নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম

২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৪


হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)—জ্ঞান, সাধনা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য জীবন

ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল তাঁদের সময়কে প্রভাবিত করেন না; শতাব্দী পেরিয়েও তাঁদের নাম মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে জ্ঞানসন্ধানীদের জন্য পথের দিশা, আত্মশুদ্ধির প্রত্যাশীদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানীদের জন্য এক গভীর অধ্যায়। হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) তেমনই এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

ইসলামী ইতিহাসে তিনি একই সঙ্গে একজন আলেম, ফকিহ, খতিব, শিক্ষক ও সুফি সাধক হিসেবে পরিচিত। কাদেরিয়া তরিকার নাম তাঁর সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তাঁর জন্ম ৪৭০ হিজরি/১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গিলান প্রদেশের নায়েফ গ্রামে। পরবর্তী জীবনে বাগদাদ হয়ে ওঠে তাঁর জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও দাওয়াতের প্রধান ক্ষেত্র। ৫৬১ হিজরি/১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদেই তাঁর ইন্তেকাল হয়।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই—তিনি শুধু আধ্যাত্মিকতার কথা বলেননি; বরং জ্ঞান, শরিয়ত, ইবাদত, আত্মসংযম ও নৈতিক চরিত্রকে একই ধারায় যুক্ত করেছিলেন।

গিলানের ছোট্ট গ্রাম থেকে বাগদাদের পথে

আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর পিতা আবু সালেহ মুসা সম্পর্কে ঐতিহাসিক সূত্রে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর মাতা উম্মুল খায়ের ফাতিমা ছিলেন তৎকালীন একজন ধার্মিক পরিবারের সন্তান। শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে তিনি মায়ের স্নেহ ও মাতামহের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। সে সময় ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল বাগদাদ। মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ৪৮৮ হিজরি/১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে, মায়ের অনুমতি নিয়ে তিনি একটি কাফেলার সঙ্গে বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই যাত্রা ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায়।

বাগদাদে এসে তিনি একাধিক বিশিষ্ট আলেমের কাছে হাদিস, ফিকহ, ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। আবু গালিব ইবন বকিল্লানি, জাফর সাররাজ, আবু সাদ আল-মুখাররিমি এবং অন্যান্য বিদ্বানের কাছে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই উসুল, ফুরু ও ফিকহের বিভিন্ন শাখায় তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য গড়ে ওঠে।

অর্থাৎ যে মানুষকে পরবর্তী যুগে প্রধানত একজন ‘সুফি সাধক’ হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে, তাঁর জীবনের ভিতটি কিন্তু নির্মিত হয়েছিল দীর্ঘ ও কঠোর জ্ঞানসাধনার ওপর।

জ্ঞান থেকে আত্মশুদ্ধির পথে

বাগদাদে অবস্থানকালে তিনি শহরের সুফি সাধকদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হন। আবু খায়র মুহাম্মদ ইবন মুসলিম আদ-দাব্বাসের মাধ্যমে তিনি তাসাউফের ধারায় প্রবেশ করেন। তাঁর জীবনে তখন জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি শুরু হয় আত্মশুদ্ধির এক কঠিন অধ্যায়।

তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনায় দীর্ঘ নির্জনবাসের কথা বলা হয়। ঐতিহাসিক ও সুফি জীবনীগ্রন্থে এই সময়কে তাঁর মুজাহাদা ও আত্মসংযমের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তাঁর জীবনের নানা কারামাত ও অলৌকিক ঘটনা নিয়ে পরবর্তী যুগে বিপুলসংখ্যক মাকামাত রচিত হয়েছে; সেগুলোর সবকিছুকে সমান ঐতিহাসিক নিশ্চয়তার সঙ্গে গ্রহণ করা যায় না। আধুনিক গবেষণাতেও তাঁর প্রামাণ্য জীবন ও পরবর্তী কিংবদন্তির মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

এই সতর্কতাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর প্রকৃত মাহাত্ম্য বোঝার জন্য অলৌকিক কাহিনির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। তাঁর জ্ঞান, শিক্ষা, চরিত্র, ইবাদত ও মানুষের ওপর তাঁর দাওয়াতি প্রভাবই তাঁর জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়।

