| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ফজলে রাব্বী হৃদয়
সত্য নিয়ে মাথা ঘামাই না। মুক্তি চাই মুক্তি।
আমাদের দেশে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট লোকেরা নিজেদের মত করে কিছু স্ক্রিপ্ট গুছিয়ে নিয়েছেন। কেন দেশের চলচ্চিত্রের এই হাল-বেহাল অবস্থা এ বিষয়ে বলতে গেলে স্ক্রিপ্টের বাইরে কিছুই বলতে চান না। পরিচালকরা বলেন, ভালো প্রযোজক এর অভাব; গল্পকার রা বলেন ভালো নির্দেশকের অভাব; প্রযোজক রা বলেন, হল নেই, ব্যবসা খারাপ; আর অভিনেতারা পুরো সিস্টেমের উপর দোষ চাপিয়ে পার পেতে চান না। সবাই আসল গলদটা ঠিক কোথায়, তা জেনেও যেন এড়িয়ে যান। তাই একটু ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম।
'আমাদের' ইতিহাস :
আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের সমৃদ্ধ কোনো ইতিহাস নেই। কথাটা শোনার পর হয়ত আপনি আমাকে ভুল প্রমাণ করবার জন্যে ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, সত্যজিত রায় সহ আরো কয়েকটা নাম আওড়াবেন। তবে সমস্যাটা হচ্ছে তারা কেউই কিন্তু বাংলাদেশের সম্পদ নয়। হ্যা, বাংলা সিনেমায় তাদের অবদান অস্বীকার কোনো উপায় নেই। কিন্তু যখন প্রশ্ন টা বাংলাদেশ নিয়ে, তখন তো কিছুটা স্বার্থপর হতেই হয়। বাংলাদেশী সিনেমায় প্রবাদপুরুষ হিসেবে কাউকে অধিষ্ঠিত করতে চাইলে জহির রায়হান, তারেক মাসুদের পর আরেকটি নাম খুঁজে বের করা সত্যিই কষ্টসাধ্য কাজ।
পথ টা সংগ্রামের :
তারেক মাসুদ। তাঁর সৃষ্টি ' মাটির ময়না' দেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে 'কান' উৎসবে প্রদর্শিত হবার সুযোগ পায়। অথচ এই ছবিটি দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পৌছে দেয়ার জন্যে তিনি প্রজেক্টর কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সিনেমা হল ভেঙে শপিং মল উঠছে, বিদেশী ছবির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, মেধাবী দের হচ্ছে না সঠিক মূল্যায়ন, সর্বস্তরে বাড়ছে নকলের প্রবণতা, নগর পরিকল্পনায় নেই পেক্ষাগৃহ নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা। পথটা সত্যিই সংগ্রামের। নতুন যারা আসছে, পথের শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে।আর সাথে নিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। যে অভিজ্ঞতাগুলো তাদের সিনেমাওয়ালা হওয়ার স্বপ্নের মাঝে অট্টহাসি দিয়ে যায়।
উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র :
আমরা।এই ভারতীয় উপমহাদেশে যাদের বসবাস, তারা অভ্যাসগত ভাবেই একটু বেশীই বিনোদন প্রেমী। আমরা বিনোদন সহজে না জুটলে তা পাবার তাগিদে নানা মাধ্যমের খোঁজ করতে থাকি। তবুও বিনোদন আমাদের লাগবেই। আর এই বিনোদনের অনেক বড় একটা অংশের যোগান দেয় ভারতীয় চলচ্চিত্র। ভারতীয় পরিচালকগণ যখন বাস্তবিকতার তোয়াক্কা না করে একের পর এক ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা শুরু করলেন এবং সেগুলো যথেষ্ট ব্যবসাসফল হওয়া শুরু করল, তখন এই ফ্যান্টাসি ছবি ই হয়ে উঠল ভারতীয় সংস্কৃতি। আর এখন এই ভারতীয় ফ্যান্টাসি ছবিগুলোই পুরো পৃথিবীতে ইউনিক এক অার্ট ফর্ম হিসেবে ওয়েল রিকোগনাইজড।
