![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাঙালী নারী, সে নন্দিত ও নিন্দিত। আর এই ঐতিহাসিক সংকট আজ পর্যন্ত বাংলার সমাজে বিদ্যমান। আজও তারা ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানি হলে বহুক্ষেত্রে মুখ বুজে থাকেন এবং কখনো কখনো আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন। বাঙালী নারীদের মধ্যে বরাবর ‘সতীত্ব’ হারানো কে নিজেকে হারানো বা নিজের পরিচয় হারানো বলে মনে করেন। যে ধর্ষণের শিরোনামগুলো নিয়মিত দৈনিক পত্রিকায় এসে থাকে তা মূলত সামগ্রিক বাস্তবতার একটি অংশ মাত্র; পুরো চিত্র হয়তো নয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী ‘রাজাকার’ মিলে বাঙালী নারীদের উপর ব্যাপক গণধর্ষণ, ধর্ষণ ও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। একাধিক সূত্র মতে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ২ লাখ থেকে ৪ লাখ নারীদের ধর্ষণ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এই নির্যাতন এতটাই বিভৎস ছিলো যা হয়তো আমি আমার শব্দ দ্বারা পুরোপুরি প্রকাশ করতে অক্ষম।
নারীদের ধর্ষণের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো, বাঙালী নারীদের ‘বিশুদ্ধ (Purify)’ করা। হ্যাঁ, ধর্ষণের মাধ্যমে ‘বিশুদ্ধ’ করার প্রক্রিয়া এবং যুদ্ধে বাঙালীদের নৈতিক অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া ও ভয় দেখানো।
বন্ধবন্ধু এবং পরবর্তীতে বাকশালের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান এই নারীদের সামাজিকভাবে অপমান হওয়া থেকে রক্ষা করতে ওঁদের নাম দেন ‘বীরঙ্গনা’। বীরঙ্গনা (বীর + অঙ্গনা) শব্দের অর্থ হলো, সাহসী নারী (বীর = সাহসী বা বীরত্বপূর্ণ অর্থে এবং অঙ্গনা = নারী অর্থে)।
কিন্তু কেন এই ‘বীরঙ্গনা’ নাম দেওয়া হয়েছিলো জানেন?
কারণ যুদ্ধের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এই নারীরা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেত না, চিকিৎসা পেত না, আর্থিক সহায়তা পেত না, কেউ তাদের বিয়ে করতে চাইতো না। স্বাধীন বাংলাদেশে ঐ ‘বীরঙ্গনা’দের সমাজ ও রাষ্ট্র অনেক দূরের কথা তারা নিজ পরিবার থেকেও পরিত্যাজ্য হয়েছিলেন। আর এই অপমানের ভার অনেকেই সহ্য করতে পারেননি এবং এ কারণেই সে সময় অগণিত বাঙালী নারী আত্মহত্যা করেছিলেন।
কেউ কেউ নিজ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছিলেন কাজের খোঁজে যাতে করে অন্তত তারা মানুষ হিসেবে একটু বাঁচতে পারেন! কিন্তু তাও পুরোপুরি সম্ভব হয় নাই। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ‘বীরঙ্গনা’দের মেয়েদের পর্যন্ত বিয়ে দেওয়া যেত না বলে অভিযোগ আছে, প্রতিবেদন আছে এবং নাটক পর্যন্ত তৈরি হয়েছে। কিন্তু ‘বীরঙ্গনা’দের সঠিক পরিসংখ্যান আজ পর্যন্ত খুঁজে না পাওয়া জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় প্রতিফলিত হয়।
নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিলো ‘বাঙালী নারী’। ‘বাঙালী নারী’ এখানে রেটোরিক অর্থে কিছুটা নেওয়া গেলেও পুরোপুরি নেওয়া যায় না। এই ‘বাঙালী নারী’ বলতে বুঝায় বাংলার মুসলিম ও হিন্দু ধর্মের সকল নারী। মানে একরকম ধর্ম নির্বিশেষে এক ধরণের সিস্টেমেটিক ধর্ষণের কথা বলার চেষ্টা করছি।
কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেত এবং বেছে বেছে হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করতো (সুসান ব্রাউনমিলারের বই ‘Against Our Will: Men, Women and Rape’ থেকে জানা যায় যে, ধর্ষিত নারীদের ৮০% মুসলিম ছিলেন, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রতিফলন, এবং বাকি ২০% হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মের নারী অন্তর্ভুক্ত হতে পারে)।
হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হত। তারা মনে করতো, “হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করলে দেশের জনসংখ্যার গঠন বদলে যাবে।” মানে হলে উত্তরসূরী মুসলিম হিসেবে একটি বাচ্চা জন্ম নেবে। অন্যদিকে রাজাকার বাহিনী মনে করতো, হিন্দু পরিবার থেকে লুটের অর্থ বা জিনিসপত্র হলো গনিমতের মাল। এই গনিমতের মাল বলতে ঐ সম্পদ কে বুঝায়, মুসলিমদের দ্বারা রণক্ষেত্রে বিজয়ী হওয়ার পর যা-কিছুই পাওয়া যায়। কি বিভৎস একটি ইসলামের ব্যাখ্যা! তাই না?
