নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ট্র্যাভেলার

জিয়াউল হক শোভন

ঘুরতে পছন্দ করি। ঘুরাই আমার জীবন

জিয়াউল হক শোভন › বিস্তারিত পোস্টঃ

নাফাকুমের পথে

৩০ শে জুলাই, ২০১৩ রাত ১২:৫৪

ভিক্টোরিয়া ফলস বা নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মতো এতো বড় জলপ্রপাত হয়তো আমাদের নেই, কিন্তূ বান্দরবানের গভীরে যেসব জলপ্রপাত আছে, আকার এবং আকৃতিতে সেগুলো একেবারে ফেলনা নয়। বর্ষার মৌসুমে প্রচণ্ড পাহাড়ি পানির স্রোতে সেগুলোতে যাওয়াটাই এক কথায় অসম্ভব। সেই নাফাকুম জলপ্রপাতের পথে রওনা দিয়েছিলাম আমরা তিনজনঃ আমি,রনি ভাই আর সম্রাট ভাই। যদিও সেবারের সেই বান্দরবান ট্রিপের আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, কিন্তূ ফেরার পথে নাফাকুম দেখে আসতে আমাদের ভুল হয়নি।

সময়টা ছিল ২০১১ সালের অক্টোবর মাস। ঢাকা থেকে রাতের বাসে করে বান্দরবান শহর, অতঃপর পরদিন ভোরে লোকাল বাসে করে থানচির পথে রওনা। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির পরশ আমরা পাচ্ছিলাম। থানচি পৌঁছে একজন লোকাল গাইড ঠিক করলাম, তার নাম লালমুন বম। যদিও এখন বান্দরবানে বাঙালি এবং গাইডদের অনেক সমিতি হয়েছে, কিন্তূ একটা সময়ে যখন টুরিস্টরা এদিকে কম আসতো, তখন এসব কিছুই ছিলনা। গাইড ঠিক করে এবার নৌকা ঠিক করার পালা। আগে এই সাঙ্গু নদীতে ইঞ্জিন ছাড়া নৌকা চলত, কিন্তূ টুরিস্ট আগমন বেড়ে যাওয়ায় এখন ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলে। নৌকা এবং মাঝি ঠিক হলে আমাদের যাত্রা শুরু হল রেমাক্রির উদ্দেশ্যে। রেমাক্রি হচ্ছে থানচি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। পাহাড়ের সারি ধরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী, চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই সুন্দর। কিন্তূ ইঞ্জিন নৌকার একটানা শব্দে এসব কিছুই আমরা উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। পথিমধ্যে একবার নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হলো। একসময় নিরাপদেই আমরা রেমাক্রি পৌঁছলাম। কিন্তূ পথে আমাদের পাড়ি দিতে হলো পাহাড়ি নদীর দারুন বিপরীতমুখী স্রোত। যদিও পুরো রাস্তায় আমরা আফসোস করছিলাম কেন আমরা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় উঠলাম, কিন্তূ স্রোতের এই চেহারা দেখে আমরা অনুধাবন করলাম,অন্তত এই ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। অথচ শীতের সময় যখন নদী একদম শুকিয়ে যায়, তখন নৌকা টেনেও নিয়ে যেতে হয়।

যাই হোক, রেমাক্রি পৌঁছে প্রথমেই আমরা চলে গেলাম রেমাক্রি বাজারে। এখানে বিজিবির বেশ বড় একটি ক্যাম্প আছে। এছাড়া টুরিস্টদের জন্য আছে কটেজ এবং আদিবাসীদের দোকান। এগুলো ভাড়া নিয়ে রাত্রিযাপন করা যায়। আমাদের সাথে তাঁবু থাকার দরুন আমরা আর এসব ঝামেলায় গেলাম না।

