| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাড্ডা
নাম:- ইকবাল জিল্লুল মজিদপেশা:- চাকুরী ও চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িতহবি:- সমাজ উন্নয়ন মূলক কাজে নিয়মিত অংশ নেওয়া, প্রতিদিন কিছু বিষয় ভিত্তিক লিখা,নিয়মীত মেডিটেশন করা
রমজানের দীর্ঘ সাধনা, সংযম, তাওবা ও ইস্তিগফারের ধারাবাহিক অনুশীলনের এক মহিমান্বিত পরিণতি হলো লাইলাতুল কদর। এটি এমন এক রাত, যা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি সময়ের সীমা ভেঙে দেওয়া এক আধ্যাত্মিক বিস্ময়। আল্লাহ তাআলা আল কুরআন-এ ঘোষণা করেছেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (৯৭:৩)। অর্থাৎ একটি রাত এমন মূল্যবান হতে পারে, যা প্রায় একটি পূর্ণ জীবনের ইবাদতের সমান মর্যাদা বহন করে।
লাইলাতুল কদর সেই পবিত্র সময়, যখন গাফেল হৃদয় জেগে উঠতে পারে, পাপভারাক্রান্ত আত্মা হালকা হয়ে যেতে পারে, এবং ভেঙে পড়া মন আল্লাহর রহমতের স্পর্শে নতুন আলো খুঁজে পেতে পারে। এটি এমন এক রাত, যখন মানুষ নিজের অতীত ভুলের ভার নামিয়ে রেখে ভবিষ্যতের জন্য নতুন অঙ্গীকার করতে পারে।
এই রাতের গুরুত্বের মূলে রয়েছে কুরআনের অবতরণ। আল্লাহ এই রাতকে কুরআনের সূচনার সাথে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ মানবজাতির জন্য যে আলোর দিশা নাযিল হয়েছে, তার সূচনা এই রাতেই। তাই লাইলাতুল কদর কেবল রহমতের রাত নয়; এটি হেদায়াতের রাত, চেতনার রাত, আত্মজাগরণের রাত।
এই রাতকে ‘কদর’ বলা হয় যার অর্থ মর্যাদা, পরিমাপ বা নির্ধারণ। এটি এমন এক রাত, যখন বান্দার জীবনের নতুন সিদ্ধান্ত, নতুন প্রার্থনা ও নতুন সংকল্প আসমানে পৌঁছে যায়। এই রাতের বিশেষত্ব হলো এটি নীরব, শান্ত ও গভীর। বাহ্যিক কোলাহল থেমে যায়, আর অন্তরের দরজা খুলে যায়।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে দাঁড়ায়, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” সহিহ বুখারি। এখানে ‘দাঁড়ানো’ মানে কেবল নামাজে দাঁড়ানো নয়; বরং অন্তরের জাগরণ, কান্না, দোয়া ও আত্মসমর্পণ।
লাইলাতুল কদরের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো এটি নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। কেন? কারণ আল্লাহ চান বান্দা খোঁজ করুক। শেষ দশ রাত জেগে থাকুক, প্রার্থনা করুক, নিজের অন্তর পরখ করুক। এই অনুসন্ধান নিজেই একটি পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া। প্রতিটি রাত তখন সম্ভাবনার রাত হয়ে ওঠে।
এই রাতে সবচেয়ে প্রিয় দোয়া হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।” হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করুন। এই দোয়া কেবল শব্দ নয়; এটি এক ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ। যখন এই আর্তি সত্যিকারের অনুতাপ থেকে উঠে আসে, তখন হৃদয়ের অন্ধকার ধীরে ধীরে আলোয় রূপান্তরিত হয়।
লাইলাতুল কদর আমাদের শেখায় আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। একটি রাতই যথেষ্ট, যদি সেই রাত সত্যিকারভাবে জেগে থাকা যায়। একটি কান্নাই যথেষ্ট, যদি তা আন্তরিক হয়। একটি দোয়াই যথেষ্ট, যদি তা অন্তরের গভীরতা থেকে আসে।
রমজান পুরো মাস জুড়ে আমাদের প্রস্তুত করে সংযম শেখায়, আত্মসমালোচনা শেখায়, নম্রতা শেখায়। আর লাইলাতুল কদর সেই প্রস্তুতির চূড়ান্ত পরীক্ষা ও পুরস্কার। এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন মানুষ অনুভব করে সে একা নয়; তার রব তার খুব কাছেই আছেন।
লাইলাতুল কদর তাই কেবল একটি রাত নয়; এটি আত্মার আলোকিত হওয়ার সন্ধিক্ষণ। এটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে পা বাড়ানোর সাহস। এটি অতীতের ভুল মুছে দিয়ে ভবিষ্যতের নতুন পথচলা শুরু করার সুযোগ।
আসুন, আমরা এই রাতকে কেবল অপেক্ষার বিষয় না বানাই; আমরা এমন অন্তর তৈরি করি, যা লাইলাতুল কদরের আলো ধারণ করতে পারে। কারণ যে হৃদয় সত্যিকারভাবে জেগে ওঠে, তার জন্য প্রতিটি রাতই হতে পারে আলোর সূচনা।
©somewhere in net ltd.