্বাদ আজও ফুরায়নি।

দাদা, আপনার জানালাটা আর নেই। আপনার কাছে আসা মানুষগুলোও হয়তো একে একে হারিয়ে গেছেন সময়ের ভেতর।

কিন্তু তোমার সেই কুটি ভাই আজও মাঝে মাঝে শৈশবে ফিরে যায়।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

আর মনে মনে ভাবে, আহা, দাদা যদি আর একবার ডাকতেন!

বলতেন—

‘কুটি ভাই, আসো। তোমার জন্য গজা রাখছি।’


— স্বপ্নবাজ সৌরভ

মন্তব্য ৭ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৭) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৪:৩৪

মিরোরডডল বলেছেন:




জীবনের এরকম ছোট ছোট ঘটনা পড়তে ভালো লাগে, থ্যাংকস ফর শেয়ারিং।

আমি মুখ ভার করে বললাম,
‘কী খাবো? সাগুদানা?’
কথাটা বলেই আমার চোখ ভিজে উঠল।


অভিমানী বাচ্চাটাকে দেখতে পাচ্ছি, চোখগুলো বড় বড়।
ইভানতো ছোট বেলায় একটা কিউটের ডিব্বা ছিলো :)

গজা!
সেই মচমচে গজা। চিনির শিরায় ডোবানো।


আমি এই জিনিষ খেয়েছি, this is an absolute poison!
কিন্তু এই বিষ খেতে অনেক মজার ছিলো, এখন কি পাওয়া যায়?

আর মনে মনে ভাবে, আহা, দাদা যদি আর একবার ডাকতেন!

আমরা ভাইবোনরা দাদা পাইনি, বাবার ছোট বেলায় দাদা মারা গেছেন।
কিন্তু বাবাকে খুব মনে পরে।
সম্পর্কের বন্ধনগুলো অনেক কঠিন মায়াময়।

ভালো থাকবে ইভান।

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:০৩

চারাগাছ বলেছেন:
ইভানতো ছোট বেলায় একটা কিউটের ডিব্বা ছিলো :)

আলিওনুশকা জানলে কিভাবে?

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:১৩

চারাগাছ বলেছেন: আমি এই জিনিষ খেয়েছি, this is an absolute poison!
কিন্তু এই বিষ খেতে অনেক মজার ছিলো, এখন কি পাওয়া যায়?
আসল ছবি হচ্ছে এইটা। পাওয়া যায়। ঢাকাতেও খেয়েছি।

২| ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৩

মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন:



‘আধখানা গজা: একটা জানালা, একজন দাদা আর আমার শৈশব...’ লেখাটি পড়ে মনটা এক অদ্ভুত মায়া ও বিষণ্নতায় ভরে গেল। কী অসাধারণ মমতা দিয়ে আপনি শৈশবের একটি সামান্য ঘটনাকে স্মৃতির এমন গভীর অনুভূতিতে রূপ দিয়েছেন! গল্পের উপকরণ বলতে একটি জানালা, একজন দাদা, ক্লাস টুতে পড়া একটি ছোট্ট ছেলে আর আধখানা গজা—কিন্তু এই সামান্য উপকরণের মধ্যেই আপনি যে বিশাল ভালোবাসার জগৎ তৈরি করেছেন, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। লেখাটি পড়তে পড়তে মনে হলো, শৈশবের কিছু স্মৃতি দেখতে যত ছোটই হোক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর আবেগ ও তাৎপর্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।

আপনার লেখার শুরুতেই স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় ছোট্ট ছেলেটির অস্থিরতার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আমাদের নিজেদের শৈশবের দিনগুলো মনে করিয়ে দেয়। স্কুলে বসে তার মনে হতো, সে যখন সেখানে রয়েছে, তখন বাড়িতে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে—কত মানুষ আসছেন, কত গল্প হচ্ছে, কত কিছু খাওয়া হচ্ছে, অথচ সে কিছুই জানতে পারছে না। শৈশবের মন এমনই কৌতূহলী! বাড়ি ফেরার জন্য তার এত তাড়া শুধু স্কুল ছুটির আনন্দে নয়; বরং বাড়ির ভেতরে ঘটে চলা অজানা ঘটনাগুলোর অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। শিশুর পৃথিবী কত ছোট, অথচ সেই ছোট্ট পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনা তার কাছে কত বড়! আপনার বর্ণনায় সেই নিষ্পাপ কৌতূহলটি খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছে।