রেমাক্রি এসেই শুনি আরেক নতুন নিয়ম। নাফাকুম যাওয়ার জন্য নাকি আলাদা গাইড নিতে হবে, আমাদের আগের গাইড যাবেনা। উপরন্তূ আমাদের গাইডের বক্তব্য, সে নাফাকুমের রাস্তা চিনেনা। শেষে বাধ্য হয়ে আমরা বিজিবির শরণাপন্ন হলাম। অবশেষে তাদের সহযোগিতায় আমাদের নৌকার মাঝি নাফাকুম যেতে রাজি হলো। যদিও এটা ছিল তার প্রথমবার নাফাকুম যাত্রা।

রেমাক্রি থেকে আট কিমি দূরেই নাফাকুমের অবস্থান। আসতে যেতে ষোল কিমি খুব বেশী কিছু মনে না হলেও রাস্তা এতোটা সোজা ছিলনা। রেমাক্রি খাল ধরে এই ট্রেইল চলে গেছে বহুদূর। পথে উঁচু নিচু বোল্ডার, বেশ কয়েকবার নদী পারাপার এবং ছোটো ছোটো কিছু পাহাড় তো আছেই। যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হছে হাঁটা,তাই আমরা সাথে করে কিছু শুকনো খাবার, গামছা এবং পানির বোতল নিয়ে নিলাম। শুরুতেই আমরা ছোটো ছোটো দুটো পাহাড় পেরোলাম। এরপর রেমাক্রি খাল ধরে উঁচু নিচু বন্ধুর পথে হাটতে থাকলাম। আমাদের বড় ব্যাকপ্যাকগুলো রেমাক্রি বাজারে রেখে এসেছি, তাই এদিক থেকে কিছুটা সাচ্ছন্দে হাটতে পারছিলাম। আদিবাসীরা খালের পানিতে গোসল করছিলো, কাপড় ধুচ্ছিল। এই পানি দিয়েই তারা তাদের গৃহস্থালি কাজকর্ম থেকে শুরু করে খাবার পানিরও প্রয়োজন মেটায়। পাহাড়ি এলাকায় পানির উৎসের বড় অভাব। ইতিমধ্যে আমাদের গাইড, নৌকার মাঝি পথ ভুল করল এবং আমরা ট্রেইলের উল্টোদিকে, খালের অপর পাড়ে চলে এসেছি। সামনে রাস্তা খুবই বাজে, পাহাড়ের গায়ে বের হয়ে থাকা পাথরের বোল্ডার ধরে এগোতে হবে। একবার পা পিছলালে নির্ঘাত মৃত্যু। আবার খালের পানিও এখানে বেশ গভীর এবং স্রোতও বেশী, ফলে অপর পাড়েও যাওয়া যাচ্ছেনা। বাধ্য হয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম এবং নিরাপদেই বোল্ডারগুলো পার হয়ে এলাম।

আবার হাঁটা শুরু করতে কিছুক্ষন পর আবিষ্কার করলাম, গাইডসহ আমরা দুইজন খালের এপারে চলে এসেছি, সম্রাট ভাই ওপারে রয়ে গেছেন। উনি সামনে হাঁটছিলেন, তাই আমাদের খাল পার হওয়াটা উনি লক্ষ্য করেননি। বাধ্য হয়েই সাঁতরে খাল পার হয়ে আমাদের পাড়ে চলে এলেন, কারন ওপারে আর সামনে রাস্তা ছিলনা। এখানে বলে রাখা দরকার, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ সাঁতারু না হলে স্রোতের মুখে এই ধরনের পাহাড়ি খাল পার হওয়া বিপদজনক। এই জন্যই ট্রেকিং এর সময় কখনো দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া উচিৎ নয়।

হাটতে হাটতে একসময় আমরা পানির গর্জন শুনতে পেলাম এবং একটু পরেই নাফাকুম এর দেখা পেলাম। পানির স্রোত বেশ ভালই ছিল, কারন সময়টা ছিলো বর্ষা এবং শীতের মাঝামাঝি। বর্ষার সময় এটা আরও ফুলে ফেঁপে উঠে এবং ওই সময় খালের পানিও বৃদ্ধি পায়। ফলে বর্ষা মৌসুমে এখানে যাওয়াটা সত্যিই বিপদজনক। উপরন্তূ হঠাৎ বৃষ্টিতে ফ্ল্যাশফ্লাড এর সম্ভাবনা তো রয়েছেই।

