নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

গয়না ও অলংকার (গাল-গল্প)

৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯


জাহানারা বেগমের স্বামী একজন সরকারি বড় কর্তা। চাকরির সুবাদে শহর বদল তাদের জীবনে নতুন কিছু নয়—কয়েক বছর পরপরই নতুন শহর, নতুন পাড়া, নতুন পরিচয়। তবে একটি জিনিস কোথাও বদলায় না—নিজের পরিবার, বংশ আর আভিজাত্য জাহির করার অভ্যাস। নতুন জায়গায় পা রেখেই আশপাশের মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া—তারা “সাধারণ” নন।

এবার বদলি হয়ে এসেছেন চট্টগ্রাম শহরে। অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, চারপাশে ভদ্র প্রতিবেশী। পাশের বাসাতেই থাকেন মহসিন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক সোহরাব উদ্দিন। এক বিকেলে সামাজিক সৌজন্য রক্ষার তাগিদে জাহানারা বেগম গেলেন প্রতিবেশীর বাসায় পরিচিত হতে।

অধ্যাপকের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন সাদামাটা পোশাক, মুখে শান্ত হাসি—খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। চা-নাশতার ফাঁকে জাহানারা বেগম সুযোগ পেয়ে গেলেন নিজের গল্প শোনানোর। কোথায় কোথায় থেকেছেন, কোন আত্মীয় বিদেশে, কার উপহার দেওয়া কোন গয়না—সবই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আত্মঅহংকারে টইটম্বুর।

কিন্তু আশ্চর্য! মাহমুদা খাতুন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেও তাতে মুগ্ধ হওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। না বিস্ময়, না ঈর্ষা—শুধু ভদ্র আগ্রহ। এই নির্লিপ্ততা জাহানারা বেগমের অহংকারে হালকা আঁচড় কাটল।

নিজেকে আরও স্পষ্টভাবে জাহির করতে তিনি হঠাৎ ঘরে লোক পাঠালেন। কিছুক্ষণ পর পরপর কয়েকটা গয়নার বাক্স এসে হাজির। ঢাকনা খুলতেই হীরার ঝিলিক, সোনার আভা, নকশার বাহার।

—এই নেকলেসটা আমার দেবর আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছে,
—এই লকেটটা টার্কিশ ডিজাইন,
—এইটা ছয় ভরি, ওইটা আট…

একটার পর একটা বর্ণনা, একটার পর একটা গর্ব।

মাহমুদা খাতুন হাসিমুখে দেখেন, মাথা নেড়ে শুনেন। কিন্তু বাহবা নেই, বিস্ময় নেই। যেন এসব তার কাছে খুব সাধারণ।

গয়নার বাক্স গোছাতে গোছাতে জাহানারা বেগম একটু থেমে বললেন—
—ভাবী, এবার আপনার গয়নার বাক্সটা আনুন না। আমিও একটু দেখি।

মাহমুদা খাতুন মুচকি হাসলেন।
—আমার গয়নার বাক্স? সেটা দেখতে হলে আপনাকে আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।

জাহানারা বেগম অবাক হলেন। মনে মনে ভাবলেন—ভাবখানা কী! মফস্বল শহরের কলেজ অধ্যাপকের সংসারে আবার কী এমন গয়না! তবু মুখে বললেন,
—ঠিক আছে, অপেক্ষাই না হয় করলাম।

এই গল্প, সেই গল্পে আরও আধঘণ্টা কেটে গেল। ধৈর্য হারিয়ে তিনি বললেন—
—ভাবী, আপনার গয়নার বাক্স কই?

মাহমুদা খাতুন জানালার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন—
—ওই যে… চলে আসছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন সোহরাব উদ্দিন। সঙ্গে তার তিন ছেলে আর দুই মেয়ে। সবার মুখেই আলাদা এক ধরনের দীপ্তি। সেদিন তারা শহরের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। বড় দুই ছেলে কলেজের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীর পুরস্কার পেয়েছে, বড় মেয়ে জুনিয়র বৃত্তি অর্জনের জন্য সংবর্ধিত হয়েছে। ছোট দুজনও বাবার হাত ধরে গর্বের ভাগ নিতে এসেছে।

মাহমুদা খাতুন তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ধীরে, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
—ভাবী, আপনি আমার গয়না আর অলংকার দেখতে চেয়েছিলেন।
এই যে… এরাই আমার গয়না, এরাই আমার অলংকার।

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

জাহানারা বেগমের চোখ সোনার ঝিলিক খুঁজছিল, কিন্তু সেখানে পেল অন্য এক আলো—শিক্ষা, মূল্যবোধ আর সঠিক লালনের আলো। সেই আলোয় তার সব হীরা-সোনা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল।

কিছু অলংকার শরীরে ঝোলে,
আর কিছু অলংকার মানুষ গড়ে তোলে।

সমাজে যারা বোঝে, তারা জানে—
জুয়েলারির পেছনে সময় নষ্ট করার চেয়ে
আসল গয়না গড়তেই সময় দেওয়া বেশি দামী।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.