নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জিনাত আক্তার

সাধারন

জিনাত আক্তার › বিস্তারিত পোস্টঃ

আগন্তুক

২৩ শে অক্টোবর, ২০১৩ দুপুর ১:৫৪

01 Oct 2013 10:58:08 AM Tuesday BdST

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

জিনাত আক্তার-এর গল্প

আগন্তুক



বাসে বসেই বিকেলটাকে কালো অন্ধকারে ডুবে যেতে দেখলাম। খুব জোর একটা বৃষ্টি যে হবে সেটা বোঝাই যাচ্ছে বাতাসের তোড় দেখে। লাইব্রেরিতে বসে কিভাবে যে দুপুরটাকে পার করে দিলাম টেরই পাইনি। লাইব্রেরি থেকে বের হলাম যখন সময়ের হিসেবটা টের পেলাম তখুনি। প্রকৃতির রঙে যে পরিবর্তন এসেছে সেটাও বুঝলাম তখুনি। দ্রুত পা চালালাম বাস কাউন্টারের দিকে। সাথে থাকা সহপাঠিনীকে বিদায় জানালাম বাসে চড়ার আগ মুহূর্তে। বাস রওনা দিতে দিতেই আকাশের রঙের পরিবর্তনটা জোরালো হয়ে উঠলো চোখের সামনে। যখন আমার গন্তব্যে এসে বাস থেকে নামলাম ততক্ষণে চারপাশ কালোয় ডুবে গিয়ে টিপটিপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করে দিয়েছে। পথে তেমন লোকজন চোখে পড়ল না। রিকশা যে এই সময়ে পাওয়া যাবে না সেটা বোধগম্য হতে কয়েক সেকেন্ড লাগল। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পাশের একটা দোকানের ছাদের তলায় আশ্রয় নিলাম। ওখানে আরও দুজন বয়স্ক লোককে দাঁড়ানো দেখে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করলাম। দোকানটির ঝাঁপ ভেতর থেকে বন্ধ। দাঁড়িয়ে থেকেই বাতাসের জোর বয়ে চলা, মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির ফোঁটা আকৃতিতে বড় হওয়ার দৃশ্য দেখতে লাগলাম। বৃষ্টি যে আরো বেগে ঝরবে সেটা আমি যেমন বুঝলাম তেমনি হয়তো আমার পাশে দাঁড়ানো লোক দুজনও বুঝলেন। তারা নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করলেন তারপর আমাকে লক্ষ্য করে একজন বললেন, ‘মা বৃষ্টি হয়তো আরো বাড়তে পারে আমরা দুজন ভিজেই রওনা দিচ্ছি তুমি চাইলে সাথে আসতে পারো। তোমার বাসা কোথায়?’



কথা বলা লোকটির সম্বোধনটি খুব ভালো লাগল, বললাম, ‘চাচা আমার বাসা এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে, ভিজে রওনা দিলে সমস্যা হবে। আপনারা চাইলে চলে যেতে পারেন।’ অপর ভদ্রলোকটি বললেন, ‘এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না।’ লোক দুজনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘সমস্যা হবে না আপনারা চলে যান, পথে কোন রিকশা পেলে পাঠিয়ে দেবেন।’



ওনারা চলে গেলেন, একবার ভাবলাম চলেই যাই ওনাদের সাথে। আবার ভাবলাম, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে তো ভিজছি না, শুধু একা দাঁড়ানোটাই যা, বৃষ্টি একটু কমলেই রওনা দেব, এরই মধ্যে হয়তো রিকশা চলে আসবে। কিন্তু কমলো না বরং বেড়েই চললো বৃষ্টিটা। রাস্তায় এতক্ষণ দু’একটা বাস, জিপগাড়ি দেখা যাচ্ছিল এখন তাও নেই। ওদিকে উৎকণ্ঠাটাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই হয়তো বাতাসের বেগ বেড়ে গিয়ে আকাশে বিজলি চমকাতে লাগলো।



