নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ট্র্যাভেলার

জিয়াউল হক শোভন

ঘুরতে পছন্দ করি। ঘুরাই আমার জীবন

জিয়াউল হক শোভন › বিস্তারিত পোস্টঃ

চিনাইবিলের সন্ধানে

৩০ শে জুলাই, ২০১৩ বিকাল ৪:৫৬

ছবির হাট বসে বিকেলে আড্ডা দিচ্ছিলাম সবাই, এমন সময় জায়েদের ঘোষণা, “আগামীকাল সকালে ঢাকার বাইরে কোথাও থাকতে চাই”, “কোথায়”? আমাদের সবার প্রশ্ন? “সিরাজীবাজার”, জায়েদের ছোট্ট উত্তর। “সেটা আবার কোথায়”? ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে ছোট্ট একটি রেলওয়ে জাংশন, আশপাশে অনেক জঙ্গল এবং ছোটো ছোটো টীলা আছে। আগেরবার রেমা-কালেঙ্গা থেকে আসার পথে ওর নাকি চোখে পড়েছিল।

ব্যাস, নতুন একটি জায়গা দেখার লোভ আমাদের পেয়ে বসল। । তখনই ছবির হাট থেকে উঠে যার যার বাসায় রওনা হলাম রাতের ট্রেন ধরবো বলে। সেই সূত্র ধরেই গত ২০শে জুন চিনাইবিল থেকে ঘুরে আসলাম আমরা ৬ জন।

৯:৫০ এ ট্রেন, সবাই সময়মতো আসলেও সম্রাট ভাই আসতে পারল না, শাহবাগের জ্যামে সে আটকা পড়ে গেছে। কি আর করা, আমরা পাঁচ জন : আমি, ফাহিম, জায়েদ, শান্তুনু এবং ইমরান যথাসময়ে ট্রেনে উঠে পরলাম। সম্রাট ভাই ফোনে জানালো, সে বাসে রওনা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ট্রেনে বসে আমরা আবিষ্কার করলাম, জায়গাটার নাম আসলে শাহজীবাজার এবং ট্রেন এই জংশনে থামে না। কিছুদূর গিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে নামতে হবে। কি আর করা, রাত ৩:১০ এ ট্রেন আমাদের শায়েস্তাগঞ্জ নামিয়ে দিলো। ইতিমধ্যে সম্রাট ভাই পৌঁছে গেলেন। ভোরের আলো একটু ফুটে উঠলে আমরা একটা টেম্পু ঠিক করলাম শাহজীবাজার, ওয়াবদার মোড় পর্যন্ত। ছোটো ছোটো টীলার পাশ দিয়ে রাস্তাটা খুবই সুন্দর। ভোর ৫:২৪ এ আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্খিত শাহজীবাজার। এখানে সকালের নাস্তা করে একটু সামনে এগোতেই দেখলাম রেললাইনের সাথেই রয়েছে ৩৬০ আউলিয়ার ১ জন, হজরত শাহ্‌ সোলেমান ফতেহ আলী (রহঃ) এর মাজার।

ভোর ৭:২৪ এ আমরা হাটা শুরু করলাম মাজারের উলটো দিকের বাগানের রাস্তা ধরে। উঁচু-নিচু পাহাড়ী পথ এবং আগের রাতের বৃষ্টিতে জংলা জায়গায় জোঁক এবং সাপের ভয় থাকলেও আমরা হাটতে থাকলাম। ভোরের স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতায় এবং আশপাশের সবুজ পরিবেশে হাটতে বেশ ভালো লাগছিল। কিছুক্ষণ পর আমরা একটি বড় ইটের রাস্তায় পড়লাম। দুই পাশে জঙ্গল এবং বাগানের এই রাস্তায় এতো সকালে খুব কমই মানুষ দেখা যাচ্ছিল। এর ভিতরেই আমরা অনেক পাখি দেখতে পেলাম। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধে হাঁটার পর হঠাৎ ডানদিকে গাছের উপরে শব্দ শুনে দেখি বেশ কয়েকটি বন মোরগ। জঙ্গলের এই বাসিন্দারা এতো সকালে আমাদের দেখে হয়তো একটু বিরক্তই হয়েছে। আরও কিছুদূর হাটতেই বাগানের এক শ্রমিককে দেখতে পেলাম অনেকগুলো কাঠ পিঠে করে নিয়ে যাচ্ছে, তাঁর কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারলাম চিনাইবিলের কথা।

আসলে এই অঞ্চলটিতে মূলত অনেকগুলো বাগান আছে। এর মধ্যে রয়েছে টী-স্টেট, রাবার বাগান, ইউক্যালিপটাস বাগান ইত্যাদি। তার ভিতরে ক্ষণে ক্ষণে রয়েছে মানুষের বসতি। কিছুদূর সামনে এগোলেই আমরা পড়ব লালচান টী-স্টেট এর সীমানায়। লালচান টী-স্টেট বাংলাদেশের অনেক পুরনো একটি চা বাগান এবং এর উৎপাদিত অধিকাংশ চা পাতা রপ্তানি হয় যুক্তরাজ্য সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। প্রায় ২০০০ একর জায়গা জুড়ে এই টী-স্টেট অবস্থিত। এখানকার ম্যানেজারের নাম ইস্কান্দার হাসান চৌধুরী, ভদ্রলোক খুবই মিশুক। এই লালচান টী-স্টেট এর সীমানার মধ্যেই রয়েছে প্রাকৃতিক লেক, চিনাইবিল।

