| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমাদের প্রশ্ন হলো কাদের হাতে সেসব অস্ত্রের মজুদ রয়েছে? এসব অস্ত্রের লাইসেন্স কারা প্রদান করেছে? এবং র্যাব ও পুলিশ বাহিনী এই ৫০ হাজার অস্ত্রের মধ্য থেকে এ যাবৎ কয়টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে? তাদের কয়জনকেই বা ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্ন উত্থাপন করার অর্থ এমন নয় যে, দেশে সংঘটিত ক্রসফায়ারকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে তা বলা হচ্ছে। মূলত এসব প্রশ্ন তোলার অন্যতম কারণ হলো, এযাবৎ যারা ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন ও আছেন তারাই প্রধানভাবে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র এবং অবৈধ অস্ত্রের মালিক। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর তাদের মধ্যে একজন। ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তারাই প্রধানভাবে আইনি ও বেআইনি অস্ত্রের মালিক হয়েছেন। অথচ আমরা শ্রেণীগতভাবে তাদের একজনকেও ক্রসফায়ারে যেতে দেখিনি। একই সঙ্গে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় ঘোষিত ৫০ হাজার অবৈধ অস্ত্রের মধ্যে ১টি অস্ত্র উদ্ধারের কাহিনীও শুনিনি। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে, সকল অবৈধ অস্ত্রবাজ র্যাব-পুলিশের টার্গেট নয়। সন্ত্রাস নিমূর্ল ও তাদের লক্ষ্য নয়। বিশেষ বিশেষ সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এবং অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় ৫০ হাজার লাইসেন্সকৃত অস্ত্র, অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে- মূলত অবৈধ কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে চলার জন্যই? আমার মনে হয় এই গোটা বিষয় আজ পর্যালোচনা হওয়া দরকার।
ক্রসফায়ারে প্রধানভাবে কারা নিহত এবং মিডিয়া নির্মিত সন্ত্রাসী
এ প্রশ্নের জবাব আমাদের সবারই কমবেশি জানা। র্যাব-পুলিশের সংবাদ বিবৃতি এবং মিডিয়াকর্মীদের পরিবেশিত সংবাদ থেকেই আমরা তথ্যগুলো জেনেছি। অর্থাৎ নিহতদের প্রধান অংশই একটা বিশেষ ধারার রাজনৈতিক কর্মী, যাদেরকে সংবাদপত্র-র্যাব-পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত, বেআইনি, উগ্রপন্থী বা চরমপন্থী দলের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দল হিসেবে তাদের নাম হলো
১. পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল),
২. পূর্ব বাংলার কমিউস্টি পার্টি (এম-এল) (জনযুদ্ধ),
৩. পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) (লাল পতাকা),
৪. পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি),
৫. পূর্ব বাংলার সর্বহারা পাটি (এমবিআরএম),
৬. বাংলাদেশের বিপ্লবী কউনিস্ট পার্টি (এম-এল),
৭. শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন
৮. নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি এবং
৯. জাসদ গণবাহিনীর প্রাক্তন কিছু সদস্য
ক্রসফায়ারে নিহতদের ক্ষেত্রে পরিবেশিত সংবাদপত্রের ভাষ্য এবং ওই দলের দাবি অনুযায়ী আমরা এসব দলের নাম পেয়েছি। একইসঙ্গে এসব দলের রাজনীতি পর্যালোচনা করে আমাদের অনেকের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ৩৭ বছরের বাংলাদেশে পর পর দুইবার রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে উক্ত বিশেষ ধারার রাজনৈতিক দলসমূহকে নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম দফায় ১৯৭৩ সালে রক্ষিবাহিনী সৃষ্টি করে তা করার চেষ্টা হয়েছিল। তখন রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থিত ছিলো।
১. পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)
২. পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এবং
৩. পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নেতা ও কর্মীরা
