নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

মাফিয়া ট্রাম্পের নজর এবার ফুটবল বিশ্বকাপে....

০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


একটা ফোন কল কতটা শক্তিশালী হতে পারে, সেটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পেল গোটা ফুটবল দুনিয়া। বসনিয়ার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে মার্কিন ফুটবলার বালোগুনের নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল বেলজিয়াম ম্যাচে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিফা সভাপতিকে ফোন করলেন, আর তাতেই বদলে গেল ষাট বছরের নিয়ম। মনে হচ্ছিল যেন রেফারির লাল কার্ড কোনো ব্যাপারই না, আসল সিদ্ধান্ত নেয় হোয়াইট হাউজের ল্যান্ডলাইন। বালোগুনের লাল কার্ড এক বছর স্থগিত করা হয়েছে ।

উয়েফা এই ঘটনয় রেগে আগুন। তারা বলল এই সিদ্ধান্ত নাকি ফুটবলের সবচেয়ে বড় রেড লাইন পার করে ফেলেছে। ১৮৮টা লাল কার্ডের ইতিহাসে মাত্র একবার এমন হয়েছিল, ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের গারিঞ্চার বেলায়, তাও নাকি সেই সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক চাপে হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল। মানে ছয় দশক পর আবার সেই একই খেলা ফিরে এলো, শুধু ফোনটা এবার সরাসরি প্রেসিডেন্টের।

বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত মুখ খুলে ফেললেন। তিনি বললেন যদি একটা ফোন কলেই এত বড় সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়, তাহলে এটাই খেলাধুলার সবচেয়ে মৌলিক নিয়ম ভাঙার নজির। ফিফার সাবেক প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটারও চুপ থাকতে পারলেন না, তিনি লিখলেন ফুটবল কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলার মাঠ হওয়া উচিত না। ভাবা যায়, যে ব্লাটার নিজেই একসময় ফিফার সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র ছিলেন, তাকেও আজ নীতিকথা বলতে হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রীড়া কমিশনারও একই সুরে বললেন খেলার সিদ্ধান্ত খেলার সংস্থাই নেবে, রাজনীতিবিদ না। কথাটা শুনতে সুন্দর, কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে তার সাথে এই বাণী কতটা মিলছে সেটা সবাই বুঝতে পারছে।

তবে ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হোস্ট দেশের এমন প্রভাব খাটানো এবারই প্রথম না, শুধু পদ্ধতিটা পাল্টে গেছে। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের মাঠে ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে একটা বল ক্রসবারে লেগে নিচে পড়েছিল, রেফারি আর লাইন্সম্যান মিলে গোল দিয়ে দিলেন, বহু বছর পর প্রযুক্তি দিয়ে প্রমাণ হলো বলটা আসলে লাইনই পার হয়নি। সেই গোলেই ইংল্যান্ড প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। খোদ ফিফার সাবেক প্রেসিডেন্ট জোয়াও হাভেলাঞ্জ পরে স্বীকার করেছিলেন সেই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের ম্যাচ পরিচালনা করা রেফারি আর লাইন্সম্যানদের বেশিরভাগই ছিলেন ব্রিটিশ আর জার্মান, ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল, ব্রাজিল বাদ পড়ে গিয়েছিল, ইংল্যান্ড আর জার্মানি ফাইনালে পৌঁছেছিল।

আট বছর পর জার্মানি নিজের মাঠেই একই সুবিধা তুলে নেয়। হাভেলাঞ্জের ভাষায় সেবারও রেফারি বাছাই থেকে শুরু করে সবকিছুই এমনভাবে সাজানো ছিল যাতে হোস্ট দেশ জিতে যায়। একজন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় নিজেই বলেছিলেন ব্রাজিল নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যে ম্যাচ হেরেছিল সেই ম্যাচে রেফারি ছিলেন জার্মান, আর তারপরই জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। ফাইনালের ঠিক আগের রাতে জার্মান পত্রিকা বিল্ড আরেক কাণ্ড ঘটায়, ডাচ খেলোয়াড়দের হোটেলে সিকিউরিটিকে ঘুষ দিয়ে কিছু মেয়ে পাঠিয়ে দেয়, তারপর প্যাপারাজ্জি দিয়ে স্ক্যান্ডাল বানিয়ে ফেলে, ডাচ খেলোয়াড়রা সারারাত স্ত্রীদের ফোনে বোঝাতে ব্যস্ত থাকেন, পরদিন ফাইনালে হেরে যান।

চার বছর পর আর্জেন্টিনার পালা। তখন দেশে সামরিক জান্তার শাসন চলছে, হাজার হাজার মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, আর সেই জান্তাই বিশ্বকাপকে নিজেদের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে। ফাইনালে ওঠার জন্য আর্জেন্টিনার পেরুর বিপক্ষে চার গোলের ব্যবধানে জিততে হতো, তারা জিতে যায় ছয় গোলে। অভিযোগ আছে ম্যাচের আগে জান্তা প্রধান নিজে পেরুর ড্রেসিংরুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলেন, আর তার কিছুদিন পরই আর্জেন্টিনা থেকে বিশাল পরিমাণ গম পাঠানো হয় পেরুতে, পেরুর আটকে থাকা টাকাও ছেড়ে দেওয়া হয় আর্জেন্টিনার ব্যাংক থেকে। সেবারই আর্জেন্টিনা প্রথম বিশ্বকাপ জেতে।

