নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

মানুষের যৌনজীবন নিয়ে আপনার এত আগ্রহ কেন ?

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০৬


স্টিফেন হকিং একবার বলেছিলেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো নারীর মন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করলে নিশ্চিতভাবে বলতেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো বাঙালির মস্তিষ্ক — যেটি যেকোনো খবর, যেকোনো ঘটনা, যেকোনো মৃত্যু, এমনকি যেকোনো পদার্থবিজ্ঞানীর জীবনীকেও শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র বিষয়ে পর্যবসিত করার অলৌকিক ক্ষমতা রাখে। সেই বিষয়টির নাম : যৌনতা।

Epstein ফাইল প্রকাশিত হওয়ার পর পৃথিবীর চিন্তাশীল মানুষেরা ভাবলেন ক্ষমতা, অর্থ ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চক্র নিয়ে। বাংলাদেশের চিন্তাশীল মানুষেরা ভাবলেন অন্য কিছু। তাঁরা ভাবলেন : হকিং সাহেব ! প্যারালাইসিসে আক্রান্ত, হুইলচেয়ারবন্দী, কণ্ঠস্বর যন্ত্রনির্ভর সেই মানুষটি Epstein-এর দ্বীপে গিয়ে কী না কী করেছেন ! মিমস ভাসতে লাগল, জোকস ছড়াতে লাগল, মানুষ হাসতে লাগল। হাসির উৎস কী? যৌনতা। সর্বদা, নিরন্তর, অবিরাম — যৌনতা।

এদিকে সেই একই ফাইলে বারাক ওবামার নাম কমপক্ষে দুইশোবার এসেছে। কিন্তু সে নিয়ে কোনো আলোচনা নেই, কোনো মিমস নেই, কোনো কৌতূহল নেই। কারণটা সহজ। ওবামা সুস্থ মানুষ, স্বাভাবিক মানুষ — তাঁর ক্ষেত্রে যৌনতার কল্পনায় বিশেষ রস নেই। কিন্তু হকিং? তিনি প্যারালাইজড ! হুইলচেয়ারে বসে থাকেন! এইখানেই মজা! এইখানেই বাঙালির ফান্টাসি জমে ওঠে। মানুষের অক্ষমতা ও দুর্বলতাকে যৌনরসের উপকরণ বানানোর এই জাতীয় প্রতিভাকে হয়তো অনন্য বলা যায় — পৃথিবীতে এই প্রতিভার তুলনা মেলা ভার।

এবার আসা যাক লুধুয়া সাহেবের কথায়। তিনি ইসলামে হিজড়াদের অধিকার নিয়ে লিখতে বসেছিলেন — বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষগুলো কীভাবে ধর্মীয় স্বীকৃতি পাবেন, কীভাবে তাঁরা মর্যাদার সাথে বাঁচবেন, কীভাবে রাষ্ট্র তাঁদের পাশে দাঁড়াবে — এই প্রশ্নগুলো তুলতে পারতেন তিনি। কিন্তু না। লিখতে গিয়ে তিনি থমকে গেলেন এবং পাঠককে জানালেন যে তিনি জানেন না হিজড়ারা কীভাবে যৌনমিলন করেন। এই না-জানার কথাটি জানানোর জন্য তিনি একটি পাবলিক লেখা বেছে নিলেন। বাঙালির মস্তিষ্ক কোন পথে ঘোরে, এটি তার একটি স্বচ্ছ আয়না।

লুধুয়া সাহেবের লেখাটি পড়ে ছোটবেলার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় থাকতাম। একদিন প্যান্ট সেলাই দিতে পাড়ার দর্জির দোকানে গেলাম। দুপুরের কড়া রোদ, দোকানে দু-একজন খদ্দের, দর্জি সাহেবের মেজাজ সেদিন বিশেষ ভালো ছিল না। সেই সময় হিজড়াদের একটি দল এলো চাঁদা চাইতে। কিন্তু দর্জি সাহেব সেদিন রীতিমতো উগ্র হয়ে উঠলেন : অপমানজনক ভাষায়, তাচ্ছিল্যের সুরে তাঁদের তাড়িয়ে দিতে চাইলেন। তখন দলের একজন হিজড়া এমন একটি কাণ্ড করে বসলেন যা আমার আজীবন মনে থাকবে। তিনি তাঁর পোশাক খুলে ফেললেন।

