নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

মাইনকা চিপা

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৬


এখন পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণীকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই সময়ে হাওরে মাছ ধরে বেকারত্বের শাপ মোচন করতে হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা সহায় থাকলে হয়তো এই চাকরি দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হবে না, কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারকগণ চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এতদিন বেকার বসিয়ে রেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত না করলেই পারত। ওহে দেশের নীতিনির্ধারকগণ, বেকারত্বের এই মানসিক যন্ত্রণা ও চাপ আপনাদের ওপর অভিশাপ হয়ে নেমে আসার আগেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটান-রাহুল দাস (জুলাই ১১, ২০২৬)।

যে মুখ দিয়ে মাকে বলেছিলাম, "মা, প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে," সেই মুখ দিয়ে এখন মাকে কীভাবে বলব—"মা, ভেরিফিকেশনে আটকে দিয়েছে!"-রাহুল দাস (২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
।

এই হলো একজন হতভাগ্য তরুণের বর্তমান অবস্থা। রাহুল দাস নামের ছোটো ভাইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েও এনএসআই ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছে। প্রাইমারিতে যে এনএসআই ভেরিফিকেশন হয়, তা আমার জানা ছিল না। পুলিশ ভেরিফিকেশন পর্যন্ত জানতাম, যেখানে কিছুটা লেনদেন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। রাহুল দাসের সঙ্গে কেন এমন হলো? সরকারই বা কেন প্রাইমারির মতো একটি নিরীহ চাকরিতে এনএসআই ভেরিফিকেশন যুক্ত করল?

ঘটনার প্রেক্ষাপট
গতকাল প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও ভাইভাতে উত্তীর্ণদের চূড়ান্ত নিয়োগের লক্ষ্যে উপজেলাভিত্তিক ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো এনএসআই ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হলো। বিনা কারণে প্রায় বারোশোর অধিক ছেলেমেয়ে বাদ পড়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সারা দেশে এবার মোট পদসংখ্যা ছিল প্রায় চৌদ্দ হাজার। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই সবচেয়ে বড় নিয়োগ। এখনো তিন-চারটি বিসিএস পরীক্ষার গেজেট প্রকাশ বাকি রয়েছে।

নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই এভাবে বাদ পড়ার ঘটনায় পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। কেউ বলছেন ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবির করার কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ বলছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণেই এই পরিণতি। সত্য-মিথ্যা আমার অজানা, তবে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার ভাই-বোনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হয়েছে। সামনে চাকরি ফিরে পাওয়ার হয়তো সুযোগ পাবে , কিন্তু এই আকস্মিক মানসিক অশান্তির দায় কার ?

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা
তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে ৫ই আগস্ট থেকে ১২ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিল ড. ইউনূসের সরকার। পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের ধারণা ছিল সব নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। কিন্তু ঘটেছিল তার সম্পূর্ণ উল্টোটা। একের পর এক সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হতে থাকল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একেবারে শেষ সময়ে, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের দিকে। এর এমসিকিউ পরীক্ষা হয় ৯ জানুয়ারি এবং ভাইভা চলে ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে এনএসআই ও দুদকের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে যুক্ত করে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন করবে, এমন নজির পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এই সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশ পরিচালনা করা, অথচ তারা মেতে উঠেছিল নতুন নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়োগ পরীক্ষায়। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে প্রায় চৌদ্দ হাজার শিক্ষককে এভাবে সুপারিশ করে যাওয়া কি যৌক্তিক ছিল?

ইউনুস সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর যদি দেড় বছর কোনো পরীক্ষা বা বিজ্ঞপ্তি না আসত, তবে অনেকেরই বয়স শেষ হয়ে যেত এবং তারা চিরতরে প্রতিযোগিতার মাঠ থেকে ছিটকে যেত। সেই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা। কিন্তু ক্ষমতার মোহে তারা নিজেদের আখের গোছাতেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছিল। ইউনূস আমলের নিয়োগগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জামায়াত-শিবির প্রার্থীরা সুযোগ পেয়েছেন বলে জনমনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন দলীয় নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার নিজস্ব লোক নিয়োগ দিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের প্রায় দশ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে সেই শূন্যপদে জামায়াতপন্থী লোকজনকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এভাবে তড়িঘড়ি করে এত বড় একটি প্রাথমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় অনেকেই এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, জামায়াতপন্থী চক্র সবসময় শিক্ষা খাতকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানায়। ইউনূস আমলের সময় এক নারী শিক্ষিকা অভিযোগ করেছিলেন যে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একটি বড় অংশই জামায়াত ভাবাপন্ন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই খবর আসত কীভাবে জামায়াত-শিবির শিক্ষাঙ্গনে তাদের জাল বিস্তার করছে। এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে খোদ বর্তমান বিএনপি সরকারও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন, যার প্রমাণ মেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তে।

