| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
২০১৮ সালের জানুয়াররি মাসের শেষদিকে হঠাৎ ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা জোসনা বেগম প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রবল কাশির সাথে এক পর্যায়ে বেরিয়ে এলো রক্ত। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ডাক্তারের কাছে, এক্সরে করতে বললেন ডাক্তার। এক্সরে-তে দেখা গেল, জোসনা বেগমের ফুসফুসে একটা বুলেট ঢুকে আছে!
জোসনা বেগমের ফুসফুসে বুলেট এলো কোথা থেকে?
জানতে হলে যেতে হবে একটু পেছনে, ১৯৭১ সালে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তখন বর্বর গণহত্যা চালাচ্ছে সারা দেশজুড়ে। ঢাকার শাহজাহানপুরে থাকতেন জোসনা বেগম, পরিবারের সাথে। একাত্তরের সেইদিন প্রচন্ড গোলাগুলি হচ্ছিল, ঘরের ভেতরে বিছানায় বসে ছিলেন জোসনা। হঠাৎ কাঁচা বাড়ির ঘরের চাল ফুটো হয়ে বিছানার ওপর বসে থাকা জোসনার বুকে পাকিস্তানীদের গুলি লাগে। অপারেশন করে বের করা হয়েছিল একটা গুলি, কেউ কল্পনাও করতে পারেনি আরো একটা গুলি ফুসফুসেই আটকে আছে! ১৯৭১ সালের পর আর কখনো জোসনার বুকের এক্সরে কিংবা শারীরিক পরীক্ষা করা হয়নি। বুলেটটাও আর ব্যাথা দেয়নি, চুপচাপ পড়ে ছিল বুকের ভেতরে, ফুসফুসে আটকে। তাই আর টের পাওয়া যায়নি যে পাকিস্তানীদের ছোঁড়া বুলেটই বহন করে চলেছেন জোসনা আজ প্রায় ৪৭ বছর ধরে। জোসনার স্বামী বোরহানুল্লাহ সাত বছর আগে মারা গেছেন। তাদের এক মেয়ে ও তিন ছেলে।
মোট ৬/৭টা গুলি সারা শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল। শুধু এটাই বের করা যায়নি। এতদিন সমস্যা হয়নি। ভুলেই গিয়েছিলেন গুলির কথা।কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বয়স বেড়েছে, ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটা, ফুসফুসটা আর পাকিস্তানীদের একাত্তরের নৃশংসতা আর বর্বরতার চিহ্ন বয়ে বেড়াতে পারছে না। তাই হঠাৎ করেই ফুসফুসটা জানান দিল এই বুলেটের কথা। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে বুলেটটি তার ফুসফুসের ভেতর আটকে আছে। তাই রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এটি বের করার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না চিকিৎসকরা। গতকাল রবিবার (২৮ জানুয়ারি) অনলাইন পত্রিকা বাংলা ট্রিবিউনকে এ কথা নিশ্চিত করেছেন তার চিকিৎসক ও জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ইএমও ফাতেহ আকরাম দোলন।
তিনি বলেন, জোসনা নামের ওই বৃদ্ধার স্পাইরোমেট্রি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তার ফুসফুসের মধ্যে বুলেটটি আটকে আছে। এ কারণে এটি বের করা সম্ভব নয়। তার শরীরে বুলেটটি এভাবেই থেকে যাবে। আগামীকাল সোমবার অর্থাৎ আজ তার সিটি স্ক্যান করা হতে পারে। রোগীর শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু তার শরীর থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে তাই দুর্বল হয়ে পড়াটা স্বাভাবিক।বর্তমানে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ১৪/১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৩১ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন জোসনা। তবে তাকে সার্বিক চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জোসনা বেগম যুদ্ধ করেননি। মুক্তিযোদ্ধা সনদও তার নেই। এমন কোন প্রমাণ তার কাছে নেই যা দ্বারা তিনি একাত্তরে পাকিস্তানীদের বর্বরতাকে তুলে ধরতে পারবেন। কিন্তু কে জানতো, মুক্তিযুদ্ধ না দেখা এই প্রজন্মের সামনে পাকিস্তান নামের নির্লজ্জ নরপিশাচে ভরা রাষ্ট্রটির পৈশাচিকতা তুলে ধরতে তাদেরই ছোঁড়া একটা জলজ্যান্ত বুলেট সযত্নে ধরে রেখেছে তার ফুসফুস!
The bullet that failed to stop Bengali Spirit with its predecessors
জোসনা বেগমের ফুসফুসে আটকে থাকা এই বুলেট আমাদের টাকায় কেনা হয়েছিল। কিনেছিল পাকিস্তানী ইয়াহিয়া সরকার। তারা এই বুলেট ব্যবহার করেছে আমাদের বিরুদ্ধেই, আমাদের হত্যা করতে, মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। কি অদ্ভুত ব্যাপার, এই বুলেট টিকে আছে আমাদের শরীরেই, টিকে আছে সসম্মানে! যদিও যেই আমাদের জন্য, স্বাধীন বাংলাদেশের উত্তরসূরীদের জন্য জোসনার মত অসংখ্য মানুষ পাকিস্তানী বুলেট বয়ে নিয়ে চলেছেন আজ ৪৭ বছর ধরে, সেই আমরা ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ করি, পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দেই, খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে মানা করি, আফ্রিদির সাথে জোসনাদের মেশাতে মানা করি। কবে না কবে কি একটা যুদ্ধ হইছিল, গন্ডগোল হইছিল, তার জন্য এখন পাকিস্তানকে ভালোবাসা যাবে না, এটা কোনো কথা হলো?
এরপরও তোমরা আর কি কি বলে পাকিস্তান ও পাকিস্তানিদের ভালোবাসবে?
ছবি- বাংলা ট্রিবিউন।

©somewhere in net ltd.