| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সেদিন বিকেলেও লোকটা জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
পাড়ার মানুষজন তাকে চেনে। চেনার কথাও। গত বাইশ বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে লোকটাকে এই গলিতে দেখা যায়। কখনো হেঁটে যায়, কখনো রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে বসে থাকে। চা ঠান্ডা হয়ে যায়। সে খেয়াল করে না। দোকানদার দু-একবার জিজ্ঞেসও করেছে, কোনো বিশেষ মানুষের জন্য অপেক্ষা করেন কি না।
লোকটা হেসে বলেছে, না।
তারপর আবার জানালাটার দিকে তাকিয়েছে।
গলিটা খুব সাধারণ। দুপাশে বাড়ি, বাড়ির সামনে গাছের সারি। পুরোনো কৃষ্ণচূড়াটা এখনো আছে, যদিও আগের মতো ফুল ফোটে না। গলির মাথায় একটা মুদি দোকান। তার পাশেই ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। বিকেল হলে স্কুলের ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফেরে, রিকশার ঘণ্টি বাজে, বাড়ির ভেতর থেকে মায়েরা ডাকাডাকি করেন।
কিছুই বদলায়নি বললে মিথ্যে বলা হবে। অনেক কিছু বদলে গেছে।
শুধু দোতলার ওই জানালাটা ছাড়া।
একসময় জানালাটায় নীল পর্দা ছিল। বিকেল হলেই পর্দাটা সরিয়ে একটি মেয়ে দাঁড়াত। কখনো চুল আঁচড়াত, কখনো গাছের টবে পানি দিত। আবার কখনো কিছুই করত না। শুধু রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত।
ছেলেটা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।
ক্লাস শেষ করে সে প্রতিদিন এই গলিতে আসত। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হতো, অথচ তার আসল গন্তব্য ছিল ওই জানালা। মেয়েটার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল এক আত্মীয়ের বাড়িতে। তারপর পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে এমন একটা সম্পর্ক—যার কোনো নাম তারা কখনো ঠিক করতে পারেনি।
মেয়েটা একদিন বলেছিল, ‘তুমি রোজ আসো কেন?’
ছেলেটা বলেছিল, ‘এই রাস্তা দিয়ে আমার বাড়ি।’
মেয়েটা হেসে বলেছিল, ‘তোমার বাড়ি তো অন্যদিকে।’
ছেলেটা সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেনি।
তাদের মধ্যে খুব বেশি কথা হতো না। কখনো বাড়ির ছাদ থেকে কথা, কখনো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে দু-একটা বাক্য। ফোনে কথা বলার সুযোগ ছিল, তবু তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলত না। বরং এমন অনেক বিকেল কেটেছে, যখন দুজনের কেউ কোনো কথা বলেনি। মেয়েটা জানালায় দাঁড়িয়ে থেকেছে, ছেলেটা রাস্তার ওপাশে।
তাদের মনে হতো, এই না-বলাটুকুও বুঝি কথারই একটা রকম।
একদিন মেয়েটা বলেছিল, তার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
ছেলেটা প্রথমে ভেবেছিল, মেয়েটা মজা করছে। তারপর বুঝল, কথাটা সত্যি।
সে জানতে চেয়েছিল, কবে।
মেয়েটা বলেছিল, সামনের মাসে।
ছেলেটা সেদিনও হেসেছিল। বলেছিল, ‘ভালো তো।’
মেয়েটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছিল।
সেদিন ছেলেটা অনেক রাত পর্যন্ত রাস্তায় হেঁটেছিল। বাড়ি ফেরার কথা মনে ছিল না। শহরের বড় রাস্তায় বাস ছুটছিল, দোকান বন্ধ হচ্ছিল, ফুটপাতে মানুষ ঘুমানোর জায়গা খুঁজছিল। কোথাও একটা পত্রিকার হকার চিৎকার করছিল। ছেলেটার সেসব কিছুই মনে থাকেনি।
তার শুধু মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোথাও একটা জানালা বন্ধ হয়ে গেছে।
অথচ পৃথিবী থেমে থাকেনি।
মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল। সে অন্য শহরে চলে গেল। ছেলেটা কয়েক মাস পর চাকরি পেল। তারপর বিয়ে, সংসার, সন্তান। বাবা-মায়ের অসুখ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, মাসের শেষে টাকার হিসাব—জীবন তাকে নিজের মতো করে ব্যস্ত করে ফেলল।
প্রথম কয়েক বছর সে ওই গলিতে আসত না। তারপর একদিন কী মনে করে এসেছিল। দেখেছিল, জানালায় নতুন পর্দা। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দুটো বাচ্চা খেলছে। মুদি দোকানে নতুন একজন দোকানদার।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গিয়েছিল।
তারপর থেকে মাঝে মাঝে আসত।
এখন প্রায় প্রতিদিন আসে।
পাড়ার কেউ কেউ ভাবে, লোকটার হয়তো মাথায় একটু সমস্যা আছে। এত বছর আগে চলে যাওয়া একজন মানুষের জানালার দিকে কেউ এভাবে তাকিয়ে থাকে নাকি?
