নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কেয়ার জন্য উৎসর্গীকৃত ব্লগ।

দানবিক রাক্ষস

অন্ধদের রাজ্যতে এক চোখা মানুষটি রাজা এবং আমি সেই রাজা। না ঈশ্বর, না পিশাচ—আমি তৃতীয় বিশ্বাস।

দানবিক রাক্ষস › বিস্তারিত পোস্টঃ

অসমাপ্ত নীহারিকা - কেয়া ।

২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭



বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে দেখলে মানুষের প্রথম যে কথাটা মনে হতো, তা হলো—ছেলেটার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে।
কালো জিনস। কালো টি-শার্ট। টি-শার্টে কখনো Behemoth, কখনো Slayer, কখনো Cannibal Corpse। কানে হেডফোন। চোখে এক বিরক্তি।
ক্যাম্পাসের এক কোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতাম। মাঝেমধ্যে হোস্টেলের ছাদে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গাঁজার ধোঁয়ার ভেতর রাতকে আরও দীর্ঘ করতাম। আমার একটা ব্ল্যাক মেটাল ব্যান্ডও ছিল।
আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। ধর্মের কাছে প্রশ্ন করি, সমালোচনা করি। মানুষের ভালোবাসাকেও সন্দেহ করতাম।

তারপর একদিন মেয়েটাকে দেখলাম।
সেদিন আকাশে বিশেষ কিছু ছিল না। ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়াগুলোও তখন ফুলহীন। মেয়েটা বান্ধবীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে হাসছিল। সাধারণ মুখ। সাধারণ পোশাক। এমন কিছু নয় যে তাকে দেখে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেমে যাবে।
কিন্তু তার হাসিটা— !!!
আমি হেডফোনে Vader শুনছিলাম। কী মনে করে গান বদলে দিলাম। বাজতে শুরু করল Children of Bodom-এর She Is Beautiful
আমি সিগারেটের ছাই ঝেড়ে মনে মনে বললাম, Fu*k!
এত সুন্দর কিছু পৃথিবীতে থাকা উচিত নয়।
অন্তত আমার পৃথিবীতে তো নয়ই।
নিজের ওপর বিরক্ত হলাম।
একটা মেয়ের হাসির জন্য নিজের প্লেলিস্ট বদলানো—এতটা দুর্বল হওয়ার কথা আমার ছিল না।
সেদিনই বুঝেছি, মানুষ কখনো কখনো নিজের অজান্তে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে ফেলে। :``>>

সেদিন রাতে ডায়েরিতে লিখেছিলাম—
তোমার নয়নে বিষণ্ণ নক্ষত্রের বাস,
তোমার কেশে বন্দি নিশীথের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার হাসিতে শ্মশানের শ্বেতপদ্ম ফোটে,
আমার সমস্ত অন্ধকার তোমার দিকে ছোটে।

মেয়েটার নাম তখনো জানতাম না।
পরে জেনেছিলাম—কেয়া।


কেয়ার সঙ্গে প্রথম কথা বলার ঘটনাটা আমার পরিকল্পনামতো হয়নি।
আমি ঠিক করেছিলাম, লাইব্রেরির সামনে গিয়ে একটা বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলব। তারপর সে মুগ্ধ হবে। আমরা কথা বলব। বন্ধুত্ব হবে।
কিন্তু সামনে গিয়ে মাথা আর কাজ করল না, আমি বললাম,
— আপনি কি জানোন , আপনার হাসিটা বিপজ্জনক?
কেয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কেন?
— মানুষের মনোযোগ নষ্ট করে।
সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।
— আপনি কি সবার সঙ্গেই এভাবে কথা বলেন?
— না। সবার হাসি এত বিপজ্জনক হয় না।
— আপনার নাম কী?
আমি নাম বললাম। সে নিজের নাম বলল।
তারপর আমার টি-শার্টের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— এই ব্যান্ডটা কি খুব ভয়ংকর?
সে দিন আমি Cannibal Corpse ব্যান্ডের The Wretched Spawn একটা কালো টি-শার্ট পড়েছিলাম।
আমি বললাম, “ওরা ভয়ংকর না। ওরা শুধু ঈশ্বর আর মানুষের ভয়ংকর রুপ প্রকাশ করে ।”

কেয়া মাথা নেড়ে হেসে বলল ।
— বুঝেছি। আপনি খুব অদ্ভুত একজন মানুষ।
সেদিনের কথাবার্তা ওই পর্যন্তই।
কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। জীবনে প্রথমবার কোনো মেয়ের হাসি পাওয়ার জন্য আমি নিজের সব দার্শনিক অহংকার বিসর্জন দিতে রাজি হয়েছিলাম !