নির্জন রাস্তায় একা দাঁড়ানো আমাকে অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরতে চাইলো চারপাশ থেকে। অনুভূতিটাকে তাড়াতে মোবাইল হাতে নিলাম, পরপর কয়েকবার চেষ্টা করলাম বাসায় যোগাযোগ করার কিন্তু নেটওর্য়াক সংযোগ পেলাম না। শূন্য পথের দিকে তাকালাম কিছুটা বিরক্তি নিয়ে। আচমকা মনে হলো কেউ একজন এগিয়ে আসছে এদিকে। বিদ্যুৎ চমকালো এই সময় সেই আলোতে দেখতে পেলাম একজন মাঝবয়সী লোক দৌড়ে আসছে এদিকে। লোকটার আসার ভঙ্গিটা স্বাভাবিক হলেও দৌড়ানোটা অস্বাভাবিক, দৌড়াচ্ছে না ভেসে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। কাছাকাছি আসতেই লোকটার পায়ের দিকে দৃষ্টি গেল পা দুটো ভেজা, সপসপ করছে। ওদিক থেকে দৃষ্টি সরাতেই প্রশ্ন শুনতে পেলাম একটা গমগমে কণ্ঠের, ‘আপনিও কি বৃষ্টির ঝামেলায় পড়ে এখানে দাঁড়িয়েছেন?’ উত্তর দেওয়ার আগেই দ্বিতীয় প্রশ্নের সম্মুখিন হলাম। ‘কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন? ’ ‘এইতো মিনিট পনের।’ বলে লোকটির দিকে তাকালাম।



চুল ঝেড়ে বৃষ্টির পানি সরানোয় ব্যস্ত আগন্তুক। স্কুল অথবা কলেজের শিক্ষক এর মতো দেখতে। ‘এর মধ্যে কোন রিকশা পাননি? ’ তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দিলাম, ‘জ্বি-না।’ এই উত্তরটাই যে শুনবেন তা যেন জানতেন, আমি থামতেই বললেন, ‘শালার রিকশাওয়লারা এই সময়েই গায়েব হয়ে যায়।’ এমন একটা মানুষের মুখ থেকে এরকম কথা প্রত্যাশা করিনি আমি। আমাকে চুপ থাকতে দেখে আগন্তুক আবার বললো, ‘মোবাইল নেই আপনার? বাসায় ফোন করেন।’ নেটওয়ার্ক এ সমস্যা হচ্ছে বললাম। শুনে বললেন, ‘শালার নেটওয়ার্ক এই সময়েই খারাপ হয়।’ এইবার আমি অন্যদিকে মুখ ঘোরালাম, সঙ্গে সঙ্গে কটু একটা কিসের গন্ধ নাকে লাগলো, উৎস খুজে পেলাম না। ‘শালার নর্দমা আমার পায়ের তলায় পড়ল’, বিড়বিড় করে বাক্যটা শেষ করে জিঙ্গেস করলো, ‘আপনি কি করেন, পড়াশোনা বুঝি?’ ‘জ্বি, কলেজ থেকে আসছি।’ ‘শালার বৃষ্টি এখনই নামল সময় পায় নাই আর।’ আপন মনে বকে উঠলো আগন্তকটি। বিশেষ এই বিশেষণে সবাইকে, সবকিছুকে যেভাবে সম্বোধন করছেন তাতে হাসি চেপে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো আমার কাছে।