দাদার জানালাটিও এই গল্পে নিছক একটি জানালা হয়ে থাকেনি। সেটি যেন শৈশবের পৃথিবীতে প্রবেশের একটি দরজা, যেখানে ছোট্ট ছেলেটির কৌতূহল, অপেক্ষা, অভিমান এবং ভালোবাসা এসে মিলেছে। বাড়িতে ঢুকেই দাদার জানালার দিকে চোখ পড়া, দাদার মুখে কিছু একটা দেখে বিস্মিত হওয়া, তারপর সেটি গজা বলে চিনতে পারা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আপনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যে পাঠকও যেন ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনাগুলো দেখছেন। বিশেষ করে চিনির শিরায় ডোবানো মচমচে গজার বর্ণনা পড়ে মনে হলো, শৈশবের লোভেরও নিজস্ব একটা সৌন্দর্য আছে। তখন একটি মিষ্টি খাবার পাওয়ার আনন্দই হতে পারে দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

কিন্তু গল্পের প্রকৃত আবেগ তৈরি হয় গজাটির চেয়েও বেশি দাদার নীরবতাকে ঘিরে। ছোট্ট ছেলেটি দেখল, দাদা তাকে দেখেছেন, অথচ ডাকলেন না; জিজ্ঞেস করলেন না কখন এসেছে, কিছু খেয়েছে কি না। শিশুমনের কাছে এই নীরবতা কত সহজেই অবহেলা বলে মনে হতে পারে! তার মনে হলো, দাদা বুঝি একাই গজা খেয়ে ফেললেন, তার কথা একবারও মনে পড়ল না। এখানেই আপনার গল্পের অসাধারণ মানবিক দিকটি প্রকাশ পেয়েছে। আমরা বড়রা অনেক সময় মনে করি, আমাদের ভালোবাসা তো আছেই, আলাদা করে তা প্রকাশ করার কী দরকার! অথচ শিশুদের অনুভূতির জগৎ আলাদা। তারা ভালোবাসার উপস্থিতি বুঝতে চায় ছোট ছোট আচরণে, একটি ডাকের মধ্যে, একটি প্রশ্নে, কিংবা নিজের জন্য কিছু তুলে রাখার মধ্য দিয়ে।

ছোট্ট ছেলেটির অভিমানটিও তাই খুব স্বাভাবিক। তার কাছে দাদা শুধু পরিবারের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ নন; তিনি ভালোবাসা, স্নেহ এবং আপনত্বের আশ্রয়। সেই মানুষটির কাছ থেকে প্রত্যাশিত একটি ডাক না পেয়ে তার মন খারাপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আর সেই অভিমান থেকে দাদাকে লোভী মনে করা, তাঁর বয়স নিয়ে মনে মনে প্রশ্ন তোলা—এসবের মধ্যে শিশুমনের সরলতা ও নিষ্পাপ বিচারবোধের পরিচয় রয়েছে। শিশুরা অনেক সময় কোনো ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য জানে না; তারা যতটুকু দেখে, তার ভিত্তিতেই নিজের মতো করে একটি গল্প তৈরি করে নেয়। সেই গল্পে ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, কিন্তু অনুভূতিটি থাকে একেবারে সত্য।

