| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ফজলে রাব্বী হৃদয়
সত্য নিয়ে মাথা ঘামাই না। মুক্তি চাই মুক্তি।
ষোড়শ শতাব্দীর পৃথিবীতে সোলায়মান ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী সুলতান। তিনি ওসমানীয় সালতানাতের দশম এবং সবচেয়ে দীর্ঘকালব্যাপী শাসনরত সুলতান, যিনি প্রাচ্যে “আল কানুনি বা আইন প্রণেতা” এবং প্রাতীচ্যে “মহামতি” নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালকে (১৫২০-৬৬) ওসমানীয় সালতানাতের স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের প্রায় ৮০০০ মেইল অঞ্চল জুড়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, যার বিস্তৃতি ছিল ভিয়েনা থেকে আরব উপদ্বীপ পর্যন্ত। বিশাল রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি কলা, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছিলেন। একজন দক্ষ প্রশাসক ও সমরনেতার পাশাপাশি তিনি একজন কবিও ছিলেন। তিনি জীবদ্দশায় প্রায় ২০০ কবিতা ও গজল লিখেছিলেন। তাঁর কবিতাগুলোর মধ্যে বিখ্যাত “আমার সুলতান মুহাম্মদ”, “মুহিব্বি বা প্রিয়তমা”। তিনি আরবী, তুর্কি ও পার্সীয় সাহিত্যে বিবিধ জ্ঞান রাখতেন। প্রাচ্যে আইন প্রণেতা হিসেবে তাঁর যে খেতাব তাঁর কারণ ছিল কুরআনের আইন এবং ইসলামী অনুশাসনের ভিত্তিতে সুলতানী আইনের প্রচলন করেছিলেন, যদিও দ্বিতীয় মোহাম্মদের সময় থেকেই এই আইন প্রচলিত হয়ে আসছিল কিন্তু সোলায়মান তা কানুন আকারে লিপিবদ্ধ করেছিলেন । প্রাতীচ্যে তিনি মহামতি হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন তাঁর ব্যাক্তিত্ব, চারিত্রিক দৃঢ়তা, মহানুভবতা, যোগ্যতা এবং সমকালীন বিশ্বে তাঁর অবস্থান ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে।
সোলায়মানের দৈহিক বিবরণ :
পিতার মৃত্যুর পর ২৬ বছর বয়সে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ সময়ে তাঁকে দেখা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মতে, “তিনি লম্বা, মাংশপেশী বহুল, সুন্দর গায়ের রঙ। তাঁর ঘাড় লম্বা, বদন সুশ্রী, চোখা নাক, সন্তুষ্টচিত্ত, গায়ের চামড়া কোমল। তাঁকে বলা হয়েছিল জ্ঞানী সুলতান, অধ্যয়ণ প্রিয় ,এবং সকল প্রজা আশা করেছিল তাঁর শাসনে ভালো কিছু পাবে।
সোলায়মানী শাসন :
সোলায়মান তাঁর ৪৬ বছরের রাজত্বকালের ১০ বছর ৩ মাস যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ১৩ টি সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন। ১৫২১ সালে বেলগ্রেড ও দেমাস্কাস, ১৫২২ সালে রোডস, ১৫২৪ সালে ইয়েদসান এসব অভিযানের মাধ্যমে সোলায়মান ইউরোপে ভিতীর সঞ্চার করেন।
১৫২৯ সালে সোলায়মান ভিয়েনা অবরোধ করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। ১৫৩৪ সালে তিনি কুর্দিস্থান ও তাব্রিজ দখল করেন। উত্তর আফ্রিকায় এসময় সোলায়মানের সেনারা আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, বার্কা, ত্রিপলি বিজয় সম্পন্ন করেন। ১৫৩৭ থেকে ৪০ পোপের নেতৃত্বাধীন পবিত্র সংঘ সোলায়মানের নৌ সেনাপতি খায়েরুদ্দীনের নিকট জলযুদ্ধে পরাজিত হয়, এভাবে ভেনিস সোলায়মানের হস্তগত হয়। ১৫৪৩ সালে রোমান সম্রাট ৫ম চার্লস ও আর্ক ডিউক ফার্ডিনান্ডকে ধরাসায়ী করার উদ্দেশ্যে সোলায়মান আবারো হাঙ্গেরী