| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নতুন নকিব
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।
সূরা মুলক, আয়াত ৫: প্রচলিত তাফসীরের আলোকে তথাকথিত সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যার পর্যালোচনা
অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।
কুরআনুল কারিম আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত সর্বশেষ ও চূড়ান্ত গ্রন্থ। এটি যেমন হেদায়েতের কিতাব, তেমনি আকীদা ও বিশ্বাসের মৌলিক ভিত্তি। ফলে কুরআনের কোনো আয়াত ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আবেগ, ব্যক্তিগত অনুমান বা আধুনিক জ্ঞানকে একক মানদণ্ড বানানো গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তাফসীরের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা, সহীহ হাদীস এবং স্বীকৃত মুফাসসিরদের ব্যাখ্যাই মূল মানদণ্ড।
সূরা মুলক-এর ৫ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত করেছেন, সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ বানিয়েছেন এবং শয়তানদের জন্য জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। এই আয়াতটি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু লেখালেখিতে এমন এক ধরনের সায়েন্টিফিক তাফসীর হাজির করা হচ্ছে, যা মূল তাফসীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সামু ব্লগে ব্লগার রাশিদুল ইসলাম লাবলু এই আয়াতের ব্যাখ্যায় দাবি করেছেন যে এখানে শয়তান বলতে মানুষরূপী শয়তান বোঝানো হয়েছে এবং আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত বস্তু বলতে গ্রহাণু, অ্যাস্টিরয়েড বেল্ট কিংবা কুইপার বেল্টের বস্তুসমূহ বোঝানো হয়েছে। এমনকি সদম ও গোমরাহ ধ্বংসের ঘটনাকেও গ্রহাণুর আঘাতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও প্রশ্ন হলো, এই ব্যাখ্যা কি কুরআনের স্বীকৃত তাফসীরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রথমে আমরা তাফসীর ইবনে কাসীর-এর দিকে তাকাই। ইমাম ইবনে কাসীর রহ. সূরা মুলক, আয়াত ৫-এর তাফসীরে স্পষ্টভাবে বলেছেন, আয়াতে উল্লিখিত “মাসাবীহ” দ্বারা নক্ষত্ররাজিকে বোঝানো হয়েছে, যা দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশকে শোভিত করে। আর “শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপ” বলতে বোঝানো হয়েছে জিন শয়তানদের, যারা আকাশে উঠে ফেরেশতাদের পারস্পরিক কথোপকথন বা গায়েবি সংবাদ শোনার চেষ্টা করে। তখন আল্লাহর আদেশে তাদের দিকে জ্বলন্ত শিখাযুক্ত উল্কা বা শিহাব নিক্ষেপ করা হয়।
এই ব্যাখ্যার পক্ষে ইবনে কাসীর রহ. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত একাধিক সহীহ হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। তার মধ্যে একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হাদিস হলো—
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ:
سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الشُّهُبِ، فَقَالَ:
«إِنَّهَا تُرْمَى لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلَا لِحَيَاتِهِ، وَلَكِنْ إِذَا قَضَى اللَّهُ أَمْرًا فِي السَّمَاءِ، سَبَّحَتِ الْمَلَائِكَةُ، فَسَمِعَ ذَلِكَ مُسْتَرِقُو السَّمْعِ مِنَ الشَّيَاطِينِ، فَيُقْذَفُونَ، فَيُلْقُونَهُ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ، فَيَكْذِبُونَ مَعَهَا مِائَةَ كَذْبَةٍ»
অর্থাৎ, হযরত আয়িশা রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে উল্কা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এগুলো কারও মৃত্যু বা জন্মের কারণে নিক্ষেপ করা হয় না। বরং আল্লাহ যখন আকাশে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন, তখন ফেরেশতারা তাসবীহ পাঠ করে। তখন শয়তানরা চুরি করে সে কথা শোনার চেষ্টা করে। এরপর তাদের দিকে উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। তারা যা সামান্য শুনতে পায়, তা তাদের অনুসারীদের কাছে পৌঁছে দেয় এবং তার সঙ্গে শত মিথ্যা যোগ করে দেয়। -সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, সূরা জ্বিন ও সূরা সাবা প্রসঙ্গ।
এই হাদিসটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, শয়তান বলতে এখানে জিন শয়তানদের বোঝানো হয়েছে এবং উল্কা নিক্ষেপের বিষয়টি আখ্যানমূলক বা রূপক নয়, বরং একটি বাস্তব গায়েবি ঘটনা।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ:
كَانَتِ الشَّيَاطِينُ يَسْتَمِعُونَ الْوَحْيَ فَيَسْتَرِقُونَهُ، فَإِذَا سَمِعُوا كَلِمَةً أَلْقَوْهَا إِلَى الْكَهَّانِ، فَزَادُوا فِيهَا تِسْعِينَ كَذْبَةً، فَأُحْرِقُوا بِالشُّهُبِ
অর্থাৎ, হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, শয়তানরা ওহির কথা শোনার চেষ্টা করত এবং তা চুরি করে নিত। তারা একটি কথা শুনে তা গণকদের কাছে পৌঁছে দিত এবং তার সঙ্গে বহু মিথ্যা যোগ করত। তখন তাদের উপর উল্কা নিক্ষেপ করা হতো এবং তারা দগ্ধ হতো। -সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম।
এই হাদিসগুলো ইমাম ইবনে কাসীর রহ.-এর ব্যাখ্যাকে অকাট্যভাবে সমর্থন করে এবং স্পষ্ট করে দেয় যে সূরা মুলক-এর আয়াতে আলোচিত শয়তানরা মানুষ নয়, বরং জিন জাতিভুক্ত শয়তান।
