| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
রহিমা বেগম তার মেয়ে সামিয়ার নতুন বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছিলেন। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বই। গতবছর বড় ছেলে এই বইটাই পড়েছিল। কিন্তু এবারের বইটা দেখে তার চোখ কপালে উঠল। যে ৭ মার্চের ভাষণটা গতবছর ছিল, সেটা আর নেই। বদলে বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে একটা চিঠি ছাপা হয়েছে। একজন তরুণের লেখা। শাহরিয়ার খান আনাস। নামটা শুনেছিলেন রহিমা বেগম। গত আগস্টে পত্রিকায় দেখেছিলেন এই ছেলেটার ছবি।
চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন তিনি। "মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না।" একজন মা হিসেবে রহিমা বেগমের বুক দুরু দুরু করতে লাগল। এই ছেলেটা তার মায়ের কথা না শুনে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেদিনই চানখারপুলে গুলি খেয়ে মারা যায়। মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা। এখন সেই ছেলেটার চিঠি তার মেয়ের পাঠ্যবইয়ে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা তুলে ধরতেই আনাসের চিঠি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টার নির্দেশনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার কথা অনুযায়ী, শত শত তরুণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশ ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছে।
পাশের বাড়ির করিম সাহেব অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার নাতি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। সকালে চা খেতে খেতে নাতির বই দেখছিলেন। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়। এই বইটাই তিনি বছরের পর বছর পড়িয়েছেন। কিন্তু এবার বইয়ের ভেতরে ঢুকে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। নতুন একটা অধ্যায় যুক্ত হয়েছে - স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান। সেখানে লেখা আছে গত বছরের জুলাই মাসের সেই দিনগুলোর কথা। যখন রাস্তায় রাস্তায় মানুষ নেমেছিল। যখন পুলিশের গুলিতে ছাত্ররা মারা গিয়েছিল। যখন শেষ পর্যন্ত সরকার পতন হয়ে গিয়েছিল।
করিম সাহেব পাতা উল্টাতে থাকলেন। তার চোখে পড়ল আরেকটা পরিবর্তন। যেখানে যেখানে বঙ্গবন্ধু শব্দটা ছিল, সেখান থেকে সেটা বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু লেখা আছে শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ভাবলেন, ইতিহাস কি এভাবে বদলে যায়? একটা শব্দ যোগ হয়, একটা শব্দ বাদ যায়, আর পুরো জাতির ইতিহাস নতুন রূপ নেয়?
শহরের অন্য প্রান্তে তানভীর তার ছেলের সাথে বসে বই দেখছিল। সপ্তম শ্রেণি। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের নাম এবার বদলে গেছে। আগে যেটা ছিল শুধু বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে গণআন্দোলন। আর ভেতরে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের কথা, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের কথা। তানভীর নিজে সেই জুলাই মাসে রাস্তায় ছিল। দেখেছিল কীভাবে মানুষ জড়ো হয়েছিল। কীভাবে পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। এখন সেই ঘটনাই তার ছেলের পাঠ্যবই।
কিন্তু নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত যখন তার বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই খুলল, সে একটা ভিন্ন ছবি দেখতে পেল। সেখানে লেখা আছে কীভাবে ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন। কীভাবে তিনি ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিলেন। কীভাবে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের বেলা ব্যালট বাক্স ভর্তি করার গল্প, ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচন - সব কিছুই এখন পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে। বইয়ে আরও লেখা আছে যে পতিত আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার একটা রোডম্যাপ তৈরি করেছিল।
রিফাত আরও পড়তে থাকল। সেখানে লেখা আছে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার কথা। কীভাবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়েছিল। আবার লেখা আছে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান কীভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। এরশাদের স্বৈরশাসনের কথাও আছে। রিফাতের মনে হলো যেন পুরো একটা রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠ দেওয়া হচ্ছে তাকে। এদিকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসা তার ইংরেজি বই খুলে একটা জিনিস খুঁজে পেল না। গতবছর যে ৭ মার্চের ভাষণটা ছিল, সেটা এবার নেই। শুধু অষ্টম শ্রেণি নয়, একাদশ আর দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি বই থেকেও সেই ভাষণ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনগুলো আসলে একটি নতুন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। বইয়ের পাতায় নতুন অধ্যায়ের সংযোজন আর পুরনো প্রসঙ্গের বিয়োজন—সব মিলিয়ে এক নতুন আখ্যানের মুখোমুখি এই প্রজন্ম। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো স্থির বিষয় নয়; সময়ের আবর্তে তা নতুন করে লেখা হয়। আর এই বদলে যাওয়া পাঠ্যক্রমের ভেতর দিয়েই আগামী দিনের তরুণেরা খুঁজে নেবে তাদের শেকড় আর আগামীর বাংলাদেশের প্রকৃত দিশা।
©somewhere in net ltd.