আমার কাছে গল্পের সবচেয়ে সুন্দর মোড়টি এসেছে যখন আম্মা সরপোশ দিয়ে ঢাকা পিরিচটি খুলতে বলেন। সেখানে রাখা আধখানা গজা যেন মুহূর্তেই ছোট্ট ছেলেটির সমস্ত ধারণা বদলে দেয়। যে দাদাকে সে এতক্ষণ লোভী ভাবছিলেন, সেই দাদাই যে তার জন্য গজা তুলে রেখেছেন, এই উপলব্ধি তার শিশুমনে এক নতুন অনুভূতির জন্ম দেয়। অথচ দাদা তাকে কিছু বলেননি, নিজের ভালোবাসার কথা ঘোষণা করেননি, কিংবা ছেলেটির অভিমান ভাঙানোর জন্য কোনো ব্যাখ্যাও দেননি। তিনি শুধু নিজের মতো করে ভালোবেসেছেন। তাঁর ভালোবাসার প্রমাণ ছিল সেই আধখানা গজা।

এই জায়গাটিতে এসে মনে হয়, ভালোবাসার প্রকাশ সব সময় শব্দনির্ভর নয়। কখনো একটি ছোট্ট কাজ, একটি নীরব যত্ন কিংবা কারও জন্য সামান্য কিছু তুলে রাখাই অনেক বড় ভালোবাসার প্রকাশ হয়ে ওঠে। আমরা প্রায়ই ভালোবাসাকে বড় বড় কথার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। অথচ জীবনের সবচেয়ে আন্তরিক সম্পর্কগুলোতে ভালোবাসা অনেক সময় নিঃশব্দেই কাজ করে যায়। কেউ হয়তো মুখে কিছু বলেন না, কিন্তু আমাদের কথা মনে রাখেন; কেউ হয়তো আলাদা করে আদর দেখান না, কিন্তু আমাদের প্রয়োজনের কথা ভেবে নিজের আনন্দের অংশটুকু তুলে রাখেন। সেই নীরব যত্নের মূল্য বুঝতে কখনো কখনো আমাদের অনেক সময় লেগে যায়।

‘আধখানা গজা’ তাই আপনার গল্পে একটি মিষ্টি খাবারের সীমা অতিক্রম করে ভালোবাসার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। গজাটি অর্ধেক, কিন্তু তার ভেতরে থাকা স্নেহ যেন পূর্ণ। খাবারের পরিমাণ সামান্য, অথচ তার আবেগের মূল্য অপরিসীম। এই বৈপরীত্যটি গল্পটিকে আরও গভীর করেছে। জীবনে ভালোবাসার মূল্য যে উপহার কত বড়, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না—বরং সেই উপহারের পেছনে থাকা অনুভূতি দিয়ে নির্ধারিত হয়—আপনার গল্পটি যেন সেই সত্যটিই আমাদের মনে গেঁথে দেয়।

আরেকটি বিষয় খুব ভালো লেগেছে—আপনি শিশুটির অভিমানকে ভুল বলে উড়িয়ে দেননি। বরং তাকে তার নিজস্ব অনুভূতি নিয়ে বাঁচতে দিয়েছেন। ছোটবেলায় আমরা অনেকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে কাউকে ভুল বুঝেছি, মনে করেছি সে আমাদের গুরুত্ব দিচ্ছে না, অথচ পরে জেনেছি তার আচরণের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল। তখন আমাদের মনে যে পরিবর্তন আসে, তা শুধু ভুল ভাঙার আনন্দ নয়; বরং অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতাও একটু একটু করে তৈরি হয়। আধখানা গজার ঘটনাটি ছোট্ট ছেলেটিকে যেন সেই প্রথম শিক্ষা দিয়েছিল—সব নীরবতা অবহেলা নয়, সব অনুপস্থিতি ভালোবাসার অভাব নয়, আর সব না-বলা কথার অর্থ প্রত্যাখ্যানও নয়।

