নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ: ক্রোধ ও কৌতুকের আড়ালে সমাজ বদলের স্বপ্ন

১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১২

শিক্ষকতা, সাহিত্য, রাজনীতি ও শিক্ষাবিস্তারে নিবেদিত এক ব্যতিক্রমী জীবন
বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁরা পাঠককে শুধু হাসাতে চান না; হাসির মধ্য দিয়ে সমাজের অসংগতি, মানুষের স্ববিরোধিতা এবং ক্ষমতাবানদের ভণ্ডামিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ ছিলেন তেমনই একজন লেখক। তাঁর কলমে রম্যরচনা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, ব্যঙ্গ হয়ে উঠেছে সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে অস্ত্র। শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও শিক্ষাবিস্তারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর জীবন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আসহাব উদ্দীন আহমদ। তাঁর পিতা মুনশী সফর আলী চৌধুরী এবং মাতা নাসিমা খাতুন। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠলেও শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৩২ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৩৪ সালে আইএ ও ১৯৩৬ সালে বিএ সম্পন্ন করেন। ১৯৩৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় গ্রাম থেকে উঠে এসে উচ্চশিক্ষা অর্জন তাঁর অধ্যবসায় ও জ্ঞানানুরাগের পরিচয় বহন করে।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। চট্টগ্রাম কলেজ, ইসলামিয়া কলেজ, লাকসাম নবাব ফয়জুন্নেছা কলেজ, ফেনী কলেজ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত হয়। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। অন্যায় ও অনিয়মের প্রতিবাদ করার প্রবণতা তাঁকে প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাতেও জড়িয়েছে। একপর্যায়ে তিনি পেশাগত জীবনের নিরাপদ পরিসর ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

আসহাব উদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে বাঁশখালী থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করেন। প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে বামপন্থী ধারার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি দলটিতে যোগ দেন এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

কৃষক-শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ও সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। সামরিক শাসনের সময় দীর্ঘদিন আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঁশখালী অঞ্চলে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কথা বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৮০ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও সমাজ ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর চিন্তাচর্চা অব্যাহত ছিল।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও সাহিত্যিক পরিচয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যে বৈষম্য ও শোষণ তিনি রাজনীতিতে প্রশ্ন করেছেন, সাহিত্যের মধ্যেও তার সমালোচনা করেছেন। তাঁর কাছে লেখালেখি ছিল নিছক ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম নয়; সমাজের অসংগতি তুলে ধরা এবং মানুষকে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করার উপায়।

১৯৪৯ সালে প্রকাশিত বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে তিনি রচনা করেন জান ও মান, ধার, সের এক আনা মাত্র, দ্বিপদ বনাম চতুষ্পদ, আমার সাহিত্য জীবন, ঘুষ, দাম শাসন দেশ শাসন এবং ভূমিহীন কৃষক, কড়িহীন লেখকসহ নানা গ্রন্থ। তাঁর অন্যান্য পরিচিত রচনার মধ্যে রয়েছে লেখক ও পাচক, দাড়ি সমাচার, বাঁশ সমাচার, লাথি লাঠি গণতন্ত্র, নতুন বোতলে পুরোনো মদ, ভাতের বাংলা কাপড়ের বাংলা ও বিপ্লব বনাম অতি বিপ্লব। এসব গ্রন্থের নাম থেকেই তাঁর লেখার বিষয়বৈচিত্র্য, সামাজিক পর্যবেক্ষণ ও ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির আভাস পাওয়া যায়।

তাঁর সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য ধার কিংবা সের এক আনা মাত্র-এর মতো রচনার দিকে তাকানো যেতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট, অভাব, দ্রব্যমূল্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর সমাজচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিচিত জীবনের এসব অনুষঙ্গকে তিনি ব্যঙ্গ ও কৌতুকের সাহায্যে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যাতে পাঠক হাসির পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন দিকটিও অনুভব করেন।