আক্রমণ করেন। ১৫৪৭ সালে আদ্রিয়ানোপলের সন্ধির মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ হয়। সোলায়মানের হাঙ্গেরী বিজয় সম্পন্ন হয় তবে ফার্ডিনান্ডকে বাৎসরিক ৩০,০০০ ফ্লোরিন্স প্রদানের বিনিময়ে হাঙ্গেরীর উত্তর-পশ্চিম অংশ শাসন করতে দেন। এই সন্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এই চুক্তিতে সোলায়মান ৫ম চার্লসকে রোমান সম্রাট হিসেবে স্বাক্ষরের পরীবর্তে স্পেনের রাজা হিসেবে স্বাক্ষর করান এবং নিজে রোমের সীজার হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
সোলায়মান ভারত মহাসাগর থেকে পর্তুগীজ আধিপত্যও বিলোপ করতে চান। এ উদ্দেশ্যে ১৫৪৮ সালে তুর্কিরা ইয়েমেন, এডেন ও লোহিত সাগরের দক্ষিণাংশ হস্তগত করে। তবে ভারত মহাসাগর থেকে পর্তুগীজদের বিতাড়িত করতে তিনি সক্ষম হননি। ১৫৫৩ থেকে ৫৫ এর মধ্যে সোলায়মান আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ও ইরজুরুম অধিকার করেন। ১৫৬৬ সালে সোলায়মান হাঙ্গেরীকে পরিপূর্ণভাবে শায়েস্তা করার নিমিত্তে ৭ম বারের মত হাঙ্গেরী আক্রমণ করেন এবং জিতেগভার দূর্গ অবরোধ করেন কিন্তু তাঁর সেনারা দূর্গ দখল করার পূর্বেই সোলায়মান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পুত্র ২য় সেলিম সিংহাসনে বসার পূর্ব পর্যন্ত সোলায়মানের মৃত্যু সংবাদ গোপন রাখা হয়।
সাম্রাজ্যের পতন :
১৮৩৯ থেকে অটোমানরা বাধ্য হয়ে সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। তাঞ্জিমাত ও এর ধারাবাহিকতায় ‘ইসলাহাত নামে দিন বদল শুরু হয়। বিধর্মী ও মুসলিমদের সামাজিক অবস্থান সমান করা হয়, বিধর্মী ও মুসলিমদের ট্যাক্স সমান করা হয়।
অটোমান শাসকগোষ্ঠী থেকেই প্রতিরোধ তৈরি হয়। গঠিত হয় তরুণ তুর্কি গুপ্ত সংগঠন। যারা ১৯০৮ সালে সফল বিদ্রোহের মাধ্যমে সুলতানকে একপ্রকার পুতুলে পরিণত করে এবং অটোমান সাম্রাজ্যে সুলতানী শাসনের ইতি ঘটায়। সংসদ কার্যকর করে নিজেরা আড়ালে থেকে সাম্রাজ্যের পতনের আগ পর্যন্ত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ করে। তরুণ তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে দুর্বল অটোমান ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ততদিনে বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে গেছে। দিকে দিকে বিদ্রোহ এবং রাশিয়া ও ইউরোপিয়ান শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে এবং অটোমান হারছে!
এদিকে সাম্রাজ্যের প্রতিপক্ষ রূপে তুর্কির নিজস্ব জাতীয়তাবাদও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সাম্রাজ্যের আনাতোলিয়া অংশটুকু কেন্দ্র করে। এমন সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে, অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির সঙ্গে চুক্তি করে। এবং নির্দিষ্ট সময়ে যুদ্ধে যোগদিয়ে পরাজিত হয়।
যুদ্ধের মাঝেই অটোমানের আরব অঞ্চলগুলো বিদ্রোহ করে বসে এবং সবশেষে পরাজিত অটোমান তাদের সাম্রাজ্য সম্পূর্ণভাবে হারায়। ১৯১৯ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে কঠিন যুদ্ধে জয়ী হয়ে শেষপর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র আনাতোলিয়া বাঁচাতে সক্ষম হয়! যে অংশটুকুই এখন তুরস্ক নামে বেঁচে আছে।
©somewhere in net ltd.