দোকানের ভেতরে, বাইরে : আশেপাশের সকলে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তারপর সেই হিজড়া আবার দর্জির দিকে তাকিয়ে চাঁদা চাইলেন। দর্জি সাহেব লজ্জায় আর বিব্রতে একশত টাকার একটি নোট এগিয়ে দিলেন, মাফ চাইলেন এবং চলে যেতে বললেন। হিজড়ারা টাকা নিয়ে চলে গেলেন — একেবারে স্বাভাবিকভাবে, যেন কিছুই হয়নি। সেদিন বুঝেছিলাম, মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য আর কোনো সম্মানজনক পথ খোলা পায় না, তখন সে অপমানকেই অস্ত্র বানাতে শেখে।

লুধুয়া সাহেব যদি সেদিন উপস্থিত থাকতেন তাহলে তাঁর কৌতূহল হয়তো মিটত। আর তিনি যদি বিভিন্ন উদ্যানে রাতের দিকে একটু হেঁটে আসতেন তাহলেও জানার সুযোগ হতো। কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায় — হিজড়াদের অধিকার নিয়ে লিখতে বসে একজন লেখকের মাথায় প্রথমে কোন প্রশ্নটি আসে, সেটি একটি জাতির মানসিকতার পরিচয় দেয়। সমস্যাটা হলো হিজড়ারা চাঁদাবাজি করেন কারণ সমাজ তাঁদের সামনে অন্য কোনো পথ রাখেনি। পরিবার বিতাড়িত করেছে, বিদ্যালয় গ্রহণ করেনি, নিয়োগকর্তারা দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে তাঁদের ব্যাংক ও ট্রাফিক বিভাগে চাকরি দেওয়া হয়েছে, ফলাফল ইতিবাচক। বাংলাদেশে সে আলোচনা নেই। আলোচনা আছে কীভাবে তাঁরা যৌনমিলন করেন। কারণ মস্তিষ্কটা যেখানে ঘোরে, প্রশ্নটাও সেখানেই জন্ম নেয়।

রেজা কিবরিয়া বিএনপির হয়ে এবারের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। বয়স সত্তরের কাছাকাছি, দ্বিতীয় স্ত্রীর বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মাঝামাঝি — দেখতে সুশ্রী এবং কমনীয়। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় প্রচুর মানুষ আসতেন। রেজা কিবরিয়া নিজেই বলেছেন, লোকজন আসত তাঁর স্ত্রীকে দেখতে : রাজনৈতিক কর্মসূচি শুনতে নয়। বিপক্ষে ছিলেন সারজিস আলম। তাঁর সমর্থকেরা অনলাইনে রেজা কিবরিয়ার স্ত্রীকে নিয়ে এমন ভাষায় মন্তব্য করলেন যা উদ্ধৃত করার যোগ্য নয়। রেজা কিবরিয়া মাল নিয়ে ঘোরেন। রেজা কিবরিয়ার ইঞ্জিন এখনো সচল আছে কিনা। নির্বাচনে সারজিস আলম হেরে গেলেন, রেজা কিবরিয়া জিতলেন।

আওয়ামী লীগ আমলে সাবেক রেলমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু প্রৌঢ় বয়সে ত্রিশ বছর বয়সী একজন তরুণীকে বিয়ে করলেন। জাতির মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন — চুন্নু সাহেব এত সুন্দরীকে কীভাবে সামলাবেন? তাঁর ইঞ্জিনের কী অবস্থা ? বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই ভদ্রমহিলা দুই সন্তানের মা হলেন, আইনজীবী হিসেবে পেশায় যোগ দিলেন, নিজের জীবন নিজে গড়লেন। কিন্তু জাতি তখন আর খোঁজ রাখে না। কারণ রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে — যৌনতার রহস্য মিটে গেছে। রহস্য শেষ, আগ্রহ শেষ, মানুষ শেষ।