আর দ্বিতীয় দফায় ২০০৪ সালে র্যাব সৃষ্টি করে সেই চেষ্টার পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। আবার দুই দফায় চালিত এই অভিযান প্রধানভাবে পরিচালিতই হয়েছে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে। ৩৭ বছরের বাংলাদেশে সরকার সমর্থিত মিডিয়াকর্মীরা জনগণকে বারবার জানান দিয়েছে আলোচিত ওই দুইটি বিভাগ নাকি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। উক্ত জনপদের জনগণ এসব বেআইনি, নিষিদ্ধ দলের কাছে জিম্মি। এসব অভিযোগ আমরা র্যাব-পুলিশ ও মিডিয়াকর্মীদের উত্থাপিত অভিযোগ থেকে বিষয়টি জেনেছি। ফলে তাদের উত্থাপিত অভিযোগকে কয়েকটি পয়েন্টে বিভক্ত করে কিছু পর্যালোচনা আমরা করতে পারি।
প্রথমত, আসা যাক নিষিদ্ধ ঘোষিত বেআইনি দল সম্পর্কে। তথ্য জানার অধিকার মিডিয়াকর্মী ও র্যাব-পুলিশের কর্মকর্তাদের মতো এ-দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই রয়েছে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা নাগরিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। এবং এই অধিকারের উপরে ভিত্তি করে মিডিয়াকর্মীদের কাছে আমাদের প্রথম জিজ্ঞাসা হলো, ৩৭ বছরের বাংলাদেশে কোন সরকার, কত সালের, কোন তারিখে, কত নম্বর আইনি প্রজ্ঞাপন জারি করাসহ সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে উল্লিখিত দলগুলোকে বেআইনি এবং তাদের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে? আমরা আশা করতে পারি মিডিয়াকর্মীরা সততার সঙ্গে সেটা জনগণকে জানাবেন। সততার প্রশ্নটা আনা হচ্ছে এই কারণে যে, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের সম্পাদকদের গরু-গাধা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা সম্পূর্ণতই উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে রিপোর্ট পরিবেশন করে বলেন অনেকেরই অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এ-দেশের ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে মিডিয়াকর্মীরা কোনো-না-কোনোভাবে যুক্ত আছেন। এটা আজ অনেকের কাছে স্পষ্ট। একই সঙ্গে অনেক পত্রিকার সম্পাদক আমাদের দেশে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবেই পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। তাদের সম্পাদিত বহুল প্রচারিত ও সততার শীর্ষে থাকা পত্রিকাগুলোতে আমরা আলোচিত এসব দলকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বেআইনি দল এবং ওইসব দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে নিছক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে দেখেছি বলেই সততার প্রশ্নটা আসছে।
এখন প্রশ্ন হলো ৩৭ বছরের বাংলাদেশে যদি কোনো সরকার আইনি প্রজ্ঞাপন জারি করে আলোচিত দলগুলোকে বে-আইনি এবং ওইসব দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি না-দিয়ে থাকে তাহলে, মিডিয়াগুলোর সম্পাদক ও সংবাদকর্মী বা র্যাব-পুলিশের কর্মকর্তারা ঘোষণা দিলেই কি দলগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? জনগণের দিক থেকে এ প্রশ্নটা উত্থাপন হতেই পারে? একইভাবে বিগত জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী সম্পর্কে ও একই প্রশ্ন তোলা যায়। তাছাড়া, তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার নামে কিছু রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, সেটা কি সরকারে থাকাকালে তারা সংসদে প্রস্তাব আকারে তুলেছিলেন? সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরেও কি যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তাবনা সংসদে গৃহীত হয়েছিল? যদি সরকার হিসেবে তারা সেটা না-করে থাকে তাহলে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কি সাংবিধানিকভাবে খালেদা জিয়া, মওদুদ, বাবরসহ র্যাব-পুলিশের কিছু কর্মকর্তাকে তাদের এই ঘোষিত যুদ্ধ চালানোর এখতিয়ার দিয়েছে? একইভাবে মিডিয়া কর্মকর্তাদের এ-ধরনের প্রপাগান্ডা চালানোর অধিকার? তাদের ঘোষিত এসব কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা কি সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র রক্ষার নামে আধুনিক ফতোয়াবাজি নয়? সাংবিধানিকভাবেই কি তাদের এসব প্রচারণা সংবিধান পরিপন্থি এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে না? আমাদের এটা অবশ্যই ভাবনার বিষয়।
