নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

একজন বই পাঠক।

মোহাম্মাদ আরিফুল ইসলাম

বই পড়তে ভালোবাসি, পেশাগত ভাবে একজন উন্নয়ন কর্মী

মোহাম্মাদ আরিফুল ইসলাম › বিস্তারিত পোস্টঃ

বই পর্যালোচনা: Dirty Wars: The World Is a Battlefield

১২ ই অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:১৫

বইয়ের নাম: Dirty Wars: The World Is a Battlefield
লেখক: জেরেমি স্কাহিল (Jeremy Scahill)

লেখকের পরিচিতি ও বিখ্যাত বইসমূহ:
জেরেমি স্কাহিল একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত আমেরিকান সাংবাদিক, লেখক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতা। তার সাংবাদিকতা ক্যারিয়ার অনেকটা নীতিগত সাংবাদিকতার উপর ভিত্তি করে, যেখানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের গোপন অপারেশন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। স্কাহিলের বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো "Blackwater: The Rise of the World’s Most Powerful Mercenary Army" এবং "Dirty Wars: The World Is a Battlefield"। এই বইগুলোতে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক কার্যক্রম ও বেসরকারি সামরিক বাহিনী এবং তাদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন।


বইয়ের লেখার প্রেক্ষাপট:
"Dirty Wars: The World Is a Battlefield" বইটি ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়, এমন একটি সময়ে যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র গোপন সামরিক অভিযান পরিচালনা করছিল। এর প্রেক্ষাপট মূলত ৯/১১ এর পরে শুরু হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ওয়ার অন টেররের (Global War on Terror) ওপর ভিত্তি করে। এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে গোপন অপারেশনের মাধ্যমে বিস্তৃত করে এবং Joint Special Operations Command (JSOC)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে গোপন সামরিক অভিযান চালায়। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সামরিক বাহিনী এবং ড্রোন হামলার প্রচলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। স্কাহিল তার গবেষণার মাধ্যমে এই সব গোপন অভিযান এবং এটির মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকগুলো তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষ জানার সুযোগ কম পেয়েছিল।


বইটির সারসংক্ষেপ:
"Dirty Wars: The World Is a Battlefield" বইটি জেরেমি স্কাহিলের দীর্ঘ গবেষণা এবং অভিজ্ঞতার ফলাফল। এই বইতে স্কাহিল দেখিয়েছেন কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার গোপনে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যা কোনো সুনির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয় বরং সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। বইটি প্রকাশের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তানে সরাসরি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল এবং এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র আরও গোপন কার্যক্রম শুরু করেছিল, যেমন ড্রোন হামলা এবং বিশেষ বাহিনীর গোপন অভিযান।

বইটি মূলত JSOC (Joint Special Operations Command)-এর কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে রচিত। JSOC একটি উচ্চ-পর্যায়ের সামরিক ইউনিট যা সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করে এবং সন্ত্রাসবাদ দমন কার্যক্রম পরিচালনা করে। স্কাহিল দেখিয়েছেন কিভাবে এই ইউনিট গোপন অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে, যার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ খুব কমই জানে। এসব অপারেশনের ফলে স্থানীয় জনগণ এবং বেসামরিক ব্যক্তিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই বইয়ের অন্যতম মূল থিম হলো "ওয়ার অন টেরর" বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব। স্কাহিল দেখিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে বিভিন্ন দেশে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং এতে তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শুধুমাত্র সন্ত্রাসীরা নয়, বরং স্থানীয় সাধারণ মানুষও পড়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ড্রোন হামলা এবং বিশেষ বাহিনীর অভিযান মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং এসব কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হয়েছে।

স্কাহিলের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ফলে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যেমন ইয়েমেন, সোমালিয়া এবং পাকিস্তানের মতো দেশে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম। বইটি প্রকাশের পর এটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, কারণ এটি এমন কিছু সত্য তুলে ধরেছিল যা সরকার সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ করতে চায়নি।


বইটির বিস্তারিত আলোচনা:
বইয়ের শুরুতেই স্কাহিল আমাদেরকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইয়েমেন এবং সোমালিয়ার মতো দেশগুলির দিকে নিয়ে যান, যেখানে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী এবং ড্রোন হামলার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। স্কাহিল দেখিয়েছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে তাদের সামরিক বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা CIA-এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ দমন অপারেশন পরিচালনা করেছে।

