| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে সবার আগে কানে ভেসে আসে মিলাদ মাহফিলের সেই ভক্তিভরা সুর। "ইয়া নবী সালামু আলাইকা, ইয়া রাসূল সালামু আলাইকা"-এই পঙক্তিগুলো যখন সমস্বরে পড়া হতো, তখন মনে হতো চারপাশের বাতাস যেন এক অদ্ভুত পবিত্রতায় ভারী হয়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতি আমাদের শেকড়ে কত গভীরে মিশে আছে, তা বোঝা যায় ১৯৬৭ সালের 'আনোয়ারা' সিনেমাটি দেখলে। সেখানে মিলাদ আর কিয়ামের যে দৃশ্যটি চিত্রায়িত হয়েছিল, তা ছিল তৎকালীন বাংলার মানুষের এক অকৃত্রিম ও শাশ্বত ঐতিহ্যের দলিল।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিক এভাবেই অন্তরের সবটুকু আকুতি ঢেলে নবীর শানে দরুদ পড়তেন। চট্টগ্রামে বড় হওয়ার সুবাদে আমরা দেখতাম, কোনো রকম প্রশ্ন ছাড়াই বড় বড় হুজুরদের উপস্থিতিতে সবাই দাঁড়িয়ে কিয়াম আর সালাম জানাচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ঢাকায় এলাম, দেখলাম এখানকার ধর্মীয় চর্চার দৃশ্যপট কিছুটা ভিন্ন। এখানকার অনেক হুজুর বসে বসে কিয়াম করেন। মামারা যখন ঢাকায় আসতেন, তারা রসিকতা করে এই হুজুরদের নাম দিয়েছিলেন 'বে কিয়ামি'। আমরা অবশ্য সময়ের সাথে সাথে এই দুই ধরণের ভিন্ন চর্চাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
পারিবারিক আবহের ভেতর যে বৈচিত্র্য ছিল, তা মাঝেমধ্যে আমাকে বেশ অবাক করত। আমার মরহুম মেজো চাচা, যিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর ছিলেন, তাকে নিয়ে আমার অন্যরকম ধারণা ছিল। ভাবতাম, যেহেতু তিনি জামাতপন্থী ঘরানার একজন শিক্ষিত মানুষ, তিনি হয়তো দাড়িয়ে কিয়াম এড়িয়ে চলবেন। কিন্তু নামাজের পর তাকে যখন দাঁড়িয়ে ভক্তিভরে কিয়াম করতে দেখলাম, আমার সেই ধারণা পাল্টে গেল। অথচ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে চট্টগ্রামে সুন্নি ঘরানার মসজিদগুলোর সাথে তাদের যে তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল, তা সামাল দিতে চাচাকে হিমশিম খেতে হতো। চট্টগ্রামের হুজুররা মনে করতেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন মানেই জামাতিদের আস্তানা, তাই তাদের নিয়ন্ত্রণে আসতে তারা নারাজ ছিলেন।
ধর্মীয় উৎসবের সাথে খাবারের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকে। চট্টগ্রামে ঈদে মিলাদুন্নবী বা ওরস শরিফ মানেই ছিল আখনী ভাতের ধুম। এখনকার নামী দামী রেস্টুরেন্টে যে আখনী পাওয়া যায়, তার স্বাদ সেই তবারকের আখনীর ধারের কাছেও লাগে না। মামাদের সুবাদে মাইজভান্ডারী দরবারের আখনী খাওয়ার সুযোগও হয়েছে অনেকবার। সেই দরবার আর পীর মুরিদি নিয়ে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ছোট মামার এক বন্ধু এক পীরের খুব মুরিদ হয়েছিলেন, দিনরাত পীরের সেবাতেই কাটত তার। একদিন নাকি তিনি স্বপ্নে দেখলেন কেউ তাকে বলছে, "পীর মুরিদি বাদ দিয়ে বাড়ি যাও, তোমার মা অসুস্থ। জীবিত বাবা মায়ের চেয়ে বড় আল্লাহর অলি আর কেউ নেই।" সেই থেকে তিনি সব ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেন।
বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের চারপাশের আদর্শিক উগ্রতাগুলোও প্রকট হয়ে সামনে আসতে শুরু করল। গ্রামে গেলে ফুফাতো ভাইদের কাছে মাজার নিয়ে তীব্র নেতিবাচক কথা শুনতাম। তারা মাজার কে দুর্গা পূজার সাথে তুলনা করত এবং অবলীলায় বলত যে একদিন নাকি বাংলাদেশের সব মাজার মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। এখন যখন দেখি বর্তমান সময়ের খেলাফতপন্থীরা হুবহু একই কথা বলছে, তখন বুঝি এই উগ্র চিন্তার শিকড় আসলে কতটা গভীরে। চট্টগ্রামে যারা সুন্নি ঘরানার হুজুর ছিলেন, তাদের অনেক সময় তাচ্ছিল্য করে ডাকা হতো 'শিন্নি খোর'। এই বিচিত্র মতবাদ আর অদ্ভুত সব বৈরী পরিবেশের মাঝেই আমরা অনেকেই বেড়ে উঠেছি ।
