| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
শ্রমিকদের নতুন মজুরির দাবিতে মিরপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন শুরু হয়েছে। দেশে এখন আলোচনার একটি বড় বিষয় হলো, অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত শ্রমিকরা কীভাবে ৩০ হাজার টাকা বেতন দাবি করেন? একজন ইন্টার্ন ডাক্তার মাসে ২০ হাজার টাকা পান, ভালো ফলাফল করা একজন ফ্রেশ ইঞ্জিনিয়ার এন্ট্রি লেভেলে ১৫ হাজার টাকার চাকরি পেতেও হিমশিম খান। সেখানে একজন পোশাকশ্রমিক ৩০ হাজার টাকা চাইছেন, এটা কীভাবে সম্ভব?
এই প্রশ্নের ভেতরে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বড় সংকট লুকিয়ে আছে। শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না, এটা সত্য। কিন্তু সেই হতাশা থেকে অন্য পেশার মানুষের বেশি বেতন চাওয়ার বিরোধিতা করার যুক্তি তৈরি হয় না।
সর্বশেষ যখন পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়েছিল, আমি ঢাকায় ছিলাম। বেশ বড় আন্দোলন হয়েছিল, পুলিশের গুলিতে তিনজন শ্রমিক মারা গিয়েছিলেন। শ্রমিকদের দাবি ছিল এন্ট্রি লেভেলে ২৩ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এবারও আমার ধারণা, ৩০ হাজার টাকা দাবি করলেও দর-কষাকষির পর্যায়ে অঙ্কটা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে থাকবে।
মজুরি বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে। ক্রেতাদের কাছে পণ্যের দাম, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং মালিকদের মুনাফার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই মালিকদের আপত্তি কিংবা উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন আলোচনায় আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, আপত্তিটা বেশ জোরালোভাবে শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশের কাছ থেকেও এসেছে। যাঁদের উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, তাঁরাও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা বেতন দাবির বিরোধিতা করছেন। এর পেছনে একটা অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণ আছে।
বাংলাদেশে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর বেসরকারি ব্যাংক কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ছাড়া ভালো বেতনের চাকরি পাওয়া কঠিন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলের বেতন খুব কম। কয়েক বছর পড়াশোনা করে একজন তরুণ যখন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার চাকরি পান, তখন তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে একজন পোশাকশ্রমিক ৩০ হাজার টাকা বেতন দাবি করছেন। এখানেই এক ধরনের তুলনামূলক হতাশা ও ইগো কাজ করে। মনে হয়, এত পড়াশোনা করেও আমি যে বেতন পাচ্ছি না, একজন পোশাকশ্রমিক সেই বেতন চাইবেন কীভাবে?
এই মানসিকতার একটা বৈপরীত্যও আছে। যাঁরা পোশাকশ্রমিকদের বেতন ৩০ হাজার টাকা চাওয়াকে অযৌক্তিক মনে করছেন, তাঁদের অনেকেই সরকারি চাকরির ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন নিয়ে আপত্তি করেন না। কারণ তাঁরাও এসব পদের চাকরির জন্য আবেদন করেন। ২০২৩ সালে দেখেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী খালাসি পদে চাকরি করছেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলও আক্ষেপ করে বলেছেন, মাস্টার্স পাস করেও তরুণরা পিয়নের চাকরি করছেন।
২০তম গ্রেডের পদগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। সুইপার, মালি, পোর্টার কিংবা অফিস সহায়কের মতো পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা এক রকম নয়। অনেক পদে অষ্টম শ্রেণি বা এসএসসি চাওয়া হয়। অথচ এখন বিএ, এমএ পাস করা তরুণরাও এসব চাকরির জন্য আবেদন করছেন। অফিস সহায়ক পদের বেতন ৩৩ হাজার টাকা হলে প্রতিবাদ দেখা যায় না কেন? কারণ চাকরিটা সরকারি। সঙ্গে আছে চাকরির নিরাপত্তা, অবসরকালীন সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। অর্থাৎ কাজের ধরন কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে চাকরির নিরাপত্তা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার। আমাদের শিক্ষিত তরুণদের সমস্যা শুধু কম বেতন নয়, ভালো চাকরির সুযোগের অভাবও। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁদের সামনে কর্মসংস্থানের বিকল্প খুব সীমিত। ফলে সরকারি চাকরি হয়ে উঠেছে অধিকাংশের প্রধান আকাঙ্ক্ষা। একজন গ্র্যাজুয়েট নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী বেসরকারি চাকরি না পেয়ে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন। এটা কোনো ব্যক্তির একক ব্যর্থতা নয়, বরং শ্রমবাজারের দুর্বলতার প্রতিফলন।
শিক্ষিত তরুণদের হতাশার বিষয়টি তাই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন, তাঁদের অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না। মূল্যস্ফীতির কারণে মাসের বিশ দিন পার হলেই অনেকের হাতে টাকা থাকে না। সরকারি চাকরিজীবীদের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতের বড় একটি অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সরকারের দায়িত্ব ছিল শ্রমিকদের আন্দোলনকে শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবি হিসেবে না দেখে সামাজিক নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা। সরকার যদি সত্যিই চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনতে চায়, তাহলে পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের দিয়ে সেই কর্মসূচি শুরু করতে পারত। একজন নারী শ্রমিকের আয়ের ওপর অনেক সময় পুরো পরিবার নির্ভর করে। তার হাতে সরাসরি সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পৌঁছালে পরিবারটির ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমত।
সরকারপ্রধান চাইলে ঘোষণা দিতে পারতেন, পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এমন একটি ঘোষণা অন্তত শ্রমিকদের মধ্যে সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারত। একই সঙ্গে শুধু পোশাকশিল্পের মালিকদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সরকারিভাবে সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হতো । এমন কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে চোখে পড়ল না।
ধনী-গরিব নির্বিশেষে এখন মোটামুটি সবাই গণমাধ্যমের কল্যাণে জানেন, বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের ওঠানামা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর একটি দেশে এর প্রভাব পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। সবকিছুর দায় সরকারের ওপর চাপানোও ঠিক হবে না। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হলো, এই পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনযাত্রার মান যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা এবং সংকট মোকাবিলায় আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া।
সরকার যদি সত্যিই মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী হয়, তাহলে সেই আন্তরিকতা শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব উদ্যোগের মধ্যেও দৃশ্যমান হতে হবে। মানুষ যখন দেখবে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে, উৎপাদন খরচ কমানোর চেষ্টা করছে, কর্মসংস্থান তৈরিতে উদ্যোগ নিচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন কঠিন পরিস্থিতিতেও সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।
ফটোকার্ড : মজদুর
©somewhere in net ltd.