২০১৫ সালে এসে আওয়ামী লীগ সরকার ‘বীরঙ্গনা’দের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেন ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে এবং তাদের জন্য ভাতা প্রদান করতে শুরু করেন। দীর্ঘদিন পর এই বাস্তবতা বাংলাদেশ নৈতিকভাবে মেনে নিলেও এই ভাতা কতটুকু একজন ‘বীরঙ্গনা’ পাচ্ছেন তা নিয়েও অভিযোগ আছে সাবেক (অনির্বাচিত) আওয়ামী সরকারের উপর। তবে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষদের মধ্যে ‘বীরঙ্গনা’দের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়তে থাকে। এই পুরো বিষয়টিকে লজ্জা হিসেবে নয়, যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা ও ‘ওয়ার-ক্রাইম’ হিসেবে বিষয়টির কিছুটা মীমাংসিত হতে দেখা যায়।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর, এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে নানান ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু হয়। একদল বলার চেষ্টা করছেন যে, এরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আরেকদল বলার চেষ্টা করছেন, ‘বীরঙ্গনা’দের সংখ্যা অন্তত ১০ লাখ! এখন এই বাস্তবতায় আমরা সাধারণ মানুষ সত্যটা জানতে চাই। এবং, আমি আজকে প্রায় দীর্ঘসময় পড়াশোনা করলাম এ বিষয়ে। তবুও, হয়তো শতভাগ নির্ভুল তথ্য দিতে পারবো না। এতগুলো বইয়ের সারমর্মও পড়া আমার পক্ষে খুবই কঠিন।
বীরঙ্গনাদের সঠিক সংখ্যা কত?
১. Against Our Will: Men, Women and Rape by Susan Brownmiller (১৯৭৫) —এই বইয়ে মোট ধর্ষণের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ২ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ নারী।
২. The Rape of Bangladesh by Anthony Mascarenhas (১৯৭১) —এই বই থেকে ধর্ষণের মাধ্যমে ‘জাতিগত পরিশুদ্ধি’ আমি আমার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি।
৩. Ami Birangana Bolchi by Nilima Ibrahim (১৯৯৪) —এই বইটি বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা। এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় নারীর ধর্ষণের কাহিনী আছে, তবে হিন্দু নারীদের প্রতি অতিরিক্ত নিষ্ঠুরতার উল্লেখ রয়েছে। ‘বাঙালী নারী’ বলতে যে রেটোরিক অর্থ আমি বিবেচনায় নিয়েছি সেটা এই বইয়ে আছে।
৪. War and Women by M.A. Hasan (২০১০) —এই বইয়ে ৩,৩৩,৭৭৭ নারীর ধর্ষণের বিস্তারিত পরিসংখ্যান দেওয়া আছে, যার মধ্যে হিন্দু নারীদের আলাদা লক্ষ্যকরণের উল্লেখ রয়েছে।
৫. Women, War, and the Making of Bangladesh: Remembering 1971 by Yasmin Saikia (২০১১) -এই বইয়ে সাকিয়া হিন্দু নারীদের ধর্ষণকে একটি ‘ধর্মীয় ও জাতিগত আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তানি সেনারা হিন্দু নারীদের ‘ইসলামিকরণ’ করার উদ্দেশ্যে গর্ভবতী করতে চেয়েছিল।
৬. বাংলাদেশ সরকার (ইতিহাসিক দাবি): ২,০০,০০০ নারী ধর্ষণের শিকার হোন। নিম্নতম অনুমান, প্রায়শই উল্লেখিত।
৭. ডা. জিওফ্রে ডেভিস (অস্ট্রেলিয়ার ডাক্তার): ৪,০০,০০০ নারী ধর্ষণের শিকার হোন। যুদ্ধের পর গর্ভপাত সেবার ভিত্তিতে, বাংলাদেশ সরকারের অনুমানের দ্বিগুণ।
৮. সাধারণ পরিসংখ্যান (বহু সূত্র): ২,০০,০০০ - ৪,০০,০০০ নারী ধর্ষণের শিকার হোন। সামাজিক লজ্জা এবং তথ্য সংগ্রহের সমস্যার কারণে এই পরিসর গ্রহণ করা হয়।