তাছাড়া, প্রশ্নগুলো তোলা হলো এই করণে যে, গত ৩৭ বছরের বাংলাদেশে মিডিয়াতে প্রকাশিত তাদের তথাকথিত ‘সন্ত্রাস’ সম্পর্কে রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে যে কেউ একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হবেন। বিষয়টি হলো আলোচিত অঞ্চলগুলোতে আলোচিত দলগুলোর এযাবৎ কয়েক শত রাজনৈতিক কর্মী যেভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে খুন হয়েছে, সেই সব খুনের প্রত্যক্ষ মদদ যুগিয়েছে মিডিয়ার রিপোর্ট বা প্রতিবেদনগুলো। এভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের রাজনীতিকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে মিডিয়ার এই যুদ্ধ ঘোষণা কেন? এটা অবশ্যই আমাদের কাছে জরুরি প্রশ্ন। তাছাড়া, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমাদেরকে নির্দিষ্ট করে এবং আইনি প্রজ্ঞাপন জারি করে আজো জানানো হয় নি আলোচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বাংলাদেশ আমলে। ওইসব আলোচিত দল সম্পর্কে সরকারগুলো যে ধরনের নীতি নির্ধারণ করেছে, তাদেরকে নির্মূল করার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তারা যেভাবে ও যে ভাষায় কথা বলেছেÑ সেটা আসলেই গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়াবহ বিপজ্জনক হতে বাধ্য। সরকার তার ভাষায় সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে দেশের দুইটি বিভাগকে টার্গেট করে নানান পদের যেসব অভিযান চালাচ্ছে তা রীতিমতো আশঙ্কাজনক। রাজনৈতিক কারণে ওসব দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে একটার পর একটা ফৌজদারি মামলা দিয়ে বাড়ি-ঘর ছাড়া করা, বিনাবিচারে আটকে রাখা, মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন চালিয়ে চিরজীবনের মতো পঙ্গু করে দেওয়া এবং টার্গেট করে বিশিষ্ট বিশিষ্ট কর্মীদের হত্যা করার যে লাইসেন্স র্যাব-পুলিশকে দেওয়া হয়েছে তা রীতিমতো ভয়াবহ। এবং সরকার ‘জনগণকে’ আশ্বস্ত করছে রাষ্ট্রের এসব দমন-পীড়ন ও হত্যা নাকি সমাজ জীবনে সুফল বয়ে আনছে। একদিকে র্যাব-পুলিশ দিয়ে অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড চালানো, অপরদিকে তাদের কর্মকর্তা ও সরকারের সাফাই গাওয়াÑ এটা একটা সরকারে নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হতে পারে না; হলেও তা মেনে নেওয়া যায় না। এটা যে কোনো নাগরিকেরই দাবি।
এক্ষেত্রে অনেকের মতামত হলো সরকার তো সরকারি কাজই করছে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো বে-আইনি ধরপাকড় করা, অত্যাচার করা এবং বিনা বিচারে হত্যা করাটা কি সরকারি কাজ? সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোয় নির্বাচিত সরকারের কাজ হলোÑ যে কোনো মূল্যে আইনের শাসন রক্ষা করা। তাকে ভূলুণ্ঠিত করা বা পদদলিত করা সরকারের কাজ নয়। দেশের আইন তৈরি হয়েছে মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য। গণতন্ত্রে মানুষের সামাজিক অধিকার রক্ষা করে আইন। কিন্তু বিগত বিএনপি সরকার গণতন্ত্রকেই পদদলিত করেছে। তাছাড়া অভিযোগকারী এবং বিচারক যদি একই সংস্থা হয় তাহলে, আইন কি নিজের মতো করে চলতে পারে? কারণ ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোতে অভিযোগকারীও পুলিশ, বিচারকও পুলিশÑ এটা আর যাই হোক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ধরন হতে পারে না।
আমরা এক একটা ক্রসফায়ার ঘটনার পর সংবাদ বিবৃতি দেখেছি নিহত ব্যক্তি হয়তো কোনো গ্রামের আম অথবা জাম বাগানে বসে নাশকতামূলক কাজের পরিকল্পনা করছিল। নিহতদের বিরুদ্ধে একাধিক খুনের মামলা ছিলো। এভাবে যুক্তি দাঁড় করিয়ে ওইসব দলের কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে ও হচ্ছে। বিষয়বস্তুকে যারা এভাবে দাঁড় করান, আমরা তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির ঘোর বিরোধী। কারণ আইনের চোখে নিহত ব্যক্তি অভিযুক্তমাত্র। আদালতে অভিযোগটি অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত না হলে উক্ত ব্যক্তি অপরাধী সাব্যস্ত হয় না। তাদের বিরুদ্ধে হাজারটি খুনের অভিযোগ থাকলেও সেটা কি আদালতে রায়ে প্রমাণিত ছিলো? অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার যে বিধান সংবিধানে দেওয়া হয়েছে, বিগত সরকার এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে পুলিশ ও র্যাব কি তা লংঘন করেনি? আমরা স্পষ্টতই মনে করি, আইনের শাসনের বিপরীতধর্মী যে কোনো কাজই গণতন্ত্র বিরোধী। মানবাধিকার বিরোধী। আজ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারি কাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মানবাধিকারের বিষয়গুলোর উপরে অসীম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যার মর্মবস্তু হলোÑ নির্যাতনমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। চারদলীয় জোট সরকার এবং র্যাব-পুলিশ কর্মকর্তারা সেটা স্পষ্টতই লঙ্ঘন করেছে। এটা প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরই মতামত।
