| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নতুন নকিব
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।
শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য
ছবি, সংগৃহিত।
সারসংক্ষেপ
রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের গভীর অধ্যয়নে প্রতীয়মান হয় যে বহু নৈতিক ও সামাজিক অপরাধ রোজা ভঙ্গ না করলেও রোজার সওয়াব, বরকত ও তাকওয়াভিত্তিক উদ্দেশ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই প্রবন্ধে রোজা রেখে মিথ্যা, গীবত, ঘুষ, দুর্নীতি, অশ্লীলতা, ঝগড়া-বিবাদ ও সামাজিক অনাচারের শরিয়াহগত অবস্থান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
১. ভূমিকা
রোজা (সিয়াম) ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এবং এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয় বরং মানব চরিত্র গঠনের একটি পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। কুরআন মাজিদে রোজার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে তাকওয়া অর্জনের কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং রোজা শুধু পানাহার বর্জনের নাম নয় বরং আত্মশুদ্ধি, নৈতিক সংযম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গঠনের একটি সমন্বিত ইবাদত। এই প্রবন্ধে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো রোজা রেখে নৈতিক অপরাধ সংঘটিত হলে তার ফিকহি ও আখলাকি পরিণতি কী।
২. রোজা ভঙ্গের ফিকহি সংজ্ঞা
চার মাজহাবের স্বীকৃত ফিকহি গ্রন্থসমূহে রোজা ভঙ্গের মৌলিক কারণগুলো প্রায় অভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো হলো ইচ্ছাকৃত পানাহার, ইচ্ছাকৃত যৌন সংসর্গ বা এর সমপর্যায়ের কার্য এবং নির্দিষ্ট শর্তে শরীরের অভ্যন্তরে কোনো বস্তু প্রবেশ করানো।
এই সীমার বাইরে সংঘটিত অধিকাংশ পাপাচার রোজা ভঙ্গ করে না। তবে এসব কাজ রোজার সওয়াব ও কবুলিয়তকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখযোগ্য ইবনু কুদামার আল মুগনি ও আল কাসানির বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
৩. কুরআন ও হাদিসে রোজার নৈতিক উদ্দেশ্যঃ
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা ইরশাদ করেন-
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। -সূরা আল বাকারা ১৮৩
হাদিসের দলিল
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ পরিত্যাগ করে না আল্লাহর কাছে তার পানাহার ত্যাগের কোনো প্রয়োজন নেই। -সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯০৩
এই আয়াত ও হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে নৈতিকতা ছাড়া রোজা তার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যে পৌঁছায় না।
৪. নৈতিক ও সামাজিক অপরাধসমূহ: ফিকহি অবস্থান
রোজা রেখে যে সকল কাজ ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মিথ্যা বলা, গীবত ও চোগলখুরি, ঘুষ গ্রহণ, মজুদদারি ও কৃত্রিম দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আমানতের খেয়ানত ও আত্মসাৎ, অশ্লীল কথা বলা বা অশ্লীল লেখা ও দৃশ্য উপভোগ করা এবং প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া।
ফিকহি দৃষ্টিতে এসব কাজ দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয় না। নৈতিক দৃষ্টিতে এগুলো কবিরা গুনাহ। রূহানি দৃষ্টিতে এসব কাজ রোজার সওয়াব ধ্বংস করার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।
গীবত সম্পর্কে হাদিস
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ الْغِيبَةُ تُفْطِرُ الصَّائِمَ
গীবত রোজাদারকে ইফতার করিয়ে দেয় অর্থাৎ তার রোজার সওয়াব নষ্ট করে দেয়। -শুআবুল ঈমান, আল বায়হাকি
৫. জিহ্বা, দৃষ্টি ও ডিজিটাল যুগ
আধুনিক যুগে জিহ্বার গুনাহ কেবল মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্লগ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তা বহুগুণে বিস্তৃত হয়েছে। রোজা রেখে গালাগালি, অনলাইন কুৎসা, চরিত্রহনন কিংবা লালসার দৃষ্টিতে তাকানো রোজা ভঙ্গ না করলেও তাকওয়ার চেতনাকে ধ্বংস করে।
হাদিসের দলিল
الصِّيَامُ جُنَّةٌ فَإِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ صَائِمًا فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ
রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া না করে। -সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৫১
৬. সামাজিক আচরণ ও পারিবারিক নৈতিকতা
বাসে ঝগড়া করা, সহযাত্রীকে কষ্ট দেওয়া, ইফতারের খাবার নিয়ে দাম্পত্য কলহ কিংবা তারাবি আট না বিশ রাকাত নিয়ে বিবাদ রোজার আত্মসংযমী শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফিকহি বিচারে রোজা বহাল থাকলেও এসব আচরণ রোজার বরকত ও রূহানি উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৭. চুরি, দুর্নীতি ও রোজার কবুলিয়ত