আবার বাগদাদে—এক আলেমের কণ্ঠে জেগে উঠল শহর

দীর্ঘ সাধনা ও নির্জনতার পর ১১২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বাগদাদে প্রকাশ্যভাবে শিক্ষা ও ওয়াজ শুরু করেন। প্রথম দিকে তাঁর শ্রোতা ছিল অল্পসংখ্যক। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর বক্তব্যের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত হয় যে তাঁর জন্য নির্ধারিত শিক্ষাকেন্দ্র ও মসজিদ মানুষের ভিড়ে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তাঁর ওয়াজের আসর আরও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হতে থাকে।

ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর বক্তৃতার ব্যাপক জনপ্রিয়তার কথা পাওয়া যায়। এমনকি তাঁর ওয়াজ শুনতে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের কথাও বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তবে এসব সংখ্যাগত বর্ণনার কিছু অংশ ঐতিহ্যগত সূত্রনির্ভর; তাই এগুলোকে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের পরিবর্তে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রতিফলন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

তাঁর বক্তব্যের শক্তি ছিল মানুষের অন্তরে পৌঁছানোর ক্ষমতায়। তিনি শুধু ধর্মীয় বিধান ব্যাখ্যা করতেন না; মানুষের নফস, অহংকার, লোভ, দুনিয়ার মোহ, তওবা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার কথাও বলতেন।

তাঁর ভাষায় ছিল সতর্কতা, আবার আশাও ছিল। ছিল ভয়, আবার আল্লাহর রহমতের প্রতি আস্থাও ছিল। ফলে তাঁর ওয়াজ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষিত সমাজ ও ক্ষমতাবানদের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর তাসাউফ: শরিয়তের বাইরে নয়, শরিয়তের ভেতরে

হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল—তাসাউফকে শরিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন না করা।

তাঁর কাছে আত্মশুদ্ধি মানে কেবল নির্জনে বসে জিকির করা নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। তিনি তাঁর অনুসারীদের আনুগত্য, আত্মসংযম, পরিশুদ্ধি ও নৈতিকতার দিকে আহ্বান জানাতেন।

তাঁর শিক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত সার যেন তাঁরই উপদেশে পাওয়া যায়—অনুসরণ করো, নতুন কিছু উদ্ভাবন করো না; আনুগত্য করো, বিরোধিতা করো না; নিজেকে পরিশুদ্ধ করো, কলুষিত করো না।

এই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ ধর্মীয় পরিচয় সহজে ধারণ করা যায়, কিন্তু সেই পরিচয়ের নৈতিক দাবি পূরণ করা কঠিন।

‘মুহিউদ্দিন’—দ্বীনের পুনর্জাগরণের আহ্বান

আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-কে ‘মুহিউদ্দিন’ উপাধিতে অভিহিত করা হয়েছে। তাঁর সময়ে তিনি বিশেষ করে হাম্বলি ফিকহের একজন প্রভাবশালী আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর শিক্ষায় আকিদা, ইবাদত ও নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

তাঁর পরিচয়কে শুধু সুফি সাধকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক এবং ধর্মীয় বক্তা; তাঁর শিক্ষায় ফিকহ, হাদিস, তাফসির, কোরআন পাঠ, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধি—সবকিছুর সমন্বয় দেখা যায়।

এই কারণেই তাঁর উত্তরাধিকার পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে শুধু একটি আধ্যাত্মিক তরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

কাদেরিয়া তরিকার বিস্তার

হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর নামের সঙ্গে কাদেরিয়া তরিকার সম্পর্ক গভীর। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্মৃতি ও শিক্ষাকে কেন্দ্র করে এই তরিকার বিস্তার ঘটে এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে তা মুসলিম বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত কাদেরিয়া ঐতিহ্যের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই বিস্তারকে শুধু একটি সাংগঠনিক তরিকার বিস্তার হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর নামের সঙ্গে যে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, তার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর স্মরণ, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানুষের কল্যাণের শিক্ষা।

তাঁর কলমের উত্তরাধিকার

আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর নামে বহু গ্রন্থ প্রচলিত থাকলেও গবেষণায় দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে তাঁর নামে অসংখ্য রচনা আরোপিত হয়েছে। তাই তাঁর রচনাসম্ভার নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে আল-গুনইয়া লি-তালিবি তারিকিল হক, আল-ফাতহুর রব্বানি এবং ফুতুহুল গায়ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রচনায় আকিদা, ইবাদত, নৈতিকতা, তওবা, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার বিষয় উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ফুতুহুল গায়ব তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তার অন্যতম পরিচিত সংকলন। আর আল-গুনইয়াতে ধর্মীয় বিধান, আকিদা, ইবাদত ও নৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।