বইতে উল্লেখিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো অনোয়ার আল-আওলাকি হত্যাকাণ্ড। আওলাকি একজন আমেরিকান নাগরিক ছিলেন এবং তাকে সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে ড্রোন হামলার মাধ্যমে হত্যা করা হয়। স্কাহিল এই ঘটনাটি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে একজন আমেরিকান নাগরিককে কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই হত্যা করা হয়েছিল। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনি এবং নৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি গুরুতর প্রশ্ন তোলে, যা এই ধরনের গোপন সামরিক কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে আলোচনা শুরু করে।

বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো JSOC-এর কার্যক্রম। স্কাহিল দেখিয়েছেন কিভাবে এই ইউনিট সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে, যেখানে বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছে। JSOC-এর কাজের ধরন ছিল গোপন এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো সঠিক ধারণা ছিল না।

বইটির কেন্দ্রীয় একটি ধারণা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "Dirty Wars" বা গোপন যুদ্ধগুলো বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তার চেয়ে বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। স্কাহিল দেখিয়েছেন যে এইসব অভিযান এবং ড্রোন হামলা কেবল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং নতুন শত্রু তৈরি করার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে যেসব অপারেশন পরিচালিত হয়েছে, সেগুলো প্রায়ই সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে এবং এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।


প্রধান শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
"Dirty Wars" বইটি শুধু একটি সামরিক ইতিহাস নয়, এটি একটি গভীরতর রাজনৈতিক, নৈতিক এবং মানবিক বিশ্লেষণ। এই বই থেকে পাঠক কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরতে পারেন:

গোপন সামরিক অভিযান ও জবাবদিহিতা:
বইটির একটি অন্যতম শিক্ষা হলো, গোপন সামরিক অভিযান এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা। স্কাহিল দেখিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এবং সামরিক বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে গোপন অপারেশন পরিচালনা করেছে, কিন্তু এই সব কার্যক্রমের জন্য কোনো জবাবদিহিতা বা স্বচ্ছতা ছিল না। এসব অভিযান প্রায়শই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে, এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, যখন রাষ্ট্র এবং সামরিক বাহিনী গোপনে অপারেশন পরিচালনা করে, তখন তাদের কার্যক্রমের উপর যথাযথ নজরদারি এবং জবাবদিহিতা প্রয়োজন।

মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধের নৈতিকতা:
"Dirty Wars" বইটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর প্রশ্ন তোলে। স্কাহিল দেখিয়েছেন কিভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণ নিয়েছে, বিশেষ করে ড্রোন হামলার মাধ্যমে। এই ধরনের হামলা শুধু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং স্থানীয় জনগণের জীবন ও নিরাপত্তার ওপরও আঘাত হেনেছে। ফলে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার:
বইটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নও তোলে। স্কাহিল দেখিয়েছেন কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী অপারেশন পরিচালনা করেছে। বিশেষ করে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে ড্রোন হামলা এবং গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যা কোনো আন্তর্জাতিক সম্মত আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক রাজনীতির মধ্যে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা:
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো গণমাধ্যমের ভূমিকা। স্কাহিল নিজেই একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে দেখিয়েছেন যে কিভাবে এইসব গোপন তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। সাংবাদিকতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গোপন কার্যক্রমের প্রতি নজরদারি এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।


আজকের বিশ্বের প্রাসঙ্গিকতা:
"Dirty Wars: The World Is a Battlefield" বইটি প্রকাশের পর থেকে বিশ্ব পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তবে এর মূল থিম এবং জেরেমি স্কাহিলের উত্থাপিত বিষয়গুলো আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের বিশ্বে যুদ্ধের কৌশল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান যেমন বহুমুখী হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের গোপন সামরিক কার্যক্রম, ড্রোন হামলা, এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন আজও বহাল রয়েছে। এই বইয়ের বিষয়বস্তু বর্তমান সময়ে আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে কারণ সামরিক বাহিনীর গোপন কার্যক্রম, বিশেষ বাহিনীর অপারেশন, এবং ড্রোন প্রযুক্তি আরও প্রসারিত হয়েছে।

