| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
শীতের এক সকালে, দাভোসের পাহাড়ি শহর থেকে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানের ভেতর বসে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বললেন, "আমি চাই না খারাপ কিছু ঘটুক।" কিন্তু তার পরের বাক্যটি ছিল একেবারে ভিন্ন সুরের। পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল নৌবহর। ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, যুদ্ধবিমান আর রণতরীতে ভরা এক ভাসমান দুর্গ। এই একটি বাক্যেই যেন সারা বিশ্ব বুঝে গেল, মধ্যপ্রাচ্যে আবারও কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
ঠিক একই সময়ে, তেহরানে বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর দাঁড়িয়ে একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন যা শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দিতে পারে। "আমাদের আঙুল এখন ট্রিগারে রয়েছে," তিনি বললেন। কোনো রূপক নয়, কোনো কূটনৈতিক ভাষা নয়। একেবারে সরাসরি, যেন এক সৈনিক আরেক সৈনিককে বলছে যুদ্ধক্ষেত্রে। দুটি বাক্য, দুটি মহাদেশ থেকে উচ্চারিত, কিন্তু একই বার্তা বহন করছে। এই শীতে পৃথিবী হয়তো আবারও এক ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে।
কিন্তু এই উত্তেজনার গল্প আজকের নয়। এর শেকড় প্রোথিত আছে অনেক গভীরে, অনেক পুরনো ক্ষতে। গত বছরের জুন মাসের সেই রাতের কথা মনে করুন। ইরানের আকাশ হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেটা ভোরের আলো ছিল না, ছিল মার্কিন বিমান হামলার আগুন। চারটি পারমাণবিক স্থাপনায় একযোগে আঘাত। তেহরান সেদিন বুঝেছিল, ট্রাম্পের হুমকি শুধু কথার কথা নয়। ওয়াশিংটন যখন কিছু বলে, তখন সেটা বাস্তবায়নও করতে পারে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হুকাবি এখন সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বারবার। "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা বলেন, তাই করেন," তিনি বলেছেন সৌদি মিডিয়ায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।
সেই হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের সম্পর্ক যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু গত ডিসেম্বরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল যখন ইরানের রাস্তায় নামল হাজার হাজার মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, নাগরিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী মাত্র পনের দিনে সেই আন্দোলন দমন করে ফেলল কঠোর হাতে। ইরানি রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ট্রাম্প তখন প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র চুপ থাকবে না। এবং তার সেই হুমকি কেবল কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না, সেটা ইরান ভালোভাবেই বুঝেছিল। ট্রাম্পের দাবি, তার হুমকির কারণেই ইরান আটশোর বেশি বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। অবশ্য ইরানি কর্মকর্তারা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, কোনো মৃত্যুদণ্ডের পরিকল্পনাই ছিল না। কিন্তু সত্য যা-ই হোক, একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয়েই এখন একটা বিপজ্জনক খেলায় জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে একটা ভুল পদক্ষেপই পুরো অঞ্চলকে আগুনে পরিণত করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই এখন ইরানের সামরিক কমান্ডাররা একের পর এক সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছেন। মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি, যিনি খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের শীর্ষ কমান্ডার, তিনি বলেছেন ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে "দ্রুত, নিখুঁত এবং ধ্বংসাত্মক।" তার হুঁশিয়ারি আরও স্পষ্ট। ইরান যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হবে ইরানের লক্ষ্যবস্তু। "হিট অ্যান্ড রান" বা আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার দিন শেষ, তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।
আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি? তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে লিখিত বার্তায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুদ্ধ হলে সেটা হবে "ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী।" ইসরায়েল আর তার মিত্ররা যত সময়সীমা কল্পনা করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলবে সেই সংঘাত। তেহরানের বার্তা পরিষ্কার। তারা যুদ্ধ চায় না, কিন্তু যুদ্ধ এলে পিছপা হবে না।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি বলছেন, "১২ দিনের যুদ্ধে" হেরে যাওয়ার প্রতিশোধ নিতেই যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল ইরানে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এই "১২ দিনের যুদ্ধ" কী, সেটা নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন এটা সাম্প্রতিক কোনো গোপন সামরিক অভিযানের কথা, আবার কেউ বলছেন এটা রূপক অর্থে বলা। কিন্তু যা-ই হোক, পেজেশকিয়ানের বার্তা পরিষ্কার। তিনি মনে করেন, বাইরের শক্তি ইরানকে দুর্বল করতে চাইছে ভেতর থেকে।
কিন্তু এই পুরো সংকটের মূলে আছে আসলে কী? পারমাণবিক কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটা বড় ইস্যু। ওয়াশিংটন কোনোভাবেই চায় না যে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হোক। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার স্পষ্ট করেছে, ইরানকে ইউরেনিয়াম মজুদ বাড়াতে দেওয়া হবে না। আর ইরান? তারা বলছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিশ্বাসের সংকট এতটাই গভীর যে কেউ কারও কথা বিশ্বাস করছে না।