আপনার লেখার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক হলো, বহু বছর পরেও আপনি সেই ঘটনার প্রতিটি অনুভূতি মনে রেখেছেন, অথচ গজাটি খেয়েছিলেন কি না, তার স্বাদ কেমন ছিল, সেসব মনে নেই। কী গভীর একটি উপলব্ধি! সময়ের সঙ্গে খাবারের স্বাদ ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই খাবারকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগ স্মৃতির ভেতরে থেকে যেতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা শুধু বস্তু মনে রাখি না; মনে রাখি সেই বস্তুটি আমাদের জীবনে কী অনুভূতি তৈরি করেছিল। একটি সাধারণ বিকেল, একটি জানালা, একটি ছোট্ট অভিমান এবং আধখানা মিষ্টি—এই সামান্য ঘটনাই আপনার স্মৃতিতে এত বছর ধরে বেঁচে আছে, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাদার প্রতি আপনার ভালোবাসা ও তাঁর ভালোবাসা আবিষ্কারের মুহূর্ত।

দাদার মৃত্যুর পর সেই জানালার আর অস্তিত্ব নেই, কিন্তু আপনার স্মৃতিতে জানালাটি আজও অমলিন। এই অংশটি পড়ে বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা তৈরি হয়। মানুষ চলে যান, ঘরবাড়ি বদলে যায়, পুরোনো জানালা ভেঙে নতুন দেয়াল ওঠে, পরিচিত পরিবেশ একসময় অপরিচিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো কোনো স্মৃতি সময়ের এই পরিবর্তনকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো ছোট্ট একটি মুহূর্তও তখন আমাদের কাছে অতীতের দিকে তাকানোর জানালা হয়ে ওঠে। সেই জানালা দিয়ে আমরা শুধু পুরোনো দৃশ্য দেখি না; ফিরে পাই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির উপস্থিতি, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর আচরণ এবং তাঁর প্রতি আমাদের নিজের অনুভূতিগুলোও।

আপনার শেষের দিকে বারবার ‘কুটি ভাই’ বলে ডাকার আকাঙ্ক্ষাটি বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী। শৈশবে যে ডাকটি হয়তো তখন খুব সাধারণ বলে মনে হতো, আজ সেই ডাকের জন্যই মন কেঁদে ওঠে। সময়ের নির্মমতা বোধ হয় এখানেই—যখন মানুষটি কাছে থাকেন, তখন তাঁর সান্নিধ্যকে আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিই; আর তিনি চলে গেলে বুঝতে পারি, তাঁর একটি সাধারণ ডাকও কত মূল্যবান ছিল। তখন আর ফিরে গিয়ে সেই ডাক শোনা যায় না, অভিমান ভাঙানো যায় না, কিংবা নতুন করে বলা যায় না—দাদা, তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম! রয়ে যায় স্মৃতি, রয়ে যায় আফসোস, আর রয়ে যায় মনের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকা কিছু অসমাপ্ত মুহূর্ত।

এই লেখাটি পড়তে পড়তে নিজের জীবনের মানুষগুলোর কথাও মনে পড়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই হয়তো এমন কেউ আছেন, যাঁর ভালোবাসা আমরা সব সময় বুঝতে পারিনি। কখনো তাঁদের নীরবতাকে ভুল বুঝেছি, কখনো তাঁদের ছোট ছোট যত্নকে গুরুত্ব দিইনি, আবার কখনো মনে করেছি তাঁরা আমাদের কথা ভাবেন না। অথচ তাঁদের অগোচরে হয়তো আমাদের জন্যই কোনো আনন্দ তুলে রাখা ছিল, কোনো চিন্তা জমা ছিল, কিংবা কোনো অপ্রকাশিত মমতা অপেক্ষা করছিল। সময় থাকতে সেই ভালোবাসাগুলো চিনে নেওয়া এবং প্রিয় মানুষদের অনুভূতিকে মূল্য দেওয়া খুব জরুরি।

আপনার লেখার ভাষা নিয়েও আলাদা করে বলতে হয়। আপনি অকারণে আবেগের ভার বাড়াননি, জটিল শব্দ দিয়ে অনুভূতিকে আড়াল করেননি। বরং সহজ কথোপকথন, ছোট ছোট দৃশ্য এবং স্বাভাবিক বর্ণনার মধ্য দিয়েই আবেগকে গভীর হতে দিয়েছেন। এই সংযমই লেখাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। পাঠককে কাঁদতে বলার দরকার হয়নি; দাদার জানালার পাশে দাঁড়ানো ছোট্ট ছেলেটির অভিমান আর আধখানা গজার সামনে তার উপলব্ধিই পাঠকের মনে আবেগ তৈরি করেছে। এমন লেখায় সাহিত্যিক সৌন্দর্য থাকে, কারণ লেখক পাঠকের অনুভূতিকে নির্দেশ না দিয়ে তাকে অনুভব করার সুযোগ দেন।