বর্তমান সরকারের ভয়
সেই একই আতংকের জেরে এনএসআই ভেরিফিকেশন করা হলো । বিগত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি তদবির ও প্রভাব বিস্তার করেছে এনসিপি। তারা পূর্ববর্তী সরকারকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। অনেকে যুক্তি দেখাতে পারেন যে প্রাথমিক শিক্ষকরা সরকারকে কোনো বড় সংকটে ফেলতে পারবেন না; তবে কেন তাদের ওপর এনএসআই ভেরিফিকেশনের খড়্গ নামানো হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে গত বছর অক্টোবর মাসে প্রাথমিক শিক্ষকদের সেই তুমুল আন্দোলনে। সে যাত্রায় অন্তর্বর্তী সরকার কোনোমতে আন্দোলন সামাল দিতে দিতেই বিদায় নেয়। ফলে নতুন সরকারের মনে ভীতি থাকাটা খুব স্বাভাবিক।

প্রাথমিক শিক্ষকদের নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেখানে নিজেদের অনুগত লোক বসাতে পারলে নানামুখী সুবিধা পাওয়া যায় স্বাভাবিকভাবেই। সরকার নতুন হওয়ায় তাদের মধ্যে অতিরিক্ত সতর্ক মনোভাব কাজ করছে। তবে এই অতি-সতর্কতার বলি হয়ে যদি কোনো নিরীহ তরুণ-তরুণী চাকরি হারায়, তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কেউ দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও যদি তার পরিবার সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে তাকে বাদ দেওয়া হবে চরম অবিচার। রাহুল দাসের মতো প্রান্তিক কৃষকের সন্তানকে কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কেবল সাধারণ কৃষকদের প্রতি কৃপা দেখালেই চলবে না, তাদের পরিবারের সার্বিক জীবনসংগ্রামের দিকটিও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।

অতীতের নিয়োগ ও একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
বিগত সরকারের আমলের প্রাথমিকে নিয়োগ ব্যবস্থার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি । দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় শেখ হাসিনার আমলের নানা ভালো-মন্দের হিসাব বারবার সামনে আসবেই। সাধারণ শিক্ষিত তরুণদের মাঝে সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে তৎকালীন সরকারের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এই যে চৌদ্দ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা, এটি মূলত আওয়ামী লীগের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ ছিল, যেখানে ২০২৭ সালের মধ্যে মোট এক লাখ শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২২ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অন্যতম সফল হিসেবে গণ্য করা হয়, যদিও ২০২৩ সালের নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছিল।

তৎকালীন সময়ে প্রাথমিকে চাকরিতে নারীরা কোটার সুবিধা পেতেন। নারী কোটা ও বিজ্ঞান বিভাগ মিলিয়ে প্রায় আশি শতাংশ পদ সংরক্ষিত থাকত, আর বাকি কুড়ি শতাংশ নির্ধারিত ছিল সাধারণ প্রার্থীদের জন্য। এমনকি পোষ্য কোটার প্রচলনও ছিল, যা পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনের পর নামিয়ে আনা হয় মাত্র সাত শতাংশে। এর মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হলেও কম মেধাবী প্রার্থীরা কোটার সুযোগ নিয়ে শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশায় ঢুকে পড়ছেন-এমন সমালোচনাও জোরালো ছিল।