এসব রাজনৈতিক দল সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, তারা অ্যানিহিলেলশন-এর মতাদর্শে বিশ্বাসী। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে তারা নিশ্চিহ্ন করারা তত্ত্বে বিশ্বাসী। তারা খুনের রাজনীতি করে। সন্ত্রাসের জাল ভয়ঙ্করভাবে ছড়াচ্ছে। ফলে সরকারের ঘোষণা ছিলো তাদেরকে কোনোভাবেই ছাড়া হবে না। অর্থাৎ সরকার কি প্রকৃত অর্থেই ঘোষণা দিচ্ছে না ওইসব দলের উপরে লাগামহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হবে? যেহেতু তারা খুনের রাজনীতি করে, ফলে বদলা হিসেবে রাষ্ট্রকেও কি পাল্টা খুনের পথ ধরতে পারে? এটা কি আসলেই কোনো পদ্ধতি? তাদের খুনের জবাব কি পাল্টা রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড? আমরা ২০০৪ সালের পর থেকে লক্ষ্য করছি জোট সরকারসহ ড. ফকরুদ্দিনের সরকার এবং র্যাব-পুলিশের কর্মকর্তারা ওইসব দলের ব্যক্তি হত্যার রাজনীতিকে অজুহাত করে রাষ্ট্রীয় খুন ও সন্ত্রাসের মাত্রা দিনকে দিন বাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহকে ক্রমান্বয়ে পদদলিত করছে। সংকুচিত করছে। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে খোদ রাষ্ট্রকেই একটা একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করছে। প্রশ্ন হচ্ছে ‘মারাত্মক’ অপরাধীদের প্রতি নির্মোহ হওয়া- নির্মম হওয়া, আর তাদের হত্যা করা সমার্থক বিষয় কিনা? ব্যক্তি হত্যা আর রাষ্ট্রীয় গণহত্যা এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি বেশি বিপজ্জনক? এটা অবশ্যই আমাদের। আমাদের বিবেচনায় আনা দরকার।
আমাদের জানামতে এসব দলগুলো মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল। এটা ফৌজদারি মামলার কোনো বিষয় নয় আর যারা রাজনীতিকে ফৌজদারী মামলার ক্যাচাল মনে করেন, আমরা ওই দৃষ্টিভঙ্গির ঘোর বিরোধী। ফলে রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি পরিভাষায় যখন একজন ‘পেশাদার দুস্কৃতকারী’-র সঙ্গে একজন পেশাদার রাজনৈতিক কর্মীর পার্থক্য করে না, তখন ওই রাষ্ট্র কি নিজেই গণতন্ত্রের হননকারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করে না? সন্ত্রাস দমনের নামে রাষ্ট্র নিজেই যখন খুনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন ওই রাষ্ট্র কি নিজেই গণতান্ত্রিক সমাজ বিরোধী হয়ে ওঠে না? তাছাড়া এ্যাকশনবিহীন কোনো মানুষ যেমন নেই, তেমনি এ্যাকশনবিহীন কোনো রাজনৈতিক দলও নেই। আঘাতের পাল্টা প্রতিঘাত শতগুণ জোরালোভাবেই ফিরে আসতে পারে। একইসঙ্গে আলোচিত বিশেষ ধারার রাজনৈতিক দলসমূহ এমনই একটা ধারার রাজনীতি করে, যা প্রচলিত ধারার রাজনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। যেমন তারা কেউই ভোটযুদ্ধে লড়ে না। ফলে তাদের গদি হারানোর ভয় অন্তত নেই। তাদের সম্পর্কে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেও লাভ নেই। কারণ তারা চূড়ান্ত অর্থে সমস্ত ধরনের রাষ্ট্রের বিলোপ চায়। তারা সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার তত্ত্বে বিশ্বাসী। ফলে রাষ্ট্র সশস্ত্র এ্যাকশনে নামলে তাদের দিক থেকেও সেটা বাড়তে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। আর তেমনটি হলো নাগরিক হিসেবে আমাদেরকেই প্রধানভাবে সমস্যার ঘুর্নীবর্তে আটকা পড়তে হবে।