একই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মারেফুল কুরআনে। মুফতী শফী রহ. পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে এটি একটি গায়েবি বিষয়, যার প্রকৃতি আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, কুরআনের গায়েবসংক্রান্ত আয়াতগুলোকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুমানের আলোকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যাতে আয়াতের মূল অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যায় বা সাহাবা ও সালাফে সালেহীনের সর্বসম্মত ব্যাখ্যার বাইরে চলে যায়।
অতএব সহীহ হাদিস, ইবনে কাসীর এবং মারেফুল কুরআনের আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে সূরা মুলক, আয়াত ৫-এ মানুষরূপী শয়তান, গ্রহাণু বেল্ট বা পৃথিবী ধ্বংসের কোনো ধারণা নেই। এসব ব্যাখ্যা কুরআনের উপর আরোপিত মনগড়া ধারণা, যা তাফসীরের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখন আলোচ্য সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যার মূল দাবিগুলোর দিকে তাকালে কয়েকটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট হয়। প্রথমত, আয়াতের শয়তানকে মানুষরূপী শয়তান বলা। অথচ আয়াতের প্রেক্ষাপট আকাশ, নক্ষত্র এবং ঊর্ধ্বজগতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত। মানুষ সেখানে যাওয়ার সক্ষমতাই রাখে না। দ্বিতীয়ত, গ্রহাণু বা অ্যাস্টিরয়েড বেল্টকে আয়াতের নির্দিষ্ট অর্থ হিসেবে দাবি করা। কোনো সাহাবী, তাবেঈ বা স্বীকৃত মুফাসসির এই ব্যাখ্যা দেননি। তৃতীয়ত, সদম ও গোমরাহ ধ্বংসকে গ্রহাণুর আঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা। কুরআন এই ধ্বংসকে আল্লাহর প্রত্যক্ষ গজব হিসেবে বর্ণনা করেছে। কোথাও গ্রহাণু আঘাতের কথা বলা হয়নি।
এ কারণে স্পষ্টভাবে বলা যায়, এই ব্যাখ্যা তাফসীর ইবনে কাসীর, মারেফুল কুরআনসহ কোনো নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি তাফসীরের নামে একটি মনগড়া ব্যাখ্যা, যা পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং আকীদাগতভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
সবশেষে বিনয়ের সঙ্গে একটি অনুরোধ, ব্লগার রাশিদুল ইসলাম লাবলুকে। একজন লেখক হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই সত্য অনুসন্ধানে আগ্রহী হবেন, এটা আশা করতেই পারি। সে ক্ষেত্রে কুরআনের মতো সংবেদনশীল ও গায়েবসংক্রান্ত বিষয়ে লেখালেখি করার সময় স্বীকৃত তাফসীর ও আলেমদের ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত সায়েন্টিফিক অনুমানকে চূড়ান্ত অর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকা একান্তভাবেই উচিত। কুরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন কখনোই আল কুরআনের নির্ধারিত অর্থকে পরিবর্তন বা বিকৃত করার মাধ্যম না হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের সহিহ ঈমান, আকিদা এবং আমলের তাওফিক দান করুন। কুরআনুল হাকিমকে আমাদের জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা হিসেবে মঞ্জুর করুন।
কৃতজ্ঞতাঃ ব্লগার বাজ ৩ এবং আলামিন১০৪ এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।
২৪ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৩৭
নতুন নকিব বলেছেন:
আপনার মন্তব্যটি যথার্থ। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নক্ষত্র ও উল্কাকে ভিন্ন ভৌত সত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করে, কিন্তু কুরআন এগুলোকে গায়েবি বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করেছে, পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ হিসেবে নয়। তাই অদৃশ্যের বিষয়গুলোকে পরিবর্তনশীল বৈজ্ঞানিক থিওরির ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা না করে আল্লাহ যেভাবে বর্ণনা করেছেন সেভাবেই গ্রহণ করাই তাফসীরের সঠিক ও নিরাপদ পদ্ধতি। ধন্যবাদ।
২|
২৪ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৩৫
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: এই ব্যাখ্যা কি কুরআনের স্বীকৃত তাফসীরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
............................................................................................
এটা আমার ও প্রশ্ন সবাই কি কুরআনের ব্যাখা সহিভাবে করতে পারে ?
এর প্রয়োজন কেন ?
প্রকৃত কেউ জানার আগ্রহ থাকলে , স্বীকৃত ও জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট যেতে পারেন ।
২৪ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪২
নতুন নকিব বলেছেন:
আপনার কথা যৌক্তিক, সবাই কুরআনের তাফসীর সঠিকভাবে করতে পারে না। তাফসীর একটি বিশেষ জ্ঞানশাস্ত্র, যার জন্য ভাষাগত দক্ষতা, সহীহ হাদিস ও স্বীকৃত আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা জরুরি। তাই প্রকৃতভাবে জানতে চাইলে মনগড়া ব্যাখ্যার পথে না গিয়ে স্বীকৃত ও জ্ঞানী আলেমদের তাফসীর অনুসরণ করাই সঠিক পদ্ধতি।
ধন্যবাদ।
©somewhere in net ltd.
১|
২৪ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২১
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী নক্ষত্র এবং উল্কা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌত সত্তা, যার একটি কোটি মাইল দূরের গ্যাসপিণ্ড এবং অন্যটি বায়ুমণ্ডলের অতি কাছের মহাজাগতিক ধূলিকণা। এই মৌলিক বৈজ্ঞানিক পার্থক্যটি স্মরণে রাখলে অদৃশ্যের বিষয়গুলোকে বিজ্ঞানের কোনো পরিবর্তনশীল থিওরির ছাঁচে না ফেলে বরং একে একটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করাই সবচেয়ে যৌক্তিক।