পাথরের উপর দিয়ে জলপ্রপাতের একদম উপর পর্যন্ত যাওয়া যায়। কিন্তূ পিচ্ছিল পাথরে খুব সাবধানে পা ফেলতে হয়। একবার পা পিছলালে স্রোতের টানে নিয়ে যাবে অনেকদূর এবং সেক্ষেত্রে বেঁচে ফেরার আশা খুব ক্ষীণ। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু চিপসের প্যাকেট এবং অন্যান্য আবর্জনা দেখলাম, যেগুলো পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাছাড়া এতো সুন্দর একটি পরিবেশে এই ধরনের আবর্জনা একদম বেমানান।

ইচ্ছে করছিলো আরও কিছুক্ষন থাকি, কিন্তূ সময় স্বল্পতার কারনে আমরা ফিরতি পথ ধরলাম। এবার আর আমরা রাস্তা ভুল করিনি। রেমাক্রি বাজার পৌঁছে বাজার থেকে একটু দূরে আমরা রাতের জন্য তাঁবু টাঙালাম । রাতে তিনজন মিলে আড্ডা দিলাম বিজিবি ক্যাম্প এর হেলিপ্যাডে এবং জ্যোৎস্নার আলোয় চারপাশের পাহাড়ি পরিবেশ আলোকিত হয়ে ছিল। অপূর্ব লাগছিল প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো।

পরদিন আবার নৌকা নিয়ে আমরা থানচি পৌঁছলাম। সেখান থেকে পরদিন সকালে বান্দরবান শহর, অতঃপর ঢাকা।

কিছু কথাঃ যদিও এখন অনেক টুরিস্টরা নাফাকুম, আমিয়াকুম থেকে শুরু করে রেমাক্রির বিভিন্ন অংশেই যায়, তারপরও কিছু জিনিস অবশ্যই মেনে চলা উচিৎ। গাইড অবশ্যই সাথে নিবেন এবং দরদাম আগেই ঠিক করে রাখুন। গাইড না থাকলে আর্মিরা আপনাকে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিবে না। গাইড সংক্রান্ত কোন সমস্যায় পড়লে আর্মি বা বিজিবি ক্যাম্পের শরণাপন্ন হতে পারেন। স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে ভালো ব্যাবহার করুন এবং তাদের আচার-আচরনকে সন্মানের চোখে দেখুন। ছবি তোলার ক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে তাদের ছবি তুলুন। হাঁটার সময় সাবধানে পা ফেলুন এবং সম্ভব হলে পিচ্ছিল স্থানগুলো এড়িয়ে চলুন। জরুরী ঔষধপত্র এবং ফার্স্ট-এইড অবশ্যই সাথে রাখুন। আর অবশ্যই পরিবেশের ক্ষতি করে এমন যেকোনো জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে অথবা নিজের সাথে করে নিয়ে আসুন।

কিভাবে যাবেনঃ ঢাকা থেকে বান্দরবানের সরাসরি বাস আছে। ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে থানচির উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ১৫০-২৫০ টাকা। থানচি বাজার থেকেই গাইড এবং নৌকা ভাড়া করতে পারবেন। গাইড কন্ট্যাক্টেও নিতে পরেন অথবা দিনপ্রতি ৫০০-৫৫০ টাকা। নৌকার ভাড়াও কন্ট্যাক্টে অথবা দিনপ্রতি ৫০০-৬০০ টাকা। তবে যদি কোন যাত্রীবাহী সার্ভিস নৌকা পেয়ে যান, সেক্ষেত্রে খরচ কিছুটা বেঁচে যাবে। খাবারের জন্য থানচি এবং রেমাক্রি বাজারে পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা আছে। ৮-১০ জনের একটি দল গেলে মোটামুটি জনপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকায় সব খরচ হয়ে যাবে।

ছবি দেখতে নিচের লিঙ্কে যেতে পারেন

http://somoysongbadbd.com/2013/07/17/17178

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.