মূলত আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিটিই চরম ত্রুটিপূর্ণ। কেবল বহুনির্বাচনী বা এমসিকিউ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করার কারণে অনেকেই গাইডবই মুখস্থ করে সহজেই চাকরি বাগিয়ে নেন। এর পরিবর্তে ব্যাংক পরীক্ষার মতো এমসিকিউর পাশাপাশি অন্তত দুই শ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে তবেই প্রকৃত ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু প্রায় প্রতিটি সরকারই নিজেদের লোক ঢোকানোর সুবিধার জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে খুব একটা জটিল করতে চায় না।

রাহুল দাসের মতোই অনলাইনে আমার সঙ্গে আরেক জন চাকরিপ্রত্যাশীর পরিচয় হয়েছিল ২০২৩ সালের দিকে। ছেলেটি একটি ফেইক আইডি ব্যবহার করে ইনবক্সে যুক্ত হয় এবং আমাদের সঙ্গে ইংরেজি চর্চা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। আলাপচারিতায় জানতে পারি, সে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কোনোমতে একটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক শেষ করেছে। চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কিছুদিন একটি পোশাক কারখানায় চাকরিও করতে হয়েছিল। তার বাবা বেঁচে নেই।

তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল একটি সরকারি চাকরি পাওয়া। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেলে তার মা বলেছিলেন, "আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করব, তুই পড়াশোনা চালিয়ে যা।" এরপর শুরু হয় তার কঠিন লড়াই। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় তার কিছু বাড়তি সুবিধা থাকলেও ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং বা ইংরেজিতে তার দুর্বলতা ছিল প্রকট। আমি তাকে বুঝিয়ে বলেছিলাম, সামনে শিক্ষকতা পেশায় আসতে হলে ইংরেজি দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। সে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিল, "আপনাদের থেকেই শিখে নেব।" এভাবেই সে আমাদের নিয়মিত ইংরেজি চর্চায় অংশ নিতে শুরু করে।

ছেলেটির ধৈর্য ও মনোবল ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রতিদিন নিয়ম করে বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা পড়াশোনা করত । বাকি সময়ে চারটি টিউশনি করিয়ে পেত মাত্র সাত হাজার টাকা। বারবার ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া তার সাধ্যের বাইরে ছিল। একসময় প্রাথমিক পরীক্ষা হলো এবং সে সফলভাবে উত্তীর্ণও হলো। ভাইভাতে খুব ভালো পারফর্ম করতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত তার চাকরিটি হয়ে গেল। সে তার মাকে আনন্দের সঙ্গে বলেছিল, "মা, আর মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হবে না।"

কিন্তু আসল বিপত্তি বাঁধল যখন সে থানা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করল। তাকে জানানো হলো, বাড়ির কাছাকাছি কর্মস্থল বা পোস্টিং নিতে হলে পঁচিশ হাজার টাকা ঘুস দিতে হবে। এই কথা শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে তো চেয়েছিল চাকরির পাশাপাশি ছোটখাটো একটি খামার করতে, যাতে বাড়ি থেকে দূরে পোস্টিং হলে খামার দেখভালের সুযোগ থাকে না। অথচ মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে পোস্টিং দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো। তার মা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "চিন্তা করিস না বাবা, তোর চাকরি কোথাও যাবে না।" শেষ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে এবং চড়া সুদে কুড়ি হাজার টাকা জোগাড় করলেন মা।

অফিসে গিয়ে হাত-পা ধরে কুড়ি হাজার টাকার বিনিময়ে পোস্টিং নিশ্চিত করা হলো। মা ও ছেলে ভেবেছিলেন বুঝি এবার তাদের দুর্দিনের অবসান হলো। কিন্তু বাধা এল পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময়। সেখানে দাবি করা হলো আরও পাঁচ হাজার টাকা, অন্যথায় নেগেটিভ প্রতিবেদন দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো। উপায় না পেয়ে আবারও এক সুদের কারবারির কাছ থেকে সেই টাকা সংগ্রহ করতে হলো তাদের।

ছেলেটি আমাকে "গুরু" বলে ডাকত। একবার সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, "গুরু, আমার মতো একজন হতদরিদ্র মানুষের কাছ থেকেও কীভাবে মানুষ এভাবে টাকা নিতে পারে? আমার মায়ের মাত্র দুটো শাড়ি, যার পুরোটা জুড়ে রিপু করা। সবাই আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো করেই জানে, তবুও কেউ একটুও ছাড় দিল না!" সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, প্রাথমিক চাকরিতে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই বেতন হয় না, প্রায় তিন মাস পর একসঙ্গে বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়।