এরপর শুরু হলো আমার বন্ধুত্ব অভিযান।
পরদিন থেকে আমি লাইব্রেরির সামনে একটু বেশিক্ষণ দাঁড়াতে শুরু করলাম। ক্যান্টিনে এমন টেবিলে বসতাম, যেখান থেকে কেয়াকে দেখা যায়। যে করিডর দিয়ে তার ক্লাসে যাওয়া, সে করিডর দিয়ে অকারণে হাঁটতাম। মাঝেমধ্যে এমন সব বই পড়ার ভান করতাম, যেগুলো আমার কাছে আগে বিরক্তিকর মনে হতো।
বন্ধুরা বলত, “ভাই, তোর ব্যান্ডের নতুন অ্যালবাম বাদ দিয়ে এখন রোমান্টিক অ্যালবাম চলছে?”
আমি গালি দিতাম।
কিন্তু পরদিনও একই জায়গায় দাঁড়াতাম।

কেয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আমার বেশ কষ্ট হয়েছিল। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেতাম না; কিন্তু কেয়ার সামনে গিয়ে মনে হতো, নিজের সমস্ত অন্ধকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এমন এক মানুষের সামনে, যে অন্ধকারকে ঘৃণা করে না—শুধু বুঝতে চায়।
আমরা প্রথম একসঙ্গে চা খেয়েছিলাম ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে।
কেয়া চায়ে চিনি কম খেত। আমি চিনি ছাড়া।
সে বলেছিল, “আপনার জীবনে মিষ্টি বলে কিছু নেই?”
আমি বলেছিলাম, “আছে। তবে সেগুলো বেশিক্ষণ থাকে না।”
সে চায়ের কাপ নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো প্রশ্ন করেনি।
সেই না-করাটুকু আমার ভালো লেগেছিল।
তারপর আমাদের দিনগুলো ছোট ছোট ঘটনায় ভরে উঠল। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বটতলায় বসে থাকা। বৃষ্টিতে ভিজে এক ছাতার নিচে হাঁটা। বইমেলায় পাশাপাশি ঘোরা। কেয়ার পছন্দের ফুচকা খেতে গিয়ে আমার ঝাল সহ্য না করতে পেরে চোখে পানি চলে আসা—আর তার হাসতে হাসতে বলা, “আপনি তো দেখি ভেতরে ভেতরে খুব নরম!”
আমি বলেছিলাম, “কাউকে বলবেন না। আমার ব্যান্ডের সম্মান আছে।”
কেয়া আমার হেডফোনে গান শুনতে চাইত। আমি তাকে Nile শুনিয়েছিলাম। দুই মিনিট পর সে হেডফোন খুলে বলেছিল, “এরা কি কারও সঙ্গে ঝগড়া করছে?”
আমি বলেছিলাম, “সম্ভবত ঈশ্বর আর মহাবিশ্বের সঙ্গে।”
সে বলেছিল, “আপনিও তাই করেন?”
আমি হেসেছিলাম। কিন্তু উত্তরটা আমার বুকের কোথাও আটকে গিয়েছিল।
কেয়া আমাকে বদলে দিতে চায়নি—অন্তত প্রথম দিকে। সে শুধু আমার পাশে বসে থাকত। আমি যখন পৃথিবীর সবকিছুকে অর্থহীন বলতাম, সে বলত, “সবকিছুর অর্থ খুঁজতে হয় না। কিছু জিনিস ভালো লাগলেই হয়।”
আমি বলতাম, “যেমন?”
সে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলত, “এই বিকেলটা।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, এই মেয়েটা জানে না, তার পাশে বসে থাকা একজন মানুষ নিজের সমস্ত অবিশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।
ডুবে যাওয়ারও যে এত শান্ত শব্দ হতে পারে, আগে জানতাম না।


সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়টা অন্য রকম ছিল। পহেলা ফাল্গুন !
চারদিকে হলুদ, কমলা, লাল। গাছে গাছে ফুল। মেয়েদের শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে। ছবি তুলছে। মাইকে গান বাজছে। সব মিলিয়ে এমন এক উৎসব, যেটাকে আমি সাধারণত বিরক্তিকর ভেবে এড়িয়ে চলতাম।
আমি কালো জিনস আর কালো টি-শার্ট পরে এসেছিলাম। টি-শার্টে Dimmu Borgir লেখা।
কেয়া কোথায়, জানতাম না।
তারপর ভিড়ের ওপারে তাকে দেখলাম।
হলুদ-কমলা রঙের শাড়ি। খোলা চুল। কপালে ছোট্ট টিপ। হাতে কয়েকটা ফুল। সে কারও কথা শুনে হাসছিল।
আমার চারপাশের শব্দগুলো হঠাৎ অস্পষ্ট হয়ে গেল। মাইকের গান, মানুষের কথা, বন্ধুদের ডাক—সব যেন পানির নিচ থেকে ভেসে আসছে। আমার চোখ শুধু তার দিকে আটকে রইল।
মনে হলো, পৃথিবী এতদিন একটা ভুল রঙে আঁকা ছিল। আজ কেউ সেখানে প্রথমবার সূর্যাস্তের রং লাগিয়েছে।
কেয়া আমাকে দেখে এগিয়ে এল।
“কী হয়েছে? এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?”
আমি অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলাম না।
তারপর বললাম, “তোমাকে আজ দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা হয়তো পুরোপুরি বাজে না।”
কেয়া হেসে বলল, “শুধু আজ?”
“আজকের জন্য পৃথিবীকে ক্ষমা করা যায়।”
সে মাথা নিচু করে হাসল।
আমি পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করলাম। আগের রাতে লিখেছিলাম। দিতে গিয়ে মনে হলো, পৃথিবীর মেটাল গড ব্যান্ডের সামনে স্টেজে দাঁড়ানো সহজ, কিন্তু একটা মেয়েকে কবিতা দেওয়া অসম্ভব কঠিন।
কেয়া কাগজটা খুলে পড়ল—
তোমার নয়নে বিষণ্ণ নক্ষত্রের বাস,
তোমার কেশে বন্দি সহস্র নিশীথের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার হাসিতে ফোটে শ্মশানের শ্বেতপদ্ম,
তোমার রূপে মুগ্ধ মৃত্যু, পরাভূত ব্রহ্মাণ্ড।

প্রথম যেদিন দেখেছি তোমায় গোধূলির অবসানে,
সেদিনই আমার আত্মা হারিয়েছে তোমার নয়নে।
আমার সুরে ঈশ্বর হয় বিচলিত,
অথচ তোমার এক চাহনিতে হয়েছি চিরতরে সমর্পিত।

আমি, তোমায় চাই
যেমন অন্ধকার চায় চাঁদ,
যেমন মৃত বসন্ত খোঁজে ফুলের সুবাস।
তোমায় পেতে পেরোব নরকের সহস্র দ্বার,
তোমার প্রেমে তুচ্ছ আমার স্বর্গের অধিকার।


কবিতা পড়ে সে আমার দিকে তাকাল।
“আপনি তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না।”
আমি বললাম, “কবিতার মধ্যে একটু মিথ্যা বলা যায়।”
কেয়া কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিল।
“সব মিথ্যা কি খারাপ?”
আমি বললাম, “না। কিছু মিথ্যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”
সে আমার হাত ধরেছিল সেদিন। ভিড়ের মধ্যে খুব অল্প সময়ের জন্য।
কিন্তু সেই সামান্য স্পর্শ নিয়ে আমি বহু রাত বেঁচে ছিলাম।