তাছাড়া, আমাদের জানা মতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিই স্বার্বভৌম। ফলে একজন স্বাধীন ও স্বার্বভৌম ব্যক্তি বা মুক্তচিন্তার মানুষের যে কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাস রাখার অধিকার রয়েছে। এমনকি দলটি যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলও হয়, তাতেও কিছু যায় আসে না। এটাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতাদর্শগতভাবে এবং প্রায়োগিকভাবে ভিন্নমত ও প্রায়োগিক বিভিন্নতা থাকবেই। তার মিমাংশাপত্রটা রাজনীতিগতভাবেই করতে হবে। ফৌজদারি কায়দায় বা পাল্টা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পথে আগানো হলে ফলাফল বিপজ্জনক হয়ে উঠতে বাধ্য। কারণ এতে করে একটা সময় প্রচলিত রাষ্ট্রের সমস্ত কাঠামোই ভেঙে পড়তে পারে। ইতিহাসে এর ঢের ঢের নজির রয়েছে।
বিশেষ ধারার রাজনীতির অর্থটা কি?
আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি যে, দেশে সংগঠিত ক্রসফায়ারে প্রধানভাবে টার্গেট করা হয়েছে একটা বিশেষ ধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নেতা-কর্মী-সমর্থক ও জনগণকে।
আলোচিত উক্ত ধারার রাজনৈতিক দলগুলো মূলত কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে পরিচিত। যদি অনেকেই তাদেরকে আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টি রূপে চিহ্নিত করেন। তবে ১৯৬৭ সালে আমাদের দেশে যখন কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন উল্লিখিত দলগুলোকে অনেকেই পিকিংপন্থি ধারা হিসেবে গণ্য করতেন। ওই পিকিংপন্থি ধারা হিসেবে এদেশের রাজনীতিতে সেদিন সক্রিয় ছিলো তিনটি দল। তাদের নাম হলো :
ক) ইস্ট পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল), ’৭১ পরবর্তীতে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল);
খ) পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এবং
গ) পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি।
পাকিস্তান পর্ব থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আলোচিত তিনটি দলই মাওসেতুঙের কৃষিবিপ্লবের লাইন ও গ্রামভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের-রণনীতিকে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখলের পদ্ধতি বা রণনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৯৮২ সালের পর বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি মাওয়ের এই রণনৈতিক লাইনকে পরিত্যাগ করে এবং খোদ মাওবাদকে বিশ্ববিপ্লব বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে আধুনিক সংশোধনবাদ বলে মনে করে। মূলত এই দলটির বর্তমান তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ। ক্ষমতা দখলের উপায় হিসেবে তারা এখন লেনিন প্রদর্শিত সশস্ত্র গণ-অভ্যুত্থানের লাইনকে গ্রহণ করেছে এবং নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিবর্তে তারা জাতীয়Ñগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলে।
পরবর্তীতে আলোচিত বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে ক্ষীন ধারায় আরো দুটি উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। যা শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন ও নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে পরিচিত।
পাশাপাশি কালের পরিক্রমায় এসে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পাটি ভেঙে আবার দুটো দল হয়েছে। যার একটি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (সিসি) এবং অপরটি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (এমবিআরএম) নামে পরিচিত। ভাঙন ঘটেছে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতেও। যার মধ্যে একটি এম-এল, একটি লাল পতাকা এবং অপরটি জনযুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। উল্লিখিত দলসমূহের মধ্যে বর্তমানে শেষোক্ত পাঁচটি দল নিজেদেরকে মাওবাদী হিসেবে গণ্য করে। অর্থাৎ মাও প্রদর্শিত কৃষিবিপ্লব ও গ্রামভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধের রণনৈতিক লাইনকে তারা মতাদর্শিকভাবেই গ্রহণ করেছে, যাকে এক কথায় তারা নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে থাকে।
উপরি-উক্ত আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্টই উপলব্ধি করতে সক্ষম যে, উল্লিখিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে হরেক কিসিমের মতপার্থক্য রয়েছে। আবার এটাও বাস্তবতা যে, আলোচিত দলগুলো পৃথক পৃথক অস্তিত্ব ধারণ করলেও কিছু মৌলিক প্রশ্নে আবার সকলের অভিন্নতা আছে। আলোচিত সমস্ত দলই সেই অভিন্ন মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারাবাহিকভাবে ’৪৭ এবং ’৭১ উত্তর বাংলাদেশে একইভাবে ধারণ করে আসছে।