২০১৯ সালের একটি ঘটনার কথা বেশ মনে পড়ে, তখন আমাদের কোচিং ব্যবসা ছিল। নাসিম নামের এক অত্যন্ত মেধাবী ছেলেকে পড়াতাম , যে এখন বুয়েটে পড়ছে। ছেলেটা অসম্ভব বিজ্ঞানমনস্ক আর আধুনিক চিন্তার অধিকারী। অথচ তার বাসায় প্রথম দিন গিয়ে দেখি দেয়ালজুড়ে আটরশি পীরের (ফরিদপুর) দরবারের পোস্টারে সয়লাব। নাসিমের বাবা ছিলেন আটরশি পীরের একনিষ্ঠ মুরিদ। এমনকি তার অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রায় সবাই ওই পীরের ভক্ত ছিলেন। ওরস শরিফের সময় দেখতাম নাসিমের বাবা দলবেঁধে ট্রাকে করে ছাগল নিয়ে রওনা হতেন। আমি হাসতে হাসতে যখন একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম , "ছাগল কোলে করে নিয়ে যেতে কেমন লাগে?" তিনি হেসে উত্তর দিতেন, "হুজুরের দরবারে যাচ্ছি।" নাসিম অবশ্য বাসায় এসব মাজারি পরিবেশ দেখে খুব বিরক্ত হতো, কারণ সবাই তাকে নিয়ে মজা করতো ।
চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ ছিল এক সময় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়। আমার বড় মামী, যিনি জামাতের রুকন আর পেশায় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, তিনি আমার আম্মাকে নিয়ে যেতেন সেই ওয়াজ মাহফিলে। মামী প্রায়ই দাবি করতেন, সাঈদী সাহেবের মাহফিলে নাকি দলে দলে হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণ করছে, যদিও আমার আম্মা সচক্ষে তেমন কিছু দেখেননি। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সাঈদীর ক্যাসেটগুলো তখন দেশের কোণায় কোণায় পৌঁছে গিয়েছিল। বাংলাদেশে ওয়াজ যে আজ এক বিশাল বিনোদন আর বার্ষিক ব্যবসার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার ভিত্তিটা মূলত ওখান থেকেই তৈরি। এখনকার ডিজিটাল যুগে ওয়াজ যেন অনেকটা প্রাচীন গ্রামীণ পুঁথি পাঠের আধুনিক সংস্করণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পবিত্র কিতাবের নির্দেশের চেয়ে অলৌকিক কিচ্ছা কাহিনী আর বক্তার কণ্ঠের সুর বেশি প্রাধান্য পায়।
আজকাল অনেক হুজুর যারা ওয়াজ-মাহফিলে 'ইয়াহুদি-নাসারাদের' গালি দেন, তারা আবার সেই প্রযুক্তি আর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেই আজ কোটিপতি। সালাফি বা আহলে হাদিস ঘরানার বক্তারা মাজার নিয়ে যেভাবে আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক কথা বলেন, সেই তুলনায় সুন্নিরা অনেক বেশি সহনশীল। এসব আবেগী ওয়াজ শুনে গ্রামের সাধারণ ও দুঃখী মানুষগুলো এক অপার্থিব স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, এই ধর্মীয় মোহ থেকেই হয়তো অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখেন; যেন একটু সচ্ছলতার পাশাপাশি মক্কা-মদিনার পবিত্র মাটি স্পর্শ করা যায়।
সম্প্রতি মতলবের একটা ওরস বন্ধ করে দেওয়া হলো। মিডিয়াতে খুব কৌশলে প্রচার করা হলো যে সেখানে মদ আর গাঁজার আসর বসেছে। নামটা 'লেংটা শাহ' হওয়াতে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা দেওয়া সহজ হয়েছে, অথচ উনার পুরো নাম হযরত শাহ সুফি সোলায়মান রহ.। খবরগুলো এমনভাবে করা হয় যাতে সাধারণ মানুষ মাজার ভাঙার ব্যাপারে এক ধরণের পরোক্ষ সম্মতি দেয়। অথচ মাজার সংস্কৃতির মানুষজন সাধারণত খুব একটা উগ্র হয় না। মাজারের ভেতরে যেসব অবৈধ কার্যকলাপ চলে, সেগুলো আইনের মাধ্যমে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেখানে যদি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প বা সাহায্য তহবিল করা হতো, তবে তা দেশের ঐতিহ্যের পাশাপাশি মানবতারও কাজে লাগত। মাজার সংস্কৃতি এ দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য, তাকে উগ্রতা দিয়ে নয় বরং সংস্কার দিয়ে টিকিয়ে রাখাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত ।
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৩৯
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: মিলাদ কিয়াম ১৯৬৭ সাল ,
বাংলা চলচ্চিত্র ছবিতে নায়ক রাজ্জাকের অভিনয়ে এক অংশের তারা কি সুন্দর ভাবে মিলাদ কিয়াম করছে।
Bangla movie (Anowara 1967)Nayok Raj Rajjak)
https://youtu.be/Ga1NPgk6jP4