ছেলেটির এই মর্মান্তিক জীবনসংগ্রামের কথা শুনলে নিজের অজান্তেই বুক ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। সামান্য কিছু আর্থিক সহায়তা করতে চাইলেও সে বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দিত এবং বলত, "তার চেয়ে আমাকে ফ্রিতে ইংরেজিটা শিখিয়ে দিন।" ২০২৪ সালের রোজার ঈদের পরপরই তার বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। ঈদের আগের দিন সে ফোন করে জানায়, এবারের ঈদও তাদের অত্যন্ত সাদামাটাভাবে কাটছে। ছেলেটি সরকারি চাকরি পাওয়ার পরও মায়ের মুখে কোনো হাসি ছিল না, কারণ মাথায় চেপে বসা ঋণের বোঝা কীভাবে শোধ করবে সেই দুশ্চিন্তা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ছেলেটির মন জুড়ে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি অগাধ কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করত। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত যে সে সম্পূর্ণ মেধা ও স্বচ্ছতার জোরে চাকরি পেয়েছে। কথা প্রসঙ্গে সে বারবার এ কথাই বলত। পরবর্তী সময়ে যখন জুলাই কোটা আন্দোলন শুরু হলো এবং আমরা যখন স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলাম, সে তখনো অবলীলায় বলে উঠত, "আমি তো ভাই সম্পূর্ণ ফেয়ারভাবে চাকরি পেয়েছি!" পরিস্থিতি এতটাই জটিল ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিল যে আমি তাকে বারবার এসব বলতে নিষেধ করতাম এবং মনে করিয়ে দিতাম চাকরি পেতে তাকে কতটাকা ঘুষ দিতে হয়েছে ।

শেষ কথা
ছেলেটির ঘটনা লেখার একটা উদ্দেশ্য আছে। তার চোখে যেমন শেখ হাসিনার সরকার কিছুটা স্বচ্ছ নিয়োগের কারণে হিরো হয়ে গিয়েছিলো, তেমনি সেই একই সরকারের বিরুদ্ধে আবু সাঈদকে মরতে হয়েছিলো সরকারের ভুল ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের কারণে। ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল থাকলে কোনো সাধারণ ঘরের ছেলে চাকুরি পেত না। একই সরকারের দুই ধরনের সিদ্ধান্ত। ভুক্তভোগী কে? সাধারণ শিক্ষিত বেকার তরুণ।

আজকের বাস্তবতাও কি খুব একটা বদলেছে? নতুন কোনো চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে প্রার্থীরা তো পরীক্ষা দিবেই। তারা তো একবারও ভেবে দেখবে না যে এটি কোন সরকারের আমল বা কোন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাদের চাওয়া কেবল একটাই-দ্রুত নিজের একটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, যার পেছনে লুকিয়ে থাকে অগণিত রাতের নির্ঘুম পড়াশোনা ও ত্যাগের ইতিহাস। এখন নতুন সরকার যদি হঠাৎ সুপারিশকৃতদের বাদ দিয়ে দেয় , তবে এর দায়ভার কেন নিরীহ চাকরিপ্রার্থীরা কাঁধে নেবে?





মন্তব্য ৪ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০

কিরকুট বলেছেন: রুই কাতলা বসে বসে জাল ছিড়ে বেড়িয়ে যায় সামান্য পুটির ডানা ধরে রাস্ট্রযন্ত্র টানাটানি করে।

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৪

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আপনার সাথে একমত ।

২| ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৪

কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:

বর্তমান সরকারের আমলে তো জানি না, তবে হাসিনার সময় সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে মাল্টিলেয়ারে ভেরিফিকেশন হতো। স্থানীয় কাউন্সিলর,‌পুলিশ এবং সর্বশেষ মনে এনএসআই রিপোর্ট জমা দিতো।

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৪

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আপনি যা বলছেন ঠিক আছে তবে প্রাইমারীতে শুধু পুলিশ ভেরিফিকেশন হতো । তা না হলে নুরু ভাইয়ের বউ জীবনেও চাকুরি করতে পারতো না । তিনি প্রাইমারীর টিচার ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.