কেয়া একদিন আমাকে বলেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা বটতলার পুরোনো বেঞ্চে বসেছিলাম। তার চুলে বৃষ্টির পানি জমে ছিল। আমি সিগারেট ধরাতে গিয়ে থেমে গিয়েছিলাম।
“কী বললে?”
কেয়া বিরক্ত হয়ে বলল, “একবার বলেছি। বারবার বলতে পারব না।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
আমার জীবনে অনেক শব্দ ছিল—গিটার, ড্রাম, মানুষের গালি, নিজের মাথার ভেতর সারাক্ষণ চলতে থাকা তর্ক। কিন্তু ওই তিনটি শব্দের সামনে আমি সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেলাম।
“আমিও তোমাকে ভালোবাসি,” বলেছিলাম শেষ পর্যন্ত।
কেয়া হেসেছিল। তারপর বলেছিল, “কিন্তু একটা কথা আছে।”
আমি বুঝেছিলাম, সুখেরও দরজা আছে। আর প্রতিটি দরজার ওপাশে হয়তো একটা প্রশ্ন অপেক্ষা করে।

কেয়া ধর্মে বিশ্বাস করত। প্রার্থনা করত। কোনো বিপদ হলে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখত। আমি প্রশ্ন করতাম। তার বিশ্বাসের জায়গায় যুক্তি নিয়ে দাঁড়াতাম, আর সে আমার যুক্তির কারণে বিরক্ত হত।
কখনো সে বলত, “একদিন তুমি বুঝবে।”
আমি বলতাম, “কী বুঝব?”
“বিশ্বাস করলে সব প্রশ্নের উত্তর পেতে হয় না।”
আমি বলতাম, “আর প্রশ্ন না করলে কীভাবে বুঝব উত্তরটা সত্যি?”
আমরা তর্ক করতাম। কখনো হাসতে হাসতে, কখনো রাগ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তর্কগুলো আমাদের আনন্দের জায়গা থেকে ব্যথার জায়গায় চলে গেল। আমার সিগারেট খাওয়া, মাঝে মাঝে গাজা খাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা এমনকি আমার গানের প্লেলিস্ট নিয়েও কেয়ার অনেক অপত্তি ছিল !
আমি রেগে গেলে এমন কথা বলতাম, যেগুলো বলা উচিত ছিল না। পরে অনুতপ্ত হতাম, ক্ষমা চাইতাম। কেয়া ক্ষমা করত, কিন্তু তার চোখে একটা ভয় থেকে যেত।
আমি চেষ্টা করেছিলাম। সত্যিই করেছিলাম। সিগারেট কমিয়েছিলাম। তার কথা ভেবে কিছু গান বদলেছিলাম।
কিন্তু পরিবর্তনেরও একটা অদ্ভুত সমস্যা আছে। যে মানুষ বদলায়, সে জানে কতটা চেষ্টা করে বদলেছে। যে মানুষ তাকে ভালোবাসে, সে শুধু দেখে—সে এখনও কতটা বদলায়নি।
কেয়া আমার চেষ্টা দেখত। তবু সন্দেহ করত।
“তুমি কি সত্যিই আমার সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাও?” একদিন সে জিজ্ঞেস করেছিল।
আমি বলেছিলাম, “চাই।”
“তাহলে আমাদের এত অমিল কেন?”
আমি পুকুরের পানির দিকে তাকিয়েছিলাম। বাতাসে পানি কাঁপছিল।
“হয়তো আমরা একে অপরকে ভালোবাসার জন্যই আলাদা।”
কেয়া মাথা নাড়ল।
“ভালোবাসা সবকিছু ঠিক করে দেয় না।”
সেদিন প্রথমবার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথাটাও কখনো কখনো যথেষ্ট হয় না।