চলচ্চিত্র তার নিজস্ব একটি ভাষায় কথা বলে। প্রশ্ন উঠতে পারে চলচ্চিত্রের ভাষা কি? কঠিন কোনো উদাহরণ দিচ্ছি না। সহজে ভেঙে বলি। ধরুন একটা মানুষ যে মোটামুটি সব ভাষার চলচ্চিত্রই দেখে, তার সামনে চার জাতির চারটি ;একটি আমেরিকান ফিল্ম, একটি ইরানি ফিল্ম, একটি ভারতীয় ফিল্ম আর একটি কোরিয়ান ফিল্ম চালিয়ে দেয়া হল। সে না জানার পরও ফিল্ম দেখা শেষে বলে দিতে পারবে কোনটা কোন দেশের ছিল। কেন পারবে? কারণ এই প্রত্যেকটি দেশই তাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের নিজস্ব একটি ভাষা তৈরী করতে পেরেছে। যে ওই ভাষা জানে সেই কেবল ছবিটি পড়তে পারবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের এই ভাষা আমরা আজ অব্দি তৈরী করতে পারি নি। আমাদের যে সকল পরিচালকগণ উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রত হয়েছিলেন, তাদের প্রায় সবাই ব্যবসায়িক ধাক্কা খেয়েছেন। এখন কেন এই ব্যবসায়িক ধাক্কার স্বীকার হতে হল, তা একটু পরিষ্কার ভাবে জানা যাক।
বিকল্প ধারার কিছু ছবির উদাহরণ বাদ দিলে, অনেক আগে থেকেই আমরা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে আদর্শ মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছি। সে দিক বিবেচনা করলে আমাদের চলচ্চিত্রের যে ধরণ ও গড়ণ তা ভারতীয় চলচ্চিত্র থেকে আলাদা করার উপায় নেই। গল্প, গানের সুর, ফাইটিং প্রায় সব ই ছিল সেখান থেকে ধার করা। বিশেষ করে আশির থেকে নব্বই এর দশকে যখন অতি মাত্রায় ভারতীয় সংস্কৃতি এদেশে দানা বাধতে শুরু করে তখন নকলের প্রবণতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এবং অনেক বছর ধরে এই নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ চর্চা চলতে চলতে একটা পর্যায়ে দেশীয় চলচ্চিত্র মেধাশূন্য হয়ে পড়ে এবং সৃজনশীলতার সংকট দেখা দেয়। তাই দর্শকেরাও একটা সময় এই একঘেয়েমিতার জন্যে দেশীয় চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং ঠিক সেই সময়টাতেই এদেশের মানুষ ডিস নেটওয়ার্কের সুবিধা পেতে শুরু যা দেশীয় চলচ্চিত্রকে রীতিমত পংগু করে ছাড়ে। এর পরে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার সেই কালো অধ্যায় গুলো আমেদের সকলেরই জানা।এখন পর্যন্তও আমাদের চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াতে পারে নি। আর এই ঘুরে না দাঁড়াতে পারার অন্যতম একটি কারণ রুচিবোধ। আশি কিংবা নব্বই দশকে মাল মসলা দিয়ে তৈরী সেই ফ্যান্টাসি ছবিগুলোর দর্শক এখনো আমাদের সমজে অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে রয়ে গেছে। সেই গড়নের ছবি তৈরী করলে নতুন জেনারেশন তা গ্রহণ করে না, আবার নতুন দের কথা মাথায় রেখে ছবি বানালে বড় একটা দর্শক অংশ হাতছাড়া করতে হয়। সুতরাং এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে ব্যবসায়িক ধাক্কা খেতেই হবে। তা আপনি যে স্টাইলেই বানান না কেন।
অনেক বছর আগে ঋত্বিক ঘটক তাঁর 'তিতাস একটি নদীর নাম' ছবির শ্যুটিং এর কাজে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখন তিনি এদেশের চলচ্চিত্রকার দের সমস্যাটা ঠিকিই ধরতে পেরেছিলেন। তাই দেশ ছেড়ে যাবার আগে বলে গেলেন,
'' First establish a library, do study then start making"
©somewhere in net ltd.