তাঁর লেখার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল জটিল আধ্যাত্মিক বিষয়কে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করা। ফলে তাঁর বক্তব্য শুধু শিক্ষিত মহলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সাধারণ মানুষও তাঁর শিক্ষা থেকে আত্মশুদ্ধির পথনির্দেশ পেয়েছে।

কারামাতের গল্পের আড়ালে যে মানুষটি

আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-কে ঘিরে মুসলিম সমাজে অসংখ্য কারামাত ও অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত। তাঁর জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসব কাহিনি যুগের পর যুগ বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, তাঁর মৃত্যুর পর রচিত কিছু মাকামাতগ্রন্থে এমন অনেক বর্ণনা যুক্ত হয়েছে, যেগুলোর ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি মধ্যযুগের কিছু আলেমও অতিরঞ্জিত বর্ণনার সমালোচনা করেছেন।

তাই তাঁর জীবনকে বুঝতে হলে কারামাতের বিস্ময় থেকে কিছুটা সরে এসে তাঁর চরিত্র ও শিক্ষার দিকে তাকানো জরুরি।

তিনি কী শিখিয়েছেন?

তিনি মানুষকে তওবার দিকে ডেকেছেন।
নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছেন।
আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দিয়েছেন।
হালাল-হারামের সীমারেখা মানতে বলেছেন।
শরিয়তের বিধানকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এবং মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

একজন মানুষের প্রকৃত মহত্ত্বের বিচার যদি তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষার আলোকে করা হয়, তবে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর উত্তরাধিকার আজও অত্যন্ত শক্তিশালী।

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: স্মরণ থেকে আত্মসমালোচনা

রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখ উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামে পরিচিত। ‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ; অর্থ এগারো। প্রচলিত ঐতিহ্যে এই দিনটি হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাতের স্মরণে পালিত হয়।

তাঁর মৃত্যু ৫৬১ হিজরি/১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে হয়েছিল—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ব্যাপক ঐকমত্য আছে। তবে নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে মতভেদ রয়েছে; প্রচলিত সুফি ঐতিহ্যে ১১ রবিউস সানি বিশেষভাবে অনুসৃত হলেও গবেষণামূলক আলোচনায় এই তারিখের ব্যাপারে সতর্কতা দেখা যায়।

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম তাই শুধু একটি স্মরণদিবস নয়—এটি আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ হতে পারে।

একজন মানুষ, যিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য কৈশোরে গিলান থেকে বাগদাদে পাড়ি দিয়েছিলেন; যিনি দীর্ঘ সাধনা ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়েছিলেন; যিনি জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধিকে একসূত্রে বেঁধেছিলেন; যিনি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তওবা, তাকওয়া ও নৈতিকতার কথা বলেছিলেন—তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হতে পারে তাঁর শিক্ষাকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনা।

আজকের পৃথিবীতে জিলানি (রহ.)-এর শিক্ষা

আজ মানুষের হাতে তথ্যের অভাব নেই; অভাব আত্মসংযমের। জ্ঞানের অভাব নেই; অভাব জ্ঞানকে চরিত্রে রূপ দেওয়ার। ধর্মীয় পরিচয়ের অভাব নেই; কিন্তু সেই পরিচয়ের নৈতিক দায়িত্ব পালন করা অনেক কঠিন।

এই বাস্তবতায় আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে—আমরা কতটা জানি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যা জানি তা কতটা জীবনে ধারণ করি।

ইবাদত যদি চরিত্রকে সুন্দর না করে, জ্ঞান যদি অহংকার বাড়ায়, ধর্মীয় পরিচয় যদি মানুষের প্রতি কঠোরতা বাড়ায়—তবে আত্মশুদ্ধির কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ।

জিলানি (রহ.)-এর শিক্ষার দিকে তাকালে বরং দেখা যায়, অন্তরের সংশোধন, নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং শরিয়তের প্রতি আনুগত্য তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

একজন বুযুর্গকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি শুধু তাঁর নামে অনুষ্ঠান করা নয়; বরং তাঁর শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করা।

আজ আমরা যদি ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে তাঁর জীবন স্মরণ করি, তাহলে নিজেদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখতে পারি—

আমি কি উপার্জনে হালাল-হারামের সীমা মানছি?

