নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

লেখক। \"শিহাবের নিউজলেটার\"-এ আমার লেখা পাবেন — বই রিভিউ, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, চিন্তাশীল প্রবন্ধ ও বিভিন্ন চলতি আলাপ নিয়ে। লিংক: https://mhshihab.substack.com/

মাহদী হাসান শিহাব

কৌতুহলী পাঠক ও লেখক

মাহদী হাসান শিহাব › বিস্তারিত পোস্টঃ

রাষ্ট্রকে আমরা আসলে নিজেদের মনে করি কি না: মনে করা ও না করার তফাৎ

০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩২



রাষ্ট্রকে আমরা আসলে নিজেদের মনে করি কিনা!

প্রশ্নটা শুনতে একটু অদ্ভুত। রাষ্ট্র তো আমরাই। সরকার, সরকারি অফিস, রাস্তা, ফুটপাত, সরকারি জমি, করের টাকা, সবই তো শেষ পযন্ত আমাদের।

কিন্তু আমাদের আচরণ দেখলে অনেক সময় মনে হয়, রাষ্ট্রটা “আমাদের” কিছু না। রাষ্ট্র হইল এমন একটা জিনিশ, যেটারে সুযোগ পাইলেই একটু ফাঁকি দেওয়া যায়।

যেমন ধরেন-

ট্যাক্স ফাঁকি দিতে পারলে চালাকি।

সরকারি নিয়মের ফাঁক বের করতে পারলে সেটা বুদ্ধি।

পরিচিত কাউরে ধরাইয়া কাজ করাইতে পারলে যোগাযোগ।

সরকারি সম্পদ নিজের কাজে লাগাইতে পারলে সুযোগ।

আর সিস্টেমরে বোকা বানাইতে পারলে তো কথাই নাই—মনে হয় বিরাট একটা কৃতিত্ব অর্জন করছি।

কিন্তু একটা জিনিশ আমরা খুব কমই ভাবি—সিস্টেমরে ফাঁকি দিয়া আসলে কাকে ফাঁকি দিতেছি?

ধরেন, একজন এমন একটা সরকারি সুবিধা নিলেন যেটা পাওয়ার কথা তার না। তিনি ভাবলেন, সরকাররে একটু বোকা বানাইলেন। অফিসারের সাথে যোগাযোগ কইরা কাজ হাসিল করার আত্মতুষ্টি পাইলেন।

কিন্তু যে মানুষটা সত্যিই ওই সুবিধার যোগ্য ছিল, তার জায়গাটা যে তিনি দখল করলেন—এই চিন্তাটা সাধারণত আসে না।

কারণ রাষ্ট্রকে আমরা অনেক সময় “আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান” হিসেবে দেখি না। দেখি একটা দূরের জিনিশ হিসেবে।

সরকার মানে “ওরা”, সরকারি সম্পদ মানে “সরকারের”, সরকারি সুযোগ মানে “যে পারে নিক”।

এই জায়গাটা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং।

আমরা পরিবারকে খুব বিশ্বাস করি। আত্মীয়কে বিশ্বাস করি। পরিচিত মানুষকে বিশ্বাস করি। নিজের লোকের জন্য অনেক কিছু করতে রাজি আছি।

কিন্তু অপরিচিত মানুষ? তার ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম প্রশ্ন হয়—“লোকটা কে?”

এজন্যই হয়তো সরকারি অফিসে গিয়েও আমরা অনেক সময় নিয়মের সম্পর্কের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করতে বেশি আগ্রহী হই। এটা নিয়ে তো বিভিন্ন সময় বড় বড় গ্যাঞ্জাম ও লাগে।

“ভাই, একটু দেখবেন।”

“আপা, কাজটা একটু করে দেন।”

“স্যার, আপনি তো আমাদের লোক।”

"আমরা তো ভাই-ব্যাগার। আমাদের জন্য একটু দেইখেন।"

এই “আমাদের লোক” ব্যাপারটা আসলে খুব গভীর একটা সামাজিক প্রবণতা। কারণ আমরা প্রতিষ্ঠানকে যতটা বিশ্বাস করি, তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস করি মানুষকে। আর মানুষকেও সবাইকে না—নিজের মানুষকে।

সমস্যা হলো, আধুনিক রাষ্ট্র এভাবে চলে না।

.

একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে আপনার কোনো আত্মীয়তা না থাকলেও তিনি আপনার কাজ নিয়ম অনুযায়ী করবেন—এই বিশ্বাসটা থাকতে হবে। আপনি কর্মকর্তাকে চেনেন না, তিনিও আপনাকে চেনেন না—তবুও আপনার অধিকার আপনি পাবেন। আপনি তার আত্মীয় না, পরিচিত না, কোনো “রেফারেন্স” নাই—তারপরও আপনি বঞ্চিত হবেন না।

এই জায়গাটাই আসলে প্রতিষ্ঠান। আর প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে গিয়েও মানুষ একে অপরের ওপর আস্থা রাখতে শেখে।

আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো—আমরা অনেক সময় কমিউনিটি নিয়ে খুব আবেগী, কিন্তু civic responsibility নিয়ে খুব একটা না।

পাশের মানুষটা ভালো আছে কি না, বয়স্ক মানুষ আমাকে সালাম দিল কি না—এসব নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা আছে। কিন্তু ফুটপাতটা কেন দখল হলো, সরকারি জমিটা কেন দখল হলো, রাস্তার জায়গাটা কে দখল করল, পাবলিক রিসোর্সটা কীভাবে নষ্ট হচ্ছে—এসব নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা ঘামাই না।

আর ঘামালেও অনেক সময় প্রতিবাদটা হয় নিজের স্বার্থে।

“আমি জায়গা পেলাম না কেন?”

“ও পাইল, আমি পেলাম না কেন?”

“ও যদি করতে পারে, আমি পারব না কেন?”

অথচ প্রশ্নটা হওয়ার কথা ছিল—

“এই সম্পদটা সবার। এটা দখল করার অধিকার কারও নাই।”

এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আবার আমাদের অনেকের individualism আসলে individual freedom-এর দর্শন না; বরং survival strategy.

নিজেকে বাঁচাও।

নিজের পরিবারকে দেখো।

নিজের লোককে দেখো।

সুযোগ পেলে নিজেরটা তুলে নাও।

কারণ প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করার অভ্যাস তৈরি হয়নি। সমাজকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার অভ্যাসও তৈরি হয়নি। তাই শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের ছোট একটা নিরাপদ বৃত্ত বানায়—পরিবার, আত্মীয়, পরিচিতজন।

বৃত্তের ভেতরের মানুষ “আমাদের লোক”। বৃত্তের বাইরের মানুষ “অন্য”।

এই “আমরা বনাম অন্য” মানসিকতাই একটা পর্যায়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।

কারণ আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যাপারটাই হলো—সবাইকে আমার আত্মীয় হতে হবে না।

সবাইকে আমি চিনব না। সবাই আমার পছন্দের মানুষও হবে না।

তারপরও তার অধিকার থাকবে।

তারপরও আমি তার প্রাপ্যটা দেব।

তারপরও সে আমার প্রাপ্যটা দেবে।

কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাড়াই।

এটাই নাগরিক সমাজের সৌন্দর্য।

.

আর একটা জিনিশ খুব খেয়াল করার মতো—মানুষ বদলানো আর সিস্টেম বদলানো এক জিনিশ না। একজন কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলেন। আরেকজন এলেন। একজন জনপ্রতিনিধি গেলেন। আরেকজন এলেন। এক সরকার গেল। আরেক সরকার এল।

কিন্তু যদি নিয়মটা একই থাকে, জবাবদিহিতার কাঠামো একই থাকে, মানুষের আচরণ একই থাকে—তাহলে কয়েকদিন পর নতুন মানুষটাও পুরোনো সিস্টেমের অংশ হয়ে যেতে পারেন।

তাই শুধ “ভালো মানুষ” খুঁজে সমস্যার সমাধান হবে না।

ভালো প্রতিষ্ঠান দরকার।

এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে ভালো থাকতে গেলে খুব বেশি ব্যক্তিগত সাহসের প্রয়োজন হবে না, আর খারাপ করতে গেলে খুব সহজে পার পাওয়া যাবে না।

আমার মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এখানে দরকার—

রাষ্ট্রকে “ওদের জিনিশ” ভাবা বন্ধ করা। সরকারি সম্পদকে “সরকারের” না ভেবে জনগণের সম্পদ ভাবা। অপরিচিত মানুষকে নিজের ভাই বানানোর আগে, তাকে একজন নাগরিক হিসেবে তার প্রাপ্য সম্মানটা দেওয়া। আর সুযোগ পেলেই সিস্টেমরে ফাঁকি দিতে পারাকে বুদ্ধিমত্তা মনে না করা।

কারণ একটা রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ শুধু আইন ভাঙার শাস্তিকে ভয় করে না—আইনটা কেন মানতে হবে, সেটাও বুঝে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো একমাত্র টাকা-পয়সা না। পারষ্পারিক আস্থা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ও বড় সম্পদ।

মানুষ যদি বিশ্বাস করে প্রতিষ্ঠানটা তারও, নিয়মটা তার বিরুদ্ধেও না এবং অন্যের অধিকারটাও তার নিজের অধিকারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ—তাহলে রাষ্ট্রকে আলাদা করে শক্তিশালী করতে হয় না।

মানুষ নিজেরাই রাষ্ট্রটাকে শক্তিশালী করে।



--

নিউজলেটার থেকে।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫২

রাজীব নুর বলেছেন: আসলে আমাদের দেশের মানুষ গুলো ভালো না।
ভুল শিক্ষা নিয়ে মানুষ ছোট থেকে বড় হয়। মানুষ গুলো মানবিক এবং সৎ নয়। এদিকে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারাও সঠিক নয়। এখন দরকার আমূল পরিবর্তন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.