| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বইয়ের নাম: হোয়াই ন্যাশন ফেইল (Why Nations Fail)
মূল লেখক: ড্যারন এসিমোগ্লু (Daron Acemoglu) এবং জেমস এ. রবিনসন (James A. Robinson)
বাংলা অনুবাদক: মোহাম্মদ আরিফ খান
লেখক সম্পর্কে:
ড্যারন আসেমোগ্লু এবং জেমস এ. রবিনসন দুইজনই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট। আসেমোগ্লু এমআইটিতে অধ্যাপক এবং তার কাজ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলির প্রভাব নিয়ে বিশদ গবেষণা করে। তিনি তার ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য অর্থনীতিতে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। অপরদিকে, রবিনসন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। উভয় লেখকই তাদের বহুমুখী গবেষণার জন্য সুপরিচিত এবং "Why Nations Fail" তাদের যুগান্তকারী কাজগুলোর মধ্যে একটি।
পর্যালোচনা:
আমাদের দেশ পূর্নঃগঠনের এই সময়টাতে "হোয়াই ন্যাশন ফেইল (Why Nations Fail)" বইটি সকলের পড়া উচিত বলে মনে করি। "Why Nations Fail" বইটি অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের ওপর জাতির উত্থান এবং পতনের কারণ অনুসন্ধান করে। লেখকদ্বয় ড্যারন আসেমোগ্লু এবং জেমস এ. রবিনসন এখানে বিশ্লেষণ করেছেন যে, কেন কিছু জাতি ধনী এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং অন্যগুলো দারিদ্র্য এবং দুর্বলতায় পড়ে যায়। এই বইটি প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির আলোচনা করা হয়েছে, তাতে ধনী ও দরিদ্র জাতির পার্থক্যের মূল কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলি জনগণের অর্থনৈতিক সুযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রসারিত করে, যেখানে নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলি শাসক শ্রেণী দ্বারা সম্পদ এবং ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। এই পার্থক্যগুলো জাতির আর্থিক সমৃদ্ধি ও স্থায়ীত্বের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বইটি ইতিহাস থেকে উদাহরণ তুলে ধরে দেখিয়েছে কিভাবে বিভিন্ন জাতি, যেমন উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বা কলোনিয়াল আমেরিকার উত্তরের রাজ্য ও দক্ষিণের রাজ্যের মধ্যে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারণে সমৃদ্ধির পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষণীয় বিষয়:
১. অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব: জাতির অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। যেখানে জনগণ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করতে পারে, সেখানে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে তফাৎ হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির বিদ্যমানতা; দক্ষিণ কোরিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা দেশটিকে দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে গেছে, যেখানে উত্তর কোরিয়া তার নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের কারণে দুর্দশায় পড়ে আছে।
২. নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকর প্রভাব: নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলি একটি ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীকে ক্ষমতা এবং সম্পদের ওপর কুক্ষিগত করে রাখে, যার ফলে স্থায়ী আর্থিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়। এই ধরণের ব্যবস্থা প্রায়ই বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি স্পষ্টভাবে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সময় যেমন দেখা গিয়েছিল, যেখানে একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাবান শ্রেণী অন্যদের অধিকার সীমিত করে রেখেছিল।
৩. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন হওয়ার কারণে জাতির উত্থান ও পতন ঘটেছে। বইটি বিভিন্ন উদাহরণ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয় যে, একই ধরণের প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন আজকের বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিকতা:
বইটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আজকের বিশ্বে, যেখানে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বিভিন্ন দেশের সমৃদ্ধি বা পতন নির্ধারণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার কিছু দেশ যেমন জাম্বিয়া, সিয়েরা লিওন এবং জিম্বাবুয়ের মতো দেশের অর্থনৈতিক পতনের পিছনে রয়েছে নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। এই দেশগুলিতে একটি ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণী ক্ষমতা এবং সম্পদ নিজেদের মধ্যে আটকে রেখেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েছে এবং দেশগুলোর উন্নয়নশীলতার পথে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলি যেমন নরওয়ে, সুইডেন এবং ডেনমার্ক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নত করেছে। এই দেশগুলিতে সুশাসন, উচ্চমানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করেছে, যা দেশগুলির আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার পার্থক্য। দক্ষিণ কোরিয়া, যার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, দ্রুততম সময়ে একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশ থেকে বিশ্বব্যাপী একটি শিল্প ও প্রযুক্তি নেতায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানসমৃদ্ধ উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে এবং তার জনগণ দারিদ্র্য ও নিপীড়নের মধ্যে বাস করছে।
বাস্তব উদাহরণ:
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকার একটি চমৎকার উদাহরণ। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং সামাজিক উন্নয়নের পেছনে রয়েছে বৃহত্তর জনগণের অংশগ্রহণ এবং সুশাসনের প্রতিষ্ঠা। তবে, এখনও অনেক ক্ষেত্রে নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অকার্যকারিতার কারণে কিছু উন্নয়নশীল প্রকল্পে সাফল্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায় যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশ আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
এছাড়াও, বর্তমান সময়ে করোনা মহামারি প্রমাণ করেছে যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমৃদ্ধ দেশগুলো যেমন নিউজিল্যান্ড এবং জার্মানি ভালোভাবে মহামারিকে মোকাবিলা করতে পেরেছে। অন্যদিকে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে।
উপসংহার:
"Why Nations Fail" একটি প্রভাবশালী বই যা জাতির সমৃদ্ধি এবং পতনের পিছনে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশদভাবে আলোচনা করে। এটি শুধুমাত্র ইতিহাস থেকে শিক্ষা দেয় না, বরং আজকের বিশ্বে কিভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নের প্রধান চালক হতে পারে এবং নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি জাতির পতনের কারণ হতে পারে, তার বিশদ বিবরণ দেয়।

©somewhere in net ltd.