| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যখন নরেন্দ্র মোদি তেল আবিবের বিমানবন্দরে নামলেন, তখন বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ জানত না যে ঠিক ৪৮ ঘণ্টা পরে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যাবে। কিন্তু মোদি জানতেন। নেতানিয়াহু জানতেন। আর সেই কারণেই এই সফরের তারিখ এত নিখুঁতভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে যেগুলো দেখতে সাধারণ কূটনীতির মতো, কিন্তু আসলে সেগুলো একটা দেশের আত্মার ঘোষণাপত্র। এই সফরটা ছিল তেমনই।
কিন্তু এই ঘোষণাপত্রের মূল্য কত, সেটা বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরতে হবে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা মনে করুন। রাশিয়া সবে ইউক্রেনে ট্যাংক পাঠিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ইমরান খান মস্কোতে পুতিনের পাশে বসে মুসকি হাসছিলেন। ছবিটা তখন বিশ্ব মিডিয়ায় ঘুরছিল ; একজন নেতা যুদ্ধের দিনে শত্রুপক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। এক মাসের মধ্যে অবিশ্বাস্য গতিতে ইমরান খানের সরকারের পতন হয়েছিল, এবং আমেরিকার সাথে সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে পাকিস্তানে রাজনীতির চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। মোদি সেই পাঠ মনে রেখেছেন। ইমরান খান ভুল পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আর মোদি ঠিক পাশে। ভূরাজনীতিতে সততার চেয়ে টাইমিং বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এই সত্যটা মোদি হাড়ে হাড়ে বোঝেন।
মোদি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে এই সাইড বেছে নিয়েছেন , নাকি আমেরিকার চাপে বাধ্য হয়েছেন ? উত্তরটা এখন আর অনুমানের বিষয় নয়, কারণ সংখ্যাগুলো কথা বলছে। গত বছর আগস্টে আমেরিকা ভারতের উপর ৫০ শতাংশ টারিফ চাপিয়েছিল শুধুমাত্র রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনার অপরাধে। ফেব্রুয়ারিতে সেই টারিফ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শর্ত ছিল রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে হবে, আমেরিকার তেল কিনতে হবে। ভারত সেই শর্ত মেনেছিল। তারপর মোদি ইসরায়েল গেলেন, যুদ্ধ শুরু হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেল।
হরমুজ বন্ধ হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে আমেরিকার Treasury Department ঘোষণা করল : ভারত ৩০ দিনের জন্য আবার রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে। Treasury Secretary Scott Bessent বললেন এটা global energy crisis সামলানোর জন্য। আমেরিকা প্রথমে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করিয়েছে, তারপর নিজেই সেই তেলের উপর নির্ভর করতে বাধ্য করেছে, এবং এখন যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে বলছে আচ্ছা, আপাতত রাশিয়ার তেল নাও। ভারত এই পুরো চক্রে একটা পণ্যের মতো ব্যবহৃত হয়েছে।
এই চক্রের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটা দেখা যাচ্ছে পারস্য উপসাগরে। আজ সেখানে ৩৭টি ভারতীয় জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এক হাজার একশো নয়জন ভারতীয় নাবিক হরমুজ প্রণালির দুই পাশে ভেসে আছেন ; যেতে পারছেন না, আসতে পারছেন না। এই জাহাজগুলোয় আছে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি, LPG, বাণিজ্যিক পণ্য। আর ইতিমধ্যে দুজন ভারতীয় নাবিক মারা গেছেন ; বিহারের অশিষ কুমার, রাজস্থানের দলিপ সিং। তারা কোনো রাজনীতি বুঝতেন না। তারা শুধু পরিবারের জন্য রোজগার করতে সমুদ্রে গিয়েছিলেন।
চাবাহার বন্দরের গল্পটা এই প্রেক্ষাপটে না বললে পুরো ছবিটা অধূরা থাকে। ভারত সেখানে বারো কোটি ডলার ঢেলেছে । স্বপ্নটা ছিল পাকিস্তানকে বাইপাস করে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানো, চিনের গোয়াদর বন্দরের বিপরীতে একটা কাউন্টারওয়েট তৈরি করা। মোদি নিজে যাকে সোনার দরজা বলেছিলেন। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ডেডলাইনের আগেই পুরো টাকা ইরানে পাঠিয়ে বোর্ড থেকে পরিচালকরা পদত্যাগ করেছেন, ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয়নি।