যাই হোক, হাটতে হাটতে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম লালচান টী-স্টেট এর ফ্যাক্টরিতে। এখানে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার আমরা হাটতে শুরু করলাম চিনাইবিল এর উদ্দেশ্যে।

আশপাশের পরিবেশ এবং মানুষের ব্যাবহার দেখে আমরা বুঝতে পারছিলাম, এখানে পর্যটকরা খুব একটা ঘুরতে আসে না। কিন্তূ প্রাকৃতিক পরিবেশের হিসেবে এই জায়গাটি আসলেই অনেক সুন্দর। এর মাঝে আমরা ছোট্ট একটি গ্রামে পৌঁছালে শুরু হোল তুমুল বৃষ্টি। সবাই ক্যামেরা বাঁচানোর জন্য পলিথিন প্যাক করতে ব্যাস্ত হয়ে পরলে আমি আর সম্রাট ভাই সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। তীব্র রোদের ভিতরে মুষলধারে বৃষ্টি, এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক খেলা। ছোট্ট একটি টীলার পাশ দিয়ে হাটতে হাটতে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম চিনাইবিলের পাড়ে। চারপাশে ছোটো ছোটো পাহাড় এবং এর মাঝখানে চিনাইবিল এর রূপ সত্যই অপূর্ব। একটি ছোটো বাঁধ তৈরি করে বিলের পানিকে সেচের জন্য ব্যাবহার করা হয়। শীতকালে এই বিলের পানিতে অনেক অতিথি পাখিও দেখা যায়।

আমরা গোসল করার জন্য বাঁধের পানিতে নেমে পড়লাম। প্রায় দুই ঘণ্টা পানিতে দাপাদাপি করে দুপুর ১২ টার দিকে আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবার যে পথে এসেছি সেই পথে না এসে সামনের দিকে হাটতে শুরু করলাম, “গুচ্ছগ্রাম” এর দিকে। সেখানে এসে আরেকটু সামনের দিকে হাটতেই দুপুর ১:৩০ এর দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম তেমুলিয়া বাজার। এখান থেকে টেম্পু এবং সিএনজি ছাড়ে শায়েস্তাগঞ্জ এর উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে লেকের আরও একটি শাখা চোখে পড়ল।

তেমুলিয়া বাজারে একটি ছোট্ট খাবারের হোটেলে বিশ্রাম নিলাম আমরা। সবাই ক্ষুধার্ত, কিন্তূ ভাতের কোন ব্যাবস্থা নেই। অতঃপর সিঙ্গারা, নিমকি এবং চা দিয়েই পেটপুজা করতে হোল। এরপর ব্যাকপ্যাক মাথায় দিয়ে সবার ক্লান্তি নেমে এলো ঘুমের রাজ্যে।

দুপুর ২:৩০ এর দিকে আমরা টেম্পু নিয়ে রওনা হলাম শায়েস্তাগঞ্জ এর উদ্দেশ্যে। রাস্তা খুবই বাজে। শায়েস্তাগঞ্জ নেমে ভাগ্যক্রমে ট্রেনের সীট পেয়ে গেলাম। যথারীতি ট্রেনের সীটে বসা মাত্র আবার ঘুম এবং একবারে ঢাকা।

কিভাবে যাবেন : চমৎকার একটি ডে-ট্রিপ এর জন্য চিনাইবিল হতে পারে উৎকৃষ্ট জায়গা। বিশেষ করে পাখি পর্যটকদের জন্য এটি আদর্শ। তবে অবশ্যই হাঁটার মানুষিকতা নিয়ে যেতে হবে। বাগানের ভিতরে কোন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই। কিছু শুকনো খাবার এবং পানি সাথে নিয়ে যাবেন। ম্যানেজারের অনুমতি সাপেক্ষে রাতে ক্যাম্পফায়ারও করা যাবে।

ঢাকা থেকে ট্রেনে অথবা বাসে করে চলে যাবেন শায়েস্তাগঞ্জ। সেখান থেকে টেম্পু বা সিএনজি নিয়ে শাহজীবাজার। উলটোভাবে তেমুলিয়া বাজার দিয়েও যেতে পারেন। তবে শাহজীবাজার যাওয়ার রাস্তাটা খুব সুন্দর। শাহজীবাজার নেমে বামের রাস্তা ধরে হাঁটলে একসময় একটি গেট পাবেন। সেটার ডান পাশ থেকেই জংলা ট্রেইল চলে গেছে বাগানের ভিতরে। বড় রাস্তায় পড়লে বাগানের যে কাউকে লালচান টী-স্টেট অথবা চিনাইবিল এর কথা জিজ্ঞেস করলেই রাস্তা দেখিয়ে দিবে। সবমিলিয়ে ৬/৭ জনের একটি দল ডে-ট্রিপ এর জন্য গেলে সবমিলিয়ে ৫০০-৬০০ টাকায় হয়ে যাবে। এ ছাড়াও অতিরিক্ত কোন তথ্যের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন : ০১৭৩৭৩৪৬৩০১

মনে রাখবেন, খাবারের প্যাকেট এবং পলিথিন জাতীয় জিনিস পরিবেশের ক্ষতি করে। তাই পলিথিন এবং যাবতীয় আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন, প্রয়োজনে নিজের সাথে করে নিয়ে আসুন। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর পরিবেশ উপহার দেয়া আমাদের সকলেরই দায়িত্ব।



ছবি দেখতে নিচের লিঙ্কে যেতে পারেনছবি দেখতে নিচের লিঙ্কে যেতে পারেন

http://somoysongbadbd.com/2013/07/09/16442

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.