হাফ মিনিট এর বিরতি দিয়ে আবার শুরু হলো কথোপকথন, ‘প্রশ্ন করে করে আপনার সম্পর্কে জানার চেয়ে বরং আমার কথা বলি, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না। কি বলেন?’ এই দ্রুত গতির কথার তোড়ে কোন কথা যোগাল না আমার মুখে । আগন্তুক বলে চললো, ‘ দু’বছর আগে একটা স্কুলে টিচার ছিলাম। কিন্তু এখন আর নই, কেন জানেন? তখন একটা রোগে আক্রান্ত হলাম, হাসপাতালে ছিলাম কিছুদিন, ঐ সময়ে চাকরিটা চলে যায়, সবাই ভেবেছিল হয়তো মারাই যাব, ডাক্তাররাও আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু শেষে টিকে গেলাম, শালার শরীরটাকে এখনও বয়ে নিতে হচ্ছে। বেকার হয়ে পথে পথে ঘোরার থেকে মরে যাওয়াই ভালো ছিল কি বলেন?’ নিজের প্রশ্নে মজা পেয়ে গা দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে এবার আর তাকে স্বাভাবিক মনে হলো না। শঙ্কা হলো, তিনি আবার বিশেষ গোত্রের (পাগলশ্রেণির) কিনা! তবে তো এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। মনে মনে ‘আল্লাহ্‌কে’ স্মরণ করতে লাগলাম। আগন্তুক কিছুক্ষণ ওপাশে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘দেখেছেন শালার পিচ্চিগুলো কি খেলা জুড়ে দিয়েছে।’ লোকটার কথা অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখলাম ওপাশে একটা ছাউনির নিচে কিছু পথশিশু তাদের নিজস্ব কিছু খেলা নিয়ে ব্যস্ত। এতক্ষণ ওদের দেখিনি।



‘বৃষ্টি মনে হয় কিছুটা কমবে দেখি বাস, রিকশা পাওয়া যায় কিনা, আপনি থাকেন রিকশা পেলেও পেতে পারেন।’ আগন্তক এর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। পথশিশুদের আমার পাশে এতক্ষণ যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তাকে কেউ চেনে কিনা। শিশুরা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো, সর্দারগোছের এক শিশু বললো, ‘কার কতা কন আফা?’ ‘এই যে এতক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো ওনাকে তোমরা দেখেছ আগে?’, জিঙ্গাসু চোখে তাকালাম শিশুদের দিকে। ফোকলা দাঁতের শিশুটি বললো, ‘এইহানে তো আফনে ছাড়া কেউ আছিল না, অনেকক্ষণ ধইরা তো আফনেই খাড়াইয়া রইছেন, আর তো কাউরে দেহি নাই।’ অন্য শিশুরা চেচিয়ে সমর্থন জানাল সঙ্গীকে। কিন্তু ওদের কথা বিশ্বাস করিই বা কেমন করে?, আগন্তক এর কণ্ঠস্বর এখনও আমার কানে বাজছে। কিছুক্ষণ আগে সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে তাকালাম, চমকে গেলাম, জায়গাটা শুকনো, এতক্ষণ ওখানে কেউ ভেজা পা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তার কোন চিহ্নই নেই! তাহলে কি পথশিশুদের কথা ঠিক! নিজের চোখ আর কানকেই বা অবিশ্বাস করি কিভাবে? ঘোর কাটলো পরিচিত টুং টাং শুনে। একটা রিকশা এগিয়ে আসছে। হাত তুলে ডাকলাম, মৃদু আওয়াজ বেরিয়ে এলো গলা থেকে। পাশের ছাউনির একটা শিশু দৌড়ে গেলো রিকশাটাকে ডাকতে। শিশুটার সামনে গিয়ে বললাম, ‘সত্যি করে বলোতো, এখানে আমি ছাড়া আর কাউকে দাঁড়াতে দেখনি?’ শিশুটি বললো, ‘সত্য আফা এইহানে আর কেউ আছিল না, মিছা কমু ক্যা!’ শিশুটার হাতে পাঁচ টাকার একটা কয়েন দিয়ে রিকশায় চেপে বসলাম। রিকশা এগিয়ে চলছে আর যতদূর থেকে দেখা যায় আমি বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছি, ভেতর থেকে ঝাঁপ বন্ধ করা দোকনের সামনেটা আবছায়া দেখাচ্ছে।



মোবাইলে বাসার নম্বর ডায়াল করলাম, নেটওয়ার্ক ঠিক হয়েছে, লাইন পাচ্ছি।



বাংলাদেশ সময়: ১০৫৬ ঘণ্টা, অক্টোবর ০১, ২০১৩

এমজেএফ/জেসিকে

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৩ শে অক্টোবর, ২০১৩ দুপুর ২:০২

কান্ডারি অথর্ব বলেছেন:


ভালো লাগল।

২৪ শে অক্টোবর, ২০১৩ সকাল ১০:২৪

জিনাত আক্তার বলেছেন: ধন্যবাদ.. :)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.