| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
শিরোনামটা একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে কিছুদিন ধরে বিদ্যুতের দাম, ভর্তুকি আর লোডশেডিং নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে, তাতে প্রশ্নটা একেবারে অযৌক্তিক নয়। কারণ সরকার বদলেছে, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তো দেশ ছেড়ে যায়নি। সঞ্চালন লাইনগুলোও কেউ খুলে নিয়ে যায়নি। তাহলে যে দেশে কয়েক বছর আগে বলা হতো বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে গেছে, সেই একই দেশে আজ আবার বিদ্যুতের দাম, ভর্তুকি আর সরবরাহ নিয়ে এত আলোচনা কেন?
শেখ হাসিনার সরকারের বিদ্যুৎনীতির সমালোচনার শেষ ছিল না। বিশেষ করে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেওয়া, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং এই খাতে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন ছিল অনেক। এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই সমালোচনার মধ্যেও একটা বিষয় আমরা হয়তো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি। শেখ হাসিনার সরকারের নিজের পরিকল্পনাই ছিল একসময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।
২০২৩ সালের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সরকার এমন আইন করেছিল, যার মাধ্যমে চাইলে গণশুনানি ছাড়াই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যেত। এর পেছনে আইএমএফের শর্তও ছিল। ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার কথা ছিল সেই শর্তের অংশ হিসেবে। সেই সরকার আজও থাকলে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১৫ বা ১৬ টাকায় পৌঁছাত। অথচ এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ৮৩ পয়সা।
কেন এই দাম বাড়ানোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল? এর পেছনের যুক্তিটা ছিল মোটামুটি পরিষ্কার। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে টেকসই করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। গরিব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে ভর্তুকির প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেই ভর্তুকি অনন্তকাল চালিয়ে যাওয়া পুরোপুরি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের চুরি, অপচয় ও নানা ধরনের অনিয়ম সামলে সরবরাহ ধরে রাখার চাপও ছিল। সেই সময় আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পেছনেও ছিল অর্থনীতিকে কিছুটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা।
শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগগুলোর একটি ছিল, সরকার অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনেছে। অভিযোগটির যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু শুধু বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য দিয়ে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। কেন এত দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে হলো, কী ধরনের চুক্তি করা হয়েছিল, কার কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে, চুক্তিগুলো কতটা স্বচ্ছ ছিল, আরও কম খরচে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল কি না, এসব প্রশ্নও একই সঙ্গে দেখতে হবে। কারণ দাম দিয়ে কেনা বিদ্যুৎ উপায় না দেখে কেনা হলেও, সেটা ব্যবহার করে যদি মানুষের প্রোডাক্টিভিটি কয়েক গুণ বাড়ানো যেত, তাহলে এই দাম গায়েই লাগত না।
আমরা সাধারণত বিদ্যুতের দাম, সরকার কত ভর্তুকি দিচ্ছে অথবা বিদ্যুৎ খাতে কত টাকা লোকসান হচ্ছে, সেসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আমরা আসলে কতটা উৎপাদন, কতটা আয় এবং কতটা অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছি, সেই প্রশ্ন খুব কমই করি। একটি দেশের বিদ্যুৎনীতি ভালো কি খারাপ, শুধু ইউনিটপ্রতি দাম দেখে বিচার করা যায় না। হিসাব করতে হবে সেই বিদ্যুৎ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে।
আসল প্রশ্নটা এখানেই। দাম নয়, রিটার্ন। বিদ্যুতের দাম কত, সরকার কত ভর্তুকি দিচ্ছে কিংবা বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে ভর্তুকি দিয়ে তা সস্তা করে ছাড়া হচ্ছে, সেটা আসলে গৌণ। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে আমরা কতটুকু অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারছি। অর্থনীতির ভাষায়, এটাই বিদ্যুতের উৎপাদনশীলতা বা রিটার্ন।
দুটো দৃশ্য কল্পনা করুন। সরকার ভর্তুকি দেওয়ার পর পাঁচ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে যদি মাত্র দশ টাকার পণ্য বা সেবা তৈরি হয়, তাহলে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের রিটার্ন কম। কিন্তু একই পাঁচ টাকার বিদ্যুৎ যদি পঁচিশ বা পঞ্চাশ টাকার পণ্য বা সেবা তৈরিতে কাজে লাগে, যেমন ওষুধশিল্প, প্রযুক্তি কিংবা উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাতে, তাহলে সেই বিদ্যুতের অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। বিদ্যুতের আসল খরচ আরও বেশি হলেও তার মাধ্যমে যদি কয়েক গুণ বেশি উৎপাদন, আয় কিংবা রপ্তানি তৈরি করা যায়, তাহলে সেই বাড়তি খরচ অর্থনীতির জন্য বোঝা নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যায়। উল্টো দিকে, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে ভর্তুকি দিয়ে তা সস্তা রাখার পরও যদি সেই বিদ্যুৎ কম উৎপাদনশীল বা অলাভজনক কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই ভর্তুকি শুধু রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর চাপ বাড়ায় না, শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সমস্যাটা এখানেই। বিদ্যুতের সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা ও আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল অর্থ খরচ করেছি, কিন্তু সেই বিদ্যুৎকে উচ্চমূল্যের পণ্য ও সেবা, রপ্তানি কিংবা নতুন শিল্পে রূপান্তর করার সক্ষমতা তৈরি করতে পারিনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চুরি, অবৈধ সংযোগ এবং কম উৎপাদনশীল খাতে এর ব্যবহার।
উদাহরণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কথা বলা যায়। প্রায়ই বলা হয়, ‘বাংলার টেসলা’ খ্যাত এই অটোরিকশাগুলোর কারণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের চাপ তৈরি হচ্ছে। মাসে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার হওয়ার কথাও বিভিন্ন আলোচনায় আসে। এই বিদ্যুৎ কি সঠিক দামে কেনা হচ্ছে? বাস্তবতা হলো, অনেক জায়গায় অবৈধ সংযোগের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি বিতরণ প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে এই সংযোগ নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের ওপর।
অটোরিকশাচালকরা দেশের শত্রু, বিষয়টি এমন নয়। আসল সমস্যাটা আরও গভীরে। একজন অটোরিকশাচালক দৈনিক ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। একজন কৃষক বা সাধারণ শ্রমিক কি প্রতিদিন এই পরিমাণ আয় করতে পারেন? শারীরিক পরিশ্রম তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেকেই এই পেশা বেছে নিচ্ছেন। মানুষ যে কাজে বেশি আয়ের মুখ দেখবে, স্বাভাবিকভাবেই সেটার দিকেই ঝুঁকবে। এটাকে শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন বানিয়ে লাভ নেই। কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈরি না করে শুধু অটোরিকশা বন্ধ করার কথা বললে সমস্যার সমাধান হবে না।
আমাদের ব্যবসায়ীরা আজ পর্যন্ত সস্তা শ্রমনির্ভর গার্মেন্টস পণ্য থেকে বেরিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে যেতে পারেননি। অথচ তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকার থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা পেয়ে আসছেন। মানুষকে দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহ খুব বেশি দেখা যায় না। দক্ষ কর্মী, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হলে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজেদের অদক্ষতা এবং অনিয়ম আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত।
সরকারও সারাজীবন ভর্তুকি দিয়ে যেতে পারে না। কোনো দেশের পক্ষেই এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষায় কম টাকা খরচ করেনি। এত বিনিয়োগের পরও জাতীয়ভাবে উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় ইনপুট বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিই, কিন্তু আউটপুট কেমন পাচ্ছি সেদিকে নজর থাকে না। স্কুল বাড়ানো হলো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো হলো, বাজেট বাড়ানো হলো; কিন্তু সেখানে যা শেখানো হচ্ছে, বাজারে তার চাহিদা আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা করা হয়নি।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সিঙ্গাপুর বা কোরিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা মানবসম্পদকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখেনি। শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যে চমৎকার সমন্বয় তৈরি করেছে। আমাদের দেশে প্রকল্প আলাদা, মন্ত্রণালয় আলাদা এবং দায়িত্বও আলাদা। ফলে জবাবদিহিতাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এবার বিদেশি বিনিয়োগের দিকে নজর দেওয়া যাক। শেখ হাসিনার আমলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা কমে আসার পরও কেন প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি? ১৫ বছরে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মোটে ২৫ থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। ভালো বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কেন এই খরা? কারণ শুধু বিদ্যুৎ থাকলেই বিনিয়োগ আসে না। দক্ষ শ্রমিক লাগে, নীতিগত স্থিতিশীলতা লাগে, ভালো প্রতিষ্ঠান লাগে এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা লাগে।
সামনের বাস্তবতা আরও কঠিন। দেশে গ্যাসের মজুত সীমিত। নতুন বড় কোনো মজুত না পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা। আমাদের উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি করতে হবে এবং সেই শিল্পে কাজ করার মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। একই বিদ্যুৎ যদি একজন দক্ষ শ্রমিকের হাতে গিয়ে বেশি ডলার আয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখে, তবে তা অর্থনীতির জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে। শুধু বিদ্যুতের দামই সবকিছুর নিয়ামক নয়; আসল প্রশ্ন হলো, সেই বিদ্যুৎ আমরা আদতে কী কাজে খরচ করছি ।
ফটোকার্ড ক্রেডিট: আওয়াজ নিউজ
©somewhere in net ltd.