রোজা রেখে চুরি, দুর্নীতি ও অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা রোজা ভঙ্গ না করলেও এমন রোজার কবুলিয়ত গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
হাদিসের দলিল
رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَالْعَطَشُ
অনেক রোজাদার আছে যাদের রোজা থেকে প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা। -ইবনু মাজাহ, হাদিস ১৬৯০
৮. উপসংহার
এই গবেষণাধর্মী আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে রোজা ভঙ্গ হওয়া এবং রোজা ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। নৈতিকতা ও তাকওয়া ছাড়া রোজা কেবল শারীরিক উপবাসে পরিণত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে রোজার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তাকওয়াভিত্তিক চরিত্র গঠন। সুতরাং রোজা আমাদের পেট নয় বরং চরিত্র শুদ্ধ করার ইবাদত।
তথ্যসূত্র (References)
১। আল কুরআনুল কারিম
২। সহিহ আল বুখারি
৩। সহিহ মুসলিম
৪। ইবনু মাজাহ
৫। আল বায়হাকি,
৬। শুআবুল ঈমান ইবনু কুদামা,
৭। আল মুগনি আল কাসানি,
৮। বাদায়েউস সানায়ে আল নওয়াবি,
৯। আল মাজমু’
এই পোস্টটি ব্লগার গোবিন্দলগোবেচারা -কে উৎসর্গ করছি। মূলতঃ তার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই এই পোস্টটির অবতারনা। তার সেই প্রশ্নগুলোর আলাদা করে উত্তরও নিচে যুক্ত করা হলো-
প্রশ্নগুলোর শরিয়াহভিত্তিক সারসংক্ষেপ
উল্লিখিত ১ থেকে ২৪ নম্বর প্রশ্নে আলোচিত অধিকাংশ কাজ যেমন মিথ্যা বলা, ঘুষ গ্রহণ, গীবত ও চোগলখুরি, মজুদদারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আমানতের খেয়ানত, আত্মসাৎ, কটু ও অশ্লীল কথা বলা, অন্যের হক নষ্ট করা, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া, ঝগড়া-বিবাদ, লালসার দৃষ্টি, উপহাস, পারিবারিক কলহ কিংবা চুরিদারি - এসব কাজ ফিকহি দৃষ্টিতে রোজা ভঙ্গ করে না। তবে শরিয়াহর নৈতিক মানদণ্ডে এগুলো স্পষ্টতই কবিরা গুনাহ বা মারাত্মক অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। ফলে এসব গুনাহ রোজার বাহ্যিক কাঠামো বহাল রাখলেও রোজার সওয়াব, বরকত ও তাকওয়াভিত্তিক উদ্দেশ্যকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একইভাবে উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া, সেহরির অনেক আগে অযথা চেঁচামেচি করে ঘুম নষ্ট করা, অনলাইনে গালাগালি, সারাদিন খেল-তামাশায় সময় নষ্ট করা, নাপাক অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে গোসল বিলম্বিত করা, অতিরিক্ত ও অপচয়মূলক ইফতার, কিংবা তারাবি আট না বিশ রাকাত নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া - এসব কাজ রোজা ভঙ্গ না করলেও রোজার রূহ ও নৈতিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিশেষত যেসব আচরণে মানুষের কষ্ট, অহংকার, লোভ বা আত্মসংযমের অভাব প্রকাশ পায়, সেগুলো রোজার প্রকৃত লক্ষ্যকে ব্যর্থ করে দেয়।
চূড়ান্তভাবে বলা যায়, এসব কাজ রোজা ভাঙে না, কিন্তু রোজাকে ধ্বংস করে দেয়। বহু মানুষের রোজা কেবল ক্ষুধা ও পিপাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, কারণ চরিত্র, জিহ্বা, দৃষ্টি ও আচরণে রোজার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। অথচ ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজার আসল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন ও নৈতিক চরিত্র গঠন। সুতরাং রোজা কেবল উপবাসের নাম নয়, বরং নিজেকে গুনাহ থেকে সংযত রাখার এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ।
আল্লাহ তাআ'লা আমাদেরকে সহিহ আমল করার তাওফিক দান করুন। ইখলাসের সাথে প্রতিটি আমল আমরা যাতে করতে পারি, সেই সৌভাগ্য আমাদেরকে নসিব করুন।
০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:২৬
নতুন নকিব বলেছেন:
আপনি যেন এবারের রমজানে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী অনেক অনেক বাজার করতে পারেন, একান্তভাবে এই প্রার্থনা রাখছি। আর এটাও চাচ্ছি, যেন আমার আত্মশুদ্ধির জন্য আপনার প্রার্থনা আল্লাহ তাআ'লা কবুল করে নেন।
আর আপনার ওস্তাদকে আপনি বলে দিবেন, তিনি যেন ব্লগারদের বিষয়ে অভদ্র, অবান্তর এবং কটাক্ষপূর্ণ বাজে মন্তব্য না করেন। কুরআন এবং ইসলাম ধর্মকে তিনি যেন সামন্ত যুগের মানব রচিত বিষয় বলে উপহাস না করেন।
©somewhere in net ltd.
১|
০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫
রাজীব নুর বলেছেন: আপনার যেন আত্মশুদ্ধি হয়।
এই প্রার্থনা আমার। ওস্তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবেন। আর ওস্তাদের পোষ্টে ভদ্র সভ্য মন্তব্য করিবেন।