গোপন সামরিক অভিযান ও ড্রোন যুদ্ধের অব্যাহত ব্যবহার:
আজকের দিনে গোপন সামরিক অভিযান ও ড্রোন যুদ্ধের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে প্রসারিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পরাশক্তিরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে (ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন) এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে (সোমালিয়া, নাইজেরিয়া) ড্রোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অভিযানে প্রায়শই বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্কাহিল তার বইয়ে দেখিয়েছিলেন কিভাবে ড্রোন হামলা এবং গোপন সামরিক অভিযান জনসাধারণের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এর প্রমাণ আমরা আজও দেখতে পাই।

উদাহরণ: ২০১৯ সালে ইরানিয়ান জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি ড্রোন হামলা চালায়, যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পর থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এ ধরনের গোপন অপারেশন আজকের বিশ্বের অনেক সংঘর্ষের কেন্দ্রে রয়েছে, এবং স্কাহিলের বইয়ের মত, এগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়।


মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে নিরীহ প্রাণের ক্ষতি:
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে অসংখ্য নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। স্কাহিল বইতে যেমন দেখিয়েছিলেন, এই ধরনের অপারেশনগুলো প্রায়শই সন্ত্রাসবাদ দমনের চেয়ে নতুন শত্রু তৈরি করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সময়ে ইয়েমেন, সিরিয়া, এবং আফগানিস্তানের মতো অঞ্চলে গোপন সামরিক অভিযান এবং ড্রোন হামলার কারণে বেসামরিক মানুষের ক্ষতি হচ্ছে, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলো কঠোরভাবে সমালোচনা করছে। এই ধরনের অপারেশনগুলো কেবল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।

উদাহরণ: ২০২১ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত ড্রোন হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু ছিল। এই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল এবং এটি আন্তর্জাতিক মহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে উঠে আসে। স্কাহিলের বইতে এই ধরনের ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, যেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন কিভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোপন কার্যক্রম প্রায়শই নিরীহ মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


গ্লোবাল ওয়ার অন টেররের প্রভাব:
বর্তমান বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর নামে বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, এই যুদ্ধ শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়, বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিতে এবং শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসছে। স্কাহিল বইতে দেখিয়েছিলেন কিভাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মাধ্যমে এক দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত অন্য দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও এই প্রভাব দেখা যাচ্ছে, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ফ্রান্স ও রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রম।

উদাহরণ: ফ্রান্সের সামরিক বাহিনী আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে "ওয়ার অন টেরর" কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু এইসব অপারেশনগুলির ফলস্বরূপ, এই অঞ্চলে নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে এবং সংঘর্ষ আরও বেড়ে যাচ্ছে। স্কাহিল তার বইতে এই ধরনের ঘটনা আগেই তুলে ধরেছিলেন, যেখানে সন্ত্রাস দমনের চেয়ে এসব অপারেশনগুলোর মাধ্যমে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।


সাইবার যুদ্ধ এবং তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার:
বর্তমান বিশ্বে সামরিক অভিযান কেবল শারীরিক যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাইবার যুদ্ধ এবং তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ আরও জটিল হয়েছে। স্কাহিলের বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গোপন সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি। আজকের পৃথিবীতে, বড় বড় রাষ্ট্রগুলো সাইবার মাধ্যমে গোপন অপারেশন পরিচালনা করছে, যেমন সাইবার আক্রমণ, হ্যাকিং, এবং ডিজিটাল নজরদারি। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন সংঘর্ষের রূপ তৈরি হয়েছে।

উদাহরণ: ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থা এবং বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাইবার আক্রমণ হয়, যা "SolarWinds Hack" নামে পরিচিত। এই সাইবার আক্রমণটি রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত বলে ধারণা করা হয়। স্কাহিলের বইয়ে যেমন গোপন সামরিক অপারেশনের কথা বলা হয়েছে, আজকের দিনে সাইবার যুদ্ধের মাধ্যমে এই ধরনের গোপন আক্রমণ আরও জটিল রূপ নিয়েছে।


উপসংহার:
"Dirty Wars: The World Is a Battlefield" বইটি যুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন নিয়ে একটি গভীর এবং সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রদান করে। জেরেমি স্কাহিল তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক অপারেশন এবং ড্রোন হামলা বিশ্বব্যাপী সংঘাত এবং মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বইটি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক অভিযান নিয়েই নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করে—কোন দেশের সরকার এবং সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কতটা জবাবদিহি করছে?

