| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশের পাটশিল্পের হালচাল; সমস্যা এবং সম্ভাবনা
প্রাইমারী থেকে শুরু করে এসএসসি সবখানে,সব শ্রেণির বাংলা দ্বিতীয় পত্রে অবশ্যপাঠ্য রচনা হল 'পাটঃ বাংলাদেশের সোনালী আঁশ'। আমরা সবাই পড়েছি। প্রাইমারীতে হয়তো ছোট আকারে পড়েছি রচনাটা, আর হাই স্কুলে গিয়ে বড় করে। ব্যস্, ও পর্যন্তই।
পাট যে একসময় সত্যিই সোনালী আঁশ ছিল তা হয়তো প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না।
আমাদের দেশে পাটের উৎপাদন সেই সোনালী সময়ের তুলনায় অনেক কমে যাওয়ার পরও প্রতি অর্থবছরে দেশে অব্যবহৃত পাটের মজুত বেড়েই চলেছে যা সত্যিই হতাশাজনক। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল অর্থবছর শেসে দেশের পাটকল গুলোতে পাটের মজুত দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ২১০ টন। যেখানে এর আগের অর্থবছরে মজুদের পরিমাণ ছিল এর চাইতে প্রায় ৬৫ হাজার টন কম পাট। কিন্তু এত বিপুল পরিমানে পাটপণ্য পাটকল গুলোতে কেন পড়ে আছে? সহজ উত্তর; পাটের চাহিদা নেই। চাহিদা নেই মানে, পাট পণ্যের ব্যাবহার দিন দিন কমছে। স্পষ্ট আইনের বিধান রয়েছে যে, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি, সরিষা, সার ইত্যাদি পণ্য মজুত বা পরিবহনের কাজে সব সময় পাটের তৈরি বস্তা অবশ্যই ব্যাবহার করতে হবে। কিন্তু বাজারে বা আড়তে গিয়ে দেখুন। কোথাও পাটের তৈরি বস্তায় পণ্য মজুত করা হয়নি, হলেও সে সংখ্যাটা নিতান্তই নগণ্য। সবই প্লাস্টিক। আর প্লাস্টিক বা প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য শুধু পরিবেশকেই সীমাহীন হুমকির মুখে ফেলছে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও এটি সমানভাবে হুমকিস্বরূপ।
আমাদের দেশের বাজারে যদি পাটের ব্যাবহার, পাটজাত পণ্যের ব্যাবহার বাড়ানো যেত তবে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির এত অবনমন হত না। লাভের মুখ না দেখলেও পাট শিল্পে ক্রমাগত লোকসানে স্থবিরতা আসত না। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ভারত অনেকটা এগিয়ে। ভারতে উৎপাদিত পাটের শতকরা আশি শতাংশই সে দেশে ব্যাবহার হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকেও বিপুল পরিমাণ পাট আমদানি করে ভারত। নগণ্য মূল্যে পাট কিনে ভ্যালু এ্যাডিশন করে ভারত সেসব পাটজাত পণ্য রপ্তানি করছে কোটি কোটি ডলারে। বাংলাদেশী পাটের সবচেয়ে বড় বাজার অবশ্য তুরস্ক। তুরস্ক বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি করে মূলত তাদের কার্পেট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে। এখন ধরুন, কোনক্রমে তুরস্কে বাংলাদেশের পাটের বাজারটা হারিয়ে গেল। তখন কি একেবারেই স্থবির হয়ে যাবে আমাদের পাট শিল্প?
কৃষকের ন্যায্য দাম না পাওয়া আরেকটা প্রধান সমস্যা। বি.জে.এম.সি. আর কৃষকের মাঝে শোষনের দেয়াল দাঁড় করায় কিছু মুনাফালোফী মধ্যসত্ত্বভোগী। কৃষক ন্যায্য দাম পায়না। তাই উৎপাদনের পরিসংখ্যানটাও নাজুক হচ্ছে দিন দিন। সরকার যদি এ বিষয়গুলোর দিকে একটু নজর দিত, দেশীয় পাটকল গুলোতে মনিটরিং আরো বাড়াতো, সবগুলো কল উৎপাদনক্ষম করতে পারত তবে নিশ্চয়ই অবস্থার উন্নতি হতই।
কিন্তু, তার চেয়েও জরুরী যে বিষয় সেটা হল আমাদের দেশে পাটের তৈরি দ্রব্যের ব্যাবহার বাড়াতে হবে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিসরূপ প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের ব্যাবহার কমিয়ে পাটকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। এজন্য জরুরী হল পর্যাপ্ত প্রচারনা, উদ্যোগ এবং সচেতনতা। কিন্তু, বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা পরাবে কে সেটাই হল বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে গবেষণা কার্যক্রম আরো বাড়াতে হবে। স্থবির অবস্থা কাটিয়ে গবেষণা কার্যক্রম আরও বাড়াতে পারলে কৃষকদের কম মূল্যে আরও ভাল জাতের পাটের বীজ যোগান দেয়া সম্ভম। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে টেকনিকাল রিসার্চ আরো জোরদার করে জুট ফাইবারের সাথে অন্যান্য ফাইবার মিশিয়ে উন্নত মানের ব্লেন্ড তৈরিতে নজর দিতে পারলে তৈরি করা সম্ভব হবে নানান ধরনের উন্নতমানের পাটজাত পণ্য। 'জুটন' এর নাম তো আমরা অনেকেই শুনেছি। শুধু জুটনই না। জুট ফাইবারের সাথে অনেক ন্যাচারাল এবং সিনথেটিক ফাইবার মিক্সিং এবং ব্লেন্ডিং করে অনেক উন্নতমানের হোমটেক্সটাইল উৎপাদন সম্ভম। তোষা পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের পর থেকে পাঠ শিল্প আবারো নতুন দিগন্তে প্রবেশ করার অপেক্ষায়। কিন্তু তার আগে তো আমাদেরকেই আগে সচেতন হতে হবে নাকি? সচেতন হতে হবে সরকাকে। সচেতন হতে হবে প্রশাসনকে। সচেতন হতে হবে ভোক্তাদের।
©somewhere in net ltd.