গ্র্যাজুয়েশনের সময় কাছে আসতে লাগল। ক্যাম্পাসের পরিচিত গাছগুলো একই রকম রইল, কিন্তু আমাদের দিনগুলো বদলে গেল। সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত—চাকরি, পরিবার, বিদেশ, বিয়ে, দায়িত্ব।
আমরা কথা বলতাম—কীভাবে একসঙ্গে থাকব।
প্রশ্নটা সহজ ছিল না।
কেয়া চাইত একটা শান্ত জীবন। এমন একটা ঘর, যেখানে সন্ধ্যায় আলো জ্বলবে, কেউ অপেক্ষা করবে, বিপদে প্রার্থনা করা যাবে। আমি চাইতাম স্বাধীনতা, নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা, এমন একটা জীবন যেখানে আমাকে প্রতিটি বিশ্বাসের সামনে মাথা নত করতে হবে না।
আমি কেয়াকে বদলাতে চাইনি। কিন্তু ভয় পেতাম, একদিন সে আমাকে এমন একজন মানুষ বানাতে চাইবে, যাকে আমি নিজেই চিনতে পারব না।
কেয়া হয়তো একই ভয় পেত—যে মানুষটাকে সে ভালোবাসে, সে একদিন তার সমস্ত কোমলতা নিয়ে চলে যাবে, শুধু রেখে যাবে কিছু পুরোনো গান আর অসমাপ্ত কবিতা।

শেষ সেমিস্টারের এক বিকেলে আমরা সেই পুকুরপাড়ে বসেছিলাম, যেখানে একসময় চায়ে চিনি নিয়ে আমাদের তর্ক হয়েছিল।
সূর্য ডুবছিল। পুকুরের পানিতে কমলা আলো। দূরে কয়েকজন ছাত্র ছবি তুলছিল। বটগাছের নিচে একটা শুকনো পাতা বাতাসে গড়িয়ে গেল।
কেয়া বলল, “তোমার কি মনে হয়, আমরা পারব?”
আমি তার হাত ধরলাম। হাতটা ঠান্ডা ছিল।
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না, কেয়া।”
কেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি চাই, তুমি আমার পাশে থাকো। কিন্তু এমনভাবে, যেন তোমাকে তোমার নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না হয়।”
আমি হাসার চেষ্টা করলাম।
“তুমি জানো, তোমার সঙ্গে প্রেম করা খুব কঠিন।”
সে মৃদু হাসল।
“তুমি নিজেও তো খুব সহজ মানুষ নও।”
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম। সেই হাসিতে আগের দিনের মতো নিশ্চিন্ততা ছিল না, কিন্তু ভালোবাসা ছিল।
আকাশ আরও অন্ধকার হলো।
আমাদের সামনে দুটো পথ ছিল। একটায় পাশাপাশি হাঁটার প্রতিশ্রুতি, অন্যটায় আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয়। কোনো পথেই নিশ্চয়তা ছিল না।
কেয়া আমার কাঁধে মাথা রাখল।
আমি তার চুলের গন্ধ পেলাম। দূরে মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে এল। আমার ভেতরে কোনো বিশ্বাস জন্মাল না, কোনো অবিশ্বাসও জিতল না। শুধু মনে হলো, এই মুহূর্তটা যেন শেষ না হয়।
আমি জানতাম না, এই মেয়েটা একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হবে, নাকি সেই স্মৃতি হবে যার কাছে ফিরে যেতে গিয়ে সারাজীবন নিজের ভেতর পথ হারাব।
জানতাম না, আমরা বিয়ে করব কি না। এক শহরে থাকব কি না। আমাদের বিশ্বাসগুলো একদিন পাশাপাশি বসতে শিখবে কি না।
শুধু জানতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শেষ বিকেলে আমি পৃথিবীকে আর ঘৃণা করতে পারছিলাম না।
কারণ পৃথিবী আমাকে কেয়াকে দিয়েছিল।
আর কেয়া আমাকে এমন এক দুঃখ দিয়েছিল, যা হারিয়ে ফেলতেও ভয় লাগত।

সন্ধ্যা নামার পর আমরা উঠে দাঁড়ালাম। কেয়া ব্যাগ কাঁধে নিল। আমি তার সঙ্গে গেট পর্যন্ত হাঁটলাম।
গেটের কাছে এসে সে বলল, “কাল দেখা হবে?”
আমি বললাম, “হবে।”