দাম শাসন দেশ শাসন শিরোনামেও অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্ন উঠে আসে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কেবল বাজারের হিসাব নয়; তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গেও যুক্ত। একইভাবে ঘুষ নামের গ্রন্থ দুর্নীতির মতো সামাজিক ব্যাধির প্রতি তাঁর সাহিত্যিক আগ্রহের পরিচয় বহন করে। আর ভূমিহীন কৃষক, কড়িহীন লেখক শিরোনামে কৃষকের ভূমিহীনতা ও লেখকের আর্থিক অনিশ্চয়তাকে পাশাপাশি রেখে বঞ্চনার দুটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনায় ‘ক্রোধ ও কৌতুকের শিল্পী’ পরিচয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তাঁর লেখায় হাস্যরস কখনো নিছক বিনোদন নয়; এর অন্তরালে রয়েছে সমাজের প্রতি ক্ষোভ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের আচরণ নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ। তিনি পাঠককে সরাসরি উপদেশ দেওয়ার পরিবর্তে ব্যঙ্গের মাধ্যমে ভাবতে বাধ্য করতে চেয়েছেন। তাঁর রচনার এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে সাধারণ রম্যলেখকের পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায়।

নিজের সাহিত্যচর্চা ও জীবনদর্শন বোঝার জন্য আমার সাহিত্য জীবন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থে তাঁর লেখালেখির উদ্দেশ্য ও সাহিত্যভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর সাহিত্য সম্পর্কে প্রকাশিত আলোচনায় শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা সৃষ্টিকে লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সাহিত্য ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র তৈরি করে।

তবে আসহাব উদ্দীন আহমদের মূল্যায়ন শুধু তাঁর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বা রম্যরচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর সামগ্রিক অবদান অনুধাবন করা সম্ভব নয়। শিক্ষাবিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। গ্রামীণ মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল কেবল পাঠদানের জায়গা নয়; বরং মানুষের চিন্তা, সচেতনতা ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি।

ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময়কার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষকসমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সাহিত্য সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে বিস্তৃত করেছিল। সাহিত্য, শিক্ষা ও রাজনীতিকে তিনি বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজ পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রয়াসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও তাঁর কর্মজীবন ও রচনাবলি থেকে একটি দায়বদ্ধ মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা, চারপাশের মানুষের জীবন এবং সামাজিক বাস্তবতাকে লেখার উপাদানে পরিণত করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গের লক্ষ্য ছিল অসংগতি, অন্যায় ও ভণ্ডামি—মানুষকে হেয় করা নয়; বরং সমাজকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করানো।

১৯৯৪ সালের ২৮ মে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ। তাঁকে বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর সাহিত্যিক অবদানের স্বীকৃতি অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ২০০৫ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এই সম্মাননা তাঁর সাহিত্যকর্মকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের অবদান শুধু তাঁর পদবি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। তাঁর কাজ কতটা মানুষের চিন্তাকে নাড়া দিয়েছে, সমাজের অসংগতি সম্পর্কে সচেতন করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে গেছে—সেই বিবেচনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান বিতরণ করেছেন, সাহিত্যিক হিসেবে সমাজকে প্রশ্ন করেছেন, রাজনীতিক হিসেবে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন এবং শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাস্তব ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

বাঁশখালীর সাধনপুর থেকে শুরু হওয়া তাঁর জীবনযাত্রা তাই কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য বা সংগ্রামের ইতিহাস নয়; এটি শিক্ষা, সাহিত্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক সম্মিলিত আখ্যান। তাঁর রচনাবলি নতুন করে পাঠ, গ্রন্থপঞ্জির নির্ভরযোগ্য সংকলন, সাহিত্যকর্মের পুনঃপ্রকাশ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে গবেষণা—এসব উদ্যোগ তাঁর উত্তরাধিকারকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হবে তাঁর সাহিত্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষা, যুক্তিবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে নতুন প্রজন্মের আলোচনায় ফিরিয়ে আনা।

অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ তাই শুধু অতীতের একজন অধ্যাপক, সাহিত্যিক কিংবা রাজনীতিক নন; তিনি এমন এক চিন্তাশীল মানুষের প্রতীক, যিনি কলম, শ্রেণিকক্ষ ও রাজনৈতিক সংগ্রাম—তিনটি পথেই সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.