এই ধর্ষণের ক্ষেত্রে হিন্দু নারীদের ‘জাতিগত শক্রু’ এবং ‘ভারতের দালাল’ ইত্যাদি বলে একরকম ভয়ানক যুদ্ধপরাধ আমরা দেখতে পাই। আবার অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্লাবিত ১০ লাখ নারীর ধর্ষণের ইতিহাস দেখতে পাই যেটা আসলে সত্যিকারের ইতিহাসকে বিকৃত করেই চলেছে। সামাজিক লজ্জা ও তথ্য সংগ্রহের সমস্যা ছিলো তাই বর্ধিত একটি পরিসংখ্যান ব্যবহার করা ইতিমধ্যেই হয়েছে। আশা করি, আমরা যারা বেসিক ধারণা চাই যে কোন বিষয়ে তাদের জন্য এই তথ্যগুলো খুবই কাজের হতে পারে।
শেষ করছি, ‘নব্য রাজাকার’ নামক নতুন ও ভয়ংকর মিথ্যা ন্যারেটিভ কে ডিকনস্ট্রাকশন করার মাধ্যমে। শুধুমাত্র মতের মিল না হলেই তাকে ‘নব্য রাজাকার’ বা ‘রাজাকার শাবক’ বলা হচ্ছে। এই ন্যারেটিভের আরেকটি ‘গণহত্যা’ জন্ম দেবার প্রয়োজনীয় পটেনশিয়ালটি রয়েছে।
এই ধরণের সামাজিক ফ্রেমিং স্বাধীনতার ৫৩ বছর ভয়ানক অপরাধ। খুব সম্ভবত এ বিষয়েও বাংলাদেশে একটি অকার্যকর আইন বিদ্যমান। আইনের ছাত্ররা ভালো বলতে পারবেন।
কেন ‘নব্য রাজাকার’ ন্যারেটিভ ঝেড়ে ফেলে দেওয়া উচিত?
প্রথমত, একাধিক সূত্র মতে ‘বীরঙ্গনা’দের সংখ্যা ২ লাখ থেকে ৪ লাখ পর্যন্ত। যুদ্ধের পর গর্ভপাতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান পাওয়া যায়। UCL-এর Bangladesh Genocide Booklet (২০২১) —এ উল্লেখ আছে, প্রায় ১,৭০,০০০ নারী গর্ভপাত করেছিলেন। ডা. জিওফ্রে ডেভিস, যিনি গর্ভপাত সেবায় সহায়তা করেছিলেন, তার মতে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ তিনি ৪,০০,০০০ ধর্ষণের শিকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গর্ভবতী নারীর কথা বলেছেন।
তবে, আন্তর্জাতিক কমিশন অফ জুরিস্টস (ICJ) —এর ১৯৭২ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৭০,০০০ নারী গর্ভবতী হয়েছিলেন, যার মধ্যে অনেকে গর্ভপাত করেছিলেন। এছাড়াও একটি বড় অঙ্কের ‘বীরঙ্গনা’ সে সময় সামাজিক লজ্জায় আত্মহত্যা করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ‘নব্য রাজাকার’ বা ‘রাজাকার শাবক’ যদি ঐ ‘বীরঙ্গনা’দের ই সন্তান হোন তাহলে ফের আপনি নৈতিকভাবে এই ‘বীরঙ্গনা’ দের অপমান করছেন। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর জাতীয় অনৈক্য সৃষ্টিতে আপনি মহান ভূমিকা পালন করছেন। এই ধরণের মহামানবদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
এছাড়াও আমাদের পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস এবং ‘আমি মেজর ডালিম বলছি’ বইয়ের ইতিহাস দিয়ে একটি গোটা যুদ্ধকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এসব নিশ্চয় একেক দৃষ্টিকোণ থেকে অঙ্কিত বা দৃষ্টিভঙ্গি বা পারসেপশনের ইতিহাস; পুরো বাস্তবতা হতে পারে না। সবই পড়ুন, জানুন এবং সম্ভব হলে আমাকেও জানান। তবে, ব্যক্তি একটি সংখ্যা নিয়ে গোঁ ধরে থাকতে পারেন তাতে ইতিহাস পরিবর্তন হয়ে যায় না।
ছবি সুত্র: The Daily Star
২| ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ বিকাল ৪:১০
রিফাত হোসেন বলেছেন: ১ লাখ হোক আর ১ জন, অর্থ পাল্টাবে না। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব কোন মুখে পাকিদের সাথে settlement করলো, যেখানে পাকিরা এহেন অপকর্মের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চায়নি।
©somewhere in net ltd.
১|
০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ৮:০১
রোবোট বলেছেন: ১লাখ ৭৫ হাজার গর্ভপাত হলে ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বেশী। ৪ লাখ সে হিসাবে বেশ গ্রহণযোগ্য মনে হয়। এক কুলাংগার (পলাতক মেজর) বলেছে ২ জন নাকী ধর্ষিতা হয়েছিলো। এই লোককে শুওরের বাচ্চা বলে শুওরকে অপমান করতে চাই না।