তবে শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, মানবাধিকার পরিস্থিতিও একটা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। মাইক হুকাবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরান যদি আবার বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, যদি ফাঁসিতে ঝোলায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে। এই বিষয়টা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন শুধু ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, মূল্যবোধের যুদ্ধও চলছে।
এই পুরো পরিস্থিতি দেখে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা কী বলছেন? তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে বড় কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনা কম। কেন? প্রথমত, ইরানে বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প নিজেই বলেছেন তেহরান আলোচনার টেবিলে ফেরার আগ্রহ দেখাচ্ছে। কূটনৈতিক চ্যানেল এখনও খোলা। কিন্তু তাই বলে পরিস্থিতি যে নিরাপদ, সেটা মোটেই না।
আসলে এখন যা চলছে, সেটা একধরনের স্নায়ুযুদ্ধ। দুই পক্ষই তাদের শক্তি প্রদর্শন করছে। যুক্তরাষ্ট্র পাঠাচ্ছে বিশাল নৌবহর, আর ইরান বলছে "আমাদের আঙুল ট্রিগারে আছে।" কেউ কাউকে দুর্বল মনে করতে চায় না। কেউ পিছু হটতে চায় না। এটা অনেকটা দুই মুষ্টিযোদ্ধার মতো যারা রিং-এ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরকে মাপছে, বোঝার চেষ্টা করছে কে আগে আঘাত করবে, কে কতটা শক্তিশালী।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নীরব থেকেছেন। তার কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য এখনও আসেনি। কিন্তু তার নেতৃত্বে বিপ্লবী গার্ড, ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, তারা কিন্তু একেবারেই নীরব নেই। তারা পরিষ্কার করে দিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব তারা দেবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পও একটা কঠিন অবস্থানে আছেন। একদিকে তিনি দেখাতে চান যে তিনি শক্তিশালী, কঠোর। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বলছেন তিনি যুদ্ধ চান না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটা খুবই কঠিন। খুব বেশি কঠোর হলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে। আর খুব নরম হলে তাকে দুর্বল মনে করা হবে, যেটা তিনি কোনোভাবেই চান না।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও এই পরিস্থিতি খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। সৌদি আরব, যারা ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী, তারা অবশ্যই চাইবে ইরান দুর্বল হোক। কিন্তু তারাও জানে, এই অঞ্চলে যুদ্ধ মানে তাদের জন্যও বিপদ। ইসরায়েলের অবস্থানও জটিল। তারা চায় ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল হোক, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে পুরো অঞ্চল যদি আগুনে পুড়তে শুরু করে, সেটাও তাদের জন্য বিপজ্জনক।
এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটা সবাই জিজ্ঞাসা করছে, সেটা হলো, এই স্নায়ুযুদ্ধ কি শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের যুদ্ধে রূপান্তরিত হবে? নাকি কোনোভাবে দুই পক্ষই একটা সমাধানের পথ খুঁজে নেবে? ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এরকম পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসা সম্ভব। ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের কথা মনে করুন। তখনও পুরো বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিমত্তা জয়ী হয়েছিল।
এখনও সেই সম্ভাবনা আছে। ট্রাম্প বলছেন ইরান আলোচনায় আগ্রহী। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদিও কঠোর ভাষায় কথা বলছেন, কিন্তু তিনিও যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা বলছেন, যা একভাবে যুদ্ধ এড়ানোর একটা আহ্বানও বটে। দুই পক্ষই জানে, যুদ্ধ হলে জয়ী হবে না কেউই। হয়তো একপক্ষ সামরিকভাবে জিতবে, কিন্তু মানবিক, অর্থনৈতিক, আর নৈতিক দিক থেকে সবাই হারবে।
এখন আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষা করছি দেখার জন্য যে পরবর্তী পদক্ষেপটা কী হবে। ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন পারস্য উপসাগরে পৌঁছে যাবে কয়েকদিনের মধ্যে। তখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় সেটা দেখার বিষয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের আঙুল ট্রিগারে আছে, তারা নিজেরাই বলেছে। একটা ভুল সিগন্যাল, একটা ভুল বোঝাবুঝি, আর পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।
কিন্তু আশার কথাও আছে। এতদিন ধরে এত উত্তেজনা সত্ত্বেও কেউ প্রথম আঘাতটা করেনি। সেটা হয়তো বলে দেয় যে দুই পক্ষই আসলে যুদ্ধ এড়াতে চায়। তারা শক্তি প্রদর্শন করছে, হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই সেই লাইনটা পার হতে চাইছে না যার পর ফেরা অসম্ভব।
এই মুহূর্তে পুরো বিশ্ব দেখছে পারস্য উপসাগরের দিকে। সেখানে একটা ঝড় আসছে, সেটা স্পষ্ট। কিন্তু সেই ঝড় কতটা ভয়াবহ হবে, সেটা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের সিদ্ধান্তের ওপর। হয়তো ইতিহাস এই সময়কে মনে রাখবে সেই মুহূর্ত হিসেবে যখন বুদ্ধিমত্তা জয়ী হয়েছিল। অথবা হয়তো মনে রাখবে সেই ট্র্যাজেডি হিসেবে যখন অহংকার আর ভুল হিসাব পুরো অঞ্চলকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল।
©somewhere in net ltd.