লোকটা এসব জানে না। জানলেও কিছু যায় আসে না।
তার জীবনে দুঃখের অভাব নেই, আবার সুখেরও অভাব নেই। বাড়িতে তার স্ত্রী আছে, ছেলেমেয়ে আছে। ছুটির দিনে তারা একসঙ্গে খেতে বসে। ছেলেমেয়েরা বাবাকে ফোন করে। স্ত্রী অসুস্থ হলে সে রাত জেগে বসে থাকে। সংসারের কোথাও কোনো শূন্যতা আছে বলে সে দাবি করতে পারে না।
তবু বিকেল পাঁচটার দিকে তার মনে হয়, কোথাও একটা অসমাপ্ত কাজ পড়ে আছে।
সে জানে না, কাজটা কী।
শুধু জানে, ওই জানালাটার সামনে এসে দাঁড়ালে তার মনে হয়, সময়টা একটু ধীর হয়ে যায়।
গত সপ্তাহে একদিন চায়ের দোকানের ছেলেটা তাকে বলেছিল, ‘চাচা, আপনি কি এই বাড়ির কাউকে চেনেন?’
লোকটা বলেছিল, ‘চিনতাম।’
‘এখন কেউ থাকে না এখানে। বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে।’
লোকটা চুপ করে ছিল।
ছেলেটা আরও বলেছিল, ‘নতুন মালিক নাকি ভেঙে ফেলবে। ফ্ল্যাট করবে।’
লোকটা চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে উঠে চলে গিয়েছিল।
পরদিনও এসেছিল।
তার পরদিনও।
আজ বিকেলে এসে দেখল, বাড়িটার সামনে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে। একজন মিস্ত্রি দেয়াল মাপছে। আরেকজন জানালার গ্রিল পরীক্ষা করছে। বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হবে সম্ভবত কাল।
লোকটা রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে রইল।
বহু বছর পর তার মনে হলো, আজ তার কিছু একটা করা দরকার। বাড়ির ভেতরে গিয়ে জানালাটাকে একবার ছুঁয়ে দেখা দরকার। নীল পর্দাটা নেই, মেয়েটাও নেই, তবু জানালাটার কাঠে হয়তো কোথাও সেই সময়ের সামান্য চিহ্ন রয়ে গেছে।
কিন্তু সে ভেতরে গেল না।
কী পরিচয়ে যাবে?
এই বাড়ির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। বাড়ির মালিককে সে চেনে না। বর্তমান বাসিন্দাদের সঙ্গে তার কোনো কথা নেই। বাইশ বছর আগে এই বাড়ির জানালায় দাঁড়ানো একটি মেয়েকে সে চিনত—এই পরিচয় দিয়ে কি কারও বাড়িতে ঢোকা যায়?
সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।
লোকটা বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। আজ আর পেছনে তাকাল না।
পরদিন বিকেলে সে আবার এসেছিল।
বাড়িটার সামনের দেয়াল ভাঙা হয়েছে। জানালাটা খুলে নামিয়ে রাখা হয়েছে রাস্তার পাশে। নীল পর্দা নেই, গ্রিল নেই। কাঠের ফ্রেমটা ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে।
লোকটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল।
তারপর রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।
দোকানদার চা দিয়ে বলল, ‘আজ তো জানালাটাই নেই, চাচা।’
লোকটা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হাসল।
বলল, ‘জানালা না থাকলে কী হয়েছে?’
দোকানদার আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সেদিন লোকটা বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বলেছিল, আগামীকাল একটু আগে বেরোতে হবে। অফিসে একটা কাজ আছে।
পরদিনও সে বেরিয়েছিল। তার পরদিনও।
শুধু আর কোনোদিন ওই গলিতে যায়নি।
বছরখানেক পর বাড়িটার জায়গায় বহুতল ভবন উঠল। নিচতলায় দোকান, ওপরে ফ্ল্যাট। নতুন গাছ লাগানো হলো ফুটপাতে। পাড়ার বাচ্চারা সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তোলে। কেউ জানে না, একসময় এখানে একটা জানালা ছিল।
যে জানালায় বিকেল হলেই একটি মেয়ে দাঁড়াত।
আর একজন ছেলে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ভাবত, এই পৃথিবীতে তার আর কিছু চাওয়ার নেই।
অনেক বছর পর লোকটা মারা গেল।
তার ছেলে বাড়ির জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে একটা পুরোনো খাতা পেল। খাতাটায় কোনো কবিতা ছিল না, কোনো চিঠি ছিল না। শুধু একটা তারিখের নিচে এক লাইনের লেখা।
‘আজও জানালায় আসেনি।’
তার নিচে আরেকটা তারিখ।
‘আজও না।’
তারপর অসংখ্য তারিখ। একই কথা। কোথাও কোনো নাম নেই।
ছেলেটা লেখাগুলোর অর্থ বুঝতে পারেনি। খাতাটা রেখে দিয়েছিল বাবার পুরোনো বইগুলোর সঙ্গে।
একদিন বাড়ি পরিষ্কার করার সময় খাতাটা তার স্ত্রীর হাতে পড়ল। তিনি অনেকক্ষণ পাতা উল্টে শেষে খাতাটা বন্ধ করে রাখলেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই। কিছু মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘর থাকে, যেখানে তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষদেরও প্রবেশাধিকার থাকে না।
খাতাটা আর কেউ খোলেনি।
শুধু পুরোনো বাড়িটার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা নতুন ভবনের দোতলার একটা জানালায় বিকেলবেলা মাঝে মাঝে এক তরুণী এসে দাঁড়ায়। তার হাতে ফোন, কানে হেডফোন। সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর কাউকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে হাসে।
গলির ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যায়। গাছের পাতায় দোলা লাগে। আকাশের রং বদলায়।
সবকিছু স্বাভাবিক।
কেউ জানে না, এই পাড়ার একটা বিকেল বহু বছর আগে কোথাও আটকে গিয়েছিল।
কেউ জানে না, যে মানুষটা প্রতিদিন জানালার সামনে এসে দাঁড়াত, সে আসলে মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করত না।
সে অপেক্ষা করত সেই ছেলেটার জন্য, যে একদিন এই গলিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করেছিল—কিছু মানুষ চলে গেলেও পৃথিবীর কিছু জায়গা তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
ছেলেটা আর কোনোদিন ফেরেনি।
শুধু বিকেলগুলো থমকে থাকে, আজও তোমার পাড়ায়।
— স্বপ্নবাজ সৌরভ.
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: তার শুধু মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোথাও একটা জানালা বন্ধ হয়ে গেছে।
অথচ পৃথিবী থেমে থাকেনি।
............................................................................................
সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করেনা ,
পাশাপাশি বুকের গভীরে বহমান ইলেকট্রন
কেউ থামায়ে রাখতে পারেনা ।