ফলে কি তাদের রাজনীতি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে সমস্ত মৌলিক প্রশ্নে তাদের অভিন্নতা রয়েছে তার একটা পর্যালোচনা আমরা করে নিতে পারি। তবে পর্যালোচনার কাজটা সবার জন্য বোধগম্য করার ইচ্ছা নিয়ে একটু সহজ-সরল বিশ্লেষণসহ একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে এই কাজটি করতে গিয়ে আমি যতটা বুঝতে সক্ষম হয়েছি সেটা আমরা ভাষায় দাঁড় করাচ্ছি।
প্রথমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে আলোচিত দলগুলোর মূল্যায়ন প্রসঙ্গে আসা যাক। এই প্রশ্নে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, দেশের প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবীরা যখন বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে, উল্লিখিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ওই দাবি নকচ করে দেয়। তারা বাংলাদেশকে কোনোভাবেই স্বাধীন-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে না। তাদের দাবি হলো, বাংলাদেশ একটা নয়া-ঔপনিবেশিক, আধা-সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। এ অবস্থার পরিবর্তন না- ঘটলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জন করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ তারা ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের পৃথক অস্তিত্ব থাকা এবং গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব কে কখনোই সমার্থক বিষয় মনে করে না । ফলে দল হিসেবে আলোচিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল এবং স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে খোদ রাষ্ট্রসহ তার আনুসঙ্গিক সমস্ত উপাদানের আমূল পরিবর্তন বা বিপ্লবী রূপান্তরে কথা বলে। ’৪৭ উত্তর পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও তাদের একই দাবি ছিলো। ’৭১ উত্তর বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অনুরূপ দাবিই বহাল রয়েছে। উল্লিখিত এই তথ্যগুলো আলোচিত দলগুলোর একদম ঘোষিত সিদ্ধান্ত। এখানে রাখত- কি করার মতো কোনো বিষয় তাদের দিক থেকে পূর্বেও কখনো ছিলো না, আজও নেই। ফলে রাষ্ট্র প্রশ্নে তাদের এই মনোভঙ্গি থেকে আমরা মোটাদাগের কয়েকটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি।
ক) তাত্ত্বিকভাবে নয়া-ঔপনিবেশিক, আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা, এটা একটা সমাজ বিশ্লেষণ ক্যাটাগরি। যার উপরে ভিত্তি করে আলোচিত দলগুলো রাষ্ট্রের চরিত্র এবং একটা শত্র“-মিত্র ভেদজ্ঞান হাজির করাসহ বিপ্লবের স্তর বা এই মুহূর্তের করণীয়টা ঘোষণা করছে।
খ) ক্ষমতা দখলের পথ হিসেবে নির্বাচনী তরিকার বিপরীতে তারা সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলছে। এবং সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়েই তারা একটা স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছে। একই সঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্রের মাজেজাকে অতিক্রম করে সোভিয়েত অথবা গণকমিউনিস্ট প্রতিষ্ঠার কথা বলছে।
গ) যেহেতু তারা ’৭১ পরবর্তী বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে না। ফলে তাদের রাজনীতির ভাবকেন্দ্র দেশের চলমান রাজনীতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের তরিকার একদম বিপরীত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান ধারা হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অথবা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে তার ফ্যাসিস্ট মতবাদ হিসেবে গণ্য করে। একই সঙ্গে যে কোনো প্রকারের উগ্র-জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে তারা স্বাধীন-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মতাদর্শগতভাবে ও রাজনৈতিকভাবে শত্র“জ্ঞান করে। মূলত এটাই হলো আলোচিত দলগুলোর বিশেষ ধারার রাজনীতি। এখানেই তাদের অভিন্নতা।
©somewhere in net ltd.