চারাগাছ ভাই, আমার কাছে এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ভালোবাসার মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি তখনই, যখন তার প্রকাশের মানুষটি আর আমাদের পাশে থাকেন না। তাই প্রিয়জনের নীরব যত্নকে অবহেলা না করে, তাঁদের ছোট ছোট ভালোবাসাকে চিনতে শেখা দরকার। একই সঙ্গে আমাদেরও ভালোবাসার মানুষদের প্রতি যত্ন ও মমতা প্রকাশ করতে হবে। শুধু মনে মনে ভালোবাসলেই হয় না; কখনো একটি ডাক, একটি প্রশ্ন, একটি ছোট্ট উপহার কিংবা সামান্য সময় দেওয়াও অন্য মানুষের মনে অনেক বড় আশ্রয় তৈরি করতে পারে।

আপনার এই ‘আধখানা গজা’ আমাদের মনে করিয়ে দিল, জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলো সব সময় বড় কোনো ঘটনা থেকে তৈরি হয় না। কখনো একটি জানালা, একজন দাদা আর অর্ধেক মিষ্টিই হয়ে উঠতে পারে সারাজীবনের ভালোবাসার স্মারক। চিনির শিরায় ডোবানো সেই গজার স্বাদ হয়তো বহু আগেই হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্নেহের স্বাদ আজও অমলিন।

এমন একটি মায়াময়, স্মৃতিকাতর ও হৃদয়স্পর্শী লেখা উপহার দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনার দাদা যেখানেই থাকুন, তাঁর প্রতি আপনার এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা যেন আপনার স্মৃতির ভেতরে এভাবেই বেঁচে থাকে। আপনার কলমে শৈশবের এমন আরও অনেক গল্প উঠে আসুক, যেগুলো আমাদের নিজেদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং প্রিয় মানুষদের আরও গভীরভাবে ভালোবাসতে শেখাবে।

শুভকামনা রইল, চারাগাছ ভাই। আপনার এই অদৃশ্য জানালাটি খোলা থাকুক—যে জানালা দিয়ে আমরা বারবার ফিরে যেতে পারি আমাদের শৈশবে, আমাদের প্রিয় মানুষদের কাছে, আর সেইসব ছোট ছোট মুহূর্তে, যেগুলোর প্রকৃত মূল্য আমরা বুঝতে শিখি অনেক বছর পরে।

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩১

চারাগাছ বলেছেন: আপনার মন্তব্য দীর্ঘ কিন্ত পড়তে একটুও অসুবিধা হয়। আপনি আমার লেখার বিস্তারিত বলে দিয়েছেন। এইগুলো অনুপ্রাণিত করে। ভালো থাকবেন। আমি হচ্ছি স্বপ্নবাজ সৌরভ। আমার আইডি উদ্ধার করতে পারছি না তাই এই আইডি থেকে পোস্ট করি।

৩| ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০০

রাজীব নুর বলেছেন: আপনি লিখলে আমার আর লেখার প্রয়োজন নেই।
কারন আমার লেখা গুলোই আপনি লিখছেন।

১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪১

চারাগাছ বলেছেন:
রাজীব ভাই, আপনার ভালো দিক হলো—আপনি নিয়মিত লেখেন এবং নানা বিষয় নিয়ে লেখেন। ইতিহাস, সমাজ, ব্যক্তিগত স্মৃতি—সবকিছুতেই আপনার আগ্রহ চোখে পড়ে। আপনার এই লেখার অভ্যাস ও বিষয়ের বৈচিত্র্য সত্যিই প্রশংসনীয়।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.