আমি কি কথায় সত্যবাদী?

আমি কি অন্যের অধিকার নষ্ট করছি না?

আমি কি ক্ষমা করতে শিখছি?

আমি কি নিজের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি?

আমি কি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার পাশাপাশি মানুষের জন্য কল্যাণকর হওয়ার চেষ্টা করছি?

কারণ আত্মশুদ্ধির পথ কেবল নির্জন সাধনার পথ নয়; মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণও সেই সাধনার পরীক্ষা

বাহ্যিক পরিচয় যত বড়ই হোক, অন্তর যদি অহংকারে পূর্ণ থাকে, তবে সেই পরিচয়ের মূল্য কতটুকু? আর একজন সাধারণ মানুষ যদি সত্যবাদী, আমানতদার, বিনয়ী ও আল্লাহভীরু হন, তবে তাঁর জীবনই হয়ে উঠতে পারে একটি নীরব দাওয়াত।

আজকের দিনে বড় পীরের শিক্ষা

আমাদের সময়ের সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়; নৈতিকও।

প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী এনে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়কে সবসময় কাছে আনতে পারেনি। তথ্য বেড়েছে, কিন্তু প্রজ্ঞা সবসময় বাড়েনি। যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু পারস্পরিক বিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।

এই সময়ে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর মতো আলেমদের জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত উন্নতি শুধু বাহ্যিক সাফল্যে নয়, চরিত্রের উৎকর্ষে।

শতাব্দী পেরিয়ে আজও বাগদাদের সেই আলেম-সাধকের নাম মুসলিম বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উচ্চারিত হয়। কেউ তাঁকে ‘গাউসুল আজম’ নামে স্মরণ করেন, কেউ ‘মুহিউদ্দিন’ নামে, কেউবা কাদেরিয়া তরিকার পীর হিসেবে। এসব সম্মানসূচক পরিচয়ের বাইরে ইতিহাসের পাতায় যে মানুষটিকে দেখা যায়, তিনি ছিলেন এক কঠোর জ্ঞানসাধক, প্রভাবশালী বক্তা, শিক্ষক এবং আত্মশুদ্ধির আহ্বানকারী।

তাঁর জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়—আধ্যাত্মিকতার পথ কেবল আবেগের পথ নয়; এটি জ্ঞানের পথ, আমলের পথ, আত্মসংযমের পথ এবং চরিত্র নির্মাণের পথ।

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের এই দিনে তাই আমাদের স্মরণ হোক শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়, আত্মজিজ্ঞাসায়।

আমরা নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি—আমার জ্ঞান কি আমাকে বিনয়ী করেছে? আমার ইবাদত কি আমার চরিত্রকে সুন্দর করেছে? আমার ধর্মীয় পরিচয় কি আমাকে মানুষের জন্য কল্যাণকর করেছে? আমার অন্তর কি সত্যিই আল্লাহর দিকে ফিরেছে?

কারণ একজন নেককার মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি তাঁর কবরের ওপর উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ নয়; বরং তাঁর রেখে যাওয়া সেই শিক্ষা, যা একজন মানুষকে নিজের ভেতর পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়।

হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন আমাদের সেই আত্মশুদ্ধির পথেই ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়—জ্ঞান থেকে আমলে, আমল থেকে চরিত্রে, আর চরিত্র থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের নেককার বান্দাদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার, নিজেদের নফসকে পরিশুদ্ধ করার এবং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সুন্দর জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন।

আমিন।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন জ্ঞান, সাধনা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞান তখনই সার্থক, যদি তা আমাদের চরিত্র ও আমলে প্রতিফলিত হয়। আজকের সময়ে তাঁর আত্মশুদ্ধি, বিনয় ও মানবকল্যাণের শিক্ষা আমাদের জন্য গভীর অনুধাবনের বিষয় -যদিও আমরা পথ ভ্রষ্টতাই বেশি গ্রহণ করি; মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংশোধনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.