বইটি পাঠকের জন্য একটি শিক্ষা দেয় যে রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গোপন সামরিক কার্যক্রমের ফলে কেবল সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে নয়, বরং এইসব অভিযানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনেও বিশাল প্রভাব পড়ে। আজকের পৃথিবীতেও এই ধরনের অপারেশন এবং ড্রোন হামলা চলছে, এবং এসব কার্যক্রম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান সময়ের প্রাসঙ্গিকতা: বর্তমান সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, ড্রোন হামলা, এবং সাইবার যুদ্ধের মতো বিষয়গুলো বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। যেমন ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পরাশক্তির সামরিক কার্যক্রম চলছে, যা স্কাহিলের বইয়ের তত্ত্বগুলির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। স্কাহিল দেখিয়েছেন কিভাবে সামরিক বাহিনীর গোপন কার্যক্রম জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, যা আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতেও প্রাসঙ্গিক।

বইটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো যে গোপন সামরিক অপারেশন এবং ড্রোন হামলার মতো কার্যক্রম কেবল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং এসব অপারেশন মানবাধিকার, আইনের শাসন, এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও বিশাল প্রভাব ফেলে। জেরেমি স্কাহিল তার বইতে এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, যা ভবিষ্যতের সামরিক অভিযান এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।


ডকুমেন্টারি: "ডার্টি ওয়ার্স" (Dirty Wars) জেরেমি স্কাহিলের বই "Dirty Wars: The World Is a Battlefield" এর ভিত্তিতে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র।
এটি ২০১৩ সালে মুক্তি পায় এবং পরিচালক ছিলেন রিক রাওলি (Rick Rowley)। স্কাহিল এই ডকুমেন্টারির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নিজেই উপস্থিত ছিলেন এবং ডকুমেন্টারিতে তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিশ্বের গোপন সামরিক অভিযানগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক কার্যক্রম, বিশেষ বাহিনীর অপারেশন, এবং ড্রোন হামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্ষতির কাহিনি বিবৃত করে।

ডকুমেন্টারির প্রধান অভিনেতা ও টিম:
ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেছেন জেরেমি স্কাহিল (Jeremy Scahill), তিনি শুধু বইটির লেখক নন, বরং ডকুমেন্টারির মূল ন্যারেটর এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকও। তার অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে কেন্দ্র করেই ডকুমেন্টারির মূল কাহিনী গড়ে ওঠে।
রিক রাওলি (Rick Rowley), তিনি এই ডকুমেন্টারির পরিচালক ছিলেন এবং তার নির্দেশনায় এই চলচ্চিত্রটি একটি শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা হিসেবে গড়ে ওঠে।
ডকুমেন্টারির চিত্রগ্রহণ এবং সম্পাদনা অত্যন্ত দক্ষভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল, যা দর্শকদের স্কাহিলের অনুসন্ধানের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করে দেয়। স্কাহিল বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে, যেমন আফগানিস্তান, ইয়েমেন এবং সোমালিয়ায় ভ্রমণ করে সেখানে ড্রোন হামলা, বিশেষ বাহিনীর গোপন অভিযান এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরেন।

ডকুমেন্টারির গ্রহণযোগ্যতা:
"ডার্টি ওয়ার্স" মুক্তি পাওয়ার পর ব্যাপক সমাদৃত হয় এবং এটি ২০১৪ সালে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড-এ সেরা ডকুমেন্টারি ফিচারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। এটি সাংবাদিকতা এবং চলচ্চিত্রের একটি অসাধারণ মেলবন্ধন হিসেবে বিবেচিত হয়, যা রাষ্ট্রের গোপন সামরিক কার্যক্রম সম্পর্কে দর্শকদের জাগ্রত করে।

ডকুমেন্টারির জোরালো অনুসন্ধান এবং সত্য প্রকাশের সাহসী প্রচেষ্টার জন্য এটি সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল, তবে এটি কিছু বিতর্কও তৈরি করেছিল। অনেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোপন অপারেশনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, যদিও সমালোচকরা এই ধরনের অপারেশনকে অমানবিক এবং অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেন।

ডকুমেন্টারিটি দেখতে (ফ্রি) এই সাইট ভিজিট করতে পারেন
https://theflixertv.to/movie/watch-dirty-wars-full-1349






মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.