এই মানসিকতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী শ্রেণিটি হলো অনলাইনের হানি-নাটস ব্যবসায়ীরা। কতিপয় মোল্লা-টাইপের মানুষ মধু, বাদাম, শস্যবীজ একসাথে মিশিয়ে এমন একটি পণ্য তৈরি করেছেন যা বাঙালির সবচেয়ে গোপন এবং সবচেয়ে পুরনো ভয়কে পুঁজি করে। বিজ্ঞাপনের ভাষা ধর্মীয়, পণ্যের প্রতিশ্রুতি অলৌকিক। বাঙালি কিনছেন, বিশ্বাস করছেন, অপেক্ষা করছেন। হাঁটা নেই, নিয়মিত ঘুম নেই, সঠিক সময়ে খাওয়া নেই — কিন্তু হানি নাটস আছে। অথচ পাড়ার গরীব মানুষটি সামান্য ভাত-ডাল খেয়ে তিন-চারটি সন্তানের বাবা হন অনায়াসে। সমস্যাটা শরীরে নয়, মাথায়। আর মাথার সমস্যা মধুময় -বাদামে সারে না।

আধুনিক বাঙালি বিদেশি খাদ্য খান, বিদেশি পোশাক পরেন, বিদেশি ভাষায় স্ট্যাটাস দেন — কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতরে যে সরু গলিটা, সেটির শেষে সর্বদা একটিমাত্র বিষয় বসে থাকে। হকিং-এর অক্ষমতা, হিজড়ার শরীর, প্রৌঢ়ের দ্বিতীয় বিয়ে, রাজনীতিকের স্ত্রী — সব পথ গিয়ে মেলে একই মোহনায়। এই মস্তিষ্কে উৎপাদনশীল চিন্তার জায়গা সংকুচিত, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন গৌণ, মানুষের মর্যাদার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় এই নয় যে বাঙালি যৌনতা নিয়ে ভাবেন। সেটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা, সর্বজনীন। দুঃখজনক হলো — হিজড়াদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয় তাঁদের শরীর দিয়ে এবং শেষও হয় তাঁদের শরীর দিয়ে। মাঝখানে তাঁদের ক্ষুধার কথা, তাঁদের মর্যাদার কথা, তাঁদের আইনি অধিকারের কথা — কোনোটাই তেমন আসে না। Epstein ফাইলে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ নথি আছে, সেখানে হকিং নিয়ে মিমস বানানো হয়। রাজনীতিতে নীতি ও যোগ্যতার প্রশ্ন আছে, সেখানে প্রার্থীর স্ত্রীকে নিয়ে কুৎসা রটানো হয়। মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আছে, সেখানে হানি নাটস বিক্রি হয়।

স্টিফেন হকিং একটি কথা বলেছিলেন — বুদ্ধিমত্তার সীমা আছে, কিন্তু মূর্খতার কোনো সীমা নেই। তিনি নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ফেসবুক ফিড দেখে এই কথাটি বলেননি। কিন্তু বলে থাকলে ভুল বলেননি।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:৫২

মিরোরডডল বলেছেন:





ভালো লিখেছে কুতুব, সহমত।

এবার আসা যাক লুধুয়া সাহেবের কথায়। তিনি ইসলামে হিজড়াদের অধিকার নিয়ে লিখতে বসেছিলেন — বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই।

যদি ভুল না করে থাকি, এই লেখাটা যে ক্লাউনের, সে লুধুয়া না।

এই পোষ্টে লুধূয়ার কমেন্ট পড়লে বুঝতে পারবে, সে ভিন্ন ব্লগার


আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.