তার চার বছর পর জার্মানি আবার খবরের শিরোনামে আসে, তবে এবার হোস্ট হিসেবে না, তবে নিজেদের সুবিধার জন্য প্রতিবেশী অস্ট্রিয়ার সাথে মিলে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটায়। দুই দলই জানত একটা নির্দিষ্ট ব্যবধানে জার্মানি জিতলে দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে, আফ্রিকার আলজেরিয়া বাদ পড়বে। জার্মানি গোল দেওয়ার পর দুই দলই খেলা প্রায় থামিয়ে দেয়, বল পাস দিতে থাকে কোনো আক্রমণ ছাড়াই। জার্মান আর অস্ট্রিয়ান ধারাভাষ্যকাররা লজ্জায় লাইভ সম্প্রচারেই দর্শকদের বলে দেন এই ম্যাচ না দেখে চ্যানেল ঘুরিয়ে ফেলতে। ফিফা তদন্ত করে বলে কোনো নিয়ম ভাঙা হয়নি, তবে এই লজ্জার পরই নিয়ম পাল্টে গ্রুপের শেষ দুই ম্যাচ একসাথে খেলানো শুরু হয়।

এরপর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সহ আয়োজক হিসেবে সুবিধা পায় বলে অভিযোগ ওঠে। ইতালি আর স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্তের সুবাদে তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা নিয়ে আজও আলোচনা হয় ফুটবল বিশ্বে।

আসলে এই তালিকাটা বেশ লম্বা। ইংল্যান্ড বল লাইন পার হওয়ার আগেই গোল পেয়েছিল, জার্মানি দুইবার নিজেদের সুবিধা বুঝে নিয়েছিল, আর্জেন্টিনা গম আর টাকা দিয়ে প্রতিপক্ষকে নরম করে দিয়েছিল, দক্ষিণ কোরিয়া রেফারির বাঁশির জোরে সেমিফাইনালে উঠেছিল। তফাৎ শুধু এইটুকুই, আগে এসব হতো গোপনে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকিয়ে বা রাতের অন্ধকারে মেয়ে পাঠিয়ে, রেফারি বাছাইয়ে চুপিসারে কারসাজি করে। এখন আর লুকোছাপার দরকার পড়ে না, প্রেসিডেন্ট নিজেই সোজা ফোন করেন, ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে ধন্যবাদও জানিয়ে দেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কাণ্ডটি আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সেই বিতর্কিত ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়। আমেরিকা ফাইনালে উঠলে ট্রাম্প যে ডলারের ফুলঝুরি আর ক্ষমতার জোরে প্রতিপক্ষকে কিনে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না তা কে বলতে পারে! কিন্তু ফুটবল নিয়ে তাঁর হঠাৎ মাতামাতির কারণ কী? আসলে নিজ দেশে তাঁর জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। ইসরায়েলের কথায় ইরানে যুদ্ধ করতে গিয়ে যেমন নাজেহাল হয়েছেন, তেমনি ইউরোপের সাথেও সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। এখন ঘরোয়া রাজনীতির এই ভরাডুবি ঠেকাতে তিনি ভেনেজুয়েলার মতো বিশ্বকাপটাও জোর করে দখল করে জনগণকে উপহার দিতে চান। তবে ট্রাম্পের এই সব হিসাব-নিকাশ আজই ওলটপালট হয়ে যেতে পারে, যদি বেলজিয়াম আমেরিকাকে বিদায় করে দেয়। এতে ট্রাম্পের মন খারাপ হলেও, জয় হবে ফুটবলের।

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:০৪

জ্যাক স্মিথ বলেছেন: বিশ্বকাপটা সে জোড় করে নিজের কাছে রেখে দেয় কি না আমি সেই চিন্তায় আছি।
ট্রাম্পের মত লোকজন বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক।

০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০৬

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: সঠিক বলেছেন ।

২| ০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১৯

সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই বলেছেন: অবাক হবার কিছুই থাকবে না যদি আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হয়। দুই হোস্ট কানাডা আর মেক্সিকো অলরেডি আউট, আমেরিকা এখনো জীবিত। ইতিমধ্যে কী প্ল্যান সাজানো হয়েছে তা আল্লাহই মালুম।

০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০৭

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: সবার মনে একই আশংকা ।

৩| ০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৬

নিমো বলেছেন: শোকর করেন কেবল ফোনই করেছে, আমাদের মত কোন কিছু চাপাচাপি করে বি।

০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০৮

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: মাফিয়ার ফোন পেয়ে ফিফা বসের কিছু কাধে উঠে গেলেও অবাক হবো না ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.