কেয়া চলে গেল।
আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। পকেটে ফোন কাঁপছিল। হেডফোনে Hypnogaja-এর Here Comes The Rain Again বাজছিল।
গানটা থামিয়ে দিলাম না।
সেদিন রাতে হোস্টেলে ফিরে পুরোনো ডাইরি খুললাম। অনেকদিন আগে লেখা কবিতা চোখে পড়ল।
ডাইরি পাতায় লিখলাম—
আমার পৃথিবী,
যেখানে সূর্য ওঠে, অথচ সকাল আসে না।
যেখানে আলোর প্রতিটি কণা বয়ে বেড়ায় মৃত নক্ষত্রের দীর্ঘশ্বাস,
আর সময়—
নিজের অস্তিত্ব ভুলে অনন্ত শূন্যতার বুকে ঘুমায়।


কলম থামিয়ে দিলাম।
আমি আর মুক্তি চাই না।
চাই না স্বর্গের প্রতিশ্রুতি,
চাই না অমরত্বের অভিশাপ।
শুধু একবার তোমার হাত ধরে হাঁটতে চাই মৃত নক্ষত্রের ধুলোর ওপর,
যেখানে সময়ের কোনো অধিকার নেই,
যেখানে ঈশ্বরও নীরব দর্শক।


জানালার বাইরে রাত গভীর হচ্ছিল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। আমার হেডফোনে গিটার চিৎকার করছিল, যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেউ নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাইছে।
আমি কেয়াকে ভালোবাসতাম।
কিন্তু ভালোবাসা কি একই পথে হাঁটার নাম? নাকি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকেও একে অপরের অজানা মহাবিশ্বকে মেনে নেওয়ার নাম?
আমি উত্তর জানতাম না।
হয়তো কোনোদিন জানবও না।
শুধু জানতাম, আমার অন্ধকারের মধ্যে কেয়া একটা জানালা খুলে দিয়েছিল। সেই জানালা দিয়ে আলো ঢুকেছিল কি না, তা নিয়ে আমরা দুজন হয়তো কোনোদিন একমত হতে পারব না।
কিন্তু জানালাটা ছিল।
তার হাসিটা ছিল।
পুকুরপাড়ের বিকেলগুলো ছিল।
পহেলা ফাল্গুনের সেই হলুদ শাড়ি ছিল।
আর ছিল একটা প্রতিশ্রুতি—যা আমরা দুজনেই সত্যি করে দিয়েছিলাম, অথচ ভবিষ্যৎকে বাধ্য করতে পারিনি তা পূরণ করতে।
শেষ রাতে কবিতার নিচে আরও কয়েকটি লাইন লিখলাম—
তোমার নীহারিকার চারপাশে কে যেন বেঁধে রেখেছে আমার অস্তিত্ব।
অথচ তুমি জানবে,
এই অনন্ত মহাশূন্যের কোথাও একটি হৃদয় এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করে।
যেখানে সূর্য প্রতিদিন উদয় হয়, অথচ অন্ধকার কখনো শেষ হয় না।
যেখানে ভালোবাসা সত্য, অথচ সেই সত্য তোমার কাছে অবাস্তব , আলীক কল্পনা ।


কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়।
কিছু ভালোবাসা শেষ হওয়ার আগেই স্মৃতি হয়ে ওঠে।
আর কিছু ভালোবাসা—একটা পুরোনোর গানের মতো—বছর পেরিয়ে, শহর বদলে, মানুষ বদলে যাওয়ার পরও হঠাৎ কোনো রাতে মনে মনে গুনগুনিয়ে ওঠে।
তখন মনে হয়, কেউ একজন এখনও পুকুরপাড়ে বসে আছে। হলুদ শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে। সে হাসছে।
আর কালো টি-শার্ট পরা একটা ছেলে, যার পৃথিবীতে একসময় আলো বলে কিছু ছিল না, চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে জানে না, মেয়েটা তার হবে কি না।
শুধু জানে—
সেই এক বিকেলে, পৃথিবীটা তার কাছে সুন্দর হয়েছিল।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৩

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: মানুষের ভালোবাসাকেও সন্দেহ করতাম।
...................................................................
মানুষের মন হলো ভালবাসার আধার, তাকে লালন না
করতে পারলে জীবনটা বৃথা ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.