কিন্তু এখন সেই জুয়ার বোর্ডে আগুন লেগেছে। মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় চাবাহারে দুটো বিস্ফোরণ হয়েছে — সেখানকার air base ও naval base লক্ষ্য করে। Outlook Business India-র civilian terminal এখন পর্যন্ত directly destroyed হয়েছে বলে confirmed নয় এবং এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আসে। এটা কি coincidence, নাকি মোদির ইসরায়েল সফরে নেতানিয়াহুর সাথে এই understanding হয়েছিল যে , military zone hit করো, কিন্তু India-র civilian terminal ছেড়ে দাও? সরাসরি প্রমাণ নেই। কিন্তু timing এবং selectivity দেখে diplomacy বোঝে এমন যে কেউ প্রশ্নটা করবেন।
তবু এই সব হিসাবের মাঝখানে বসে একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে ; দশকের পর দশক ধরে যে দেশটা ভারতের পাশে ছিল, ১৯৯৪ সালে OIC-তে কাশ্মীর প্রশ্নে যে দেশটা ভারতকে রক্ষা করেছিল, সেই ইরানকে ভারত কি অন্তত একবার সতর্ক করতে পারত? উত্তরটা হলো না — এবং এই না-টাই হয়তো ইতিহাসে ভারতের সবচেয়ে দামি নীরবতা হয়ে থাকবে।
ভারতের কি উচিত ছিল ইরানের পক্ষে দাঁড়ানো ? এই প্রশ্নটা আসলে ভুল প্রশ্ন। কারণ সৌদি আরব মার্কিন-ইসরায়েলি অপারেশনকে সমর্থন দিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। UAE ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিজেই ইন্টারসেপ্ট করেছে। পাকিস্তান সব পক্ষকে সংযত হতে বলার নাটক করেছে। তুরস্ক চুপ। তাহলে ভারতকে কেন একাকী কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে? সত্যিকারের প্রশ্নটা হলো ভিন্ন : মোদি কি অন্তত চুপ থাকতে পারতেন? কিয়েভ ও মস্কো দুই জায়গায় গিয়ে যুদ্ধের সময় নয় বলার যে কৌশল তিনি ইউক্রেন প্রশ্নে নিয়েছিলেন, সেই একই কৌশল তিনি ইরানের ক্ষেত্রে নিতে পারতেন। কিন্তু এবার তিনি সেই পথ বেছে নেননি। এবার তিনি যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে এক পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ভূরাজনীতির এই খেলায় সবচেয়ে মর্মান্তিক মুহূর্তটা তৈরি হয়েছিল তখন, যখন ভারতের আমন্ত্রণে যোগ দিয়ে ফিরতি পথে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ মার্কিন আঘাতে ডুবে গেল। ভারতের সমুদ্রসীমার কাছে, ভারতের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা অতিথির জাহাজ ডুবল আর দিল্লি নীরব রইল। একজন অতিথিকে রক্ষা করতে না পারা এক কথা, কিন্তু শোকটুকুও না জানানো আরেক কথা। এই নীরবতা কৌশলগত হতে পারে, কিন্তু এটা নৈতিকভাবে ভারতের সেই 'পৃথিবী একটি পরিবার'' এই দাবির সাথে মেলে না।
আমেরিকার এই পুরো কৌশলটা এখন অনেক স্পষ্ট। ভারতকে দিয়ে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করাও, তারপর মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়ে তাকে আবার রাশিয়ার কাছে ফেরত পাঠাও এবং বলো এটা temporary ; তারপর আমাদের তেল কিনতে হবে। পুরো চক্রে ভারত একটা pawn হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু মোদির হিসাব হয়তো ভিন্ন - এই যন্ত্রণার বিনিময়ে একটা বড় পুরস্কার পাওয়া যাবে। নেতানিয়াহু যে ছয় দেশের নিরাপত্তা জোটের কথা ঘোষণা করেছেন, তার অন্যতম প্রধান সদস্য ভারত। কাশ্মীরে, দেশের ভেতরে মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটা blanket protection পাওয়া যাবে ।
পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া ৩৭টি জাহাজের ওপর বসে থাকা এক হাজার একশো নয়জন নাবিক এখন যা ভাবছেন, তা হয়তো এই দেশের কোনো হিসাবের খাতায় নেই। তারা শুধু চাইছেন বাড়ি ফিরতে। কিন্তু রাজনীতির যে বাজি ধরা হয়েছে, তার মূল্য প্রথমে দিতে হয় সবসময় তাদেরই, যারা বাজি ধরেননি।
©somewhere in net ltd.